নারী

ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকারের আকর্ষনীয় শ্লোগানে নারী নির্যাতন

সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করলে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ এর অর্থ দাড়াঁয় সমাজের সকল কাজে পুরুষের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করে নারীর আর্থিক প্রতিষ্ঠাসহ ক্ষমতা ও অধিকার অর্জন। কিন্তু, প্রকৃত অর্থে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে শোষণের লক্ষ্যে এটা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের এক নতুন চক্রান্ত। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে যেখানে কোটি কোটি পুরুষদের নেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সেখানে ক্ষমতায়নের নামে পুরুষদের কর্মহীন রেখে নারীদের অসহায়ত্ব ও সস্তা শ্রমকে পুঁজি করছে বিভিন্ন এন.জি.ও এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে, একদিকে তারা  অর্জন  করছে  বিশাল  অঙ্কের  মুনাফা,  আর  অন্যদিকে  সাহায্য-সহযোগীতার  নামে জোরপূর্বক ধর্মান্তরসহ সকল স্তরে নষ্ট করছে ইসলামী মূল্যবোধ।

নারী-পুরুষের  সমঅধিকারের ধারণাটি  মূলতঃ  সৃষ্টি হয়েছে  এমন  এক  পুঁজিবাদী  সমাজে যেখানে অর্থ উপার্জনের কারণে সমাজ ও পরিবারে পুরুষরা ছিলো মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ও সম্মানিত। আর উপার্জন না করতে পারায় গৃহিনী ও মা হিসাবে নারী ছিলো চরমভাবে নির্যাতিত  আর  উপেক্ষিত।  নির্যাতিত  এই  নারীদের  ছিলো  না  সম্পদের  মালিকানা, উত্তরাধিকার, শিক্ষা, উপার্জন বা ভোটের অধিকার। মূলতঃ এই রকম এক চরম বঞ্চনা পূর্ণ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই শুরু হয় ‘সমঅধিকার’ আন্দোলন। বস্তুতঃ সমঅধিকার আন্দোলন নারী-পুরুষকে ঠেলে দিয়েছে পরস্পর বিপরীতমুখী এক অবস্থানে। নিজ অধিকার নিশ্চিত করতে  পশ্চিমা  বিশ্বের  নারীরা  অবতীর্ন  হয়েছে  পুরুষদের  সাথে  এক  ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতায়। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে তো পারেইনি বরং নারীর উপর নির্যাতন বেড়েছে বহুমাত্রায়।

সমঅধিকার আন্দোলন থেকে সবচাইতে বেশী লাভবান হয়েছে পুরুষরা। কারণ, তারা এখন অবলীলায় সন্তান লালন-পালন সহ পরিবারের ভরণপোষনের দায়িত্বও চাপিয়ে দিচ্ছে নারীদের উপর। আর, ঘরে বাইরে দু’দিক সামলাতে গিয়ে নারী হচ্ছে চুড়ান্ত মানসিক আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার। অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে নারীরা হয়ে যাচ্ছে পরিবারের প্রতি উদাসীন। আর, সংসারে দীর্ঘ সময় মায়ের অনুপস্থিতিতে মাদকাসক্তি বা

নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে এ দেশের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যত। আসলে, ‘সমঅধিকার আন্দোলন’ আমাদের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে সমাজ ও পরিবারকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে পুঁজিবাদী বিশ্বের এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত। এ চক্রান্তের ফলে একদিকে ধ্বংস হচ্ছে সমাজে ইসলামী মুল্যবোধ আর অপরদিকে শক্তিশালী হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধকেন্দ্রিক ধ্যান-ধারনা।

নারীদের ক্ষমতায়ন সমতার ফলাফল:

 শ্রমজীবী নারী:  পুরুষের পাশাপাশি মাটি কাটা, ইট ভাঙ্গা কিংবা দিনমজুরীর কাজ করলেও প্রায় সকল ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিকরা শিকার হচ্ছে প্রচন্ড পরিমাণ বেতন বৈষম্যের।  যেমনঃ  দিনমজুর  হিসাবে  সারাদিন  একই  পরিশ্রমের  জন্য  পুরুষরা যেখানে পাচ্ছে ২০০ টাকা, সেখানে নারীকে দেয়া হচ্ছে ১৫০ টাকা। আর, পোশাক শিল্পে  কর্মরত  হাজার  হাজার  নারীর  সস্তা  শ্রমকে  পুঁজি  করে  বহুজাতিক কোম্পানীগুলো প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে তাদের লাভের অঙ্ক। এছাড়া, অস্বাস্থ্যকর আর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘসময় কাজ করতে গিয়ে নারীর জীবন হচ্ছে দুর্বিসহ। কর্মক্ষেত্রে বা রাস্তা-ঘাটে তারা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার। আর, অবুঝ সন্তানকে সাথে করে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর কিংবা বিপদজনক পরিবেশে কাজ করার ফলে মায়ের সাথে সাথে সন্তানের জীবনও হচ্ছে ঝুঁকির সম্মুখীন।

 এন.জি.ও  প্রতিষ্ঠানগুলোর শোষন  নির্যাতন: ক্ষুদ্রঋণের যাদুস্পর্শে এদেশের দরিদ্র নারীদের ভাগ্য উন্নয়নের কষ্টকল্পিত বর্ণনা রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু, বাস্তবতা হলো, দাদন ব্যবসায়ীদের মতো এন.জি.ও প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামের সহজ- সরল নারীদের চড়াসুদে ঋণ দিয়ে ক্রমশঃ জড়িয়ে ফেলছে ক্রমবর্ধমান সুদের এক কঠিন শৃঙ্খলে। ক্ষুদ্র ঋণ তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন করছেই না, বরং বেশীর ভাগ সময়ই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে নারীরা হারাচ্ছে নিজের সঞ্চিত অর্থ, গরু-বাছুর, জমিজমা, ভিটেমাটি সবকিছু। কেউ বা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, আর কেউ বা প্রচন্ড মানসিক ও আর্থিক চাপে জর্জরিত হয়ে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। মূলতঃ এক্ষেত্রেও নারীকে ক্ষমতায়নের স্বপ্নে বিভোর করে তাদের অসহনীয় দারিদ্রতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করা হচ্ছে। আর মুনাফা লাভের আশায় এ ধরনের প্রতারণা মূলক কাজকে সহায়তা দিচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের দাতা সংস্থাগুলো।

 ফটো সুন্দরী,  মডেলিং এবং ফ্যাশন শো: গত প্রায় এক দশকেরও বেশী সময় ধরে এদেশে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে হচ্ছে সুন্দরী প্রতিযোগিতা, ফ্যাশন শো কিংবা রূপসী তোমার গুনের খোঁজে জাতীয় বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। কিন্তু, কাগজে কলমে রূপসীর গুন খুঁজে বের করা উদ্দেশ্য হলেও এর পেছনে রয়েছে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এজেন্ডা। কারণ, এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলোর সাথে ফ্যাশন, বিউটি, ডায়েট, কসমেটিকস কিংবা বিউটি ম্যাগাজিন ইন্ডাস্ট্রিগুলো সরাসরি জড়িত। তাই, একদিকে নারীর সৌন্দর্যকে পুঁজি করে এদেশে বহুজাতিক কোম্পানীগুলো করছে জমজমাট ব্যবসা আর অন্যদিকে গণমাধ্যমে নারীদেহের খোলামেলা প্রদর্শন নারীকে পরিণত করছে নিরেট ভোগ্যপণ্যে। যার প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে নারীরা সর্বত্র হচ্ছে নির্যাতিত।

পতিতাবৃত্তি নারী পাচার:  নারীর জীবনে চরম অবমাননাকর আর ঘৃন্য পেশা হচ্ছে পতিতাবৃত্তি। মূলতঃ দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠির নুন্যতম মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ এ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাই দু’মুঠো ভাতের যোগারে হাজার হাজার নারীকে ঠেলে দিয়েছে চরম ঘৃন্য এ পেশায়। তারপর আবার পতিতা হবার অপরাধে তাদের করেছে সমাজচ্যুত। আর হীন স্বার্থান্বেষী এক শ্রেনীর মানুষ নারীর এ অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তার জীবন আর সম্মানের বিনিময়ে করছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। বস্তুতঃ এদেশে পতিতাবৃত্তির প্রধান শিকার অভিভাবক ও আশ্রয়হীন শিশু- কিশোরীরা। যাদের কাজ দেবার নামে মোটা অঙ্কে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন পতিতালয়ে কিংবা পাচার করা হচ্ছে দেশের বাইরে। আর, একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবি এ সব অসহায় নারীদের দায়িত্ব এড়ানোর জন্য জঘন্য এই পেশাকে অন্য সব পেশার মতো সামাজিক স্বীকৃতি দেবার দাবী জানাচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে, সমঅধিকার, মুক্তি, ক্ষমতায়ন এ সবই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের শোষনের হাতিয়ার, যা দিয়ে তারা সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বিস্তার করেছে শোষন আর নির্যাতনের জাল। নিত্যনতুন গালভরা শোগানে প্রস্তুত করেছে নারী নির্যাতনের নানারকম ক্ষেত্র। ফলশ্রুতিতে, মুক্তির মিথ্যা শোগানে আজ নির্যাতিত হচ্ছে বিশ্ব নারী সমাজ। আসলে, ক্ষমতায়ন, শিক্ষা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠা নয়, শুধুমাত্র সমাজের সর্বস্তরে ইসলামের সঠিক বাস্তবায়নই নারীকে মুক্তি দিতে পারে চলমান এই নির্যাতন থেকে। কারণ, আলাহতায়ালা নারী-পুরুষ উভয়কেই সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন একটি শান্তি ও সৌহার্দপূর্ণ সমাজ তৈরীতে নারী এবং পুরুষের কি ভূমিকা হওয়া উচিত। অথবা কেমন হওয়া উচিত তাদের পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী এবং আচরন। প্রকৃতপক্ষে একটি ইসলামিক সমাজ না পুরুষতান্ত্রিক, না নারীতান্ত্রিক। বরং এটা এমন এক মানবসমাজ যেখানে নারী ও পুরুষ পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। প্রত্যেকেরই উপরই  রয়েছে  আলাহ প্রদত্ত নির্ধারিত  দায়িত্ব, যা  পালনের মাধ্যমে  তারা  দুনিয়া এবং আখেরাত উভয়ক্ষেত্রেই সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে। আর এরকম একটি ভারসাম্য পূর্ণ সমাজের নিশ্চয়তা দিতে পারে শুধুমাত্র আলাহ প্রদত্ত ‘খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা’। একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পারে পুঁজিবাদী সমাজ কর্তৃক নারীকে পণ্যে পরিণত করার এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্র নষ্যাৎ করতে। সমাজের সর্বস্তরে আলাহ্‌’র আইনের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্ধ করতে পারে নারীর প্রতি এই ক্রমবর্ধমান নির্যাতন, নিশ্চিত করতে পারে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রাপ্য অধিকার।

মতামত দিন