আখলাক

সংস্কৃতিঃ অনুকরণ ও অনুসরণ

সংস্কৃতিঃ অনুকরণ অনুসরণ

মুহাম্মাদ আতাউর রহমান

 অনুলিখন: নাজমুল চৌধুরী

এই পৃথিবীর বুকে আবহমান কাল ধরে লক্ষ লক্ষ জাতি, গোত্র, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা প্রভৃতি বিদ্যমান। প্রতিটি জাতি, গোষ্ঠী, গোত্রের রয়েছে পৃথক পৃথক আচার, ব্যবহার, রীতি-নীতি, আইন কানুন ইত্যাদি। প্রত্যেকেরই আছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি জাতিকে সু-শৃঙ্খল, সুন্দরতম, আদর্শবান, কর্ম নিষ্ঠাবান রূপে তুলে ধরা যায়। সংস্কৃতি মানব জীবনকে আদর্শবান রূপে গড়ে তুলতে পারে আবার পারে আদর্শহীন, নিকৃষ্ট, জঘন্য বানাতে। সমাজ থেকে নিয়ে রাষ্ট্র পর্যায়ে সংস্কৃতির বিস্তার পরিলক্ষিত হয়।

আদর্শবান, কর্মনিষ্ঠ, সুশৃঙ্খল, মহান, সৌহার্দপূর্ণ মানসিক মূল্যবোধ সম্বলিত জাতি গঠনে সংস্কৃতির তুলনা নেই।

বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরার জন্য সংস্কৃতি কি? সে সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন। সংক্ষিপ্ত কথায় সংস্কৃতি হচ্ছে- All the arts, beliefs, social institutions, Characteristics of a community, race etc.

আবার অন্যভাবে ব্যক্ত করা যেতে পারে।

Culture is what man has created material and non-material.

মোট কথা সংস্কৃতির সংজ্ঞা মনিষীগণ বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। সংস্কৃতির ভাবধারা জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করার জন্য সংস্কৃতি বিশারদগণ বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান চালু করেছেন।

জাতীয় পর্যায়ে সংস্কৃতিক ভানধারা, আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, প্রগতিশীল পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে যে সব আচার ব্যবহার, অনুষ্ঠান দেখা যায় তা আমাদের দেশের মুসলিম জন সাধারণ বিশেষ করে যারা প্রগতি-পন্থীদের ‌অনুকরণে সুখবোধ করেন, নিজেকে ধন্য মনে করেন, তারা নির্বিচারে পালন করেন। প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, হাই সোসাইটী, নাস্তিক পণ্ডিত, সোস্যালিজম, কমিউনিজম, গান্ধিইজম হচ্ছে বর্তমান মানুষের তথা মুসলিম নামধারীদের আদর্শের অন্যতম উৎস। অন্ধ অনুকরণ ও অনুসরণ প্রিয়তা সর্বদা ন্যায়নীতি ও সঠিক আদর্শের মুলে কুঠারঘাত করার উদাত্ত আহবান জানায়। প্রগতি পন্থীরা এদেশের সমাজে নয়া বান ডেকে এনেছেন। অভিবাদন, শিষ্ঠতা, সম্ভাষন, সালাম ও সম্মান প্রদর্শন প্রতিটি জাতির মাঝে দেখা যায়। প্রগতিপন্থীরা পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। তাই তাদের একে অপরের সাক্ষাৎ কালে বা বিদায়ের সময় বলতে দেখা যায়-

Good morning, Good day, Good bye, Tata ইত্যাদি। Good morning বাক্যটিতে দুইটি শব্দ আছে Good=শুভ বা ভাল morning প্রভাত বা সকাল। শব্দ দ্বয়ের সমন্বয় ঘটালে ইহার অর্থ হবে সু-প্রভাত বা ভাল সকাল। যদি কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ কালে পরস্পর বলা বলি করে ভাল সকাল! ভাল সকাল! সুপ্রভাত! সুপ্রভাত! তা হলে এই শব্দদ্বয় দ্বারা কি ভাব প্রকাশ পেল?

প্রগতিশীল পণ্ডিত মুর্খরা ভেবে দেখেছেন কি? উল্লেখ্য যে, পাশ্চাত্যে শ্বেতাঙ্গ নরনারী গণের Good morning-এর মতো জাহিলি যুগের বর্বর, মুর্খ আরবগণ ‘সাবাহাল খায়ের’ শ্বদদ্বয় ব্যবহার করত।

 

Good morningএর স্বরূপ সন্ধানঃ “সাবাহাল খায়র” বা “গুড মর্নিং”-এর উৎপত্তি সম্পর্কিত একটি বিরাট ইতিহাস রয়েছে। সংক্ষেপে বলা চলে যে, এই ধরা পৃষ্ঠে এমন কতগুলি জাতি ছিল যারা খোদাদ্রোহী। আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন সময় গজব, আযাব অবতীর্ণ করে ছিলেন। কখন সকালে, কখন গভীর অন্ধকার রাত্রিতে কখনোবা প্রাতঃকালে আবার কখন মধ্যাহ্ন কালে এই সব গজব, আযাব আপতিত হত। সাইক্লোন, জলোচ্ছাস, শিলাবৃষ্টি, রক্ত বাদল, ভূমিকম্প ইত্যাদির দ্বারা সেই সমস্ত অবাধ্য, বিবেকহীন, খোদাদ্রোহী, স্বেচ্ছাচারী, বর্বর জাতি বা জনপদ গুলিকে বিরান করে ছিলেন। এই সব বিপদগ্রস্থ জাতির লোক জন যদি কোন দিন বা রাত্রিতে বেঁচে যেত, তবে বলত, ‘ইয়া সাবাহাল খায়ের’। ‘আজকের প্রভাত কত মনোরম’। সেই অন্ধকার যুগের আরবরা লুটতরাজ, মারামারি, হানাহানি, গোত্রদ্বয়, রক্তপাত, অপহরণ ইত্যাদিতে কুখ্যাত ছিল। সশস্ত্র ডাকাত দল অন্ধকার রাত্রিতে অতর্কিত ভাবে আক্রমন করত। চালাত হত্যার ষ্টিম রোলার। ডাকাতদের আক্রমন হতে রক্ষা পাবার জন্য তাহারা আত্মগোপন করত এবং নিরাপদে রাত্রি যাপন করতে পারলে প্রাতকালে বলত ‘ইয়া সাবাহাল খায়ের’। যেহেতু আরবী ও ইংরেজী বাক্যদ্বয়ের অর্থ একই সেহেতু মুসলমানগণ নিজেদের সংস্কৃতি রেখে কিভাবে ইহা বলতে পারে? পশ্চিমা শেতাঙ্গ ও তাদের দোসর প্রগতি পন্থীদের অনুকরণে আমরা আনন্দ উপভোগ করি। নিজেদেরকে ধন্য মনে করি। ভদ্র বলে আত্ম প্রকাশ করি। প্রকৃতপক্ষে প্রগতি পন্থীদের অনুকরণে ভদ্রতা প্রকাশ করা সম্ভব? কখনও কি ভাববার অবকাশ পেয়েছি আমরা কার অনুকরণ ও অনুসরণ করব? কাকে আদর্শের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করব? রাসূল (সাঃ) বজ্রকণ্ঠে বলেছেন, ‘ঐ ব্যক্তি আমাদের নয় যে অন্যের ভাব ধারা গ্রহণ করে।’ তিনি এও বলেছেন যে, যার ভাব ও যার অনুকরণ করবে সে (কিয়ামত কেটে) তার সঙ্গী হয়ে উঠবে’ (তিরমিযী)।

অতএব প্রিয়নবীর উম্মত হতে হলে তার নির্ভেজাল সংস্কৃতি গ্রহণ ছাড়া সকল পথ রুদ্ধ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য করা প্রতিটি মুসলমানের কাম্য। প্রশ্ন জাগতে পারে যে, প্রগতিপন্থীদের Good morning, Good day, Good bye, Tata এর পরিবর্তে আমাদের করনীয় কি?

উত্তরঃ

ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহঃ) উভয়েই আবদুল্লাহ বিন উমর হতে হাদীছ বর্ণনা করেছেন যে, জনৈক ব্যক্তি নবীর (সাঃ) দরবারে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, হে আল্লাহর নবী (সাঃ) ইসলামের উত্তম স্বভাব কি? প্রিয় নবী (সাঃ) উত্তর দিয়েছিলেন যে, লোকজনকে খাদ্য দান করা আর পরিচিত-অপরিচিত সকলকে সালাম করা। অর্থাৎ পরস্পরের সাক্ষাতে Good morning, Good day, Good afternoon Tata bye bye ইত্যাদির বদলে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলা। যার অর্থ অত্যন্ত সুন্দর। আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম মানুষ হতে চাইলে প্রগতিবাদীদের শেখানো বুলি না আওরিয়ে সালামের ব্যাপক প্রসার লাভ করার জন্য সচেষ্ট হতে হবে।

হযরত আবু উমামা (রাঃ) বলেন, প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন সেই বলেন, প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা বেশী প্রিয় যে প্রথম সালামদেয়।

বিদায়কালে প্রগতিপন্থী পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবি ও তথাকথিত হাই, সোসাইটীর লোকেরা বলে থাকেন,  Good bye, Tata.

কিন্তু প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন, যখন তোমরা বাড়ী হতে বাইরে কোথাও যাবে, সে সময় বাড়ীর ছোট বড় সকলকে সালাম দ্বারা দোয়া করে যাবে (বায়হাকী)।

অনেকক্ষেত্রে যারা সালাম আদান প্রদান করে থাকেন (বিশেষ করে স্কুল কলেজের ছাত্ররা) তারা কিছুটা হলেও হস্ত উত্তলন করেন। এ সম্পর্কে একটি হাদীছে বলা হয়েছে।

নবী (সাঃ) বলেছেন- খবরদার ইয়াহুদ ও নাসারাগণের রঙ্গে রঞ্জিত এবং তাদের মতাবলম্বী ও ভাববাদী হইও না। কারণ ইয়াহুদীগণ আঙ্গুলির ইশারায় ও খৃষ্টানগণ হস্ত ইমারায় পরস্পর সালাম বিনিময় করে থাকে। অতএব আমাদেরকে নির্ভেজাল সংস্কৃতির অনুসরণ করতে হবে। আমরা মুসলিম জাতি। আমাদের আছে নিজস্ব সংস্কৃতি। তা শিরক বিহীন। কোন জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঢেলে দেওয়ার সফল হাতিয়ার হচ্ছে সংস্কৃতিক আগ্রাসন। দীর্ঘ দুইশত বৎসর ব্যাপি এবং বর্তমান কালেও পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গরা আমাদের সংস্কৃতিকে বিলীন করার লক্ষ্যে তাদের সংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। আমাদেরকে ইয়াহুদি, নাসারগণের হাব-ভাব, কার্যকলাপ, আনুকরণকে পদদলিত করতে হবে। প্রগতিপন্থী পণ্ডিতগণ যে ভয়াবহ মারাত্মক সংস্কৃতিক ব্যাধি ছড়ানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত, তা থেকে বাঁচার প্রধান উপায় নির্ভেজাল সংস্কৃতির অনুসরণ করা।

আত-তাহরীক পুরনো সংখ্যা থেকে নেয়া

মতামত দিন