জীবনী

সাঈদ বিন যায়েদ (রা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

সাঈদ বিন যায়েদ (রা) ছিলেন আশারায়ে মুবাশশারাহ’র অন্যতম সাহাবী। তিনি ছিলেন রাসূল (সা)-এর অন্যতম নিকটতম সাহাবী ও বাল্যকালের পরম বন্ধু। প্রথম পর্যায়ে ইসলামী গ্রহণকারী সাহাবীদের অন্যতম। তাঁর কারণেই কুরাইশ সিংহ উমার (রা) এর মত ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম পর্যায়ের মুজাহিদ ছিলেন। তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও গানীমাত লাভ করেছিলেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে বিজয়ে ঝাণ্ডা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হন। রাসূল (সা) তাকে জীবদ্দশায় জান্নাতী বলে শুভ সংবাদ দেন। তিনি একাধারে ছিলেন একজন শাসক,সাহসী বীর যোদ্ধা ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী।

জন্ম পরিচয়: তাঁর প্রকৃত নাম সাঈদ। কুনিয়াত ‘আবুল আওয়ার’। কারো কারো মতে ‘আবু ছাওর’।তবে প্রথমোক্ত নামেই তিনি বেশী পরিচিত। পিতার নাম যায়েদ। তাঁর মাতার নাম ফাতেমা। তাঁর বংশ পরিক্রমা কা’ব ইবন লুওয়াই পর্যন্ত গিয়ে রাসূল (সা)-এর সাথে এবং নুফাইল ইবনে আব্দুল উযযা পর্যন্ত গিয়ে হযরত উমার (রা)-এর বংশের সাথে মিলিত হয়েছে।

পিতা যায়েদের দ্বীনে ইবরাহীমের উপর অটল থাকা:  সাঈদের পিতা যায়েদ ছিলেন সেই  সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের একজন যারা ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বেই কুফর, শিরক ও পৌত্তলিকতার অন্ধকারে তাওহীদের আলোকবর্তিকা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তনি সেই অন্ধকার যুগেও মুশরিকদের হাতে যবাহকৃত প্রাণীর গোশত ভক্ষণ করতেন না। এ সম্পর্কে বুখারীতে হাদীস রয়েছে।

লাইছ বলেন, হিশাম তাঁর পিতা ও আসম বিনতে আবু বকরের বরাত দিয়ে আমাকে লিখেছেন যে, একদিন আমি যায়েদকে দেখলাম যে, কা’বা ঘরের সাথে স্বীয় পিঠকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলছেন,হে কুরাইশ দল, আল্লাহর কসম! আমি ছাড়া তোমাদের কেউ ইবরাহীম (আ)-এর দ্বীনে অনুসারী নও। আর ইবরাহীম (আ) জীবন্ত প্রথিত শিশু-কন্যাকে জীবিত করতেন।

যখন কেউ তার মেয়েকে হত্যা করতে চাইত, তখন তিনি তাকে বলতেন, একে হত্যা করো না। তোমার পরিবর্তে আমি ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিব। এ বলে তিনি তাকে নিয়ে যেতেন। মেয়েটা যখন বড় হতো, তখন তার পিতাকে বলতেন, তুমি চাইলে আমি মেয়েটাকে তোমায় দিয়ে দিবো। যদি না চাও তবে ভরণ পোষণ করে যাব।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) থেকে বর্ণিত। মহানবী (সা)-এর উপর ওয়াহী নাযিল অবতীর্ণ হবার পূর্বে ‘বালদাহ’ নামক স্থানের নিম্নভাগে যায়েদ বিন আমর এর সাথে মহানবী (সা)-এর সাক্ষাত হয়। তারপর রাসূল (সা)-এর সামনে খাবার আনা হলে তিনি তা খেতে অস্বীকার করলেন এবং যায়েদ এর সামনে ঠেলে দিলেন। অত:পর যায়েদ বললেন, তোমাদের মুর্তির নামে তোমরা যা যবেহ কর, তা আমি কিছুতেই খেতে পারি না। আমি তো কেবলমাত্র তাই খেয়ে থাকি যা যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়। যায়েদ বিন আমর কুরাইশদের যবেহ সম্পর্কে নিন্দা করতেন এবং উক্ত আচরণের প্রতিবাদ ও তার ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত করে বলতেন, বকরীকে সৃষ্টি করলেন আল্লাহ। তিনিই তার জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। তিনিই তার জন্য যমীন থেকে ঘাস লতাপাতা উত্পন্ন করেন। এত কিছুর পর তোমরা তাকে গায়রুল্লাহর নামে যবেহ কর ? আমি তোমাদেরকে একটি মূর্খ সম্প্রদায়রুপে দেখতে পাচ্ছি ?

এ কথা শুনে তাঁর চাচা ও উমার ইবনুল খাত্তাবের পিতা আল খাত্তাব উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর গালে এক থাপ্পর বসিয়ে দিলে বলল-

তোর সর্বনাশ হোক। সব সময় আমরা তোর  মুখে এ ধরণের বাজে কথা শুনে সহ্য করে আসছি। এখন আমাদের সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। তারপর তার গোত্রের বোকা লেকাদের উত্তেজিত করে তাঁকে কষ্ট দিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত করে তুলতো। অবশেষ তিনি বাধ্য হলেন মক্বা ছেড়ে হেরা পর্বতে আশ্রয় নিতে। তাতেও সে ক্ষান্ত হলো না। গোপনেও যাতে তিনি মক্বায় প্রবেশ করতে না পারেন, সেদিকে সর্বক্ষণ দৃষ্টি রাখার জন্য একদল কুরাইশ যুবককে সে নিয়োগ করে রাখে।

অত:পর যায়েদ বিন আমর কুরাইশদের অগোচরে ওয়ারাকা ইবন নাওফেল, আব্দুল্লাহ ইবন জাহাশ, উসমান ইবনুল হারিস এবং মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহর ফুফু উমাইমা বিনতু ‘আবদিল মুত্তালিবের সাথে গোপনে মিলিত হলেন। আরববাসী যে চরম গুমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত সে ব্যাপারে তিনি তাদের সাথে মত বিনিময় করলেন। যায়েদ তাঁদেরকে বললেন:

‘আল্লাহর কসম আপনারা নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন, আপনাদের এ জাতি কোন ভিত্তির ওপর নেই। তারা দ্বীনে ইবরাহীমকে বিকৃত করে ফেলেছে, তার বিরুদ্ধাচরণ করে চলছে। আপনারা যদি মুক্তি চান, নিজেদের জন্য একটি দ্বীন অনুসন্ধান করুন’।

অত:পর এ চার ব্যক্তি ইয়াহুদী, নাসারা ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের নিকট গেলেন দ্বীনে ইবরাহীম তথা দ্বীনে হানীফ সম্পর্কে জানার জন্য । ওয়ারাকা ইবন নাওফিল খৃস্ট ধর্ম অবলম্বন করলেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবন জাহাশ ও উসমান ইবনুল হারিস কোন সিদ্ধান্তে আসলেন না। আর যায়েদ বিন আমর ইবন নুফায়িলের জীবনে ঘটে গেল এক চমকপ্রদ ঘটনা। আমরা সে ঘটনা তাঁর জবানেই পেশ করছি।

‘আমি ইয়াহুদী ও খৃষ্টধর্ম সম্পর্কে অবগত হলাম; কিন্তু সে ধর্মে মানসিক শান্তি পাওয়ার মত তেমন কিছু না পেয়ে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলাম। এক পর্যায়ে আমি শামে (সিরিয়া) এসে উপস্থিত হলাম। আমি আগেই শুনেছিলাম সেখানে একজন রাহিব’ (সংসারত্যাগী) ব্যক্তি আছেন, যিনি আসমানী কিতাবে অভিজ্ঞ। আমি তার নিকট উপস্থিত হয়ে আমার কাহিনী বিবৃত করলাম। আমার কথা শুনে তিনি বললেন- ‘ওহে মক্বাবাসী, আমার মনে হচ্ছে আপনি দ্বীনে ইবরাহীম অনুসন্ধান করছেন’।

বললাম, হ্যাঁ আমি তাই অনুসন্ধান করছি।

তিনি বললেন, ‘আপনি যে দ্বীনের সন্ধান করছেন, আজকের দিনে তো তা পাওয়া যায় না। তবে সত্য তো আপনার শহরে। আল্লাহ আপনার কওমের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তি পাঠাবেন যিনি দ্বীনে ইবরাহীম পুনরুজ্জীবিত করবেন। আপনি যদি তাকে পান তাঁর অনুসরণ করুন।

যায়েদ আবার মক্বার দিকে যাত্রা শুরু করলেন। প্রতিশ্রুত নবীকে খুঁজে বের করার জন্য দ্রুতা পা চালালেন।  তিনি যখন মক্বা থেকে বেশ দূরে তখনই আল্লাহ তা’আলা নবী মুহাম্মাদ (সা)-কে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠালেন। কিন্তু যায়েদ তাঁর সাক্ষাত পেলেন না। কারণ মক্কায় পৌছার পূর্বেই একদল বেদুঈন ডাকাত তাঁর উপর চড়াও হয়ে তাঁকে হত্যা করে।

শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’আ করেন—

‘হে আল্লাহ, যদিও আমি এ কল্যাণ থেকে আমাকে বঞ্চিত করলেন, আমার পুত্র সাঈদকে তা থেকে আপনি মাহরুম করবেন না’।

ইসলাম গ্রহণ : আল্লাহ তাআলা যায়িদের এ দু’আ কবুল করেছেন। রাসূল (সা) লোকদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। প্রথম ভাগেই যাঁরা আল্লাহ ও তার রাসূল (সা) এর উপর ঈমান আনেন তাদের মধ্যে সাঈদও একজন। রাসূল (সা) দারুল আরকামের প্রবেশের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।  তিনি একাই ইসলাম গ্রহণ করেননি, সাথে তাঁর স্ত্রী উমার ইবনুল খাত্তাবের বোন ফাতিমা বিনতুল খাত্তাবও ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের কারণে কুরাইশ বংশের এ যুবক অন্যদের মত যুলুম অত্যাচারের শিকার হন। কুরাইশরা তাঁকে ইসলাম থেকে থেকে ফেরানো দূরে থাক, তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে বরং কুরাইশদের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উমার বিন খাত্তাবকে ইসলামের মধ্যে নিয়ে আসেন।

জিহাদে অংশগ্রহণ : সাঈদ তার যৌবনের সকল শক্তিব্যয় করেন ইসলামের খিদমাতে। তিন যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তার বয়স বিশ বছরও অতিক্রম করেনি। তিন প্রথম পর্যায়ের মুহাজির ছিলেন। তিনি মুহাজিরদের প্রথম দলের সাথে মদীনায় গমন করেন। রাসূল (সা) তার সাথে উবাই বিন কা’ব এর ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দেন। সাঈদ (রা) বদর যুদ্ধ ব্যতীত সকল যুদ্ধেই তিনি বীর বিক্রমে রাসূল (সা)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় হিজরী সনে কুরাইশদের সেই বিখ্যাত বণিক দল, যে দলটিকে উপলক্ষ্য করেই বদর যুদ্ধ সংগঠিত হয়, সে দলটি শাম দেশ হতে আসছির। সে সময় রাসূল (সা) সাঈদ ও তালহাকে গুপ্তচর হিসেবে প্রেরণ করেন। তাঁরা শাম সীমান্তে ‘তুজবার’ নামক স্থানে ‘কশদ জোহানীর’ মেহমান হন। কুরাইশ বণিক দল সীমান্ত অতিক্রম করলে উভয় গুপ্তচর বণিক দলের দৃষ্টি এড়িয়ে মদীনার দিকে দ্রুত রওয়ানা হন, যাতে রাসূল (সা) কে বণিকদলের সংবাদ দিতে পারেন।  কিন্তু বণিক দল কিছুটা সন্দেহ করে সমুদ্র তীরবর্তী পথ ধরে চলতে লাগলো। এই বণিকদল এবং তাদের সাহায্য কারী দল যারা মক্কা থেকে এসেছিল, উভয় দল একত্রিত হয়ে বদর ময়দানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, যার ফলে সমগ্র জগতে ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত হয়।

সাঈদ বিন যায়েদ যখন মদীনায় পৌছেন, তখন বদর যুদ্ধে জয়ী হয়ে ইসলামে গাযীগণ আনন্দিত মনে রণক্ষেত্র হতে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। সাঈদ (রা) যেহেতু  নিজেও একটি খিদমতে আদিষ্ট ছিলেন, তাই রাসূল (সা) তাঁকেও বদর যুদ্ধের মালে গানীমাতের অংশ দান করেন। এবং জিহাদের সাওয়াব প্রাপ্ত হওয়ার সুসংবাদ জানান।

উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধেই তিনি রাসুল (সা)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধিতেও রাসূল (সা)-এর সাথে ছিলেন।

পারস্যের কিসরা ও রোমের কাইসারের সিংহাসন পদানত করার ব্যাপারে তিনি মুসলিম সৈন্যবাহিনীর সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুসলিমদের সাথে তাদের যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয় তার প্রত্যেকটিতে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

ইয়ারমূক যুদ্ধেই তিনি তাঁর বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। তিনি নিজেই বর্ণনা করেন,

‘ইয়ারমুকের যুদ্ধে আমার ছিলাম ছাব্বিশ হাজার বা তার কাছাকাছি। অন্যদিকে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিলো এক লক্ষ বিশ হাজার। তারা অত্যন্ত দৃঢ় পদক্ষেপে পর্বতের মত অটল ভঙ্গিতে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। তাদের অগ্রভাবে বিশপ ও পাদ্রী-পুরোহিতদের বিরাট এক দল। হাতে তাদের ক্রুশ খচিত পতাকা, মুখে প্রার্থনা সংগীত।  পেছন থেকে তাদের সুরে সুর মিলাচ্ছিল বিশাল সেনাবাহিনী। তাদের সেই সম্মিলিত কন্ঠস্বর তখন মেঘের গর্জনের মত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছিল।

মুসলিম বাহিনী এ ভয়াবহ দৃশ্য ও তাদের বিপুল সংখ্যা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। ভয়ে তাদের অন্তরও কিছুটা কেঁপে উঠলো, সেনাপতি আবু উবাইদা তখন উঠে দাঁড়ালেন এবং মুসলিম সৈন্যদের জিহাদে অনুপ্রাণিত করে এক ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে সাহায্য কর, তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন। তোমাদের পা’কে দৃঢ় করবেন।

আল্লাহর বান্দারা! ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্য হলো কুফরী থেকে মুক্তির পথ, প্রভুর রিজামন্দী হাসিলের পথ এবং অপমান ও লজ্জার প্রতিরোধক। তোমরা তীর বর্শা শানিত করে ঢাল হাতে প্রস্তুত হয়ে যাও। অন্তরে  আল্লাহর যিকর ছাড়া অন্য সব চিন্তা থেকে বিরত থাক। সময় হলে আমি তোমাদের নির্দেশ দেব ইনশাআল্লাহ।

সাঈদ (রা) বলেন, তখন মুসলিম বাহিনীর ভেতর থেকে এক ব্যক্তি বেরিয়ে এসে আবু ‘উবাইদাকে বলল, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ মুহুর্তে আমি আমার জীবন কুরবানী করব। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে পৌছে দিতে হবে এমন কোন বাণী কি আপনার আছে ?  আবু উবাইদা বললেন: হ্যাঁ, আছে। তাঁকে আমার ও মুসলিমদের সালাম দিয়ে বললে: ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমাদের রব আমাদের সাথে যে অংগীকার করেছেন, তা আমরা সত্যই পেয়েছি।

সাঈদ (রা) বলেন,

“আমি তাঁর কথা শুনা মাত্রই দেখতে পেলাম সে তার তরবারি কোষমুক্ত করে আল্লাহর শত্রুদের সাথে সংঘর্ষের জন্য অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থায় আমি দ্রুত মাটিতে লাফিয়ে পড়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে অগ্রসর হলাম এবং আমার বর্শাহাতে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। শত্রুপক্ষের প্রথম যে ঘোড় সওয়ার আমাদের দিকে এগিয়ে এলো আমি তাকে আঘাত করলাম। তারপর অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সকল প্রকার ভয়ভীতি একেবারেই দূর করে দিলেন। অত:পর মুসলিম বাহিনী রোমান বাহিনীর ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালাল এবং তাদেরকে পরাজিত করল”।

দিমাশক অভিযানেও সাঈদ বিন যায়েদ অংশগ্রহণ করেন। দিমাশক জয়ের পর আবু ‘উবাইদা তাঁকে সেখানকার ওয়ালী নিযুক্ত করেন। এভাবে তিনি হলেন দিমাশকের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ওয়ালী। কিন্তু জিহাদের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে এ পদ লাভ করে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি আবু ‘উবাইদাকে লিখলেন: আপনারা জিহাদ করবেন, আর আমি বঞ্চিত হবো, এমন আত্মত্যাগ ও কুরবানী আমি করতে পারিনে। চিঠি পৌছার সাথে সাথে কাউকে আমার স্থলে পাঠিয়ে দিন। আমি শিগগিরই আপনার নিকট পৌছে যাচ্ছি। আবু উবাইদা বাধ্য হয়ে ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ানকে দিমাশকের ওয়ালী নিযুক্ত করলেন এবং সাঈদ বিন যায়েদ জিহাদের ময়দানে ফিরে গেলেন।

 

সাঈদ বিন যায়েদ (রা)-এর দুআ :

উমাইয়া যুগে সাঈদ (রা)-কে কেন্দ্র করে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে মদীনাবাসীদের মুখে ঘটনাটি শোনা যেত। ঘটনাটি হলা, আরওয়া বিনতে উওনাইস নামে এক মহিলা দুর্নাম রটাতে থাকে যে, সাঈদ তার জমির একাংশ জবর দখল করে নিজ জমির সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন। যেখানে সেখানে সে এ কথা বলে বেড়াতে লাগলো। একপর্যায়ে সে মদীনার ওয়ালী মারওয়ানের নিকট বিষয়টি উত্থাপন করল। যাচাই করার জন্য মারওয়াক কয়েকজন লোককে তাঁর কাছে পাঠালেন। রাসূলুল্লাহর সাহাবী সাঈদের জন্য বিষয়টি ছিল বেশ কষ্টদায়ক। তিনি বললেন, ‘তারা মনে করে আমি তার উপর যুলম করেছি। কিভাবে আমি যুলম করতে পারি ? আমি তো রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ জমি যুলুম করে নিবে, ক্বিয়ামাতের দিন সাত তবক যমীন তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।

ইয়া আল্লাহ! সে ধারণা করেছে যে, আমি তার উপর যুলম করেছি, যদি সে মিথ্যুক হয় তবে তার চোখ অন্ধ করে দাও, যে কূপ নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করছে এর মধ্যেই তাকে নিক্ষেপ কর এবং আমার পক্ষে এমন আলোক প্রকাশ করে দাও, যাতে মুসলিমদের মাঝে স্পস্ট হয়ে যায়, আমি তার উপর যুলম করি নি।

এ ঘটনার পর কিছুদিন যেতে না যেতেই আকীক উপত্যকা এমনভাবে প্লাবিত হলো যে, অতীতে কখনও এরুপ হয়নি। যলে দু’যমীনের মাঝখানের বিতর্কিত চিহ্নটি এমনভাবে প্রকাশ হয়ে পড়লো যে, মুসলিমরা তা দেখে বুঝতে পারলো সাঈদ সত্যবাদী। তারপর অল্পদিন যেতে না যেতেই মহিলাটি অন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় একদিন সে তার যমীনে পায়চারী করতে করতে বিতর্কিত জমির কূপটির মধ্যে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, আমরা শুনতাম লোকেরা কাউকে অভিশাপ দিতে গেলে বলত, আল্লাহ তোমাকে অন্ধ করুন যেমন অন্ধ করেছেন রওয়া। এ ঘটনায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন, তোমরা মযলুমের দুআ থেকে দূরে থাক। কারণ সেই দুআ ও আল্লাহর মাঝে কোন প্রতিবন্ধক থাকে না। এই যদি হয় সব মাযলুমের অবস্থা, তাহলে ‘আশারায়ে মুবাশশারাহ’ বা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জনের একজন সাঈদ বিন যায়েদের মত মাযলুমের দু’আ কবুল হওয়া তেমন আশ্চর্য কি ?

 

সাহাবীগণের মর্যাদা: আবু নু’আইম বিরাহ ইবনুল হারিস থেকে বর্ণনা করেন, মুগীরা একটি বড় মসজিদে বসে ছিলেন। তখন তাঁর ডানে বামে কুফার কিছু লোক বসেছিল। এমন সময় সাঈদ নামক এক ব্যক্তি আসলে  মুগীরা তাঁকে সালাম করে খাটের উপর পায়ের দিকে বসলেন। অত:পর কুফাবাসী এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে মুগীরার দিকে মুখ করে গালি বর্ষণ করতে লাগলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মুগীরা এ লোকটি কার প্রতি গালি বর্ষণ করছে ? তিনি বললেন, আলী বিন আবী তালীরেব প্রতি। তিনি বললেন, ওহে মুগীরা! এভাবে তিনবার ডাকলেন। তারপর বললেন, রাসূল (সা)-এর সাহাবীদের এভাবে গালি দেওয়া হবে, আর আপনি তার প্রতিবাদ করবেন না, এ আমি দেখতে চাই না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি রাসূল (সা) বলেছেন, আবু বকর জান্নাতী, যুবায়ের জান্নাতী, আব্দুর রহমান জান্নাতী, সা’দ জান্নাতী এবং নবম ব্যক্তিও জান্নাতী। তোমরা জাইলে আমি তার নামটি বলতে পারি। রাবী বলেন, লোকেরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলো, হে রাসূলুল্লাহ সাহাবী! নবম ব্যক্তিটি কে ? তিনি বললেন, নবম ব্যক্তিটি আমি। তারপর তিনি কসম করে বললেন, যে ব্যক্তি একটি যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেছেন, তার সাথে তার মুখমন্ডল ধূলি ধুসরিত হয়েছে, তার এই একটি কাজ যে কোন ব্যক্তির জীবনের সকল কর্ম অপেক্ষা উত্তম, যদিও যে নূহের সমান বয়স লাভ করুক না কেন।

 

হাদীস শাস্ত্রে তাঁর অবদান: সাঈদ বিন যায়েদ (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বহু হাদীস বর্ণনাকরেছেন। তাঁর নিকট থেকেও বহু সাহাবী ও তাবেঈ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার নিকট তার ছেলে ইবনে হিশাম, ইবনে উমার, আমর বিন হুরাইস, আবু তুফাইল, কায়েস বিন হাযেম, হুমাইদ বিন আব্দুর রহমান বিন আউফ, উরওয়া বিন যুবাইর, আব্বাস বিন সাহল বিন সা’দ, আব্দুল্লাহ বিন আউফ, মুহাম্মাদ বিন যায়েদ বিন আব্দুল্লাহ ইবনে আমর, মুহাম্মাদ বিন সীরীন প্রমুখ।

ইন্তেকাল: সাঈদ বিন যায়েদ (রা) মদীনার নিকটবর্তী আকীক নাম উপত্যকায় ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুসন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ওয়াকিদীর মতে ৫০ অথবা ৫১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। উবায়াদুল্লাহ বিন সাঈদ আয-যুহরীর মতে তিনি ৫২ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। ইবেন উমার (রা) যখন জুমু’আহর সালাতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সে সময় সাঈদ (রা)-এর ইন্তেকালের সংবাদ পান।সংবাদ পেয়েই জুম’আর সালাত বাদ দিয়ে আকীকে গমন করেন। সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস তাঁকে গোসল করান। আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) তার সালাতে জানাযার ইমামতি করেন। অত:পর মদীনায় এনে তাকে দাফন করা হয়।

 

তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা:

  • গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা বস্তু ভক্ষণ করা হারাম।
  • নবুওয়াত পূর্ব যুগেও দ্বীনে ইবরাহীমের উপর কিছু ব্যক্তি অটল ছিলেন।
  • নবুওয়াত পূর্ব যুগেও নাবী (সা) গায়রুল্লাহর নামে কোন বস্তু ভক্ষণ করেননি।
  • পশু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে হবে। নতুবা সেই খাবার ভক্ষণ করা হারাম।
  • ইবরাহীম (আ) ইয়াহদুীও ছিলেন না, খৃষ্টানও ছিলেন না, বরং তিনি শুধু সেই ওয়াহদাহু লা শারীকের ইবাদাত করতেন।
  • নেককার ব্যক্তির দুআ কবুল হয়।
  • নেককার পিতার সন্তানের হিদায়াতের জন্য করা দুআও কবুল হয়।
  • জিহাদে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের পাশাপাশি সমর্থন বা অন্যান্য কাজে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা যায়।
  • শাসনক্ষমতার চেয়ে জিহাদের প্রতি সাহাবাগণের গুরুত্ব বেশী ছিলো।
  • সাহাবীগণের মর্যাদা উম্মাতের অন্য যেকোন ব্যক্তির চেয়ে বেশী। সাহাবাগণকে গালি দেয়া কাবীরাহ গুনাহ।
  • মাযলুমের দুআ বা বদদুআ দ্রুত কবুল হয়।

 

ইসলামের আলোকজ্জ্বল জ্যোতিকে সারা বিশ্বে বিস্তারের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণের অবদান অপরিসীম। তেমনি সাঈদ বিন যায়েদ (রা) আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (সা) প্রদর্শিত বিধানকে যমীনে প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে স্বীয় জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জীবন চরিত থেকে আমাদের বহু কিছু শিখার আছে। আমাদের উচিত প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল (সা)-ও তার সাহাবীদের আদর্শকে বাস্তবায়ন করা।

 লেখাটির পিডিএফ ডাউনলোড করতে

সাঈদ বিন যায়েদ (রা)-এর জীবনী সম্পর্কে অন্যান্য পিডিএফ

সাঈদ বিন যায়েদ (রা)

আশুরায়ে মুবাশশারাহ সাঈদ বিন যাঈদ (রা) এর জীবন

 

–         আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, আশারায়ে মুবাশশারাহ, সহীহুল বুখারীর কিতাবুল মানাকিব, The Encyclopaedia of Islam, মাসিক আত-তাহরীক জুলাই’৯৮, হায়াতুস সাহাবা প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে সংকলিত ও সংক্ষেপিত।

 

ইনশাআল্লাহ ধারাবাহিকভাবে আশারায়ে মুবাশশারাহ’র অন্যান্য সাহাবীগণকে নিয়ে জীবনী আসবে।

মতামত দিন