বিদআত

বিদআত দূরীকরনে ইমাম ও ওয়ায়েজগণের ভূমিকা

বিদআত দূরীকরনে ইমাম ও ওয়ায়েজগণের ভূমিকা

লেখক : জনি সিদ্দিক

সম্পাদনা: সম্পাদনা পরিষদ

ইবাদতের ক্ষেত্রে বিদআত মারাত্নক একটি  ব্যাধি ! এই ব্যাধি মুসলিমকে  জাহান্নামে নিয়ে যায়। যেমন বর্তমানে ক্যান্সার ও এইডসকে প্রাণঘাতি রোগ বলা হয়; তেমনি বিদআতও মুসলিমদের জন্য আত্নঘাতি ! কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্‌লাম আদর্শ। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো নতুন উদ্ভাবিত বিষয়, আর প্রতিটি নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রুষ্টতা এবং সকল ভ্রুষ্টতা জাহান্নামে যাবে। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জুমুআ, নং-১৪৩৫)

শুধু তাই নয় ! বিদআতিকে সম্মান প্রদর্শনও করা যাবেনা ! ইব্রাহিম ইবনু মাইসারা তাবেয়ী বলেন-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো বিদআতিকে সম্মান করলো, সে যেনো ইসলাম ধর্মের ধ্বংসে সাহায্য করলো। (বাইহাকি, শুআবুল ঈমান ৭/৬১)

কি ভয়ংকর ও মারাত্নক কথা ! স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিদআতকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলেছেন, সেই বিদআতের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্কই থাকা উচিৎ নয়। কিন্তু তারপরেও যেনো এই বিদআতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমরা এমন কিছুকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করে জাহান্নামে যাওয়ার পথকে সুগম করছি, যা সম্পূর্ণ বিদআত বা নতুন উদ্ভাবন। এর তালিকা অনেক লম্বা! অথচ এগুলো থেকে সতর্ক করা প্রত্যেক মুসলিমের দ্বায়িত্ব। কেননা, বিদআত হলো একটি অন্যায় যা সরাসরি ইসলাম এর সাথে করা হয়। আর রাসূলুল্লাহ (সা) অন্যায় কাজ দেখলে তাতে বাধা প্রদান করতে বলেছেন।

যাই হোক আগে আমাদের জানতে  হবে যে এই বিদআত কি?

 

আরবি বিদআত শব্দটি বাদাউ শব্দমূল হতে উদ্ভুত। এর অর্থ সম্পর্কে আল্লামা ইবনু মানযুর বলেন : নবসৃষ্টি, এবং যা ধর্মের পূর্ণতার পরে উদ্ভাবন করা হয়েছে।

 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বলেছেন যে, এটা নতুন উদ্বাবিত বিষয়। আরো খোলাসা করে বলা যায় যে, ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন কোনো পদ্ধতিকে ইবাদত মনে করা, যা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা সাহাবি কেউ-ই পালন করেননি এবং পালন করতে বলেননি। সেই সকল পদ্ধতি আবিষ্কারকে বিদআত বলে।

 

বিদআতের প্রকারভেদ। বিদআতের প্রকারভেদ নিয়ে আলেমদের মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান। অনেক আলেম এটাকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। যথা, ১)বিদআতে হাসানাহ বা ভালো নব আবিষ্কার ও ২)বিদআতে সায়্যিয়াহ বা খারাপ নব আবিষ্কার। আবার অনেক আলেম বলেছেন বিদআত বিদআতই; বিদআতের মধ্যে ভালো খারাপ নেই! কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেই দিয়েছেন যে, সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা। আর সকল ভ্রষ্টতাই জাহান্নামে যাবে ! তাছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ থেকে সর্বোতভাবে বেঁচে থাকতে বলেছেন। যেমন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আমাদের কর্ম যা নয়, এমন কোনো কর্ম যদি কোনো মানুষ করে, তবে তার সেই কর্ম প্রত্যাখ্যাত হবে ! (সহিহ মুসলিম)

 

মোটকথা বিদআত পালন করে কোনো লাভ নেই। কেননা, কেউ যদি ভালো বিদআত করে বা খারাপ বিদআত করেতবে উভয় বিদআতী জাহান্নামী। রাসূলুল্লাহ (সা)  “কুল্লু বিদআতিন দলালা” বলে সকল বিদআতীর কথাই বলেছেন। “কুল্লু” অর্থ “সকল” অতএব বিদআতে হাসানা বা ভালো বিদআত হলো ভ্রষ্টতা এবং বিদআতে সাইয়্যাহ বা খারাপ বিদআতও ভ্রষ্টতা। যা করলে জাহান্নাম নিশ্চিত। তাই বিদআতি বেশি আমল করার চেয়ে অল্প সুন্নাত পালন করাই উত্তম ! এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন, -বিদআত পদ্ধতিতে বেশি আমল করার চেয়ে সুন্নাতের উপর অল্প আমল করা উত্তম।(হাকিম মুসতাদরাক) তিনি আরো বলেছেন,-তোমরা অনুসরণ করো, উদ্ভাবন করোনা। কারণ দ্বীনের মধ্যে যা আছে তাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট।( দারিমী,আস-সুনান ১/৮০)

 

মূলত বিদআত পালনের ফলে মূল সুন্নাত ঢাকা পড়ে যায়। সেটা আর আমল করা হয়না। এতে সুন্নাত বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেটা খুবই ভয়ংকর বিষয় ! এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, প্রতি বৎসরই মানুষ কিছু কিছু বিদআত উদ্ভাবন করতে থাকবে আর সুন্নাতকে মেরে ফেলতে থাকবে ! এক পর্যায়ে শুধু বিদআতই অবশিষ্ট থাকবে আর সুন্নাতসমূহ বিলীন হয়ে যাবে ! (তাবারানি, মাজমাউদ দাওয়ায়েক)

উপরোক্ত হাদিসমূহ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বিদআত থেকে দূরে থাকা আমাদের জন্য ফরযে আইন ! বিদআতের বিরুদ্ধে আমাদেরকে উঠে-পড়ে লাগতে হবে। আর সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাদিসগুলোকে আবার পুনর্জীবিত করতে হবে এবং মৃত হাদিস পুনর্জীবিত করায় অসংখ্য সাওয়াব আছে। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে আমার সুন্নাতকে জীবিত করবে, সে আমাকেই ভালোবাসবে। আর যে আমাকে ভালোবাসবে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। (সুনানে তিরমিযি হাদীস নং-২৬৩০)

 

বিদআতমূলক ইবাদতের কিছু উদাহরণ হলো

১.উচ্চ স্বরে যিকির করা ,

২.ইল্লাল্লাহর যিকির করা,

৩.ছোট দাড়ি রাখাকে প্রথা বানানো,

৪.ফরজ নামাজের পর সম্মিলিতভাবে হাত তুলে মুনাজাত করা,

৫.  মিলাদ পাঠ করা ।

৬. প্রতিবছর মিলাদুন্নবী যিকির করা ।

৭.  উচ্চস্বরে যিকির করা ।

৮. শবে বরাত পালন করা,

৯. শবে মিরাজ পালন ইত্যাদি আরো অসংখ্য বিদআত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে আরো ভালোভাবে জানার জন্য পাঠককে আমি ড. খোন্দকার আব্দুল্‌লাহ জাহাঙ্গীর কর্তৃক রচিত,রাহে বেলায়াত, এহইয়াউস সুনান, হাদিসের নামে জালিয়াতি, এবং খুতবাতুল ইসলাম, আবদুল হামিদ ফাইযী রচিত বিদআত দর্পন, মুফতি আলী হোসাইন রচিত হাকীকাতে সুন্নাত, বিদআত ও রুসুমাত প্রভৃতি বইগুলো পাঠ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। ইনশাআল্লাহ আপনার চক্ষু খুলে যাবে !

 

এতক্ষন বিদআতের সংজ্ঞা ও এর ক্ষতিকর দিকগুলো বর্ণনা করলাম। এখন বলবো বিদআত দমনে কার কার জোরালো দ্বায়িত্ব রয়েছে। এই বিদআতগুলোর বেশিরভাগই প্রচার করেন আমাদের পীর-মাশায়েখ, ইসলামি চিনতাবিদ ও বক্তা, এবং মসজিদের ইমামগণ এবং একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী আলেম ! তাদের অনেকেই নিজেদের পকেট ভারি করতে এইসব বিদআত চালু করেছেন। যেমন-মিলাদ, ক্বিয়াম, শবে বরাত ইত্যাদি ইত্যাদি সব ভ্রান্ত কিছু পদ্ধতি। অথচ ইসলাম থেকে এসব দূর করাই তাদের মূল কাজ ছিলো। কেননা মসজিদের ইমাম ও ইসলামি বক্তাগণই পারেন এগুলো দূর করতে। তারাই পারেন এগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ! যেহেতু তাদের কিছু সংখ্যকের দ্বারাই একাজ হয়, সেহেতু তারাই পারবেন এগুলো দূর করতে। তাদের কথাবার্তাগুলোই আমাদের সাধারণ মুসলমানরা অকপটে মেনে নেয় ! সুতরাং একাজে ইমাম ও ওয়ায়েজগণই হলেন উপযুক্ত ব্যক্তি। প্রত্যেক ইমাম-ই যদি বিদআতগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তবে সাধারণ মুসলমানরা অবশ্যই সেগুলো ছাড়তে বাধ্য ! অতএব সকল ইমাম ও ওয়ায়েজগনের উচিৎ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ কাজে নেমে পড়া ! মহান আল্‌লাহ পাক আমাদেরকে একাজে কবুল করুন এবং সকল প্রকার বিদআত থেকে হেফাযত করুন। আমিন।।

মতামত দিন

কমেন্ট