সলাত

বিতরের সালাত সম্পর্কে গুরুত্তপুর্ণ কিছু তথ্য বহুল সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ

বিতরের সালাত সম্পর্কে গুরুত্তপুর্ণ কিছু তথ্য বহুল সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ

বিতর অর্থ হল বেজোর।

সহিহ বুখারীর ইফাঃ ৯৩৭-৯৪০, আধুঃ ৯৩২-৯৩৫ মোট ৪ টি হাদিসঃ
রাতের সালাত দু দু রাকাত করে। আর তমাদের মধ্যে কেউ যদি ফজর হবার আশংকা করে সে যেন ‘এক রাকাত’ সালাত আদায় করে নেয়। আর সে যে সালাত আদায় করল তা তার জন্য বিতর (বেজোর) হয়ে যাবে।

 

প্রথম গুরুত্তপুর্ণ তথ্য
———————–
ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, রাতের বিতর তিন রাকাত উহা দিনের বিতর মাগরিবের মত।
এই হাদিস যইফ- দারাকুত্নী হাদিসটি বর্ননা করেন এবং যইফ সাব্যস্ত করেন।
ইবনু ওমর (রাঃ) এর বরাতে,
‘মাগরিব হচ্ছে দিনের বিতর। তোমরা রাতের নামাজকে বিতর কর।’
তাবারানী উক্ত হাদিস বর্ননা করেন।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসুল (সাঃ) বলেন,
‘তোমরা মাগরিবের সালাতের সাথে সাদৃশ্য করে তিন রাকাত বিতর পড় না, বরং পাঁচ রাকাত দ্বারা, সাত রাকাত দ্বারা বা নয় রাকাত দ্বারা কিংবা এগার রাকাত দ্বারা বিতর পড়।’
দারাকুত্নী উক্ত হাদিস বর্ননা করেন, হাদিস সহিহ।

অতএব এখানে গুরুত্তের সাথে লক্ষ করতে হচ্ছে যে,
১/ বলা হয়েছে মাগরিব হচ্ছে দিনের বিতর। অর্থাৎ এর মানে হচ্ছে দিনের বেলায় যে সকল সালাত আদায় করা হয় তার মধ্যে মাগরিবের সালাত হচ্ছে বেজোর।
২/ সহিহ হাদিসে প্রমাণিত রাসুল (সাঃ) মাগরিবের মত করে ৩ রাকাত পড়তে নিষেধ করেছেন। আমরা কিভাবে মাগরিব তিন রাকাত পড়ি? দুই রাকাতের পর বসে তাশাহুদ পড়ি তার পর তৃতীয় রাকাতে দাড়াই। এটাই হচ্ছে মাগরিবের সালাত।

অতএব আমাদের সমাজে প্রচলিত এই রকম মাগরিবের মত দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদে বসে বিতর পড়া সহিহ হাদিস দ্বারা নিষেধ।


৩/ যেহেতু দিনের মাগরিব ৩ রাকাত বেজোড়। এবং রাতের বিতর সালাতও (১, ৩, ৫, ৭…) বেজোড় তাই বলা হয়েছে মাগরিব হচ্ছে দিনের বিতর।
৪/ ১ রাকাতও বিতর আছে আবার ৩ রাকাতও বিতর আছে। আবার ৫,৭,৯ রাকাতও বিতর আছে। শুধু মনে রাখতে হবে ৩ রাকাত বিতরের সালাত মাগরিবের তিন রাকাতের মত ২য় রাকাতে বসে নয়।

অতএব বিভ্রান্ত হবে না । বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নাই।

বিতর সালাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। আদায়ের ব্যাপারে জোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বিতর সালাত কত রাকাত?
————————–
বিতর মানে বেজোড়। জোড়ের সাথে এক যোগ করলেই বেজোড় হয়ে যায়। অর্থাৎ ১ বেজোড়, ২+১=৩ বেজোড়, ২+২+১= ৫ বেজোড়, ২+২+২+১= ৭ বেজোড় ইত্যাদি।
আমরা সবার প্রথমেই বুখারীর হাদিস উল্লেখ করেছি যে রাতের সালাত দুই দুই করে। শেষে ১ রাকাত বিতর।
রাসুল (সাঃ) থেকে ১ রাকাত, ৩ রাকাত, ৫ রাকাত, ৭ রাকাত, ৯ রাকাত বিতর পড়ার সহিহ দলিল বিদ্যমান।
– বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজি, ফিকহুস সুন্নাহ।
রাসুল (সাঃ) থেকে বিতর পড়ার তিনটি পদ্ধতি সহিহ হাদিসে বর্নিত হয়েছে।

প্রথম পদ্ধতিঃ ১ রাকাত বিতর।
********************
বিতর হচ্ছে শেষ রাতে এক রাকাত সালাত। – বুখারী, মুসলিম।
‘… যে এক রাকাত বিতর পড়তে চায় সে এক রাকাত পড়তে পারে।’ – আবু দাউদ।

বিতরের নিয়ত নিয়ে সালাতে দাড়িয়ে সাধারণ সালাতের মতই সানা, আউজুবিল্লাহ বিসমিল্লাহ ইত্যাদি পাঠ করে সুরা ফাতেহা পাঠ করতে হবে সাথে অন্য একটি সুরা বা আয়াত কেরাত হিসেবে পাঠ করতে হবে। তার পর রুকুতে যেতে হবে। রুকু থেকে উঠে সামিয়াল্লাহ… ইত্যাদি পাঠ শেষ করে ”দুয়া কুনুত” পাঠ করতে হয়। আবার রুকুর আগেও দুয়া কুনুত পাঠ করা যায়। উভয়টাই জায়েজ। দুয়া কুনুত পাঠ অপরিহার্য (ওয়াজিব) নয়। তাই না জানলেও বিতর হয়ে যাবে, তবে শিখে নেওয়া উচিত। কুনুত পাঠ করে তারপর সিজদায় গিয়ে দুটো সিজদা করে তাশাহুদে বসে পড়তে হবে। তার পর আত্যাহিয়াতু, দুরুদ, দুয়া মাসুরা ইত্যাদি পাঠ করে সালাম ফেরাতে হবে। এটাই ১ রাকাত বিতর। সাধারণ সালাতের মতই।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ ৩, ৫, ৭ ,৯,১১ রাকাত বিতর।
*****************************
বুখারির হাদিস রাতের সালাত দুই দুই করে + সর্ব শেষে ১ রাকাত যোগ করে বিতর করে দেওয়া।
তাহলে ৩ রাকাত কিভাবে হবে? সাধারণ দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে তারপর উপরের নিয়মে ১ রাকাত, ২+১ = ৩ রাকাত।
একইভাবে ২+২+১= ৫ রাকাত, একইভাবে ৭,৯,১১ রাকাত।
মূলত বিতর হচ্ছে তাহাজ্জুদেরই একটা অংশ মাত্র।
নিয়ত কি হবে এক্ষেত্রে? আপনি যখন সালাতে দাড়বেন অন্তরে কি ঠিক করে দাড়বেন? অন্তরে ঠিক করবেন যে এখন বিতর পড়ব ২+১ বা ২+২+১ ! মনে মনে স্বিদ্ধান্ত করাই নিয়ত।

তৃতীয় পদ্ধতিঃ ৩, ৫ ,৭… রাকাতের ক্ষেত্রে ‘টানা পড়া’ঃ
************************************
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসুল (সাঃ) তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তিনি শেষ রাকাত ব্যতীত বসতেন না।
-মুস্তাদরাক হাকেম, বায়হাক্বী, সনদ সহিহ।
রাসুল (সাঃ) তিন রাকাত বিতর পড়তেন। মাঝে বসতেন না। মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক।
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসুল (সাঃ) পাঁচ রাকাত বিতর পড়তেন। কিন্তু শেষ রাকাত ছাড়া বসতেন না। – নাসাঈ, সনদ সহিহ।
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসুল (সাঃ) পাঁচ রাকাত বিতর পড়তেন, এর মধ্যে কোথাও বসতেন না, একেবারে শেষ রাকাতে বসতেন। – আহমদ, সুনান নাসাঈ।
এখানে লক্ষ করতে হবে মনোযোগ দিয়ে যে টানা ৩,৫,৭ … রাকাত বিতরে রাসুল (সাঃ),
‘কোথাও বসতেন না একেবারে শেষ রাকাতে বসতেন’ বা ‘শেষ রাকাত ছাড়া বসতেন না’ অর্থাৎ ৩ রাকাত বিতরে ২য় রাকাতে তাশাহুদে বসতেন না, ৫ রাকাত বিতরে ২য় ৩য় বা ৪র্থ রাকাতে তাশাহুদে বসতেন না একইভাবে ৭ রাকাত বা ৯ রাকাত বা ১১ রাকাতেও একই পদ্ধতিতে গিয়ে একদম শেষ রাকাতে তাশাহুদে বসতেন।
এখন নিয়মটা তাহলে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ করিঃ
১/ সাধারণ সালাতের মত সানা থেকে শুরু করে সুরা ফাতেহা + অন্য কেরাত পাঠ করে ১ম রাকাত।
২/ যথারীতি সাধারণ নিয়মে ২য় রাকাত
৩/ এখন সাধারণ নিয়মে ২য় রাকাত শেষে আত্যাহিয়াতু পাঠের জন্য বসা যাবে না, সরাসরি দাড়িয়ে যেতে হবে ৩য় রাকাতে। যদি ২য় রাকাতে বসে যান তাহলে তা মাগরিবের সালাতের মত হয়ে যাবে যা রাসুল (সাঃ) নিষেধ করেছেন।
৪/ এখন ৩য় রাকাত সাধারণ নিয়মে সুরা ফাতেহা + অন্য সুরা পাঠ করে রুকুতে যেতে হবে। রুকুর আগে বা পরে দুয়া কুনুত পাঠ করা যায়।
৫/ এভাবে ৩ রাকাত বিতরে কেবল ৩য় রাকাতে বসে, ৫ রাকাত বিতরে কেবল ৫ম রাকাতে বসে, ৭ রাকাত বিতরে কেবল ৭ম রাকাতে বসে আত্যাহিয়াতু+ দুরুদ+ দুয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করতে হবে।
প্রসঙ্গঃ দুয়া কুনুতঃ
আমাদের সমাজে যে কুনুত প্রচলিত এমন কি স্কুলের পাঠ্য ইসলামশিক্ষা বইয়ে যে দুয়া কুনুত আমরা শিখেছি বা শিখাচ্ছি তা মূলত বিতরের কুনুত নয়।
দুয়া কুনুত দুই প্রকার।
১/ কুনুতে রাতেবাঃ যেটা বিতরে পড়া হয়।
২/ কুনুতে নাজেলাঃ যেটা বিপদ আপদে ফরয সালাতে বিশেষ দুয়া চেয়ে করা হয়। এটা আমাদের দেশে একদমই প্রচলিত নয় তাই আমরা এটা সম্পর্কে জানিই না! মূলত ‘আল্লাহুম্মা নাস্তাঈনুকা …’ এটা কুনুতে নাজেলার অংশ বিশেষ আমরা বিতরে পড়ে থাকি যা সঠিক নয়।
কুনুতে রাতেবা বিতরের কুনুতঃ
দুয়া কুনুত পড়া ওয়াজিব নয়। মাঝে মাঝে দুয়া কুনুত ছেড়েও দেয়া যায়। – আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজি।
তবে রুকুর পড়ে কুনুত পড়ার বর্ননাকারী অধিক এবং এর উপরেই খুলাফায়ে রাশেদিন আমল করেছেন। – বায়হাক্বী। তাই রুকুর পড়ে কুনুত পাঠ করাই উত্তম।
ওমর (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), আনাস (রাঃ), আবু হুরায়রা (রাঃ) সাহাবি থেকে বিতরের কুনুতে বুক বরাবর হাত তুলে দুয়া করা প্রমাণিত আছে। -বায়হাক্বী।
কিন্তু আমাদের সমাজে প্রচলিত যে আল্লাহু আকবার বলে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে আবার হাত বেধে দুয়া কুনুত পাঠের ‘সহিহ’ কোন দালিলিক প্রমান নাই।
হাত দুলে দুয়া করে হাত মুখে মুছার কোন দলিল নেই তাই এরূপ না করাই শ্রেয়।
কুনুত কোথায় পড়তে হয়ঃ
দুয়া কুনুত রুকুর আগে বা পড়ে পড়া যায়। – বুখারী মুসলিম।
১ রাকাত বিতরে তো রাকাতই একটা, এই ক্ষেত্রে রুকুর আগে বা পরে হাত তুলে দুয়া কুনুত পাঠ করতে হয়।
৩, ৫, ৭, ৯, ১১ রাকাত বিশিষ্ট টানা বিতরে শেষ রাকাতে রুকুর আগে বা পরে দুয়া কুনুত পাঠ করতে হয়।
বিতরের সঠিক দুয়া কুনুতঃ
বিতর সালাতে দুআ কুনুতঃ

اَللَّهُمَّ اهْدِنِيْ فِيْمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِىْ فِيْمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِيْ فِيْمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِيْ فِيْمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِيْ شَرَّ مَا قَضَيْتَ، فَإِنَّكَ تَقْضِىْ وَلاَ يُقْضَى عَلَيْكَ، إنَّهُ لاَ يَذِلُّ مَنْ وَّالَيْتَ، وَ لاَ يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ، وَصَلَّى اللهُ عَلَى النَّبِىِّ-

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাহ্দিনী ফীমান হাদায়িতা , ওয়া ‘আ-ফিনী ফীমান ‘আ-ফাইতা, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইতা, ওয়া বা-রিকলি ফীমা ‘আ‘ত্বাইতা, ওয়া ক্বিনী শাররা মা ক্বাযাইতা; ফাইন্নাকা তাক্বযী ওয়া লা ইয়ুক্বযা ‘আলাইকা, ইন্নাহূ লা ইয়াযিল্লু মাঁও ওয়া-লাইতা, ওয়া লা ইয়া‘ইয্ঝু মান্ ‘আ-দাইতা, তাবা-রাকতা রাববানা ওয়া তা‘আ-লাইতা, ওয়া সাল্লাল্লা-হু ‘আলান্ নাবী’।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! তুমি যাদেরকে সুপথ দেখিয়েছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে সুপথ দেখাও। যাদেরকে তুমি মাফ করেছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে মাফ করে দাও। তুমি যাদের অভিভাবক হয়েছ, তাদের মধ্যে গণ্য করে আমার অভিভাবক হয়ে যাও। তুমি আমাকে যা দান করেছ, তাতে বরকত দাও। তুমি যে ফায়ছালা করে রেখেছ, তার অনিষ্ট হ’তে আমাকে বাঁচাও। কেননা তুমি সিদ্ধান্ত দিয়ে থাক, তোমার বিরুদ্ধে কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তুমি যার সাথে বন্ধুত্ব রাখ, সে কোনদিন অপমানিত হয় না। আর তুমি যার সাথে দুশমনী কর, সে কোনদিন সম্মানিত হ’তে পারে না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি বরকতময় ও সর্বোচ্চ। আল্লাহ তাঁর নবীর উপরে রহমত বর্ষণ করুন’।
-সুনানু আরবা‘আহ, দারেমী, মিশকাত হা/১২৭৩ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫; ইরওয়া হা/৪২৯, ২/১৭২।

সম্মানিত পাঠক! আশা করি আমাদের লেখায় বিতরের পদ্ধতি আমরা আপনাদের বোধগম্য করে উপস্থাপন করতে পেরেছি। এখন থেকে আমরা আমাদের বিতরের সালাতকে সুন্নাত অনুসারে দায় করতে সচেষ্ট হব ইনশা আল্লাহ্‌।

মতামত দিন