সিয়ামের আদব, করণীয় ও বর্জণীয় (পর্ব: ১)

প্রত্যেকটি ইবাদতের রয়েছে কিছু আদব-কায়দা বা শিষ্টাচার। কিছু আদব হল অবশ্য পালনীয় যা বাস্তবায়ন না করলে ইবাদতটি গ্রহণযোগ্য হবে না, আর কিছু হল মোস্তাহাব অর্থাত্ যা পালন করলে ইবাদতটি পরিপূর্ণতার সহায়ক হয় এবং ইবাদতের মাঝে কোন ক্ষতি হয়ে গেলে তা কাটিয়ে উঠা যায় ও পরিপূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায়। তাই আমরা এখানে সিয়ামের কতিপয় আদব ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব। আমরা যদি এ আদবসমূহ মান্য করে সিয়াম আদায় করতে পারি তবে আল্লাহর ফজলে আমরা সিয়ামের পূর্ণ সওয়াব বা প্রতিদান লাভ করতে সক্ষম হব।

১. নিয়ত করা: হাদিসে এসেছে “প্রত্যেক কাজ নিয়তের উপর নির্ভশীল” –সহীহ বোখারী। মৌখিকভাবে আমাদের সমাজে যে রোজার নিয়ত প্রচলিত রয়েছে তা সম্পূর্ণ বিদাআত। নিয়ত হল অঙ্গীকার করা, সংকল্প করা, অর্থাত্ ইচ্ছা পোষণ করা। রামজানের ২৯/৩০টা রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। এই ফরজ আপনাকে পালন করতেই হবে। এর জন্য দরকার ইচ্ছাটা। আপনি সেহরী করলেন, উদ্দেশ্য হচ্ছে পরদিন রোজা রাখা। এতটুকু যতেষ্ট। এখানে মৌখিক নিয়ত দরকার নাই।

২. সিয়ামের ক্ষেত্রে আদেশ নিষেধ মেনে চলা: সিয়াম পালনকারী তো বটেই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হল আল্লাহ যা কিছু আদেশ করেছেন তা পালন করা। আর যা কিছু করতে তিনি নিষেধ করেছেন তার প্রত্যেকটি বর্জন করা। এর নামই হল ইসলাম বা স্রষ্টার কাছে মানুষের পূর্ণ আত্মসমর্পণ। একজন মুসলিম যেমন কখনো নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে পারে না তেমনি অন্য মানুষের খেয়াল-খুশি বা তাদের রচিত বিধানের অনুগত হতে পারে না। যদি হয় তবে তা স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করা হল না। যদি এমনভাবে জীবনকে পরিচালিত করা যায় তবে তাকেই বলা হবে পরিপূর্ণ ইসলাম। আর পরিপূর্ণ ইসলামে প্রবেশ করতে আল্লাহর রাব্বুল আলামিন আদেশ করেছেন মানুষকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ
“হে মোমিনগণ! তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” -সূরা বাকারা: ২০৮

ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করার নামই হল তাকওয়া। যে তাকওয়া অবলম্বন করতে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বার বার নির্দেশ দিয়েছেন। এ তাকওয়ার দাবি হল আল্লাহর আনুগত্য করা হবে, অবাধ্য হওয়া যাবে না, তাকে স্মরণ করা হবে ভুলে যাওয়া চলবে না, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে অকৃতজ্ঞ (কাফির) হওয়া যাবে না। ঈমানদারের সবচেয়ে বড় কর্তব্য হল, শিরক ও রিয়া মুক্ত থেকে খালেস আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদতসমূহ সম্পাদন করা। এর মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত। সালাত বাদ দিয়ে সিয়ামের কি মূল্য আছে? দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায় করতে হবে জামাতের সাথে। জামাতের সাথে সালাত আদায়ের মাধ্যমে মুনাফেকি থেকে মুক্তির সনদ নিতে হবে। এরপর যথা সময় জাকাত আদায় করতে হবে। সত্যিকার হকদারকে জাকাত প্রদান করতে হবে। এমনিভাবে যে সামর্থ্য রাখে তার হজ ও ওমরাহ আদায় করতে হবে। সাথে সাথে উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে সকলের সাথে আচরণ করতে হবে। মাতা-পিতার সাথে ভাল আচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক সু-দৃঢ় রাখা, প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ, সাধ্য-মত সত্কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করতে হবে। এমনিভাবে জাদু-টোনা, সুদি কারবার, মিথ্যা কথা, ধোঁকাবাজি, ঘুসসহ সকল প্রকার দুর্নীতি, মাদক সেবন, ব্যভিচার, সৃষ্টি জীবকে কষ্ট দেয়া ও গান-বাদ্য পরিহার করতে হবে। মানুষের অধিকারগুলো যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

৩. অন্যায় আপকর্ম থেকে বিরত থাকা: অনেককে দেখা যায় সিয়াম পালন করে অযথা কথা-বার্তা, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সে খবর রাখে না যে এ সকল অন্যায় কাজ-কর্ম সিয়ামের প্রতিদান লাভে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের ব্যাপারেই হয়তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كَمْ مِنْ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَكَمْ مِنْ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ
“কত সিয়াম পালনকারী আছেন যারা উপোস থাকা ছাড়া আর কিছু পায় না। আর কত রাতজাগা সালাত আদায়কারী আছে যারা রাত্রি-জাগরণ ব্যতীত আর কিছু লাভ করে না।” (আহমেদ ও দারেমী – বর্ণনায় আবু হুরাইরা রা.)
অতএব যার উদর সিয়াম পালন করছে তার উচিত তার মুখ, কর্ণ, চক্ষু, হাত ও পা সবকিছুই সিয়াম পালন করবে। সকল অন্যায়-অবৈধ কাজ হতে এ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো পবিত্র থাকবে। যেমন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
وَالصَّوْمُ جُنَّةٌ فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ يَوْمَئِذٍ ، وَلاَ يَسْخَبْ ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ : إِنِّى امْرُؤٌ صَائِمٌ.
“সিয়াম হল ঢাল। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে সিয়াম পালন করবে সে যেন অশ্লীল আচরণ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। যদি তার সাথে কেউ ঝগড়া বিবাদ কিংবা মারামারিতে লিপ্ত হতে চায় তবে তাকে বলে দেবে আমি সিয়াম পালনকারী।” (সহীহ মুসলিম, সহীহ বোখারী, বর্ণনায় আবু হুরাইরা রা.)

রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো এরশাদ করেন:
«لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشَّرْبِ فَقَطْ. إِنَّمَا الصِّيَامُ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ. فَإِنْ سَابَّكَ أَحَدٌ أَوْ جَهِلَ عَلَيْكَ فَقَلْ: إِنِّى صَائِمٌ».
“শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম নয়। মূলত সিয়াম হল : অনর্থক-অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা। যদি তোমার সাথে কেউ ঝগড়া-বিবাদ কিংবা মারামারিতে লিপ্ত হতে চায়, অথবা মূর্খতা সুলভ আচরণ করে তবে তাকে বলে দেবে আমি সিয়াম পালনকারী।” (সহীহ ইবনে খুযাইমা, সহীহ ইবনে হিব্বান ও হাকেম, মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ-বর্ণনায় আবু হুরাইরা রা.)

অন্য আরেক বর্ণনায় এসেছে যদি সিয়াম পালনকারী নিষিদ্ধ কথা ও কাজ-কর্ম পরিত্যাগ না করেন তবে তার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে দুঃসংবাদ:
«مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ».
“যে মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” (সহীহ বোখারী- বর্ণনায় আবু হুরাইরা রা.)

আল্লাহ আমাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূল স. এর দেখানো পথে রামজানের সাওম রাখার তাওফীক দিক।

সূত্র

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button
kiw kow kan