বিজ্ঞান ও ইসলাম

দীনী কাজ সহজিকরণে কম্পিউটার

কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সাধারণত সংবাদের শিরোনামে আসে নেতিবাচক খবরের জন্য। এসব পড়ে প্রযুক্তির এ দুই দিগন্ত সম্পর্কে নাওয়াকিফ লোকেরা ভাবেন কম্পিউটার-ইন্টারনেট মানেই নেতিবাচক কিছু। তাঁদের এ ধারণা একেবারেই অমূলক। এ দুয়ের ইতিবাচক ও কল্যাণকর দিকগুলো জানলে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি যে সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে তা হলফ করেই বলা যায়। আপনি যদি হন কোনো বিদগ্ধ গবেষক কিংবা প্রাজ্ঞ আলেম তথা ফকীহ বা মুহাদ্দিস তবে কম্পউটার হতে পারে আপনার জন্য এক অকল্পনীয় উপকারী বন্ধু। উদার অকৃপণ সহযোগী। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে নিয়ে যে পেশারই হোন না কেন কম্পিউটার হতে পারে আপনার বিশ্বস্ত সহায়তাকারী। তাই পৃথিবীর তাবৎ দেশের মানুষ এই যন্ত্রটির ওপর নির্ভর করছেন নির্দ্বিধায়। বিশ্বে বর্তমানে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০ কোটি। (দৈনিক প্রথম আলো : ৮/৭/২০১২)

প্রথমেই আমাদের মাথা থেকে কম্পিউটার সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তার ভূত তাড়াতে হবে। প্রতিটি বস্তুরই ভালো-মন্দ দিক থাকে। বিষ কেন তৈরি হয়? মানুষ মারার জন্য? নাহ, মানুষ বাঁচানোর জন্যই এর সৃষ্টি। বিষ দিয়ে বিষধরকে মেরে মানুষের জীবন বাঁচাতে হয়। কিন্তু মানুষের ভুল ব্যবহারের কারণে তা হয়ে ওঠে মানুষের প্রাণ হরণকারী। অতএব দোষ বিষের নয়; এর ব্যবহারকারীর। একটি ধারালো বটি দিয়ে আপনি তরকারি কাটবেন নাকি মানুষের গর্দান উড়িয়ে দেবেন সে সিদ্ধান্ত তো আপনাকেই গ্রহণ করতে হবে। মানুষ মারা যাবে বলে তো আর ঘর-সংসার থেকে প্রয়োজনীয় এই ধাতবকে বিতাড়িত করতে পারেন না। তাহলে তরকারি ছাড়াই ভাত খেতে হবে। কম্পিউটার-ইন্টারনেটের ব্যাপারটিও অনেকটা সে রকম। এর ভালো-মন্দ নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর ওপর। অতএব কম্পিউটার-ইন্টারনেটকে মন্দ না ঠাওরে নেতিবাচক ব্যবহার রোধ করতে হবে। সমালোচনা করলে করতে হবে এর অপারেটরের। প্রচলিত বাগধারার বিপরীতে বলা যায় পাপকে নয় পাপীকে ঘৃণা করুন।

আমাদের শুরুতেই বুঝে নিতে হবে, বর্তমান বিশ্বে কম্পিউটার এমন এক প্রযুক্তির নাম পৃথিবীর সবকিছুতেই যার সাহায্য অপরিহার্য। যার অবদান অনস্বীকার্য। পৃথিবীর সব যন্ত্রই বর্তমানে কম্পিউটারাইজড। কম্পিউটারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্যে পরিচালিত। লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চা, সাহিত্য-কলা সবকিছুতেই কম্পিউটার প্রসারিত করেছে তার সাহায্যের হাত। কৃষি, বাণিজ্য, চাকরি থেকে নিয়ে হেন কোনো পেশা নেই উন্নত বিশ্বে যাতে কম্পিউটারের সাহায্য নেয়া হয় না। ক্ষুদে ক্যালকুলেটর আর মোবাইল থেকে নিয়ে টিভি, রেডিও, সাইকেল, গাড়ি ও রেল, তেমনি যাত্রীবাহী বিমান থেকে নিয়ে সব ধরনের যুদ্ধাস্ত্র, বোমারু বিমান, সাবমেরিন, ট্যাংক-কামান- সবগুলো প্রস্তুত ও পরিচালিনায় কম্পিউটারের সাহায্য গ্রহণ আজ বিশ্বজনীন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর সবাই যখন কম্পিউটারের মাধ্যমে নিজের কাজ সহজে ও স্বল্প সময়ে সমাধা করছে তখন কেউ যদি এর বিরুদ্ধে আড়ি করে বসে থাকেন তবে তা হবে দিবালোকের বিরুদ্ধে পেঁচার দশা।

এবার আসুন এর কিছু উপকারী দিক আলোচনা করা যাক :

ভাষা চর্চা বা শিক্ষার ক্ষেত্রে :

গবেষকরা অধিকাংশই একাধিক ভাষা চর্চা করেন। তাদেরকে জানতে হয় বিভিন্ন ভাষা। ভাষা শিক্ষায় কম্পিউটার আপনাকে অভূতপূর্ব সহযোগিতা দেবে। আপনি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় গ্রন্থগুলোর সফট বা পিডিএফ কপি সংগ্রহ করে পড়তে পারেন। এ সম্পর্কিত অডিও শুনে আর ভিডিও দেখে উপকৃত হতে পারেন। আরবী আর ইংরেজি ভাষা শিক্ষা বা চর্চাই সাধারণত এ দেশের লোকেরা করে থাকেন। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহেই রয়েছে অনেক অডিও। বক্তব্য, শব্দার্থ, শিক্ষামূলক ভিডিও। আরবী শিক্ষার জন্য সৌদি আরব থেকে সংগৃহীত অনেক কিতাব রয়েছে। ইংরেজি শেখার জন্য অডিও ও ভিডিও তো যত্রতত্রই পাওয়া যায়। আপনি বড় বড় কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ বিক্রেতা এবং অডিও-ভিডিও বিক্রয়ের দোকানগুলোয় যোগাযোগ করে এসব সংগ্রহ করতে পারেন। অনেক ভিডিও কিনতে পাওয়া যায় যেখানে সারা পৃথিবীর সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও ভ্রমণ স্পট সচিত্র ধারাবিবরণীসহ কিনতে পাওয়া যায়। পেনড্রাইভ বা হার্ডডিস্ক কিনে বিনে পয়সায় (USB drive) ইউএসবি পোর্টে ঢুকিয়ে পরিচিত কারও কাছ থেকে এসব সংগ্রহ করতে পারেন। ইন্টারনেট থেকে ফ্রি ডাইনলোডও করে নিতে পারেন। (ইন্টারনেটে বেশির ভাগ তথ্যই বিনামূল্যে সংগ্রহ করা যায়। খুব অল্প কিছু সাইট আছে যেখান থেকে কিছু নিতে হলে মূল্য পরিশোধ করতে হয়।) এই সাইটে গেলে আপনি প্রয়োজনীয় অধিকাংশ জিনিসই খুঁজে পাবেন। এটিই পৃথিবীর সবচে বড় ভিডিও শেয়ারিং সাইট : http://www.youtube.com/ ইউটিউবে ঢুকলে আপনি নিম্নোক্ত ক্যাটাগরির তথ্যগুলো খুঁজে পাবেন :

• Trending

• Popular

• Entertainment

• Sports

• News & Politics

• Comedy

• People & Blogs

• Science & Technology

• Gaming

• Howto & Style

• Education

• Pets & Animals

• Autos & Vehicles

• Travel & Events

• Nonprofits & Activism

তবে ইউটিউব ব্যবহারে সাবধান থাকতে হবে; কারণ ভালোর পাশাপাশি মন্দ অনেক কিছুও এখানে থাকে।

সবচে বড় কথা ভাষা শিক্ষার জন্য অভিধান অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিশ্বের প্রচলিত বড় ও জনপ্রিয় ভাষাগুলোর অভিধান ইন্টারনেটে অহরহ পাওয়া যায়। আমাদের বাংলা, ইংরেজি ও আরবীর ডিজিটাল অভিধানও পাওয়া যায় অনেক রকমের এবং নানা বৈশিষ্ট্যের। আর সবচে মজার বিষয় হলো, এসব অভিধানের কোনো কোনোটায় শব্দের উচ্চারণ দেয়া থাকে। আবার কোনোটাতে ছবিও দেয়া থাকে, যা একজন শিক্ষার্থী তথা বিদ্যার্থীকে প্রভূত সহযোগিতা করে। আর শব্দটি যদি ইংরেজি হয় তবে ডান বাটনে ক্লিক করলে দেখবেন Synonyms তথা প্রতিশব্দ লেখা আসছে। ওটাতে ক্লিক করলে আপনি সিলেক্ট করা শব্দের অনেকগুলো প্রতিশব্দ বা সমার্থবোধক শব্দ দেখতে পাবেন। এটি আপনাকে ভাষা শেখায় বড় কাজ দেবে।

গবেষণা ও ইলমী তাহকীকের জন্য :

আপনি যদি হন কোনো গবেষক বা পণ্ডিত তথা বিদ্বান ব্যক্তি, তবে তো আপনার পড়াশোনার মধ্যেই ডুবে থাকতে হয়। নিশ্চয় আপনাকে বিশাল বইয়ের সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে হয়। এর জন্য যেমন প্রয়োজন পর্যাপ্ত জায়গার তেমনি দরকার প্রচুর অর্থের। তদুপরি লেটেস্ট ও সর্বসাম্প্রতিক বইগুলো সংগ্রহ করতে গলধঘর্ম হতে হয়। অনেক সময় প্রচুর টাকা থাকলেও নানা কারণে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। অথচ শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তব যে বই আপনি নিজ শহরে বা দেশে হন্যে হয়েও খুঁজেও সংগ্রহ করতে পারছেন না তা আপনি ইন্টারনেট থেকে কয়েকটি ক্লিকের বিনিময়েই সংগ্রহ করতে পারেন। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে কয়েক হাজার প্রাচীন ও দুর্লভ গ্রন্থসহ প্রায় সবগুলো ইসলামী রেফারেন্স গ্রন্থই রয়েছে।

আপনি যদি হন বিদগ্ধ গবেষক, যাকে প্রতি মুহূর্তে নানা তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় বিচরণ করতে হয়, তবে আপনি (Encyclopedia Britannica) এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা কিংবা (Encarta) এনকার্টার মতো বিশ্বকোষগুলো আপনার কম্পিউটারে সংরক্ষণ করুন। সহজেই আপনি প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। শুনলে অবাক হবেন যে ব্রিটানিকার মতো পৃথিবীর সবচে বড় বিশ্বকোষ প্রণয়ন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছেন, আগামীতে তাঁরা কেবল এর কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ভার্সনই প্রকাশ করবেন। এরপর থেকে এর আর প্রকাশিত বা মুদ্রিত কপি পাওয়া যাবে না। (আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে এই দু’টি সফটওয়ারও আছে। অভিজ্ঞতা থেকেই আমি কথাটা লিখেছি।)

আপনি যদি হন মুহাক্কিক তথা শেকড় সন্ধানী আলেম তাহলে আপনার জন্যও রয়েছে বিশাল দিগন্ত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ইচ্ছে করলেও প্রয়োজনীয় শত শত আরবী রেফারেন্স গ্রন্থ ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করতে পারি নি। ভারত-পাকিস্তানের সর্বশেষ অনেক উর্দু কিতাব সংগ্রহ করাই যেখানে চাট্টিখানি কথা নয়, সেখানে সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের গবেষণামূলক দরকারী নতুন-পুরাতন কিতাব সংগ্রহ করা তো অনেক সময় অসম্ভবই হয়ে পড়ে। সরাসরি সৌদি আরব থেকে আনানোর যে খরচ তা শুনে তো রীতিমত আঁতকেই উঠতে হয়। ইলমের তীব্র পিপাসুরাও এখানে এসে হাল ছেড়ে দেন। আলহামদুলিল্লাহ, আপনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের কম্পিউটারেই যখন ইচ্ছে তখনই প্রয়োজনীয় যে কোনো কিতাব ডাইনলোড করে নিতে পারেন। আরবের আলেমগণই পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা নিজেদের সকল গ্রন্থই ইন্টারনেটে বিনামূল্যে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। বর্তমান বা অতীতের বড় বড় আলেমদের খুব কম সংখ্যক কিতাবই পাবেন ইন্টারনেটে তারা যা সবার জন্য অবারিত করে দেন নি।

যারা মুফতী বা মুহাদ্দিস কিংবা আলেমে দীন তাঁদের জন্য কম্পিউটার অপরিহার্য করে দিয়েছে আরবদের আবিষ্কৃত একটি সফটওয়ার। সেটি মূলত একটি বিশাল লাইব্রেরি। যার নাম (المكتبة الشاملة) ‘মাকতাবা শামেলা’ বা সুবিস্তৃত ডিজিটাল লাইব্রেরি’। আদতেই তা এক বিশাল লাইব্রেরি। ধরুন আপনি একটি ফতোয়া লিখতে যাচ্ছেন কিংবা কোনো ইলমী তথা গবেষণামূলক নিবন্ধ বা গ্রন্থ প্রস্তুত করতে মনস্থ করেছেন তাহলে আপনাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক রেফারেন্স গ্রন্থ সংগ্রহ করতে হবে। তাতে সরবরাহকৃত প্রতিটি তথ্যের যেমন ‘মাসদার’ বা সূত্র জানতে হবে তেমনি তার সত্যাসত্যও নিরূপণ করতে হবে। আপনাকে এর জন্য যেমন অনেক লম্বা সময় দিতে হবে তেমনি প্রয়োজনীয় গ্রন্থগুলোও আপনার সংগ্রহে থাকতে হবে। মাকতাবা শামেলা আপনাকে এ ক্ষেত্রে অতুলনীয় সহযোগিতা দেবে। এতে পাবেন আপনি কুরআন, তাফসীর, হাদীস, শুরুহুল হাদীস (হাদীসের ব্যাখ্যা), ফিকহ, উসূলে ফিকহ, ফতোয়া ও উলূমুল হাদীসের যাবতীয় রেফারেন্স গ্রন্থ। আপনার কম্পিউটারে এই ডিজিটাল লাইব্রেরি সন্নিবেশিত করে আপনি আকাশ হাতে পাবার আনন্দ পেতে পারেন।

যেমন ধরুন আপনি কোনো দীনী বিষয়ে নিবন্ধ লিখছেন, এখন অবশ্যই এতে পবিত্র কুরআনের আয়াত থাকবে। থাকবে তার ব্যাখ্যা বুঝতে সঠিক তাফসীর। তেমনি থাকবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাসূলের হাদীস, ফিকহবিদ ও মুহাদ্দিসগণের বক্তব্য। এসব সংগ্রহ করতে আর তা যাচাই-বাছাই করতে আপনাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। প্রথমে আপনাকে তথ্যটি কোন কিতাবে আছে তা জানতে হবে। তারপর আপনাকে ওই কিতাব সংগ্রহ করতে হবে। এরপর আপনাকে পাতা উল্টে উল্টে কাঙ্ক্ষিত তথ্যটি কোন পাতায় আছে তা প্রথমে জানতে হবে এবং একেএকে পাতা উল্টে সে পর্যন্ত যেতে হবে। তারপরও আপনাকে আপনার ওই লেখায় এই উদ্ধৃতির বাক্য বা শব্দগুলো সংযোজন করতে হবে নির্ভুলভাবে। বলাইবাহুল্য, এখানে অনেকগুলো কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ করতে হবে। অথচ এর সবগুলো কাজই আপনাকে নিমিষে করে দেবে এই শামেলা নামক ডিজিটাল লাইব্রেরি। আয়াত বা কাঙ্ক্ষিত বাক্যের সম্ভাব্য শব্দ লিখে প্রয়োজনীয় ক্যাটাগরিতে সার্চ দিলেই ওই কিতাব, তার পৃষ্ঠা নাম্বার ও খণ্ড নাম্বারসহ হুবহু আপনাকে সরবরাহ করবে। আপনি শুধু উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়ে প্রয়োজনীয় অংশটুকু আপনার লেখায় সংযোজন করবেন। আয়াতের ব্যাখ্যা কিংবা হাদীসের তবকা বা স্তর ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আপনি সহজেই নিজের ইলম প্রচার করতে পারবেন এবং নিজেও নির্ভুল ইসলামী জ্ঞান হাসিল করতে পারবেন।

শিক্ষামূলক কাজের জন্য :

শিক্ষামূলক কাজের জন্যও কম্পিউটার আপনাকে দেবে অকল্পনীয় সব সহযোগিতা। উপরে যেমনটি বলা হয়েছে সে উপায়ে আপনি আপনার বিষয় সংশ্লিষ্ট অডিও, ভিডিও সংগ্রহ করবেন। নানা লেসন পড়বেন আর শুনবেন। আর আপনার সার্বিক সহযোগিতায় তো ডিজিটাল ডিকশনারিগুলো থাকছেই। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী এমনকি শিক্ষকগণ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি অনেক শব্দের উচ্চারণে ভুল করে থাকেন। নানা কারণে তাঁদের কোনো কোনো শব্দের উচ্চারণে আঞ্চলিকতা কিংবা অশুদ্ধতার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন পূর্বে বলা হয়েছে, এই সমস্যা দূরীকরণে অনেক অভিধানে উচ্চারণ শোনারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভালোভাবে শব্দার্থ হৃদয়াঙ্গমর করতে যেন পারেন সে জন্য কোনো কোনোটায় সংশ্লিষ্ট চিত্র বা ছবিও দেয়া হয়।

সিংহভাগ মানুষই লেখাপড়া বা ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে বানান নিয়ে ঝামেলায় পড়েন, তাদের জন্য ইংরেজি ও বাংলায় রয়েছে দারুণ ব্যবস্থা। যে কোনো ডকুমেন্ট বা লেখায় ইংরেজি যে কোনো শব্দ লেখার পর (Enter) ‘এন্টার’ বাটন চাপলে শব্দটির বানান ভুল থাকলে তাতে লাল আন্ডার লাইন থাকবে। তখন ডান বাটন ক্লিক করলেই এর সম্ভাব্য সঠিক বানান দেখাবে। সেটাতে ক্লিক করলে অটোমেটিক আপনার বানান শুদ্ধ হয়ে যাবে। সম্প্রতি বাংলা স্পেল চেকারও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘সৃষ্টি অফিস টুলস’, ‘ধ্রুব বাংলা স্পেল চেকার’ প্রভৃতি স্পেল চেকার পাওয়া যায়। নিম্নোক্ত ঠিকানায় গিয়ে ইন্টারনেট থেকে ফ্রি বাংলা স্পেল চেকার ডাউনলোড করে নিতে পারেন। এই সফটয়ারটিকে নির্দেশ দিলে আপনার লেখায় থেকে যাওয়া বানান ভুলগুলো চিহ্নিত করবে। একইসঙ্গে শব্দটির সম্ভাব্য সবগুলো শুদ্ধ বানানও প্রদর্শন করবে। http://www.omicronlab.com/avro-keyboard-download.html

আপনি যদি আগ্রহী ছাত্র হন তবে প্রচুর সাধারণ জ্ঞানের উপাত্ত কম্পিউটারে সংগ্রহ করতে পারেন। তারপর নিয়মিত তা থেকে আপনার ভেতরের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবেন। সাধারণ জ্ঞান বাড়ানোর মত প্রচুর বই পাওয়া যায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা বা ব্যক্তির ওপর তৈরি করা সচিত্র প্রতিবেদন ও ডকুমেন্টারি দেখেও নিজের জ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করতে পারবেন। পারবেন অন্য দশজন থেকে এগিয়ে যেতে। কম্পিউটারের মাধ্যমে শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচে বেশি উপকৃত হতে পারেন আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় আগ্রহী মা-বোনেরা। পর্দা রক্ষা করে দারুণ উপায়ে আপনারা সরাসরি দীনী ইলম হাসিল করতে পারেন। ইতোমধ্যে এ ব্যবস্থা আরব বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছে। আর তা হলো, ছেলেদের সামনে শিক্ষক ক্লাস নেবেন, তাদেরকে সামনে রেখে বোর্ডে পাঠ্য বিষয় বুঝিয়ে দেবেন আর কম্পিউটারে প্রজেক্টর লাগিয়ে কাছে বা দূরে অবস্থিত মেয়েদের পৃথক কক্ষে বসে তারা এই পাঠ সরাসরি দেখতে পারবেন। অথচ এই মেয়েদের কেউ দেখতে পারবেন না।

দীনী ইলম হাসিলের ক্ষেত্রে :

আমাদের ব্যস্ত জীবনে অনেক সময়ই সম্ভব হয় না বড় বড় আলেমদের সান্নিধ্যে গিয়ে ইলম হাসিল করা। কম্পিউটার আমাদের জন্য এ ক্ষেত্রে দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছে। ঘরে বসে আমরা তাঁদের আলোচনা ও ওয়াজ-নসীহতের সিডি সংগ্রহ করে কিংবা কারো সিডি থেকে বিনামূল্যে কপি করে নিজে শুনে উপকৃত হতে পারি। বাংলাদেশের জনপ্রিয় প্রায় সব আলেম-উলামার ওয়াজের সিডিই এখন সর্বত্র পাওয়া যায়। কম্পিউটারের দোকানগুলোয় ‘ডাউনলোড করা হয়’ লিখে দেয়া থাকে। সেখানে গিয়েও আপনি এসব দীনী আলোচনা আপনার কম্পিউটার বা মোবাইলের জন্য সংগ্রহ করতে পারেন। কিংবা অন্যের কম্পিউটার থেকে সিডি রাইট করেও নিজের কম্পিউটারে নিতে পারেন।

অনেক সময় জানার জন্য কিংবা লেখায় উদ্ধৃতি দেওয়া কিংবা তাহকীক বা গবেষণার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের আয়াত ব্যবহার করতে হয়, আয়াতের নাম্বার, সূরা ইত্যাদি জানতে ও উল্লেখ করতে হয়। এখন যারা পবিত্র কুরআনের হাফেজ নন, তবে মোটামুটি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করেন এর অর্থ বুঝেন, তাঁর ক্ষেত্রে দেখা যায় হয়তো আয়াতের একটি শব্দ বা কিছু অংশ মনে পড়ে। সূরা বা আয়াত নাম্বার খুঁজে বের করতে হাফেজ সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হয়, নয়তো অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, তাঁর জন্য কম্পিউটারে রয়েছে দারুণ ব্যবস্থা। আপনি ‘কুরআন সার্চ’ প্রোগ্রাম বিশিষ্ট কোনো সফটওয়ার কারো কাছ থেকে সংগ্রহ করুন। কিংবা সরাসরি ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে ডাইনলোড করে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করুন। এটি শুধু আপনাকে আয়াত খুঁজে বের করতেই সহযোগিতা করবে না। স্বতন্ত্র রীতির কারণে কুরআনের আয়াত যে কেউ লিখতে বা টাইপ করতে যেখানে প্রায় ব্যক্তিই টুকিটাকি জানা অজানা ভুল করেন সেখানে আপনি নির্ভুলভাবে আপনার লেখা বা জন গবেষণাপত্রে আয়াত বা উদ্ধৃতি সংযোজন করতে পারবেন।

সুস্থ বিনোদন যোগানোর ক্ষেত্রে :

আপনি কম্পিউটারে পছন্দের সব নির্দোষ ভিডিও সংগ্রহ করবেন আপনার কম্পিউটারে। সময় সুযোগ মত সেগুলো শুনে আপনার বিনোদন তৃষ্ণা মেটাবেন তা দিয়ে। বিশ্বের বড় বড় সব ক্বারী সাহেবের তিলাওয়াত, যেমন মক্কা ও মদীনার মসজিদের বিখ্যাত ইমামগণের হৃদয় জুড়ানো কুরআন তিলাওয়াত, ক্বারী আবদুল বাসেত থেকে নিয়ে বর্তমানের সব বিখ্যাত ক্বারীগণের তিলাওয়াত সংগ্রহ করে আপনি নিজের জীবনকে রাঙাতে পারেন পবিত্র বিভায়। তাছাড়া দেশীয়সহ আন্তর্জাতিক সব ইসলামী শিল্পীদের হৃদয়কাড়া সব গান ও আবৃত্তিও আপনি সংগ্রহ করতে পারেন উপরে বলা আসা পন্থাগুলো অবলম্বন করে।

আপনি ঐতিহাসিক নানা ঘটনার তথ্য ও ইসলামী ইতিহাসের বিখ্যাত সব ঘটনার বিবরণমূলক বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্র দেখতে পারেন। মজার মজার সব ইসলামী কার্টুন পাওয়া যায়। এসবও সংগ্রহ করতে পারেন উপর্যুক্ত পন্থায়। এর মাধ্যমে আপনি যেমন সুস্থ বিনোদন চাহিদা মেটাতে পারবেন, তেমনি পারবেন নিজের জ্ঞান ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ এবং নিজেকে আরও শাণিত করতে। তবে এসব কার্টুন ও ডকুমেন্টারি সাধারণ ইংরেজি ও আরবী ভাষায় বেশি পাওয়া যায়। বাংলাতে কিছু ডাবিংকৃত ভিডিও পাওয়া যায় রাজধানীর সমৃদ্ধ সব ইসলামী প্রকাশনী পাড়াগুলোয়। ইন্টারনেটে ঢুকে islamic cartoons লিখে সার্চ দিলে অনেক সুন্দর সুন্দর শিক্ষণীয় কার্টুনের লিংক খুঁজে পাবেন। সেগুলো থেকে বাছাই করে আপনি পছন্দের কার্টুন ডাইনলোড করে নিতে পারেন। সেগুলো আপনি নিজের কম্পিউটারে সেভ করে রেখে পছন্দ মত সময়ে দেখবেন এবং অন্যকে দেখতে দেবেন।

লেখালেখির ক্ষেত্রে :

যারা লেখালেখি ও সাহিত্য চর্চা করেন তারা সবাই জানেন প্রকৃতপক্ষে এ কাজটি কত কঠিন। একজন লেখককে তাঁর এ সহজাত প্রতিভা বিকাশে এবং জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভে কতটা ত্যাগ, সংযম ও অখণ্ড অধ্যাবসায় চালিয়ে যেতে হয় তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই জানেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটি লেখা তৈরি করতে গিয়ে কখনো ওই কাগজ হারিয়ে ফেলেছি, কখনো একটি তথ্যের জন্য শ্রমসাধ্য প্রায় পূর্ণাঙ্গ একটি লেখা দিনের পর দিন পড়ে থেকেছে। কখনো দেখা গেছে, বহু কষ্টে একটি রচনা প্রস্তুত করেছি কিন্তু সময় মতো পৌঁছানো সম্ভব হয় নি, কিংবা কিছু অর্থ ব্যয় করার পরও সেকেলে ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ডাক ব্যবস্থার অভিশাপে তা আর সম্পাদকের হাত পর্যন্ত যেতে পারেনি। আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কোনো কপি নিজের কাছে না থাকায় এমন অনেক লেখা চিরতরে হারিয়ে গেছে। তা আর কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। আমার অনুল্লেখযোগ্য লেখালেখি জীবনে প্রথম যে বইটি আমি অনুবাদ করেছি অনেক আবেগ আর ভালোবাসা দিয়ে, সে পাণ্ডুলিপিটি আমি উদ্ধার করতে পারছি না। তাই চাইলেও পারছি না সেটি প্রকাশ করতে, কিংবা অন্তত তার চেহারাখানি দেখতে।

অথচ এই কম্পিউটার এসে অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাল। আগে একটি খসড়া করতে হত, তারপর সেটি ফ্রেস করে প্রেরণযোগ্য করতে হত। এখন সরাসরি কম্পিউটারে লিখি। বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের কথা জানি তাঁরা সরাসরি কম্পিউটারেই তাদের লেখা প্রস্তুত করেন। অবস্থা এমনকি এমন দাঁড়িয়েছে যে হাতে যেন লেখা বেরুতেই চায় না। কম্পিউটারে বসলেই ছোটে ফোয়ারা। এর কারণ, লেখা তৈরির ক্ষেত্রে কম্পিউটারের সরবরাহ করা নানা সুবিধা। যেমন : লিখতে গিয়ে অনেক সময় বক্তব্য আগপাছ করতে হয়, কোনো শব্দ বা বাক্য বারবার ব্যবহার করতে হয়, সেক্ষেত্রে কম্পিউটারে এ কাজ করলে অনেক সুবিধে হয়। কম্পিউটারকে কমান্ড দিয়ে কাজগুলো সহজেই করা যায়। কম্পিউটারে লেখার মধ্যে কাটাকাটি বলে কিছু চোখে পড়ে না। যদি কম্পিউটারটি নিরাপদ হয় তাহলে লেখা হারানোর চিন্তা করতে হয় না। সহজেই তা সংরক্ষণ করা যায়। ইচ্ছে হলে কিংবা প্রয়োজনে একটি লেখা বিভিন্ন জায়গায় বারবার প্রেরণ করা যায়। পেনড্রাইভ বা সিডিতে কপি করে আপনি লেখাটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে পারেন। অন্যের কাছে প্রেরণও করতে পারেন। কম্পিউটারের সঠিক ব্যবহারবিধি না জানা থাকলে হয়তো ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে আপনার ডকুমেন্ট হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ কারণে পেনড্রাইভে বা সিডিতে রাইট করে রাখলে আপনার ডকুমেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে আর তেমন ভাবতে হবে না। তবে যদি সেই সিডি বা পেনড্রাইভও আপনার কাছে হারিয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো কারণে নিরাপদ মনে না হয় তাহলে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে লেখাটি স্থায়ীভাবে মেইল এড্রেসে সংরক্ষণ করতে পারেন। এতে করে কোনোদিন লেখাটি হারাবে না। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বসে কম্পিউটার বা মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করে লেখাটি উদ্ধার করতে পারবেন। প্রয়োজনীয় ঠিকানায় সরাসরি প্রেরণ করতে পারবেন। একটি নির্দিষ্ট ফাইলে ধারাবাহিকভাবে এক বা একাধিক বিষয়ে লিখতে থাকলে অজ্ঞাতেই বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয়ে যায়। বই লিখে তা বয়ে বেরাতে হয় না। এক প্রকাশকের সঙ্গে কথা না মিললে কয়েকটি ক্লিক করেই তা একাধিক প্রকাশক বা ব্যক্তির কাছে প্রেরণ করা যায়।

প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে :

প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে কম্পিউটার কতটা সহায়ক তা মনে হয় নতুন করে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। আধুনিক যে কোনো প্রতিষ্ঠানেই এখন কম্পিউটার নামক বস্তুটি অতি অবশ্যই উপস্থিত থাকে। ব্যবসায়িক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলে এ বিনে তো অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না যেন। হিসাব-নিকাশ ও অফিসিয়াল প্রকাশযোগ্য বা গোপন নানা তথ্যাদি কম্পিউটারে লিখে সহজে সংরক্ষণ করা যায়। চাইলে পাসওয়ার্ড দিয়ে সংশ্লিষ্ট ফাইলে অন্যের প্রবেশিধাকার রোধ করা যায়। প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি, প্রচারপত্র, পরিকল্পনা ইত্যাদি আগে লিখিত আকারে থাকত, সেখান থেকে প্রতিবার নতুন করে কষ্ট করে লিখতে বা প্রকাশ করতে হত। আর এখন কম্পিউটারের বদৌলতে এ কাজ আর বারবার করতে হয় না।

আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে কম্পিউটার তো রীতিমত যুগান্তকারী ভূমিকাই রাখছে। ছাত্রজীবনে নিজের শিক্ষকদের দেখেছি কর্তৃপক্ষের বহু চাপাচাপির পর রাত জেগে পরীক্ষার খাতা দেখে দেবার পরও চূড়ান্ত ফল প্রকাশে মাস খানেক লেগে যেত। কখনো প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতে হতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার মাত্র সপ্তাহখানেক আগে প্রকাশ করা হত। আর এখন কম্পিউটারের এক্সেল প্রোগ্রামের মাধ্যমে অকল্পনীয় কম সময়ে এ কাজটি করা সম্ভব হচ্ছে।

অফিস বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে :

আপনি যদি হন কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক কিংবা অফিসের এমডি তবে আপনার কাজেও কম্পিউটার সাহায্য করতে প্রস্তুত। প্রতিষ্ঠানের কাজে আপনাকে নিশ্চয় যেতে হয় ব্যাংকে। দেখবেন ব্যাংকের এমডি সাহেব তাঁর কাঁচে ঘেরা কক্ষে বসে নিরবে পর্যবেক্ষণ করছেন অফিসের কে কোন কাজে ব্যস্ত। সিসিটিভির মাধ্যমে আজকাল বড় বড় শপিং মলগুলোতেও এসবের পরিচালকরা নিজ জায়গায় বসে নিরবে সব ক্রেতা ও দর্শকসহ সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছেন। আমাদের রাজধানী ঢাকা শহরসহ উন্নত বিশ্বের সকল সড়কে এই কম্পিউটারের মাধ্যমে ট্রাফিক সিগন্যাল দেয়া যায়। দায়িত্বশীলগণ পথ-ঘাট ও যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। অফিসে যদি সবাই কাজ করেন কম্পিউটারে তাহলে কম্পিউটারে বসে কে কোন কাজ করছে তা আপনি নিজ রুমে বসেই পর্যবেক্ষণ করতে পারেন কম্পিউটার নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে।

পরিতাপের বিষয় হলো, অনেকে কেবল না জানা বা ইচ্ছা না করার কারণে এই কম্পিউটার নামক যন্ত্র কিনে এতে শুধু গান শোনা কিংবা নাটক/সিনেমা দেখা ছাড়া কোনো কাজে লাগান না। কেউ কেউ নিজের অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চাকেও কম্পিউটার কিনে দেন, সে শুধু গেমস খেলা ছাড়া আর কোনো কাজে একে লাগায় না। ইদানীং আবার অনেকে বুদ্ধি খাটিয়ে পুরান কম্পিউটারের একখানি মনিটর কেনেন। তারপর তাতে টিভি কার্ড লাগিয়ে টেলিভিশন দেখার অতি সখের (?) কাজটি সারেন! হাস্যকর ব্যাপার হলো, কম্পিউটারের এমন নেতিবাচক ব্যবহার দেখে অনেকে এই নিরীহ বস্তুটির প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে যান। তারা যে কারো কম্পিউটার ব্যবহারকেই নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন।

বস্তুত পৃথিবীতে যত প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে এবং আগামীতে হবে সবগুলোই আল্লাহর দান। আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি আর প্রকৃতিতে নানা উপাদান দিয়েছেন বলেই ক’দিন পরপর নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে। অতএব আমাদের বরং শুকরিয়ার সঙ্গে এসব নেয়ামত ভোগ করা দরকার। আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে এসবকে কাজে লাগানো উচিত। পক্ষান্তরে প্রযুক্তির প্রতি বিদ্বেষ রাখা মূলত আল্লাহর নেয়ামতকেই অবহেলা বা অস্বীকারের নামান্তর। কেউ যদি অপরাধ করে, আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ করে তবে তার দায় কেবল তার ওপরই বর্তাবে। অন্য কারও ওপর এর বোঝা চাপানো যাবে না। অন্য কাউকে এ দোষে দোষী বানানো যাবে না। নিচের আয়াতগুলোয় দেখুন কত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কথাগুলো। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ إِن تَكۡفُرُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمۡۖ وَلَا يَرۡضَىٰ لِعِبَادِهِ ٱلۡكُفۡرَۖ وَإِن تَشۡكُرُواْ يَرۡضَهُ لَكُمۡۗ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُم مَّرۡجِعُكُمۡ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَۚ إِنَّهُۥ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ ٧ ﴾ [الزمر: ٧]

‘তোমরা যদি কুফরী কর তবে (জেনে রাখ) আল্লাহ তোমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী; আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না এবং তোমরা যদি শোকর কর তবে তোমাদের জন্য তিনি তা পছন্দ করেন; আর কোন বোঝা বহনকারী অপরের বোঝা বহন করে না। তারপর তোমাদের রবের দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে। তখন তোমরা যে আমল করতে তিনি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় অন্তরে যা আছে তা তিনি সম্যক অবগত’। {সূরা আয-যুমার, আয়াত : ৭}

﴿ مَّنِ ٱهۡتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهۡتَدِي لِنَفۡسِهِۦۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيۡهَاۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبۡعَثَ رَسُولٗا ١٥ ﴾ [الاسراء: ١٥]

‘যে হিদায়াত গ্রহণ করে, সে তো নিজের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের (স্বার্থের) বিরুদ্ধেই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই’। {সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ১৫}

﴿ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ وَإِن تَدۡعُ مُثۡقَلَةٌ إِلَىٰ حِمۡلِهَا لَا يُحۡمَلۡ مِنۡهُ شَيۡءٞ وَلَوۡ كَانَ ذَا قُرۡبَىٰٓۗ إِنَّمَا تُنذِرُ ٱلَّذِينَ يَخۡشَوۡنَ رَبَّهُم بِٱلۡغَيۡبِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَۚ وَمَن تَزَكَّىٰ فَإِنَّمَا يَتَزَكَّىٰ لِنَفۡسِهِۦۚ وَإِلَى ٱللَّهِ ٱلۡمَصِيرُ ١٨ ﴾ [فاطر: ١٨]

‘আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না এবং কোন ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি তার বোঝা বহনের জন্য কাউকে ডাকে তবে তার বোঝার কোন অংশই বহন করা হবে না যদিও সে আত্মীয় হয়; তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করবে যারা তাদের রবকে না দেখেও ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে; আর যে ব্যক্তি পরিশুদ্ধি অর্জন করে সে নিজের জন্যই পরিশুদ্ধি অর্জন করে। আর আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তন’। {সূরা ফাতির, আয়াত : ১৮}

﴿ قُلۡ أَغَيۡرَ ٱللَّهِ أَبۡغِي رَبّٗا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيۡءٖۚ وَلَا تَكۡسِبُ كُلُّ نَفۡسٍ إِلَّا عَلَيۡهَاۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُم مَّرۡجِعُكُمۡ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ فِيهِ تَخۡتَلِفُونَ ١٦٤ ﴾ [الانعام: ١٦٤]

‘বল, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন রব অনুসন্ধান করব’ অথচ তিনি সব কিছুর রব’? আর প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে, তা শুধু তারই উপর বর্তায় আর কোন ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের রবের নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে সেই সংবাদ দেবেন, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে’। {সূরা আল-আন‘আম, আয়াত : ১৬৪}

কে কী করছে, কে কম্পিউটার কোন খারাপ কাজে লাগাচ্ছে তার হিসাব রাখা বা তার ওপর বিধান জারি করা আমার দায়িত্ব নয়। তেমনি না জেনে, নিশ্চিত না হয়ে প্রমাণ ব্যতিরেকে কাউকে মন্দ ঠাওরানোও আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ وَلَا تَقۡفُ مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٌۚ إِنَّ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡبَصَرَ وَٱلۡفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَٰٓئِكَ كَانَ عَنۡهُ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٦ ﴾ [الاسراء: ٣٦]

‘আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে’। {সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬}

কেউ কম্পিউটারে সিনেমা দেখছে বা গুনাহ কামাই করছে দেখে আপনি এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না। জাগতিক কোনো কিছু অর্জন যদি আপনার অনায়াস সাধ্য হয় আর তা আপনার উপকার ছাড়া অপকার না করে তবে একে অবজ্ঞা করা কাম্য নয়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ وَٱبۡتَغِ فِيمَآ ءَاتَىٰكَ ٱللَّهُ ٱلدَّارَ ٱلۡأٓخِرَةَۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ ٱلدُّنۡيَاۖ وَأَحۡسِن كَمَآ أَحۡسَنَ ٱللَّهُ إِلَيۡكَۖ وَلَا تَبۡغِ ٱلۡفَسَادَ فِي ٱلۡأَرۡضِۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُفۡسِدِينَ ٧٧ ﴾ [القصص: ٧٧]

‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’। {সূরা আল-কাসাস, আয়াত : ৭৭}

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হয়ে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করার তাওফীক দান করুন। কম্পিউটারকে বানিয়ে দিন আমাদের আখেরাতে পদোন্নতির সোপান। আমীন।

উৎসঃ i-onlinemedia

মতামত দিন