পর্যালোচনা

কুরবানী করা প্রথা নয়, ইবাদত

রচনায় : মুহাম্মাদ হাশিম মাদানী

যুলফী ইসলামী সেন্টার, সৌদিআরব

সকল মুসলিম ভাইদের উদ্দেশ্যে বলছি যে, দ্বীনের উপর ফিৎনা সব যুগেই এসেছে এবং বর্তমানেও আসছে। মুসলিমরা তাদের দ্বীন ও দ্বীনের বিধি-বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকুক তা অবশ্যই ইসলামের শত্রুরা চায় না। তবে দুঃখ তাদেরকে নিয়ে নয়, যারা অমুসলিম। যাদের ধর্মের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে মিথ্যার উপর। তারা মন্তব্য করতেই পারে আমাদের দ্বীনের বিধি-বিধানকে নিয়ে। তারা কটুক্তি করতেই পারে আমাদের দ্বীনী ঈদ-উৎসব উদযাপনকে নিয়ে। উত্থাপিত পূর্বেও হয়েছে এবং এখনোও হচ্ছে। তাদের বহু আপত্তি ঈদুল আযহার দিন আমাদের কুরবানীর পশু জবাই করাকে নিয়ে বলে, এ সব অপচয়, অনৰ্থক এবং অর্থনষ্ট করা বৈ আর কিছুই নয়। এতে নাকি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে তাদের আপত্তি উত্থাপন এবং কটুক্তি করা তেমন কোন বিস্ময়কর ও বিচিত্র ব্যাপার নয়। তারা তো করতেই পারে, বরং দুঃখ তখনই লাগে যখন কোন মুসলিম ভাই কুরবানী করাকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার বলে মুসলিম সমাজকে তা ত্যাগ করতে আহ্বান জানায়।

সানোয়াজ খান নামে এক মুসলিম ভাইয়ের ‘সামাজিক কল্যাণে খরচ হোক কুরবানীর অর্থ’ এ বিষয়ে একটি লেখা ১৪/১১/১০ রবিবার সংবাদ প্রতিদিনে প্রকাশ হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানি না। তিনি সমাজের হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, যেহেতু কুরবানী করাটা কেবল একটি ধর্মীয় আচার বিধায় এ কাজ না ক’রে তার অর্থ যদি অন্য কোন সমাজ কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়, তাহলে নাকি বেশী উত্তম হয়। লেখাটি পড়ে মনে হল, এ মুসলিমদের জন্য বড় এক ফিৎনা। কিছুদিন আগে নূর আলম নামে এক নাপিত ভাই এ রকমই সমাজের হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে মুসলিম সমাজকে কুসংস্কার ও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচানোর জন্য বড়ই বিভ্রান্তিকর একটি বই লিখে মহাফিৎনা খাড়া করে দিয়েছেন। তাতে তিনি ইমাম মাহদী ও দাজ্জালের আবির্ভাব, ঈসা (আঃ)-এর পুনরাগমন এবং রাসূলুল্লাহ -এর মু’জিযাকে অস্বীকার ক’রে বলেছেন যে, এগুলো ভিত্তিহীন ও জাল। যাক আমরা মুসলিম সমাজকে এ ফিৎনা থেকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তার প্রতিবাদ লিখে সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দের হাতে তুলে দিয়েছি। এখন সনোয়াজ সাহেব এক নতুন ফিৎনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। তাই জনাব সানোয়াজ সাহেবকে বলছি,

কুরবানী কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এই কুরবানী অর্থাৎ, পশু জবাইয়ের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহ হল এমন এক মহান ইবাদত যা আল্লাহ ভালবাসেন এবং যা তিনি চান। এ হল অতীব গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। কারণ, বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রতি বছর মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে তা পালন করেছেন। জী হ্যাঁ জনাব সানোয়াজ খান সাহেব, এটা দ্বীনের মহান কাজ। এর দ্বারা একজন মুসলিম পূত-পবিত্র মহান আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিয়ে বলে,

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।” (সূরা আনআম ১৬২)

জী না জনাব সানায়োজ সাহেব, এটা এমন কোন ধর্মীয় আচার নয়, যা অভ্যাসগতভাবে মুসলিমগণ পালন করে থাকে। বরং এটা হল দ্বীনের সুমহান প্রতীক। আল্লাহভীরুতার প্রতীক। কুরবানী পশুর রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে মুসলিমগণ তাদের মহান আল্লাহর (দ্বীনের) প্রতীকসমূহের সম্মান করে। আর এই সম্মান করাকে আল্লাহ তাআলা হৃদয়ের সংযমশীলতার বহিঃপ্রকাশ বলে গণ্য করেছেন। যেমন, তিনি বলেন,

ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ

অর্থাৎ, “আর যে আল্লাহর (দ্বীনের) প্রতীকসমূহের সম্মান করে এটা তো তার হৃদয়ের সংযমশীলতারই বহিঃপ্রকাশ”। (সুরা হাজ্জ ৩২)

কুরবানীর দিন পশু জবায়ের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করা মহান আল্লাহর নিকট অতীব মহান এবং সর্বাধিক প্রিয় কাজ। আর এ কথা বলেছেন বিশ্ব নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)। যেমন, তিনি (সাঃ) বলেন, “কুরবানীর দিন আদম সন্তান এমন কোন কাজ করে না যা (এই দিনের) রক্ত প্রবাহের চেয়েও শ্রেয়”। (তাবারানী)

এই উত্তম কাজটাকে আপনি ধর্মীয় একটি আচার এবং অন্ধ অনুকরণ বলছেন। যে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে সেটা অন্ধ অনুকরণ ? আল্লাহ বলেন,

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অর্থাৎ, “আমি অবশ্যই তোমাকে (হাওযে) কাউসার (বা প্রভূত কল্যাণ) দান করেছি। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় কর এবং কুরবানী কর।” (সূরা কাউসার, আয়াত নং ১-২)

যে কাজ বিশ্ব নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তার মদীনার দশ বছরের জীবনে প্রতিবার পালন করেছেন,

সেটা কেবল আচার পালন এবং অন্ধ অনুকরণ ? আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, “নবী করীম (সাঃ) মদীনায় দশ বছর ছিলেন। প্রতি বছর তিনি কুরবানী করেছেন”। (আহমাদ, তিরমিযী)

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি কুরবানী না করে, তাকে বিশ্ব নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ঈদের মাঠে উপস্থিত হতে নিষেধ করেছেন। শুনুন আবু হুরাইরাহর জবানী। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠে উপস্থিত না হয়।” (ইবনে মাজাহ)

যে কুরবানী নবী করীম (সাঃ) প্রতি বছর পালন করেছেন তা কি অন্ধ অনুকরণ ? নবী করীম ও কি কারো অন্ধ অনুকরণে এ কাজ করতেন? আর যখন তিনি এ কাজ করতেন, তখন কি মুসলিমদের সামাজিক অবস্থা আরো উন্নত ছিল? তখন কি দুঃস্থ বালক-বালিকাদের শিক্ষা ও গরীব বিধবাদের প্রতিপালনের কোন সমস্যা ছিল না? সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ কুরবানী না করলে তাকে ঈদের মাঠে উপস্থিত হতে নিষেধ করছেন। সে সময় যে মানুষগুলোকে এ হুমকি তিনি শুনিয়ে ছিলেন, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল জানেন? মাসের পর মাস তাঁদের বাড়ীর উনুনে আগুন জত না। ক্ষুধায় তাদের পেটগুলো পিঠের সাথে মিশে যেত। এমন কঠিন পরিস্থিতির সময় তিনি (সাঃ) সামাজিক উন্নয়নের কথা ভেবে সামর্থ্যবান সাহাবীদেরকে তো বলতে পারতেন যে, তোমরা কুরবানী না দিয়ে তার অর্থ অসহায় গরীবদের মাঝে বন্টন করে দাও। নাকি তিনি ধর্মের নিয়ম পালনের ক্ষেত্রে শুধু আত্মিক কথা ভাবতেন, সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি কোন চিন্তা করতেন না? শুনুন কোন এক বছর সাহাবীদের মাঝে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি (সাঃ) তাদেরকে তিন দিনের বেশী কুরবানীর গোশত জমা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। লক্ষ্য করুন নিমে বর্ণিত হাদীসটির প্রতি। সালমা ইবনে আকওয়া (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের যে ব্যক্তি কুরবানী করে, সে যেন তৃতীয় দিনের পর এমন অবস্থায় প্রভাত না করে যে, তার ঘরে কুরবানীর গোশতের কিছু অংশ অবশিষ্ট থেকে যায়। পরবতী বছর আসলে, সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা গত বছর যেরূপ করেছিলাম, এ বছরও কি অনুরূপ করব? তিনি বললেন, নিজেরা খাও, অন্যকে খেতে দাও এবং জমা করে রাখ। (যেহেতু) ঐ বছর মানুষ (ক্ষুধার) কষ্টে পড়েছিল, এ জন্য আমি চেয়েছিলাম তোমরা তাদের সাহায্য কর” (বুখারী ও মুসলিম)

জনাব সানোয়াজ সাহেব! উল্লিখিত হাদীসটি পড়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করবেন। নবী করীম (সাঃ) মানুষের দুর্ভিক্ষ ও তাদের ক্ষুধার কষ্ট্রের দিক লক্ষ্য ক’রে কুরবানী করতে সমর্থ যাঁরা তাঁদেরকে তিন দিনের বেশী গোশত জমা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। যাতে তাঁরা গোশত দানের মাধ্যমে গরীব সাহাবীদের সাহায্য করেন। তিনি এ কথা কেন ভাবলেন না যে, এই দুর্ভিক্ষের বছরে কুরবানী না করে তার অর্থ দরিদ্র সাহাবীদের মাঝে বন্টন করে দেওয়া হোক? তিনি কুরবানী করতে নিষেধ করেননি, বরং কুরবানী ক’রে তার গোশত জমা করতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁর কি সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মের জন্য কোন চিন্তাভাবনা ছিল না? তিনি তো কুরবানী করতে পারবে এমন সামর্থ্যবানদের উদ্দেশ্যে বলতে পারতেন যে, তোমাদের কুরবানী করার চেয়ে তার অর্থ গরীবদের মাঝে বন্টন করে দেওয়া বেশী উত্তম—যেমন, আপনি বলেছেন। সে সময়কার অবস্থা বর্তমানের চেয়ে তো আরো করুণ ছিল। নাকি আপনার চিন্তার প্রসার নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অপেক্ষা আরো বেশী? তিনি হয়তো সামাজিক উন্নয়নের ব্যাপারে তত গভীরভাবে চিন্তা করতে পারনেনি, যা আপনি পেরেছেন।

জী হ্যাঁ, জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুঃস্থ বালক-বালিকাদের শিক্ষার ব্যবস্থা হওয়া খুবই ভাল কাজ। তার জন্য বিশেষ তহবিল হওয়া অতীব উত্তম কাজ। তবে তা কুরবানী না করে তার অর্থ দিয়ে নয়। বরং আরো পয়সা, সোনা-রূপা এবং আরো অন্যান্য জিনিসের যাকাত ঠিক মত আদায় করে দিত, তবে মুসলিমদের মাঝে কোন অভাবী থাকত না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনায়াসে চলত এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক আরো বহু কৰ্ম সাধিত হত। বিত্তশালীদের কাছ থেকে ঠিকমত যাকাত উসুল করা কিভাবে যায় সে নিয়ে চিন্তা করুন। কুরবানী করা এক মহান ইবাদত, অতএব এটাকে বন্ধ করার পায়তারা চালাবেন না। আমরা সৌদী আরবে দেখেছি, এখানে ধনী ব্যবসায়ীরা তাদের যাকাতের টাকা বিশেষ প্রতিষ্ঠানে জমা দেয়। আর এই টাকা দিয়ে দেশে এবং বিদেশে ইসলামের বহু খেদমত হয়। সৌদি সরকার গরীব মুসলিম দেশগুলোকে অনেক সাহায্য করে থাকে। আর এখানে শীর্ষ আলেমদের একটি কমিটি আছে। যাঁদের মতামতের ভিত্তিতে দ্বীনি বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যদি কুরবানী না করে তার অর্থ গরীব বিধবাদের প্রতিপালনে ব্যয় করা বেশী ভাল কাজ হত, তবে এ দেশের আলেমগণ জনগণকে অবশ্যই বলতেন যে, তোমরা কুরবানী না করে তার অর্থ গরীব দেশগুলোতে পাঠিয়ে দাও। শুনুন, এ দেশের এক মহামান্য শায়খ কুরআন ও হাদীসের গভীর জ্ঞানের অধিকার ব্যক্তি মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন (রহঃ) কুরবানীর ব্যাপারে কি বলেছেন। তিনি বলেছেন,

কুরবানী করা তার অর্থ দান-সাদকা করার চেয়েও উত্তম। কারণ, এ কাজ নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ করেছেন। অনুরূপ কুরবানী করা হল মহান আল্লাহর (দ্বীনের) প্রতীক। যদি মানুষ কুরবানী না করে তার অর্থ দান করে, তাহলে দ্বীনের এই প্রতীকই নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া কুরবানী না করে তার অর্থ দান করে দেওয়া যদি বেশী উত্তম হত, তবে তা নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর উম্মাতকে স্বীয় কথা ও কর্মের দ্বারা অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দিতেন। তিনি তো তার উম্মাতের জন্য কোন কল্যাণ বর্ণনা করতে বাদ দেননি। এমন কি যদি কুরবানীর অর্থ দান বা সাদকা করা কুরবানী করার সমানও হত, তাহলে তিনি (সাঃ) তার উম্মাতকে সাদকাই করতে বলতেন। কারণ, কুরবানী করার চেয়ে এটা আরো সহজ এবং এতে ঝামেলা কম। তাই বলছি, কুরবানী করা তার অর্থ দান করার চেয়ে অনেক উত্তম। এমন কি যদি কুরবানী পশুর চামড়া ভরতি দিরহাম সাদকা করা হয়, তবুও কুরবানী করাটাই হবে তার চেয়ে অনেক অনেক শ্রেয়। কারণ, ব্যাপার এখানে কুরবানীর গোশত পাওয়া ও খাওয়া নয়, বরং ব্যাপার হল কুরবানীর পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের (মাজমুআ’ ফাতওয়া-শায়খ ইবনে উসাইমীন রহঃ)

জনাব, যে কাজ মুহাম্মাদ (সাঃ) করেছেন ও করতে বলেছেন, তা পালন করা যদি অন্ধ অনুকরণ হয় তাতে দোষ কি? কেননা, তাঁর অনুকরণ তো অন্ধের মতনই করতে হয়। তিনি করেছেন ও করতে বলেছেন এমন কাজ সম্পাদনের ব্যাপারে তো কোন বিচার-বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। তিনি করেছেন ও বলেছেন উম্মাতের জন্য এটাই যথেষ্ট। তিনি যা করেছেন বা করতে বলেছেন তা ঠিক, না বেঠিক অথবা তিনি যা করেছেন তার চেয়ে অন্যটা আরো উত্তম—এ রকম বিবেচনা করার কোন অধিকার তো আমাদের নেই। দেখুন মহান আল্লাহ কি বলেন,

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا

অর্থাৎ, “আল্লাহ ও তার রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তার রাসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে”। (সূরা আহযাব, আয়াত নং-৩৬)

কুরবানী না করে তার অর্থ সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করলে তাতে নাকি সমাজ ও সম্প্রদায় দুয়েরই উন্নতি হবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার যে আপনার নেই তা আশা করছি কুরআনের উক্ত আয়াত দ্বারা পরিস্কার বুঝতে পারছেন। জী হ্যাঁ, নবী (সাঃ) করেছেন, আমাদেরকেও করতে হবে। নবী (সাঃ) বলেছেন, আমাদেরকে মানতে হবে। বিবেক-বুদ্ধি খাটানোর কোনই দরকার নেই। জানেন নবী করীম (সাঃ)-এর সাহাবীগণ তাঁকে কোন কাজ করতে দেখলে তারাও সে কাজ করতে আরম্ভ করে দিতেন। এ নিয়ে ভেবে-চিন্তে দেখার তারা কোনই প্রয়োজন মনে করতেন না যে, তিনি কাজটা কেন করেছেন? যেমন,

একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে নামায পড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ করে (নামায রত অবস্থায়) তিনি তাঁর জুতো দুটি খুলে বাম পাশে রেখে দিলেন। এটা যখন সাহাবীরা দেখলেন, তখন তারাও তাঁদের জুতোগুলো খুলে ফেললেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নামায শেষে সাহাবীদেরকে সম্বোধন ক’রে বললেন, তোমরা তোমাদের জুতোগুলো কেন খুলে ফেললে? তারা বললেন, আমরা আপনাকে আপনার জুতো দু’টি খুলে ফেলতে দেখলাম, তাই আমরাও আমাদের জুতোগুলো খুলে ফেললাম। তখন তিনি (সাঃ) বললেন, জিবরীল (সাঃ) আমার কাছে এসে জানালেন যে, জুতো দু’টির মধ্যে নোংরা রয়েছে। (আবু দাউদ)

জী জনাব, কুরবানী নবী করীম (সাঃ) করেছেন এবং করতে বলেছেন তার ব্যবহারিক উপকারিতা এবং তা যুক্তিযুক্ত কি না তা নিয়ে গবেষণা করার কোনই অধিকার আমাদের নেই। জনাব সানোয়াজ সাহেব কুরবানী করার মত এক মহান ইবাদাত পালনের ক্ষেত্রে মুসলিমগণ যে অর্থ ব্যয় করে সেদিকে আপনার নজর পড়েছে এবং তা সামাজিক কোন অন্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করাকে বেশী ভাল মনে করেছেন। অথচ যদি আপনি আপনার দৃষ্টিকে আরে একটু সম্প্রসারিত করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, মুসলিমদের কোটি কোটি টাকা শিরক ও বিদআতীয় কার্যকলাপে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কবর ও মাজারে মানত করার মাধ্যমে মুসলিমরা তাদের বিপুল অর্থ আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজে ব্যয় করছে। শিরকীয় আখড়াগুলোতে যদি যান, তাহলে দেখতে পাবেন যে, কি পরিমাণ অর্থ শিরকের মত মহাপাপের কাজে মানুষ নষ্ট করে দিচ্ছে। আবার অনেক মাজার তো সরকারী কব্জায় চলে গেছে। অর্থাৎ, সেই মাজারগুলোতে মুসলিমদের মানত করা হাঁস-মুরগী ও গরু-ছাগল সহ আরো বহু কিছু সরকারী গাড়ীতে বোঝাই হয়ে কোথায় যে চলে যায় এবং সেগুলো যে কাদের উপকারে ব্যবহার হয় তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। এ সব অর্থ দিয়ে মুসলিমদের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে। আপনার যে ধর্মীয় নেতাগণ মুসলমানদের কোরবানীকে বাধ্যতামূলক নয় বলে মন্তব্য করেছেন এবং যা আপনার কাছে বড়ই মনঃপুত হয়েছে, তারা এই শিরকের কাজে অপচয় ও নষ্ট হয়ে যাওয়া অর্থের ব্যাপারে কোন আলোকপাত করেন না কেন? নাকি এ যে শিরক তাও বুঝার মত জ্ঞানের আপনাদের অভাব? যদি মাজারের ভক্ত হন, তাহলে তো সেখানে প্রদান করা অর্থকে পুণ্যের কাজই ভাববেন। মাজারীদের কাছে কুরবানী করার চেয়ে মাজারে নজরানা পেশ করার গুরুত্ব আরো বেশী। পারলে এই বিপুল অর্থকে কিভাবে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে লাগানো যায় সে ব্যাপারে একটু চিন্তা-ভাবনা করবেন। কুরবানীর অর্থ নিয়ে ভাবার কোনই দরকার নেই। কারণ, তা আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় হয়।

আর আপনি যে বলেছেন, কোরবানী করার মধ্যে মানুষের ত্যাগের চেয়ে আবেগই থাকে বেশি

ভাই সানোয়াজ সাহেব! কে ত্যাগ স্বীকার করে, আর কে আবেগে করে–এ বিচার কোন মানুষ করতে পারে না। জী হ্যাঁ, নামায তো অনেকে পড়ে, কিন্তু আপনি কি বলতে পারবেন কার নামায গৃহীত হয়, আর কার হয় না? কেউ লোক দেখানি নামায পড়ে, আবার কেউ নিষ্ঠার সাথে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নামায পড়ে। এখন কে লোক দেখানি নামায পড়ছে, আর কে আল্লাহর জন্য নামায পড়ছে এ ফয়সালা কি আমরা করতে পারব? এক শ্রেণীর মানুষ লোক দেখানি নামায পড়ে বলে কি আমরা সাধারণভাবে বলে দেব যে, নামায পড়ে কী লাভ? কারণ, এতে ইখলাসের চাইতে লোক প্রদর্শনের ব্যাপারটাই বেশী থাকে? জী না, এ রকম বলা যায় না। অনুরূপ কেউ কুরবানী দিয়ে ত্যাগের পরিচয় দেয়। আবার কেউ হয়তো কেবল আবেগে এ কাজ করে। তবে কে আবেগে করে, আর কে ত্যাগের পরিচয় দেয় তার ফয়সালা আমাদের হাতে নেই। সেটা কেবল আল্লাহই জানতে পারেন। আর তিনি এই ত্যাগ ও আবেগের ভিত্তিতেই কারো কুরবানী কবুল করবেন এবং কারো প্রত্যাখ্যান করবেন। হ্যাঁ, একটি কথা মনে রাখবেন যে, শরীয়তে সাব্যস্ত নয় এমন কোন কাজ কেবল আবেগে করা যায় না। কিন্তু সাব্যস্ত কর্ম সম্পাদন করার সময় ভক্তি ও আবেগ তো থাকতেই পারে। কুরবানী করা ইবাদাত বিধায় এই ইবাদাত সম্পাদন করবে মুসলিমগণ ভক্তি, ত্যাগ এবং আবেগ সহকারে। এতে দোষের কিছুই নেই।

আবার লিখেছেন অনেকে সূদের টাকাতেই পশু কোরবানী করছে আপনার বলার উদ্দেশ্যে হল, যেহেতু বহু মানুষ সূদের টাকায় কুরবানী করে যাতে কোন লাভ হয় না, তাই কুরবানী না করে তার অর্থ সামাজিক উন্নয়নমূলক অন্য কাজে ব্যয় করা বেশী ভাল।

ভাই সাহেব! মক্কা পর্যন্ত আসার মত অর্থ যাদের আছে তাদের উপর হজ্জ ফরয। আশা করি এ বিধান আপনার জানা আছে। এখন মনে করুন যে, অনেকে সূদের টাকা নিয়ে, ঘুষের টাকা নিয়ে বা আত্মসাৎ করা টাকা নিয়ে হজ্জ করতে আসে। আপনি কি বলবেন যে, যেহেতু অনেকে সূদ, ঘুষ ও আত্মসাৎ করা টাকা নিয়ে হজ্জ করতে আসে তাই হজ্জ না করে তার অর্থ দিয়ে সমাজের অন্য কাজ হওয়াই বেশী ভাল। সবাই কি সূদের টাকা দিয়ে কুরবানী করে? হজ্জ কবুল হওয়ার জন্য যেমন হালাল টাকা হওয়া শর্ত। অনুরূপ কুরবানী কবুল হওয়ার জন্য হালাল টাকা দিয়ে কুরবানীর পশু কেনা শর্ত। এ তে কবুল হওয়া ও না হওয়ার ব্যাপার। কেউ কেউ সূদের টাকা দিয়ে কুরবানী দেয় বলে কি আপনি সাধারণভাবে হুকুম জারী করে দিবেন?

কুরবানী করাকে একটি প্রথা বলছেন? জী না, কুরবানী এমন কোন প্রথা নয়, যা পূর্বপুরুষদের দেখাদেখি মুসলিমগণ পালন করে। বরং তা আল্লাহর নির্দেশ এবং বিশ্ব নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সুমহান সুন্নাত।

আবার বলেছেন, কোরবানীর অর্থ কোন সামাজিক মঙ্গলের জন্য ব্যয় করাও ধর্মপালনেরই অঙ্গ এবং এতে নাকি সৃষ্টিকর্তা আরও বেশি সন্তুষ্ট হবেন

জনাব সৃষ্টিকর্তা কিসে সন্তুষ্ট হবেন, আর কিসে অসন্তুষ্ট হবেন, তা আমাদের বিচার-বুদ্ধির উপর নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ, ব্যাপার এমন নয় যে, আমরা আমাদের বিবেক-বুদ্ধি দিয়েই নির্বাচন করব তাঁর সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্টমূলক কাজগুলো। বরং তা নির্বাচিত হয়ে গেছে অহীর আলোকে। আর অহীর আলোকে যা নির্বাচিত হয়ে গেছে, তা নিয়ে আর পুনর্বিবেচনা করার কোন অবকাশ আমাদের নেই। কুরবানী করার বিধান এসেছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে। তিনি এটাকে তার দ্বীনের প্রতীক হিসাবে গণ্য করেছেন। আর তার দ্বীনের প্রতীকসমূহের সম্মান করা যে হৃদয়ের সংযমশীলতার পরিচয় তাও তিনি তাঁর কুরআনে বলে দিয়েছেন। সুতরাং কুরবানী না করে তার অর্থ সামাজিক অন্য কোন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা বেশী ভাল হবে, এমন বিবেচনা করার বৈধতা আমাদের নেই বা তার অধিকার শরীয়ত-প্রণেতা আমাদেরকে দেননি।

পরিশেষে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! তুমি মুসলিম উম্মাহকে এই ধরনের ফিৎনা থেকে রক্ষা কর! সমাজের হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে যারা মুসলিম সমাজের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার পায়তারা চালাচ্ছে তাদের মন্দ অভিপ্রায় থেকে সমাজকে হেফাযত কর।

মতামত দিন