নারী সাম্প্রতিক বিষয়

যে আফিয়া সিদ্দিক্বীকে আমি দেখেছি…

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

“আফিয়া সিদ্দিক্বীর ব্যাপারে আমি আপনাদেরকে একটা কথা জানাতে চাই। যারা এই মহিলাকে কাছ থেকে দেখেছেন, ইসলামের জন্য তার ভালোবাসা ও উৎসর্গের গল্পগাঁথা জানেন, তারা এও জানেন যে, ইসলামের জন্য আফিয়া খুব সহজে এবং অনায়াসে যে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও খুব অল্প কিছু মানুষই এমন ত্যাগ স্বীকার করার সৎসাহস দেখায়।”

“নিরাপত্তার জন্য আফিয়া বিরাট হুমকিস্বরুপ”
-ক্রিস্টোফার লাভিন, সহকারী ইউএস এটর্নি, অগাস্টের ১১ তারিখে বিচারককে উদ্দেশ্যে করে এই কথাটি বলেন। আফিয়াকে তার গুলিবিদ্ধ ক্ষতস্থানের চিকিৎসা থেকে বিরত রাখার জন্য এই কথাটি বলা হয়েছিল।

 রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদেরকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একদলে ছিল সেসব মুসলিম যারা ইসলাম গ্রহণের পর নিজ দেশ বা সমাজের মানুষদের সাথে থেকে যায়, এবং তাদের ধর্মচর্চা দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি অর্থাৎ নামায, রোযা, কালেমা ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। অন্যদলটি ইসলাম গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং তারা দ্বীনের খাতিরে হিজরত করেছিল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সামরিক মহড়া ও যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। একাধিক হাদীস থেকে আমরা দেখতে পাই, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু’ধরনের মুসলিমদের সমান সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা দেননি। যেমন, মুসলিম এবং আত-তিরমিযী শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো বাহিনীর নেতা বা আমীর নির্বাচন করার সময় শত্রুদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছে তাদের সাথে কী রুপ আচরণ করতে হবে এ ব্যাপারে তাদেরকে দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, “… তাদেরকে আমন্ত্রণ জানাও যেন তারা তাদের দেশ (ভূমি) ছেড়ে মুহাজিরিনদের ভূমিতে হিজরত করে চলে আসে, এবং তাদেরকে জানিয়ে দাও, যদি তারা এমনটি করে, তাহলে তারা মুহাজিরিনদের সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। যদি তারা হিজরত করতে সম্মত না হয়, তাহলে তাদেরকে বলে দিও যে সেক্ষেত্রে তারা বেদুইনদের সমমর্যাদা লাভ করবে, আর তাদের উপর আল্লাহ তা’আলার সেইসব হুকুমগুলো প্রযোজ্য হবে যেগুলো অন্য মুসলিমদের উপরেও প্রযোজ্য হয়…”
এই পার্থক্যকরণটি খুব সুস্পষ্ট। কারণ এখানে একটি দল নিজেদের কাঁধে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব তুলে নিতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। অপরদিকে অন্য দলটি ইসলামের ব্যক্তিগত, বাধাধরা এবং ঝুঁকিমুক্ত কাজগুলোর মধ্যে আবদ্ধ থেকেছে। মূলকথা হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎকালীন মুসলিমদের ইসলামচর্চাকে দু’ভাগে ভাগ করেছিলেন: মুহাজিরিনদের দ্বীন বা দ্বীন আল-মুহাজিরিন, যারা দ্বীনকে সহায়তা ও দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এবং বেদুইনদের দ্বীন বা দ্বীন আল-‘আরব, যারা কেবল দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চলতেন।
যদিও এ বাস্তবতা হাজার বছর আগের, তথাপি এটাই চিরন্তন বাস্তবতা যে মুসলিমদের মধ্যে এ দুটি শ্রেণী বিরাজমান থাকবে। কাজেই, যে কেউ লক্ষ করলে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের ইসলাম-পালন-করা-মুসলিমদের(practicing Muslims) মাঝেও এ পার্থক্যটি আবিষ্কার করবে। অতীতের সেই দ্বীন আল-‘আরাবকে সে ইসলামের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যে ইসলামচর্চা গতানুগতিক সেই পাঁচটি স্তম্ভ অর্থাৎ কালেমা-নামায-রোযা-যাকাত-হাজ্জ, হালালভাবে জবেহকৃত পশু খাওয়া আর স্থানীয় মসজিদকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা-এসবের মাঝে সীমিত। এ ধরনের মুসলিমই যখন পশ্চিমা দেশে খুঁজে পাওয়া দায়, তখন আপনি যদি পশ্চিমা দেশে এমন কারো দেখা পান, যিনি গতানুগতিক ধারার ইসলামকে ছাড়িয়ে এক ধাপ এগিয়ে আছেন এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেকে দ্বীন আল-মুহাজিরীনদের দলে ঠাঁই করে নিয়েছেন, তাকে দেখে কি আনন্দে আপনার চোখে জল আসবে না? ভেবে দেখুন কত চমৎকার একজন মুসলিম হলে পশ্চিমা দেশে থেকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদাত নয়, বরং চিন্তার জগত পুরো উম্মাহকে জুড়ে বিস্তৃত হয়! এই অগ্রপথিকেরা অন্যান্যদের এগিয়ে এসে উম্মাহর সক্রিয় সদস্য হতে উৎসাহিত করেন এবং রাতদিন সাধ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়ে আল্লাহর আরোপিত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে যান। শত ব্যস্ততার ভীড়েও তারা ক্ষান্ত হন না। বরং তাদের হৃদয় স্পন্দিত হয় তার মুসলিম ভাইবোনদের সাথে ঐকতানে। তারা মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে জানে এবং তাদের পরোয়া করে না যারা কেবল খায় আর গবাদিপশুর মত বেঁচে থাকে। তাই বলা হয়ে থাকে,
هكذاالاحرارفيدنياالعبيد
“দাসত্বের এই দুনিয়ায় তারাই হল মুক্ত স্বাধীন …”
এমনই এক মানুষকে ঘিরে সারা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে। সেই মানুষটি একইসাথে একজন ছাত্রী, স্ত্রী ও তিন সন্তানের মা। ক্ষীণকায়, ছোটখাট সেই মানুষটির নাম আফিয়া সিদ্দিক্বী।
আমি খুব করে চাই এ মানুষটির গল্প আপনারা শুনুন! তার গল্প আমার হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে, তাই আমি চাই আপনারাও উপলব্ধি করুন কেন এই মানুষটির গল্প আমাকে প্রভাবিত করেছে। যারা তাকে চেনেন তারা জানেন, ইসলামের জন্য আফিয়া খুব সহজভাবে এবং অনায়াসে যে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও খুব অল্প কিছু মানুষই এমন ত্যাগ স্বীকার করার সৎসাহস দেখায়।
আফিয়া ছিলেন ছোটখাট, শান্ত, ভদ্র এবং লাজুক এক নারী। হৈ-হুল্লোড় কিংবা সভাসমাবেশে খুব কমই তিনি মানুষের চোখে ধরা দিতেন। কিন্তু, প্রয়োজনের সময় তিনি ঠিকই সাড়া দিতেন, আর যে কথাগুলো বলা প্রয়োজন সেগুলোই সবাইকে বলতেন। একবার বসনিয়ার এতিম শিশুদের জন্য তহবিল সংগ্রহের দরকার পড়ল, সেখানে স্থানীয় এক মসজিদে আফিয়া তার বক্তৃতায় কড়া ভাষায় পুরুষদেরকে তিরস্কার করলেন। পুরুষ হয়ে কেন তারা বসে আছে আর নারী হয়ে আফিয়াকে তহবিল সংগ্রহের কাজ করতে হচ্ছে? তিনি সবার কাছে আর্তি জানালেন, “পুরুষরা কোথায়? আমাকে আজকে কেন একা দাঁড়িয়ে এসব কাজ করতে হচ্ছে?” তিনি ঠিকই বলেছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন মা, স্ত্রী এবং ছাত্রী। আর তার চারপাশে ছিল এমন সব পুরুষ, ইসলামের কাজের কথা উঠলেই যাদের আর দেখা পাওয়া যেত না।
MIT’র ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে আফিয়া স্থানীয় মুসলিম কারাবন্দীদের কাছে কুরআনের কপি ও ইসলামী বইপত্র গাড়িতে করে পৌঁছাবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি স্থানীয় মসজিদে বইগুলোকে আনিয়ে নিতেন। তারপর ভারি বইগুলো বাক্সবন্দী করে মসজিদের খাড়া সিঁড়ি ভেঙে পুরো তিনতলা পাড়ি দিয়ে নিজ হাতে সেগুলো জেলে জেলে পৌঁছে দিতেন। সুবহানআল্লাহ, আল্লাহর কি ক্বাদার: যেই মানুষটি মুসলিম কারাবন্দীদের সাহায্য করতে নিজে এত সময় আর শ্রম ব্যয় করেছেন সেই তিনি নিজেই আজ একজন কারাবন্দী (আমি আল্লাহর কাছে দু’আ করি যেন তিনি মুক্ত হতে পারেন)!
ইসলামের প্রতি তার যে একনিষ্ঠতা ক্যাম্পাসেও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ত। বোস্টন ম্যাগাজিনের ২০০৪ সালের একটি প্রবন্ধ উল্লেখ করেছে, “… যারা মানুষকে ইসলামের শিক্ষা দেয়, তাদের জন্য আফিয়া তিনটি গাইড লিখেছেন। গ্রুপের ওয়েবসাইটে তিনি শিক্ষা দিতেন কিভাবে একটি দা’ওয়াহ টেবিল পরিচালনা করতে হয়, কিভাবে স্কুলের ইনফরমেশন বুথগুলোকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে ইসলামের শিক্ষা দেওয়া যায় এবং তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা যায়।” সেই প্রবন্ধটি আফিয়ার গাইডের কিছু কথা উদ্ধৃত করেছে। তিনি সেখানে লিখেছিলেন,
“ভেবে দেখুন! আমাদের এই বিনম্র কিন্তু আন্তরিক দা’ওয়াহর প্রচেষ্টা থেকেই একটি সুবিশাল দা’ওয়াহ আন্দোলন জন্ম নিতে পারে! একটু ভেবে দেখুন! আর এই আন্দোলনের হাত ধরে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে, তাদের সকলের পুরষ্কার আমাদের খাতাতেও জমা হবে! বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করুন এবং বড় পরিকল্পনা হাতে নিন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে শক্তিশালী করেন এবং কাজে আন্তরিকতা ঢেলে দেন যাতে করে আমাদের এই বিনম্র প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে, এবং ছড়িয়ে পড়তে থাকে যতদিন না এই আমেরিকা একটি মুসলিম দেশে পরিণত হয়।”
আল্লাহু আকবর… তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখুন! … তার আকাশ-ছোঁয়া আশা আর পাহাড়সম স্বপ্ন! পুরুষ হয়ে যদি এক নারীর কাছে এমন স্বপ্ন দেখা শিখতে হয় তবে তো আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত।
তিনি প্রত্যেক সপ্তাহে রবিবারে তার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেন স্থানীয় মুসলিম শিশুদের ক্লাস নিতে। এক বোন থেকে জানতে পারি, প্রতি সপ্তাহে আফিয়া গাড়ি নিয়ে বের হতেন এবং নও মুসলিমদের একটি ছোট্টদলকে তিনি ইসলামের মৌলিক বিষয়াদির উপর শিক্ষা দিতেন। আফিয়ার ক্লাস করতেন এমন এক বোন বলেন, “তিনি নিজে যেমন, তেমনই থাকতেন, বিশেষ কিছু করে কারো নজরে আসতে চাইতেন না বা বিশেষ কারো সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি স্রেফ আমাদের কাছে আসতেন এবং আল্লাহ সম্পর্কে আমাদেরকে শিক্ষা দিতেন। অথচ ইংরেজি তার মাতৃভাষাও ছিল না!”
আফিয়ার হালাক্বায় (ক্লাস) অংশ নিতেন এমন আরেক বোন বলেন, “আফিয়া আমাদেরকে বলতেন, মুসলিম পরিচয় নিয়ে আমাদের লজ্জিত হবার কিছু নেই। তিনি বলেছিলেন, “দুর্বলদের প্রতি আমেরিকানদের কোনো সম্মান নেই। যদি আমরা উঠে দাঁড়াই এবং শক্তিশালী হই, তখন তারা আমাদেরকে ঠিকই সম্মান দেখাবে”।”
আল্লাহু আকবর … হে আল্লাহ, আমাদেরকে এই বোনকে মুক্ত কর!
কিন্তু এসব কিছুর মাঝেও, আফিয়ার সবচেয়ে বেশি অনুরাগ কাজ করত বিশ্বের নানাপ্রান্তের শোষিত ও নিপীড়িত মুসলিমদের প্রতি। বসনিয়ায় যখন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল, তিনি তখন পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকেননি। বরং, তিনি তৎক্ষণাৎ হাতের কাছে যা পেয়েছেন তা নিয়ে সাধ্যের মধ্যে কিছু একটা করার চেষ্টা করেছিলেন। সারাদিন ঘরে বসে বসনিয়া গিয়ে ব্যাপক ত্রাণকার্যক্রম চালাবার মত আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখার মানুষ আফিয়া ছিলেন না। বরং তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং তাই করলেন যা তার সাধ্যে আছে: মানুষের সাথে কথাবার্তা বলে তাদেরকে বসনিয়ার অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করলেন, ডোনেশন যোগাড় করলেন, ই-মেইল করলেন, স্লাইডশো-তে বসনিয়ার অবস্থা উপস্থাপন করে সবার মাঝে সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা করলেন। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি তা হল, আফিয়া চোখে আঙ্গুল দিয়ে সবাইকে একটা জিনিষ দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, যদি আমরা আমাদের নিপীড়িত ভাই-বোনদের জন্য কিছু একটা করতে চাই, আমাদের কিছু-না-কিছু অবশ্যই করার থাকবে। নিদেনপক্ষে, যারা অজ্ঞ, তাদের মধ্যে আমরা সারা বিশ্বের মুসলিম ভাই-বোনদের উপর কী ঘটে চলেছে সে ব্যাপারে সচেতনতা অন্তত সৃষ্টি করতে পারি।
হাত গুটিয়ে পেছনে পড়ে থাকা কোন কাজের কথা নয়। একবার আফিয়া স্থানীয় মসজিদে বসনিয়ার এতিমশিশুদের জন্য সাহায্য চেয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। তার কথা শুনে শ্রোতাদের তেমন কোন ভাবাবেগ হল না, তারা তার কথা শুনে স্রেফ বসেই ছিল। তখন আফিয়া জিজ্ঞেস করলেন: “এইরুমে যতজন মানুষ আছে, তাদের ক’জনের একজোড়ার বেশি জুতো আছে?” রুমের প্রায় অর্ধেক মানুষ হাত তুলল। তিনি বললেন, “তো আপনারা এগিয়ে আসুন বসনিয়ার শিশুদের জন্য! যারা একটি কঠিন শীত পার করতে যাচ্ছে!” তার আর্তি এতটাই জোরালো ছিল যে মসজিদের ইমাম পর্যন্ত তার জুতোজোড়া খুলে দান করে দেন!
ইসলামের জন্য এ নারীর তীব্র আবেগ আর ভালবাসার গল্পের আরো অনেকটুকু আছে। তবে আফিয়া কেমন ছিলেন তা বোঝার জন্য উপরের উদাহারণগুলোই যথেষ্ট, এবং আশা করি নারী হিসেবে তার ত্যাগের যে গল্প তা বোনদের আগে ভাইদেরকে নাড়া দেবে, তাদেরকে ইসলামের সেবায় যা-কিছু-আছে তাই নিয়ে নেমে পড়তে অনুপ্রেরণা যোগাবে। মনে রাখবেন, তিনি তার সব কিছু ঢেলে দিয়েছিলেন এমন একটা সময়ে, যখন তিনি ছিলেন একজন মা এবং একজন পিএইচডি ছাত্রী। আর আমাদের হাতে আরো বেশি সময় থাকা সত্ত্বেও তার কাছাকাছিও কিছু করছি না।
আফিয়ার এ প্রতিচ্ছবিকে মনের মধ্যে গেঁথে যখন আমি আদালতের শুনানিতে আফিয়াকে দেখতে পেলাম তখন আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। আদালতকক্ষের সামনের বামের দরজাটা হালকা করে খুলে যাওয়ার পর নীল হুইলচেয়ারে বসা দুর্বল, নিস্তেজ, প্রবল-পরিশ্রান্ত এক নারী আমাদের সবার সামনে উপস্থিত হল। তিনি তার মাথাটি সোজা করে ধরেও রাখতে পারছিলেন না। তার পরনে ছিল গুয়ানতানামো ধাঁচের গোলাপী কারাপোষাক, আর তার মাথা মোড়ানো সাদা হিজাবে, যেটা দিয়ে তার অস্থিসার হাতদুটো ঢাকা (কারাগারের ইউনিফর্মে হাতাকাটা থাকে)। তার উকিল দ্রুত তাঁর কাছে গিয়ে বসার পর জামিনের জন্য শুনানি শুরু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কুশলি, সহযোগী ইউএস এটর্নি ক্রিস্টোফার লাভিন, তিন-চারজন এফবিআই এজেন্টকে সাথে নিয়ে হেঁটে আসলেন, তাদের মধ্যে এক মহিলা ছিল যাকে পাকিস্তানীর মত দেখাচ্ছিল (আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক এই দালালের প্রতি)। আত্মপক্ষ সমর্থন করে বিবাদী উকিল বললেন, জামিনের আবেদনে শুনানি দেরি হবার কারণ হল আফিয়ার শরীরের করূণ হাল। আফিয়ার উকিল মূলত বলতে চাইলেন, আফিয়ার এ মুমূর্ষু অবস্থায় জামিন নয়, বরং সবকিছুর আগে তাকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করানো হোক। লাভিন উঠে দাঁড়িয়ে আপত্তি জানাল, বলল আফিয়া আমেরিকা নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরুপ। বিচারক সে কথা খুব একটা আমলে নিলেন মনে হল না। ফলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি বলে চললেন, “এ এমন এক নারী যে বন্দী অবস্থায় বোমা ফাটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে”। একথা শুনেই আমি আফিয়াকে দেখলাম এবং লক্ষ করলাম আফিয়া খুব হতাশা আর কষ্ট নিয়ে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন, যেন সমস্ত পৃথিবী তার বিরুদ্ধে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রসঙ্গত, আফিয়া ছিলেন খুব ছোটখাট আর তিনি এতটাই নুয়ে পড়েছিলেন, আমি কেবল তাকে পেছন থেকে হুইলচেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় সামান্যই দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি শুধু এতটুকুই দেখেছি তার মাথা বাম দিকে ঝুঁকে পড়েছে, হিজাবে তার মাথা মোড়ানো এবং ডান হাত বের হয়ে আছে।
তিনি কেন এতটা মনোকষ্টে জর্জরিত আর বিষাদগ্রস্ত ছিলেন তা আমি বুঝতে পেরেছি যখন তার উকিল তার শারীরিক অবস্থা বিশদভাবে তুলে ধরলেন:
  • আমেরিকার তত্ত্বাবধানে থাকাকালীন সময় থেকে তার ব্রেইন ড্যামেজ হয়েছে।
  • আমেরিকান সরকারের অধীনে থাকাকালীন সময়ে তার একটি কিডনী সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
  • তিনি খেতে পারছেন না কেননা অপারেশনের সময় তার অন্ত্রের কিছু অংশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, এটিও ঘটেছে আমেরিকান প্রহরায়।
  • গুলিবিদ্ধ স্থানের সার্জারি করতে গিয়ে তার শরীরের প্রলেপের পর প্রলেপ জুড়ে সেলাই করা হয়েছে।
  • তার শরীরে বুক থেকে শুরু করে পুরো ধড় জুড়ে অস্ত্রোপচারের বিশাল ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
এ সব যন্ত্রণা নিয়ে, আমেরিকায় কারারুদ্ধকালীন পুরো সময়জুড়ে তাকে একবারও ডাক্তার দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। আফগানিস্তানে তার অযত্ন-অবহেলায় অপারেশনের পর তার পেটে অবিরত অসহ্য ব্যথা হবার পরেও না। বরং এই ব্যথার জন্য তাকে দেওয়া হয়েছে আইবোপ্রোফেন নামের একটি ব্যথানাশক ঔষধ, যেটা কিনা লোকে খায় মাথাব্যথার জন্য!
এসব কিছুর পরেও, সরকারপক্ষের আইনজীবি বেহায়া এবং নির্লজ্জের মত তাকে ডাক্তার দেখানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখার আস্পর্ধা দেখিয়ে গেলেন, যুক্তি দেখিয়ে চললেন আফিয়া নাকি “নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরুপ”। যখন বিচারক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন আফিয়াকে এভাবে একদম প্রাথমিক চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত রাখা হল, তখন এটর্নি সাহেব তোতলাতে শুরু করলেন এবং বললেন, “আসলে তখন পরিস্থিতি খুব জটিল আকার ধারণ করেছিল”, এবং নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য প্রত্যাশিতভাবেই অত্যন্ত সস্তা একটা কুযুক্তি ধার করলেন, “এটি আফিয়ার নিজের সিদ্ধান্ত যে তিনি পুরুষ ডাক্তারের কাছে নিজেকে দেখাতে চাননি”। আইনজীবি যখনই একথা বললেন, আফিয়া তাঁর জীর্ণশীর্ণ হাত তুলে অতিকষ্টে ডানে-বামে নেড়ে যেন বিচারককে বলতে চাইলেন, “না! সে মিথ্যে বলছে!”। আমার খুব কষ্ট লাগল। চোখের সামনে এভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ঝুরি ঝুরি মিথ্যা বলতে দেখে আফিয়ার চেহারায় প্রচণ্ড হতাশার ছাপ দেখা দিল। তার আইনজীবি তখন তার কাছে গিয়ে তার হাতটি ধরে পায়ের উপর বসিয়ে দিলেন এবং হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলেন।
শুনানি যখন শেষ হল, আমার মাথায় তখন ইবন আল-কায়্যিমের একটি সুগভীর উক্তি বারবার মনে পড়তে লাগল, তিনি বলেছিলেন, একজন বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে না ততক্ষণ, যতক্ষণ না, “…শেষ প্রতিবন্ধকটি অবশিষ্ট থাকবে যা থেকে শয়তান তাকে তাড়া করে এবং বান্দাকে অবশ্যই এই প্রতিবন্ধকের মোকাবেলা করতে হবে। যদি কেউ এই বাধা থেকে রক্ষা পায় তাহলে তারা হলেন আল্লাহর নবী এবং রাসূলগণ, যারা সৃষ্টির সেরা। এটি হল শয়তানের সেই প্রতিবন্ধকতা যেখানে শয়তানের বাহিনী মু’মিন বান্দার উপর চড়াও হবে এবং বিভিন্ন প্রকারে তার ক্ষতিসাধন করে: হাত, জিহবা এবং অন্তর দ্বারা। ঈমানের মাত্রা অনুযায়ী এই পরীক্ষার মাত্রাও ভিন্ন হবে। বান্দার ঈমান যতবেশি হবে, শত্রু ততবেশি করে তার বাহিনীকে বান্দার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবে ও পৃষ্ঠপোষকতা করবে। শয়তান তার অনুসারী ও মিত্রদের সহযোগিতায় বান্দাকে গুড়িয়ে দিতে চাইবে। এই বাধাকে এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই, কেননা আল্লাহর দিকে আহবানে সে যত দৃঢ়তার পরিচয় দেবে এবং আল্লাহর অর্পিত আদেশ পালনে ব্রতী হবে, শয়তান ততবেশি করে মূর্খলোকদের মাধ্যমে তাকে ধোঁকা দিতে তৎপর হবে। কাজেই, যে বান্দা তার শরীর ঈমানের বর্মে আচ্ছাদিত করে আল্লাহর রাহে, আল্লাহর নামে শত্রুকে মোকাবেলা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল, তার এই ইবাদাতই হল, সকল ইবাদাতের মাঝে শ্রেষ্ট ইবাদাহ”।
ইবন আল-কায়্যিম এর এই কথাগুলো আদালতের সেই দৃশ্যে পরিষ্কারভাবে আমার চোখের সামনে ফুটে ওঠে। আদালতে আফিয়ার শরীরে দুর্বলতা আর নাজুকতার ভাব থাকলেও, সারাটা সময় জুড়ে আমি তার মধ্যে সুস্পষ্ট সম্মান ও শক্তির একটি ছাপ দেখতে পাচ্ছিলাম। আদালতে তার সবকিছু, আইনজীবির মিথ্যা অভিযোগে মাথা ঝাঁকিয়ে প্রতিবাদ; যে হিজাবের কথা এ ধরণের ভয়ানক পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ মানুষের মনেই থাকার কথা না, আদালতকক্ষে সে হিজাবে নিজেকে আবৃত রাখার প্রতি তীক্ষ্ণ মনোযোগ; আদালত কক্ষে এফবিআই এজেন্ট, ইউএস মার্শাল, রিপোর্টার, অফিসিয়াল-সকলের এই নুয়ে-পড়া-দুর্বল-ছোটখাট-শান্তদর্শন এই মহিলার দিকে ভয়ার্ত চোখে চেয়ে থাকা – এ সব কিছু একটা জিনিষ নির্দেশ করে, আর তা হল এদের সবাই আফিয়ার একটি জিনিষকে নিয়েই শঙ্কিত আর ভীতসন্ত্রস্ত, আর সেটি হল আমাদের এই বোনের ঈমান।
এই হল আমাদের প্রিয় বোনের অবস্থা, কুফফারদের হাতে বন্দি এক মুসলিম নারী…
কী বলার আছে আমার …?
মুসলিম বন্দী মুক্ত করার ওয়াজিব দায়িত্বের কথা বলে আমি আমার এ লেখা শেষ করব না। আমি খলিফা আল-মু’তাসিমের উদাহারণ টেনে এনে বলব না দেখুন তিনি কেবল মুসলিম নারীকে উদ্ধার করার জন্য একটা শহর ধসিয়ে দিয়েছিলেন। আমি সালাহ আদ-দীন কিংবা ‘উমার বিন ‘আবদ আল-‘আযীয এর কথা আপনাদেরকে শোনাব না যারা কিনা হাজার হাজার মুসলিম বন্দীদের উদ্ধার করেছিলেন। এ চমৎকার গল্পগুলো আপনাদের সামনে বলার লোভ আজকে আমাকে সংবরণ করতে হবে। কেন জানেন? কারণ, দুঃখের কথা এই নয় যে আফিয়া বন্দী। বরং দুঃখের কথা হল, পাঁচ লক্ষ মুসলিমের শহরে মাত্র অল্প কিছু মুসলিমও আফিয়ার শুনানির দিনে উপস্থিত থাকার কাজটাকে ঝামেলার ব্যাপার মনে করে নিজের গা বাঁচাতেই বেশি আগ্রহী। দুঃখ হল এই, পুরো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি মুসলিম সংগঠন এই বোনটির পক্ষে এগিয়ে আসল না, তার পক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। ইবন আল-কায়্যিম ঠিকই বলেছিলেন,
“যদি গীরাহ (উম্মাহকে আগলে রাখার প্রবল ঈর্ষা) মানুষের হৃদয় ত্যাগ করে চলে যায়, তবে সে হৃদয় থেকে ঈমানও হারিয়ে যায়।”
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন একটা সময়ে যখন আমাদের বেশিরভাগই দ্বীন আল-‘আরবের অনুসারী হয়ে কেবল নামায-রোযা নিয়েই পড়ে আছে, তখন আফিয়া সিদ্দিক্বীকে কিভাবে সাহায্য করা যেতে পারে, সে শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে উপযুক্ত শিক্ষক হতে পারতেন একমাত্র আফিয়া নিজেই।
এবং আল্লাহই উত্তম সাহায্যকারী।
উৎসঃ ফেসবুক

মতামত দিন