আক্বীদা

ঈমান বৃদ্ধির উপায় সমূহ

পূর্ববর্তী পোস্ট : ‘ঈমান’ এর পরিচয়

১) মানব জীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা : তাওহীদ তিন প্রকার। যথা- (ক) তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ (খ) তাওহীদে উলূহিয়্যাহ (গ) তাওহীদে আসমা ওয়াছ ছিফাত।

(ক) তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ :

তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ হল প্রতিপালক হিসাবে আল্লাহকে একক গণ্য করা। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা সকল সৃষ্টির পালনকর্তা, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, জীবন ও মৃত্যুদাতা, কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। অতএব সকল বিপদাপদে তাঁর নিকটেই প্রার্থনা করতে হবে। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক।

যেমন মহান আল্লাহ বলেন, اَلْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক’ (ফাতেহা ১)

মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেন, قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ ‘বল, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের নিকট’ (নাস ১)। আল্লাহ তা‘আলা সকলের সৃষ্টিকর্তা। তিনি বলেন, ‘তারা কি স্রষ্টা ব্যতীতই সৃষ্ট হয়েছে, না তারা নিজেরাই (নিজেদের) স্রষ্টা’ (তূর ৩৫)

মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَلَئِنْ سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيْزُ الْعَلِيْمُ ‘তুমি যদি তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) জিজ্ঞেস কর, কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো তো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহ’ (যুখরুফ ৯)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

خَلَقَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا وَأَلْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ وَبَثَّ فِيهَا مِن كُلِّ دَابَّةٍ وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنبَتْنَا فِيهَا مِن كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ- هَذَا خَلْقُ اللَّهِ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ الَّذِينَ مِن دُونِهِ بَلِ الظَّالِمُونَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ-

‘তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকার জীব-জন্তু এবং আমরাই আকাশ হ’তে বৃষ্টি বর্ষণ করে এতে উদগত করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদরাজি। এটা আল্লাহর সৃষ্টি! তিনি ছাড়া অন্যেরা কি সৃষ্টি করেছে তা আমাকে দেখাও; বরং সীমালংঘনকারীরা তো স্পষ্ট  বিভ্রান্তিতে  রয়েছে’ (লোকমান ১০-১১)

মহান আল্লাহই সকল সৃষ্টির রিযিকদাতা। তিনি বলেন, وَمَا مِنْ دَآبَّةٍ فِي الأَرْضِ إِلاَّ عَلَى اللهِ رِزْقُهَا ‘আর ভূ-পৃষ্ঠে যত প্রাণী বিচরণ করে তাদের সকলেরই রিযিক আল্লাহ দিয়ে থাকেন’ (হূদ ৬)

আল্লাহই মানুষের জীবনদাতা ও মৃত্যুদাতা। মহান আল্লাহ বলেন,كَيْفَ تَكْفُرُوْنَ بِاللهِ وَكُنتُمْ أَمْوَاتاً فَأَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِْيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيْكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ ‘কিরূপে তোমরা আল্লাহকে অবিশ্বাস করছ? অথচ তোমরা নির্জীব ছিলে, পরে তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করেছেন, পুনরায় তিনি তোমাদেরকে নির্জীব করবেন, পরে আবার জীবন্ত করবেন। অবশেষে তোমাদেরকে তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে’ (বাক্বারাহ ২/২৮)

উপরে বর্ণিত বিষয় সমূহে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না। কারণ আমরা সবাই রূহের জগতে মহান আল্লাহকে প্রতিপালক হিসাবে স্বীকৃতি দান করেছি। মহান আল্লাহ বলেন,وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِيْ آدَمَ مِنْ ظُهُوْرِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوْا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُوْلُوْا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِيْنَ ‘হে নবী! যখন তোমার প্রতিপালক বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ হ’তে তাদের সন্তানদেরকে বের করলেন এবং তাদেরকেই তাদের উপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা বলল, হ্যাঁ! আমরা সাক্ষী থাকলাম। (এই স্বীকৃতি এজন্য যে), যাতে তোমরা ক্বিয়ামতের দিন বলতে না পার আমরা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলাম’ (আ‘রাফ ১৭২)

প্রত্যেক আদম সন্তানই ইসলামের উপর তথা তাওহীদের উপর জন্মলাভ করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلاَّ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ، كَمَا تُنْتَجُ الْبَهِيمَةُ بَهِيمَةً جَمْعَاءَ، هَلْ تُحِسُّونَ فِيهَا مِنْ جَدْعَاءَ. ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ رضى الله عنه (فِطْرَةَ اللهِ الَّتِى فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لاَ تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ). ‘প্রত্যেক নবজাতকই ফিৎরাতের উপর (তাওহীদের উপর) জন্মলাভ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহূদী, নাছারা বা অগ্নিপূজক রূপে গড়ে তোলে। যেমন চতুষ্পদ প্রাণী একটা পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাকে কোন (জন্মগত) কানকাটা দেখতে পাও? অতঃপর আবু হুরায়রা (রাঃ) তিলাওয়াত করলেন, তাঁর (আল্লাহর) দেয়া ফিৎরাতের অনুসরণ কর, যে ফিৎরাতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই, এটাই সরল সুদৃঢ় দ্বীন’ (রূম ৩০)[1] অতএব যে ফিৎরাতের উপর মানুষ সৃষ্টি হয়েছে তার উপর অটল থাকলে সে সরল-সঠিক সুদৃঢ় পথে টিকে থাকবে। এতে তার ঈমান বাড়বে এবং পরকালে সুখময় স্থান জান্নাত লাভ করবে ইনশাআল্লাহ। পক্ষান্তরে ফিৎরাতের পরিবর্তন করলেই সঠিক পথ হারিয়ে বিভ্রান্ত হবে।

(খ) তাওহীদে উলূহিয়্যাহ বা তাওহীদে ইবাদত :

সকল প্রকার ইবাদতে আল্লাহকে একক গণ্য করা। যেমন ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত, যবেহ-কুরবানী, নযর-নিয়াজ, রুকূ-সিজদা, ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা ইত্যাদি সকল কিছু আল্লাহর জন্যই হ’তে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,إِيَّاكَ نَعْبُدُ وإِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ ‘আমরা শুধুমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি’ (ফাতেহা ৪)। অতএব আমরা আমাদের প্রকৃত মা‘বূদের নিকটেই সকল বিপদ-আপদ থেকে আশ্রয় চাইব। একমাত্র তাঁরই ইবাদত করব। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلاً أَنِ اعْبُدُواْ اللهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوْتَ ‘আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাগূত হ’তে নিরাপদ থাকবে’ (নাহল ৩৬)। অতএব শুধু আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে, অন্য কারো নয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِن رَّسُوْلٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُوْنِ ‘আমরা তোমার পূর্বে কোন রাসূল প্রেরণ করিনি এই অহী ব্যতীত যে, আমি ছাড়া অন্য কোন (হক্ব) মা‘বূদ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর’ (আম্বিয়া ২৫)। তিনি আরো বলেন, لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحاً إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُواْ اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَـهٍ غَيْرُهُ  ‘নূহকে তার কওমের নিকট পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, হে আমার কওম! তোমরা শুধু আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন সত্য মা‘বূদ নেই’ (আ‘রাফ ৫৯)। তিনি অন্যত্র বলেন,وَاعْبُدُواْ اللهَ وَلاَ تُشْرِكُواْ بِهِ شَيْئاً  ‘আর তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না’ (নিসা ৩৬)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল মাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি’ (যারিয়াত ৫৬)

অতএব বুঝা যাচ্ছে যে, মহান আল্লাহ জিন ও মানুষকে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। ইবাদতের মধ্যে শিরক মিশ্রিত হ’লে ইবাদত বাতিল হয়ে যায়, যেমন পবিত্রতার মধ্যে অপবিত্র মিশ্রিত হ’লে সেটি বাতিল বলে গণ্য হয়। আর শিরককারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যায়। এজন্য শিরক থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করবেন না, তবে এতদ্ব্যতীত তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন’ (নিসা ১১৬)। আল্লাহ আরো বলেন, إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللّهُ عَلَيهِ الْجَنَّةَ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে (অন্য কাউকে) শরীক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন’ (মায়েদাহ ৭২)। অতএব শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত করলে ঈমান বাড়বে। পক্ষান্তরে শিরক মিশ্রিত ইবাদত করলে ঈমানে ঘাটতি পড়বে।

(গ) তাওহীদে আসমা ওয়াছ ছিফাত : কুরআন ও হাদীছে আল্লাহর নাম ও ছিফাত (গুণাবলী) সমূহ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবেই বর্ণনা করা এবং সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা হচ্ছে তাওহীদে আসমা ওয়াছ ছিফাত। কোন পরিবর্তন-পরিবর্ধন না করে, অস্বীকার না করে, অবস্থা বর্ণনা না করে এবং কারো সাথে সাদৃশ্য প্রদান না করে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর উপর ঈমান আনতে হবে।[2] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلِلّهِ الأَسْمَاء الْحُسْنَى فَادْعُوْهُ بِهَا وَذَرُواْ الَّذِيْنَ يُلْحِدُوْنَ فِيْ أَسْمَآئِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُواْ يَعْمَلُوْنَ ‘আর আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ রয়েছে। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামে ডাকো, আর তাদেরকে বর্জন করো যারা তাঁর নাম সমূহ বিকৃত করে, সত্বরই তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে’ (আ‘রাফ ১৮০)। সুতরাং আল্লাহর নাম ও গুণাবলী যেভাবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবেই বর্ণনা করতে হবে। কারো সাথে তার সাদৃশ্য করা যাবে না। তিনি বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيْعُ البَصِيْرُ ‘কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা (শূরা ১১)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, وَلاَ تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ‘যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সে বিষয়ের পিছনে পড়ো না’ (বনী ইসরাঈল ৩৬)। আয়াতটিতে আল্লাহর অবস্থা কেমন তা বর্ণনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআন এবং ছহীহ হাদীছে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবেই বর্ণনা করতে বলা হয়েছে।[3] মানব জীবনে তিন প্রকার তাওহীদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঈমান মযবূত হবে ও ইহকাল-পরকাল সুখময় হবে।

আল্লাহ তা‘আলার নামগুলো যেভাবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবেই বর্ণনা করতঃ অর্থ বুঝে মুখস্থ করে আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করলে ঈমান বাড়বে এবং জান্নাত লাভ করা যাবে ইনশাআল্লাহ। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলার এক কম একশটি অর্থাৎ নিরানববইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি এগুলো মুখস্থ করবে (অর্থ বুঝে আমল করবে) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[4] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আল্লাহ তা‘আলার নিরানববইটি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি এগুলোর হিফাযত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ বেজোড়। তিনি বেজোড় পসন্দ করেন’।[5] হাদীছটির ব্যাখ্যা হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর নিরানববইটি নাম হেফাযত করবে এবং মর্মার্থ বুঝে আমল করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[6]

(২) ইবাদত কবুলের শর্তদ্বয় মানব জীবনে বাস্তবায়ন করা : ইবাদত কবুলের মৌলিক দু’টি শর্ত হ’ল- (ক) ইখলাছ বা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা (খ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অনুসরণ করা। এ দু’টি শর্তের প্রতি খেয়াল রেখে ইবাদত করলে তা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে এবং এতে ঈমানও বৃদ্ধি হবে। সকল প্রকার ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সম্পাদন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا أُمِرُوْا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَاء وَيُقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ ‘তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই ইবাদত করতে এবং ছালাত কায়েম করতে ও যাকাত প্রদান করতে, এটাই সু-প্রতিষ্ঠিত সঠিক দ্বীন’ (বাইয়িনাহ ৫)। মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেন, ‘হে নবী! বল, আমি একমাত্র আল্লাহর জন্যই ইবাদত করি তাঁর প্রতি আমার আনুগত্যকে একনিষ্ঠ রেখে’ (যুমার ১৪)। সকল প্রকার ইবাদত যেমন ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত, যবেহ-কুরবানী, নযর-নিয়াজ, রুকূ-সিজদা, দো‘আ-প্রার্থনা, ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই করতে হবে। কোন পীর, অলী-আওলিয়ার নামে বা মাযার-কবরের নিকট নয়। ইবাদত অন্যের জন্য করলেই শিরক হয়ে যাবে এবং পরকালীন জীবনে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হ’তে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ ‘নিশ্চয়ই তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি এ মর্মে ওহী হয়েছে যে, যদি তুমি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক কর তবে নিঃসন্দেহে তোমার সকল আমল বাতিল হয়ে যাবে এবং অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (যুমার ৬৫)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاء رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحاً وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَداً ‘সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে’(কাহফ ১১০)

প্রতিটি কাজের জন্য সর্বপ্রথম নিয়ত ঠিক করতে হবে এবং সর্বপ্রকার ইবাদত আললাহর সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা সৎ আমল করেছে তাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বস্ত্ত (জান্নাত) রয়েছে এবং আরো রয়েছে অতিরিক্ত উৎকৃষ্ট জিনিস (আল্লাহর সাক্ষাৎ) (ইউনুস ২৬)। তিনি আরো বলেন,وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِيْ جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ ‘আল্লাহ তা‘আলা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে এমন জান্নাত সমূহের ওয়াদা করেছেন যার পাদদেশে নহর সমূহ প্রবাহিত রয়েছে। সেখানে তারা অনন্তকাল বসবাস করবে। আরও (ওয়াদা করেছেন) ঐ উত্তম বাসস্থান সমূহের, যা আদন নামক জান্নাতের মাঝে অবস্থিত। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড়। এটা হচ্ছে অতি বড় সফলতা’ (তওবা ৭২)

অতএব পরকালে সুখময় স্থান লাভ করার জন্য সকল সৎকর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে করতে হবে এবং নিয়ত খালেছ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দিকে হবে, তার হিজরত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যেই গন্য হবে। আর যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের জন্য অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে, যে জন্য সে হিজরত করেছে’।[7]

ওমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) তাঁর দো‘আয় বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমার সকল আমল কবুল কর (রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী করার তাওফীক দাও), সেটি শুধুমাত্র তোমার সন্তুষ্টির জন্য করার তাওফীক দাও এবং সেটি যেন কারো উদ্দেশ্যে না হয়।

ফুযাইল বিন ইয়ায বলেন, আমল হ’তে হবে ইখলাছের সাথে ও সঠিক পদ্ধতিতে। বলা হ’ল হে আবু আলী! ইখলাছ ও সঠিক পদ্ধতিটা কি? তিনি বললেন, আমলটি যদি খালেছ হয়, সঠিক পদ্ধতিতে না হয় তাহ’লে কবুল হবে না। আর যদি সেটি সঠিক পদ্ধতিতে হয় কিন্তু খালেছ নিয়তে না হয়, তাহ’লেও কবুল হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত খালেছ নিয়তে ও সঠিক পদ্ধতিতে না হবে। আর খালেছ নিয়ত হ’ল শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা ও সঠিক পদ্ধতি হ’ল রাসূল (ছাঃ)-এর ছহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী করা।[8]

(খ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অনুসরণ করা : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللهََ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ ‘হে নবী! বল, যদি তোমরা আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহ’লে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন ও তোমাদের অপরাধ সমূহ মার্জনা করে দিবেন, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়’ (আলে ইমরান ৩১)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে যা দিয়েছেন তার অনুসরণ করতে হবে আর যা থেকে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا وَاتَّقُوْا اللهَ إِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ ‘রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা হ’তে বিরত থাকো, আর আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি খুবই কঠিন’ (হাশর ৭)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে কেউ এমন কোন আমল করল, যে ব্যাপারে আমাদের অনুমোদন নেই তা প্রত্যাখ্যাত’।[9] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে নেই এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, তা প্রত্যাখ্যাত’।[10]

ইবাদত কবুলের দু’টি শর্তের সাথে আরেকটি শর্ত : আমলটি বিশুদ্ধ আক্বীদার ভিত্তিতে সম্পন্ন হ’তে হবে, নচেৎ তা কবুল হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, مَنْ عَمِلَ صَالِحاً مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ ‘মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎ কর্ম করবে, তাকে আমরা নিশ্চয়ই আনন্দময় জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদান করব’ (নাহল ৯৭)। আয়াতটিতে শর্তযুক্ত হয়েছে যে, আমল কবুলের জন্য বিশুদ্ধ আক্বীদায় বিশ্বাসী হ’তে হবে এবং মুমিন হ’তে হবে। কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আমল করলে আল্লাহর নিকট কশ্মিনকালেও তা কবুল হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاء مَّنثُوْراً ‘আমরা তাদের কৃতকর্মগুলোর দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব’ (ফুরক্বান ২৩)। ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ বান্দার ভাল-মন্দের বিচার করবেন। ঐ সময় মুশরিকরা তাদের আমল থেকে কোন ফায়দা পাবে না এবং সেগুলো তাদেরকে নাজাত দিতে পারবে না। কেননা তাদের আমল শরী‘আত অনুযায়ী হয়নি এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়নি। সুতরাং সেটা বাতিল হবে।[11] মহান আল্লাহ বলেন, أُوْلَـئِكَ الَّذِيْنَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلاَّ النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُواْ فِيْهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُواْ يَعْمَلُوْنَ ‘তারা এমন লোক যে, তাদের জন্য আখেরাতে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই। আর তারা যা কিছু করেছিল তাও বিফল হবে এবং তারা যা করে তা বাতিল হবে’ (হূদ ১৬)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ بِقِيْعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتَّى إِذَا جَاءهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئاً وَوَجَدَ اللهَ عِنْدَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ وَاللهُ سَرِيْعُ الْحِسَابِ ‘যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে; কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হ’লে দেখবে ওটা কিছু নয় এবং সে তার নিকট পাবে আল্লাহকে। অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দিবেন। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর’ (নূর ৩৯)। তিনি আরো বলেন,مَّثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُواْ بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيْحُ فِيْ يَوْمٍ عَاصِفٍ لاَّ يَقْدِرُوْنَ مِمَّا كَسَبُواْ عَلَى شَيْءٍ ذَلِكَ هُوَ الضَّلاَلُ الْبَعِيْدُ ‘যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা তাদের কর্মসমূহ ভস্ম সদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়; যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না; এটা তো ঘোর বিভ্রান্তি’ (ইবরাহীম ১৮)।

(৩) কল্যাণকর ইলম শিক্ষা করা : মানুষ যখন শরী‘আতের জ্ঞান অর্জন করবে, কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর জ্ঞানার্জন করে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়ন করবে তখনই তার ঈমান বাড়বে। এটি ঈমান বৃদ্ধির অন্যতম উপায়। মহান আল্লাহ বলেন, شَهِدَ اللهُ أَنَّهُ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ وَالْمَلاَئِكَةُ وَأُوْلُواْ الْعِلْمِ قَآئِمَاً بِالْقِسْطِ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ ‘আল্লাহ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং ফেরেশতাগণ, ন্যায়নিষ্ঠ বিদ্বানগণও (সাক্ষ্য প্রদান করেন) তিনি ব্যতীত অন্য কোন সত্য মা‘বূদ নেই, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (আলে ইমরান ১৮)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, لَّـكِنِ الرَّاسِخُوْنَ فِيْ الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَالْمُؤْمِنُوْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيكَ وَمَا أُنزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَالْمُقِيْمِيْنَ الصَّلاَةَ وَالْمُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَالْمُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أُوْلَـئِكَ سَنُؤْتِيْهِمْ أَجْراً عَظِيْماً ‘কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং বিশ্বাসীগণের মধ্যে যারা তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল তৎপ্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং যারা ছালাত প্রতিষ্ঠাকারী ও যাকাত প্রদানকারী এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী, তাদেরকেই আমি মহা পুরস্কার দেব’ (নিসা ১৬২)। কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জন করে আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে ঈমান বাড়ে। মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ آمِنُواْ بِهِ أَوْ لاَ تُؤْمِنُواْ إِنَّ الَّذِيْنَ أُوتُواْ الْعِلْمَ مِن قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّوْنَ لِلأَذْقَانِ سُجَّداً، وَيَقُوْلُوْنَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِن كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُوْلاً، وَيَخِرُّوْنَ لِلأَذْقَانِ يَبْكُوْنَ وَيَزِيْدُهُمْ خُشُوْعاً- ‘তুমি বল, তোমরা কুরআনে বিশ্বাস কর অথবা বিশ্বাস না কর, যাদেরকে এর পূর্বে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদের নিকট যখন এটা পাঠ করা হয় তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং বলে, আমাদের প্রতিপালক পবিত্র। আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি কার্যকরী হয়েই থাকে। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে’(বানী ইসরাঈল ১০৭-১০৯)

বিদ্বানগণ কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জন করে নিজেরা তদনুযায়ী আমল করেন এবং অন্যদের নিকট প্রচার করে থাকেন। এতে একে অপরের ঈমান বাড়ে এবং ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,وَلِيَعْلَمَ الَّذِيْنَ أُوْتُوْا الْعِلْمَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِن رَّبِّكَ فَيُؤْمِنُوْا بِهِ فَتُخْبِتَ لَهُ قُلُوْبُهُمْ وَإِنَّ اللهَ لَهَادِ الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ ‘আর এজন্যও যে, যাদের জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা তোমার প্রতিপালকের নিকট হ’তে প্রেরিত সত্য। অতঃপর তারা যেন বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন ওর প্রতি অনুগত হয়। যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ সরল পথে পরিচালিত করেন’ (হজ্জ ৫৪)। মানুষ কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জন দ্বারাই সঠিক পথ প্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,وَيَرَى الَّذِيْنَ أُوتُوا الْعِلْمَ الَّذِيْ أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ هُوَ الْحَقَّ وَيَهْدِيْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيْزِ الْحَمِيْدِ ‘যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা বিশ্বাস করে যে, তোমার প্রতিপালকের নিকট হ’তে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা সত্য। এটা মানুষকে পরাক্রমশালী ও মহা প্রশংসিত আল্লাহর পথ নির্দেশ করে’ (সাবা ৬)। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্য যারা আলেম তারা তাঁকে ভয় করে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল’ (ফাতির ২৮)

কল্যাণকর ইলম শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করা এবং ঈমান বৃদ্ধি করা সম্ভব। মহান আল্লাহ বলেন,قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوْا الْأَلْبَابِ ‘বল, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে’ (যুমার ৯)। অতএব কুরআন-সুন্নাহর ইলম অর্জন করা ফরয। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের উপর (শরী‘আতের) জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরয’।[12] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকেই দ্বীনের ইলম দান করেন’।[13] ইলম শিক্ষা করলে জান্নাতে যাবার পথ সহজ হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষার জন্য পথ চলে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেন।[14] ইলম অর্জনের মাধ্যমে নবীগণের উত্তরাধিকারী হওয়া যায়। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘আলেমগণই হ’লেন নবীগণের উত্তরাধিকারী। নবীগণ দীনার বা দিরহামের উত্তরাধিকারী করেন না। নিশ্চয়ই তাঁরা ইলমের উত্তরাধিকারী করেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করল, সে বৃহদাংশ গ্রহণ করল’।[15] ইলম অর্জন করে অপরকে শিক্ষা দিলে, সে অনুযায়ী আমলকারী যে নেকী পাবে, শিক্ষাদাতাও অনুরূপ নেকী পাবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি দ্বীনী ইলম শিক্ষা দিবে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় ছওয়াব পাবে, যে তার উপর আমল করল। কিন্তু আমলকারীর ছওয়াব থেকে একটুকুও কমানো হবে না’।[16]

কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনকারীর উপর আল্লাহ রহম করেন। আর ফেরেশতাগণ, আসমান-যমীনের অধিবাসীগণ, পিপীলিকা এমনকি সমুদ্রের মাছও তার জন্য দো‘আ করতে থাকে। আবু উমামা  বাহেলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সামনে দু’জন লোকের কথা উল্লেখ করা হ’ল। তাদের একজন আলেম, অপর জন আবেদ। তখন তিনি বলেন, আলেমের মর্যাদা আবেদের উপর ঐরূপ, যেরূপ আমার মর্যাদা তোমাদের সাধারণের উপর। তারপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতামন্ডলী, আসমান-যমীনের অধিবাসী এমনকি পিপীলিকা তার গর্তে থেকে এবং মাছও কল্যাণের শিক্ষা দানকারীর জন্য দো‘আ করে’।[17] দ্বীনী ইলম শিক্ষা দিয়ে গেলে মৃত্যুর পরেও তার ছওয়াব পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তিনটি ব্যতীত তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। ঐ তিনটি আমল হ’ল প্রবাহমান দান-ছাদাক্বা, এমন ইলম যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দো‘আ করে’।[18]

অতএব ঈমান বাড়াতে হ’লে ও ইহলোক-পারলোক সুখময় জীবন-যাপন করতে হ’লে সবার উপর আবশ্যক হবে সন্তান-সন্ততিক ছোট থেকেই দ্বীনের সঠিক জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। দ্বীনী ইলম শিক্ষা লাভ না করলে পৃথিবী অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। ফলে মানুষ দ্বীনী বিষয়ে অজ্ঞদের নিকট থেকে ফৎওয়া নিয়ে গোমরাহ হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আছ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের থেকে ইলম ছিনিয়ে নেন না। বরং দ্বীনের আলেমদের উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ইলমকে উঠিয়ে নিবেন। তখন কোন আলেম অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে লোকেরা মূর্খদেরকেই নেতা বানিয়ে নিবে, তাদের জিজ্ঞেস করা হ’লে তারা না জেনে ফৎওয়া প্রদান করবে, এতে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে’।[19]

(৪) কুরআনুল কারীম অর্থ বুঝে পড়া এবং সে অনুযায়ী আমল করা : ঈমান বৃদ্ধি ও তা সুদৃঢ় করণের অন্যতম উপায় হ’ল অর্থ বুঝে পবিত্র কুরআন পড়া, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করা এবং তদনুযায়ী আমল করা। মহান আল্লাহ বলেন, وَهَـذَا كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ مُّصَدِّقُ الَّذِيْ بَيْنَ يَدَيْهِ  ‘আমরা এই বরকতময় কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা তার পূর্বের সকল কিতাবকে সত্যায়নকারী’ (আন‘আম ৬/৯২)। অর্থ বুঝে কুরআন তেলাওয়াত করলে এবং তার প্রতি আমল করলে আল্লাহর রহমত লাভ হয় এবং সঠিক পথের দিশা পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, وَهَـذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ ‘আমরা এই বরকতময় কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি! সুতরাং তোমরা এটা অনুসরণ কর এবং ভয় কর, যেন তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়’ (আন‘আম ৬/১৫৫)। তিনি আরো বলেন, وَلَقَدْ جِئْنَاهُمْ بِكِتَابٍ فَصَّلْنَاهُ عَلَى عِلْمٍ هُدًى وَّرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ ‘আমরা তাদের নিকট এমন একখানা কিতাব পৌঁছিয়েছিলাম, যা পূর্ণ জ্ঞান দ্বারা বিশদ ব্যাখ্যা করেছিলাম এবং যা ছিল মুমিন সম্প্রদায়ের জন্যে হেদায়াত ও রহমত’ (আ‘রাফ ৭/৫২)।

পবিত্র কুরআন মানব জাতির জন্য হেদায়াত স্বরূপ। এতে জীবনের প্রত্যেক বিষয়কে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা  হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَاناً لِّكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَّرَحْمَةً وَّبُشْرَى لِلْمُسْلِمِيْنَ- ‘আমরা আত্মসমর্পণকারীদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, স্বরূপ, পথ-নির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি’ (নাহল ১৬/৮৯)।

পবিত্র কুরআন বুঝে-শুনে পড়ে আমল করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ ‘এ এক কল্যাণময় কিতাব। এটা আমরা তোমার উপর এজন্য অবতীর্ণ করেছি যে, যাতে মানুষ এর আয়াত সমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানী ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে’ (ছোয়াদ ৩৮/২৯)। পবিত্র কুরআনই মানব জাতিকে হেদায়াতের পথ দেখায়। মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ هَـذَا الْقُرْآنَ يِهْدِيْ لِلَّتِيْ هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِيْنَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْراً كَبِيْراً  ‘এ  কুরআন  (সৃষ্টিকুলকে)

সর্বশ্রেষ্ঠ হেদায়াতের পথ নির্দেশ করে এবং সৎপরায়ণ বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৯)। পবিত্র কুরআনই মানব জাতির জন্য হেদায়াত ও আরোগ্য স্বরূপ। আল্লাহ বলেন, وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ وَلاَ يَزِيْدُ الظَّالِمِيْنَ إَلاَّ خَسَاراً ‘আমরা অবতীর্ণ করি কুরআন, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। কিন্তু তা যালেমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৮২)।

মহান আল্লাহ কুরআন নিয়ে গবেষণা করতে এবং সঠিক অর্থ বুঝে আমল করতে নির্দেশ দিয়েছেন, أَفَلاَ يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوْا فِيْهِ اخْتِلاَفاً كَثِيْراً ‘তারা কেন কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি ওটা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হ’তে হ’ত তবে তারা ওতে বহু অসংগতি পেত’ (নিসা ৪/৮২)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوْبٍ أَقْفَالُهَا ‘তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ’? (মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)।

কুরআন পড়া, অর্থ বুঝা, গবেষণা করা এবং আমল করা এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ বিন মাস‘ঊদ (রাঃ) বলেন, وَاللهِ الَّذِى لاَ إِلَهَ غَيْرُهُ مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ مِنْ كِتَابِ اللهِ إِلاَّ أَنَا أَعْلَمُ أَيْنَ أُنْزِلَتْ وَلاَ أُنْزِلَتْ آيَةٌ مِنْ كِتَابِ اللهِ إِلاَّ أَنَا أَعْلَمُ فِيْمَ أُنْزِلَتْ، وَلَوْ أَعْلَمُ أَحَدًا أَعْلَمَ مِنِّىْ بِكِتَابِ اللهِ تُبَلِّغُهُ الإِبِلُ لَرَكِبْتُ إِلَيْهِ  ‘আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই, আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি সূরা সম্পর্কেই আমি জানি যে, তা কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং প্রতিটি আয়াত সম্পর্কেই জানি যে, তা কোন ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি যদি জানতাম যে, কোন ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত এবং সেখানে উট পৌঁছতে পারে, তাহ’লে আমি সওয়ার হয়ে সেখানে পৌঁছে যেতাম’।[20]

মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, ‘আমি ইবনে আববাস (রাঃ)-এর নিকট কুরআন পেশ করতাম। সূরা ফাতেহা থেকে শেষ (নাস) পর্যন্ত প্রত্যেক আয়াতের নিকট থামতাম এবং সেখানে কি বলা হচ্ছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম (অর্থ জিজ্ঞেস করতাম)। হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন, পবিত্র কুরআনে কোন আয়াত অবতীর্ণ হ’লে সেটির অর্থ এবং কি উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে তা জানতে ভালবাসতাম।[21]

সুতরাং অর্থ বুঝে কুরআন পড়তে হবে এবং আমল করার চেষ্টা করতে হবে, তাহ’লে ঈমান বাড়বে। আর কুরআনের প্রতি অবহেলা করে আমল না করলে সঠিক পথের দিশা পাওয়া যাবে না; বরং পথভ্রষ্ট হ’তে হবে। পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হ’তে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,قَدْ كَانَتْ آيَاتِيْ تُتْلَى عَلَيْكُمْ فَكُنْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ تَنْكِصُوْنَ، مُسْتَكْبِرِيْنَ بِهِ سَامِراً تَهْجُرُوْنَ، أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوْا الْقَوْلَ أَمْ جَاءَهُمْ مَّا لَمْ يَأْتِ آبَاءَهُمُ الْأَوَّلِيْنَ- ‘আমার আয়াত তোমাদের কাছে পাঠ করা হ’ত; কিন্তু তোমরা দম্ভভরে পিছন ফিরে সরে পড়তে এই বিষয়ে অর্থহীন গল্প-গুজব করতে করতে। তবে কি তারা এই বাণী অনুধাবন করে না? অথবা তাদের নিকট কি এমন কিছু এসেছে যা তাদের পূর্বপুরুষদের নিকট আসেনি’? (মুমিনূন ২৩/৬৬-৬৮)।

যে ব্যক্তি অর্থ বুঝে কুরআন পড়বে ও তদনুযায়ী আমল করবে তার পক্ষে কুরআনই কথা বলবে, আর আমল না করলে তার বিপক্ষে কথা বলবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ ‘পবিত্র কুরআন তোমার পক্ষে কথা অথবা বিপক্ষে দলীল’।[22] সুতরাং মুসলমানের উপর ওয়াজিব পবিত্র কুরআন অর্থসহ পড়া এবং আমল করা।

(৫) নবী করীম (ছাঃ)-এর জীবনী অধ্যয়ন করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জীবন চরিত অধ্যয়ন করলে ও তার আখলাক নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মানুষের ঈমান বাড়বে। মহান আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেন, لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُوْلٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيْزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيْصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِيْنَ رَؤُوْفٌ رَّحِيْمٌ ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট আগমন করেছে একজন রাসূল যাঁর কাছে তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অতি কষ্টদায়ক মনে হয়। তিনি তোমাদের হিতাকাংখী, মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও দয়ালু’ (তওবা ৯/১২৮)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيْمٍ‘নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রে অধিকারী’ (কলাম ৬৮/৪)।

তিনি আরো বলেন,لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيْ رَسُوْلِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُوْ اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيْراً ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ নিহিত আছে’ (আহযাব ৩৩/২১)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের যা দিয়েছেন সেগুলি জীবনে বাস্তবায়ন করলে ঈমান সুদৃঢ় হবে এবং পরকালীন জীবনে মুক্তি লাভ করা সম্ভব হবে। আল্লাহ বলেন,وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوْا ‘রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা বর্জন কর’ (হাশর ৫৯/৭)।

মূলতঃ সম্পূর্ণ কুরআন মজীদই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জীবনাদর্শ। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,

مَا خُيِّرَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَ أَمْرَيْنِ إِلاَّ أَخَذَ أَيْسَرَهُمَا، مَا لَمْ يَكُنْ إِثْمًا، فَإِنْ كَانَ إِثْمًا كَانَ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنْهُ، وَمَا انْتَقَمَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم  لِنَفْسِهِ، إِلاَّ أَنْ تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللهِ فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ بِهَا.

‘নবী করীম (ছাঃ)-কে যখনই (আল্লাহর নিকট থেকে) দু’টো কাজের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হ’ত, তখন তিনি দু’টোর মধ্যে থেকে সহজটি বেছে নিতেন, যদি না সেটা গুনাহর কাজ হ’ত। যদি সেটা গুনাহর কাজ হ’ত তাহ’লে তিনি তা থেকে বহু দূরে থাকতেন। আল্লাহর কসম! তিনি কখনও তাঁর ব্যক্তিগত কারণে কোন কিছুর প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি যতক্ষণ না আল্লাহর হারামসমূহকে ছিন্ন করা হ’ত। সেক্ষেত্রে আল্লাহর জন্য তিনি প্রতিশোধ নিতেন’।[23]

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, خَدَمْتُ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم عَشْرَ سِنِيْنَ، فَمَا قَالَ لِىْ أُفٍّ. وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ  ‘আমি দশটি বছর নবী করীম (ছাঃ)-এর খেদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনও আমার প্রতি উফ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। একথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?[24]

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, لَمْ يَكُنْ فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا، وَقَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ مِنْ أَخْيَرِكُمْ أَحْسَنَكُمْ خُلُقًا. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বভাবগতভাবে অশালীন ছিলেন না, তিনি অশালীন কথা বলতেন না। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম যে স্বভাব-চরিত্রে সর্বোত্তম’।[25] বর্ণিত কুরআনের আয়াত ও হাদীছ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি মুসলমানদের ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে। এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে এবং তাঁর অনুসরণ করার মাধ্যমে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি মিলবে।

(৬) ইসলামের সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা : দ্বীন ইসলামের প্রতিটি কাজ-কর্ম সেŠন্দর্যমন্ডিত, এর সবই মানুষের জন্য কল্যাণকর। ইসলামের আক্বীদাসমূহ সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও উপকারী। এর নীতি-নৈতিকতা সবচেয়ে সুন্দর ও প্রশংসিত। এর আমল ও বিধি-বিধানসমূহ সুন্দর ও ন্যায়-নীতিপূর্ণ। দ্বীনের এই সেŠন্দর্যের দিকে লক্ষ্য করলে মুসলমানদের ঈমান বাড়বে বৈ কমবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَكِنَّ اللهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيْمَانَ وَزَيَّنَهُ فِيْ قُلُوْبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوْقَ وَالْعِصْيَانَ أُوْلَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُوْنَ ‘কিন্তু আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং উহাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন। আর কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়। তারাই সুপথপ্রাপ্ত’ (হুজুরাত ৪৯/৭)।

মানুষ তার জীবনকে ঈমানের বলে বলিয়ান করলেই সে সুখময় জীবন যাপন করবে। ইসলামের সকল সৎ কাজ জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে এবং সকল অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে। নিজেকে ঈমানদার হিসাবে তৈরী করার চেষ্টা করবে। এভাবে সমাজ ও পরিবার সুখময় করতে সক্ষম হবে। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُوْنَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُوْدَ فِى الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِى النَّارِ. ‘তিনটি গুণ যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হ’তে অধিক প্রিয় হওয়া। কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসা। কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মত অপসন্দ করা’।[26] হাদীছটি থেকে প্রমাণিত হয় যে, ভাল কাজের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং পাপ কাজ দ্বারা ঈমান হরাস পায়।

(৭) সালাফে ছালেহীনের জীবনচরিত পড়া : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবী এবং তাঁদের অনুসারীগণ ইসলামের শ্রেষ্ঠ যুগের মানুষ। ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, خَيْرُ أُمَّتِىْ قَرْنِىْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ  ‘আমার উম্মাতের শ্রেষ্ঠ হ’ল আমার যুগের লোক (অর্থাৎ ছাহাবীগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগের লোক (অর্থাৎ তাবেঈগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগের লোক (অর্থাৎ তাবে তাবেঈগণ)[27] তারাই ইসলামের রক্ষক ও সৃষ্টিজগতের সঠিক পথের দিশা লাভের কান্ডারী। ঈমানের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। এই পুন্যাত্মা ব্যক্তিগণই দ্বীনের ঝান্ডাবাহী। অতএব তাঁদের প্রশংসা করতে হবে, তাদেরকে ভালবাসতে হবে এবং তাদের জন্য দো‘আ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَالسَّابِقُوْنَ الأَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِيْنَ وَالأَنْصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا أَبَداً ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ ‘মুহাজির ও আনছারদের মধ্যে (ঈমান আনয়নে) যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তিনি তাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্ত্তত করে রেখেছেন যার নীচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত থাকবে। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটাই হচ্ছে মহাসাফল্য’ (তওবা ৯/১০০)। মুহাজির ও আনছারদের সবাইকে ভালবাসতে হবে। কারণ এটা ঈমানের পরিচায়ক।

আমরা যদি ছাহাবীগণের জীবনের দিকে লক্ষ্য করি তাহ’লে সহজেই বুঝতে পারব যে, তাঁরা দ্বীন প্রচারের জন্য কত কষ্ট স্বীকার করেছেন। তাঁদের মাধ্যমে আমার সঠিক দ্বীনের বুঝ পেয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদেশ-নিষেধ তাঁরা পূর্ণভাবে পালন করে গেছেন। তাঁদেরকে দ্বীন প্রচারের জন্য ঘরবাড়ী ছাড়তে হয়েছে। দিনের পর দিন অভুক্ত থাকতে হয়েছে। তাই আমাদের উপর ওয়াজিব তাঁদের জন্য দো‘আ করা, তাঁদেরকে মুহাববত করা, তাঁদের নিন্দা না করা, গালি-গালাজ না করা। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لاَ تَسُبُّوْا أَصْحَابِى، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيْفَهُ ‘তোমরা আমার ছাহাবীগণকে গালমন্দ কর না। তোমাদের কেউ যদি ওহোদ পর্বত পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাঁদের এক মুদ বা অর্ধ মুদের সমপরিমাণ ছওয়াব হবে না’।[28]

ছাহাবীগণকে ভালবাসা ঈমানের পরিচয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, آيَةُ الإِيْمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الأَنْصَارِ ‘ঈমানের আলামত হ’ল আনছারকে ভালবাসা এবং মুনাফিকীর চিহ্ন হ’ল আনছারদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা’।[29]

মোদ্দাকথা সালাফে ছালেহীনের জীবন পর্যালোচনা করলে মানুষের ঈমান বাড়বে।

(৮) আল্লাহর সৃষ্টি জগত সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করা : আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে মানুষ চিন্তা-গবেষণা করলে ঈমান বাড়বে। যেমন আসমান-যমীন, চন্দ্র-সূর্য, নক্ষত্ররাজি, দিন-রাত্রী, পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, সমুদ্র, নদ-নদী, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা, বর্ণ-গোত্র, ভাষা ও বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। অতএব এসব বিষয় নিয়ে মানুষ চিন্তা-গবেষণা করলে তাদের ঈমান বাড়বে। মহান আল্লাহ বলেন, تَبَارَكَ الَّذِيْ جَعَلَ فِي السَّمَاء بُرُوْجاً وَجَعَلَ فِيْهَا سِرَاجاً وَقَمَراً مُّنِيْراً، وَهُوَ الَّذِيْ جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ أَرَادَ أَن يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُوْراً- ‘কত মহান তিনি যিনি আকাশে সৃষ্টি করেছেন বড় বড় তারকাপুঞ্জ এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও জ্যোতির্ময় চন্দ্র। যে উপদেশ গ্রহণ করতে ও কৃতজ্ঞ হ’তে চায় তার জন্য তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি এবং দিবসকে পরস্পরের অনুগামীরূপে’ (ফুরক্বান ২৫/৬১-৬২)। দিবা-রাত্রির বিবর্তন, চন্দ্র-সূর্যের নিজ কক্ষপথে প্রদক্ষিণ, আহ্নিকগতি ও বার্ষিকগতি এবং ঋতুর পরিবর্তন সবই আল্লাহর হুকুম মত চলছে। আল্লাহর হুকুমের কোন বিপরীত হচ্ছে না।

মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَاخْتِلاَفِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِيْ تَجْرِيْ فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنزَلَ اللهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ مَّاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الأرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيْهَا مِنْ كُلِّ دَآبَّةٍ وَتَصْرِيْفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخِّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ لآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُوْنَ ‘নিশ্চয়ই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে, যা মানুষের কল্যাণ সাধন করে তা সহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহে, আল্লাহ আকাশ হ’তে বৃষ্টি বর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্যে প্রত্যেক জীবজন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর গতি পরিবর্তনে এবং আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থিত নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (বাক্বারাহ ২/১৬৪)।

মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পুনরায় তাকে মাটির বুকে ফিরে যেতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَكُمْ مِّنْ تُرَابٍ ثُمَّ إِذَا أَنْتُمْ بَشَرٌ تَنْتَشِرُوْنَ ‘তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, এখন তোমরা মানুষ হিসাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছ’ (রূম ৬০/২০)।

মানুষের একে অপরের মাঝে সৃষ্টিগত ও ভাষার দিক দিয়ে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন আল্লাহ বলেন, وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِيْ ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِيْنَ ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্যে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে’ (রূম ৬০/২২)।

মহান আল্লাহ বলেন,أَفَلَا يَنْظُرُوْنَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ، وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ، وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ، وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ- ‘তবে কি তারা উষ্ট্রপালের দিকে লক্ষ্য করে না যে, কিভাবে ওকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং আকাশের দিকে যে, কিভাবে তাকে সমুচ্চ করা হয়েছে? এবং পর্বতমালার দিকে যে, কিভাবে ওটাকে স্থাপন করা হয়েছে? এবং যমীনের দিকে যে, কিভাবে ওটাকে সমতল করা হয়েছে?’ (গাশিয়াহ ৮৮/১৭-২০)। উপরোক্ত আয়াত সমূহ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর সৃষ্টি জগত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করলে মানুষের ঈমান বৃদ্ধি পাবে।

(১০) নেক আমল : সকল সৎ আমল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে। শরী‘আত নির্দেশিত পন্থায় ও খাঁটি নিয়তে যেকোন সৎ আমল করলে তা ঈমান বৃদ্ধি করে। কারণ অত্যধিক আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

অন্তরের ইবাদত বা আমল হ’ল ইখলাছ, মুহাববাত-ভালবাসা, আশা-ভরসা, ভয়-ভীতি, ধৈর্য্য সন্তুষ্টি ইত্যাদি। জিহবার আমল হ’ল আল্লাহর যিকির ও তাঁর প্রশংসা করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করা, ভাল কাজের আদেশ করা, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা, তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করা, দো‘আ-ইসতেগফার পড়া ইত্যাদি। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল হ’ল ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত, ছাদাকাহ, জিহাদ ইত্যাদি। এসব আমল দ্বারা ঈমান বৃদ্ধি পায়।[30]

মোদ্দাকথা যে যত বেশী ভাল আমল করবে, তার ঈমান তত বৃদ্ধি পাবে। তাওহীদ প্রতিষ্ঠার পর কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী সকল আমল করার চেষ্টা করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায়ের চেষ্টা করতে হবে এবং আউয়াল ওয়াক্তে পড়তে সচেষ্ট হ’তে হবে। ছিয়াম সঠিক নিয়মে আদায় করতে হবে। যার উপর হজ্জ ও যাকাত ফরয হয়েছে তাকে সেগুলো ঠিকভাবে আদায় করতে হবে। সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে সর্বাধিক ভালবাসতে হবে। সকল আমল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ইত্তেবা করতে হবে। বেশী বেশী যিকর-আযকার করতে হবে। সকল মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনা করতে হবে। এসব আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ আমাদের ঈমান বৃদ্ধি করার তাওফীক দান করুন আমীন!

পরবর্তী অংশ পড়ুন: ঈমান হ্রাস পাওয়ার কারণ

– হাফেয আব্দুল মতীন


[1]. বুখারী হা/১৩৫৯

[2]. ইবনু তায়মিয়া, শারহুল আক্বীদা আল-ওয়াসিতিয়্যাহ, পৃঃ ১৩

[3]. মুহাম্মাদ ছালেহ আল-ওছায়মীন, ফাৎহু রাবিবল বারিয়্যাহ, পৃঃ ১৫

[4]. বুখারী হা/৭৩৯২, ‘তাওহীদ’ অধ্যায়

[5]. বুখারী হা/৬৪১০ ‘দু‘আসমূহ’ অধ্যায়

[6]. ইবনে তায়মিয়া, মাজমূউ ফাতাওয়া, ৬/৩৮০-৩৮১; মুহাম্মাদ ছালেহ আল-উছায়মীন, আল-কাওয়ায়েদুল মুছলা, পৃঃ ১৫

[7]. বুখারী হা/১; মুসলিম হা/৪৯২৭, ‘জিহাদ’ অধ্যায়

[8]. ইবনে তায়মিয়াহ, শারহু রিসালাহ তাদামুরিয়্যাহ (দারু কুনূয ইশবিলিয়া, প্রথম সংস্করণ ১৪২৫ হিঃ), পৃঃ ৫৩৫

[9]. মুসলিম হা/৪৪৯৩, ‘বিচার-ফায়ছালা’ অধ্যায়

[10]. মুসলিম হা/৪৪৯২

[11]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৬/১১৪

[12]. ইবনু মাজাহ হা/২২৪ সনদ ছহীহ

[13]. বুখারী হা/৭১

[14]. বুখারী ‘ইলম’ অধ্যায়, পৃঃ ১৬

[15]. আবু দাঊদ হা/৩১৫৭; ইবনু মাজাহ হা/২২৩; তিরমিযী হা/২৬০৬; সনদ ছহীহ

[16]. ইবনু মাজাহ হা/২৪০, সনদ হাসান

[17]. ছহীহ তারগীব হা/৭৭; মিশকাত হা/২১৩; ইবনু মাজাহ হা/২২৩, সনদ ছহীহ

[18]. মুসলিম হা/১৬৩১

[19]. বুখারী হা/১০০; মুসলিম হা/২৬৭৩

[20]. বুখারী হা/৫০০২

[21]. শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ, দারউত তা‘আরুয বায়নাল আকল ওয়ান নাকল, তাহকীক : ডঃ মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম, ১৪১১ হিঃ ১/২০৮

[22]. মুসলিম হা/২২৩, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়

[23]. বুখারী হা/৬৭৮৬

[24]. বুখারী হা/৬০৩৮

[25]. বুখারী হা/৬০২৯

[26]. বুখারী হা/১৬

[27]. বুখারী হা/৩৬৫০; মুসলিম হা/২৫৩৩; মিশকাত হা/৬০০১

[28]. বুখারী হা/৩৬৭৩

[29]. বুখারী হা/১৭

[30]. ড. আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ, যিয়াদাতুল ঈমান ওয়া নুকছানিহি, পৃঃ ১৮৩-২৩৭

মতামত দিন