আক্বীদা

ঈমানের অসুস্থতা

ঈমান খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং আপেক্ষিক একটি বিষয়। নিজেদেরকে যারা কথা ও কর্মের দ্বারা মুসলমান হিসাবে দাবি করি তাদের ভেতর নুন্যতম ঈমান আছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বেঈমান শব্দটাও আমাদের পরিচিত যার অর্থ ঈমান নেই যার। আসলেই কি মানুষের ঈমান কখন কখন থাকে না?

আসলে বিষয়টা ঈমানের বিভিন্ন স্তরের সাথে সম্পর্কিত। আর ঈমানের স্তর স্থান কাল ভেদে পরিবর্তিত হয়। ঈমান আসলে নিজেদের কর্মের দ্বারা ফুটে ওঠে। ঈমান কোন প্রদর্শিত বিষয় নয় যে তাকে কারো সামনে তুলে ধরতে হবে। হ্যা তুলে যদি ধরতেই হয় তবে তাঁর সামনে তুলে ধরা উচিত যিনি আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন ঈমানের পরীক্ষা নেবার জন্য। ভালো কাজে সম্পৃক্ততা এবং খারাপ কাজে অসম্পৃক্ততা নির্ভর করে ঈমানের স্কেল বা মাপকাঠির উপর। অর্থাৎ কেও যখন কোন খারাপ কাজে জড়িয়ে যায় তখন তাঁর ঈমান কমে গেছে আবার সে যখন কোন খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে তখন সে তার ঈমানের জোরেই খারাপ থেকে বিরত থাকে। এই বিরত থাকা কখন কখন ঈমানের জোরে না হয়ে লৌকিকতার স্বার্থে বা নিজের আত্মমর্যাদার স্বার্থেও ঘটে। উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া যাক…

উদাহরণ-১: দুই জন ছেলে (ক এবং খ), তারা দুজনেই জানে মেয়েদের দেখলে ইসলামী বিধান কি?

ঘটনা একঃ দুজনেই রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে হটাৎ একজন সাধারন পোশাক পরিধান করা সুন্দরী রমণী তার বিপরীত দিক থেকে হেটে আসছে দেখে ক মাথা নিচু করল কিন্তু খ মেয়েটার দিকে চেয়েই থাকল।

ঘটনা দুইঃ ক এবং খ দুজনেই তাদের পরিবারের সাথে বাহিরে বের হয়েছে। এবং তারা দুজনেই আবার একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হল, কিন্তু এই ক্ষেত্রে দুজনেই মাথা নিচু করে থাকল।

ঘটনা তিনঃ সম্পূর্ণ ইসলামী পোশাক পরিধান করা একটা মেয়ে হঠাৎ তাদের দৃষ্টি গোচর হল কিন্তু তারা দুজনেই মাথা নিচু করে থাকল।

ঘটনা তিনটাকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ক সব সময় তার ইসলামী অনুশাসনকে প্রাধান্য দিয়েই মাথা নিচু করেছে কিন্তু খ তা করেনি। খ পরিবারের সাথে থাকার কারণে লৌকিকতাকে এবং মেয়েটা ইসলামী পোশাক পরিধান করায় তার সামনে নিজের আত্মমর্যাদাকে প্রাধান্য দিয়েই মাথা নিচু করেছে। খ মাথা নিচু করলেও উপকৃত হতে পারল না তার কর্মের দ্বারা।

এখানেই আমাদের শত্রুর লাভ। কারণ তার উদ্দেশ্য আমল ধ্বংস করা সেটা যেভাবেই হোক। কোন ভালো কাজের নিয়াত না থাকলেও যদি ভালো কাজ হয়ে যায় তার দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেক কাজের ক্ষেত্রে নিয়াত ই হল প্রথম শর্ত। নিয়াতের সাথে ঈমান জড়িত। ঈমান যত বাড়তে থাকবে নিয়াত ততই পরিশুদ্ধ হবে। ঈমান হল অন্তরে বিশ্বাস রেখে মুখ দিয়ে স্বীকার করা এবং সেই অনুযায়ী কর্মে পরিণত করা।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ঈমান যখন বিনা কাজে শুধু কথায় হবে তখনতা কুফরী হবে। আর যখনতা শুধু কথা ও কাজে হবে বিনা মননে(নিয়াতে) তখনতা মুনাফেকী হবে। আর যখনতা সুন্নাত মোতাবেক না হয়ে কেবল কথা ও কাজে এবং নিয়াত অনুযায়ী হবে তখনতা বিদআত ও মনগড়া হবে।” [কিতাবুল ঈমানঃ১৫২ পৃষ্ঠা]

আনন্দ-অবসাদ সবার জীবনেই কম বেশি থাকে। কিন্তু আনন্দ-অবসাদকে উপভোগ করার পদ্ধতি সবার ভিন্ন ভিন্ন। এই ভিন্নতাকে আমরা নিজেদের ভেতর অভ্যর্থনা জানিয়েই নিয়ে এসেছি। কিন্তু এই ভিন্নতা সবসময় আমাদের জন্য কল্যাণকর হয় না। এই ভিন্নতাই আমাদের প্রকাশ্য শত্রুর দল ভারী করে। আনন্দ-অবসাদকে উপভোগের ভেতরেও ঈমান জড়িত। আনন্দ-অবসাদ সবসময় নিজেদের কর্মফল বা আল্লাহ সুবহানা ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ব্যর্থতাই শয়তানের লাভ।

ঈদের দিন আল্লাহ সুবহানা ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য একটি উপহার। দিনটি প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই আনন্দের। যেহেতু আল্লাহ আমাদেরকে উপহারটি দিয়েছেন তেমনই কিভাবে উপহারটিকে উপভোগ করতে হয় তার জন্য কিছু নিয়মও দিয়েছেন। কিন্তু যখন এই হালাল উপহারকে হারামের মাধ্যমে উপভোগ করা হয় তখন সেটি সৃষ্টিকর্তার সাথে মজা ছাড়া আর কিছুই নয়।

অবসাদের সময় গুলোকে জীবন থেকে দ্রুত পার করার চেষ্টা সবাই করে। কিন্তু চেষ্টায় এমন কিছু মিশ্রিত থাকে, যা শুধু সময় গুলোকে অতিবাহিত করে এবং আমাদের মনের পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু তা আত্নিক প্রশান্তি দিতে পারেনা। সাধারণত অবসাদের সময় গুলোকে আমরা মুভি, টিভি সিরিয়াল, গান বা ফেসবুক চালিয়ে পার করে দেই। সমস্যা হল আমরা হারামকে হালালের জায়গায় প্রতিস্থাপনই শুধু করিনি বরং সেটাকেই নিজের অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছি। ফলশ্রুতিতে আমরা কখন অবসাদ গস্থ হলেও মাথায় হালাল বিনোদনের কোন আইডিয়াই আসেনা।

অনেকের কাছে মনে হতে পারে বিনোদন আবার হালাল হয় কিভাবে, তাদেরকে বলব আগে নিজের দৈনন্দিন জীবনে এবং কর্মক্ষেত্রে হারামের জায়গায় হালালকে অগ্রাধিকার দেন তখন আপনি নিজেই হালাল বিনোদনের পথ খুজে পাবেন।

একজন মু’মিন কখনই হতাশ হয়না। কারণ সে জানে এর ভেতরেই তার জন্য কল্যাণ রয়েছে।

আসলে কোন বিষয় সম্পর্কে জানাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন বিষয় সম্পর্কে জানা না থাকলে ওই বিষয়কে মূল্যায়ন করা সম্ভব না। রসুল(সাঃ) বলেছেন, “জ্ঞান(শরিয়তের) অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয।” [ইবনে মাজাহ্]

ঈমানের অসুস্থতাকে সুস্থ করার প্রথম উপায় হল শারীয়াহ এর সঠিক জ্ঞান অর্জন করা।

আল্লাহ আমাদের কে জ্ঞান বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের ঈমানকে পরিশুদ্ধ করার এবং সেই অনুযায়ী চলার তৌফিক দান করুক। (আমিন)

(সুবহা-নাকাল্লা-হুম্মা ওয়া বিহামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা আস্তাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকা)

সূত্র:

মতামত দিন

কমেন্ট

  • শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ঈমান যখন বিনা কাজে শুধু কথায় হবে তখনতা কুফরী হবে। আর যখনতা শুধু কথা ও কাজে হবে বিনা মননে(নিয়াতে) তখনতা মুনাফেকী হবে। আর যখনতা সুন্নাত মোতাবেক না হয়ে কেবল কথা ও কাজে এবং নিয়াত অনুযায়ী হবে তখনতা বিদআত ও মনগড়া হবে।” [কিতাবুল ঈমানঃ১৫২ পৃষ্ঠা]
    >>তাহলে সুন্নাত মোতাবেক পরিপূর্ণ “ঈমান ” কিভাবে হবে — বিস্তারিত জানাবেন কি ???