পর্যালোচনা

সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন

লেখক:- ডাঃ ফারূক বিন আব্দুল্লাহ*
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন ফষ্টার ডালেস বলেছিলেন, ‘কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হ’লে, আগে সে জাতির সংষ্কৃতিকে ধ্বংস করে দাও’ । বর্তমানে বাংলাদেশে যেভাবে অপসংষ্কৃতির নগ্ন চর্চা শুরু হয়েছে, তাতে খুব বেশি দিন লাগবে না এ দেশের নিজস্ব সংষ্কৃতি বিলুপ্ত হ’তে । দেশীত মানবিক শাশ্বত সংষ্কৃতি বিলুপ্তির লক্ষ্যেই সাম্রাজ্যবাদী ত্বাগূতী শক্তির এদেশীয় দোসররা মুসলিম ঐতিহ্যাশ্রয়ী গৈরবময় এ জনপদের হাযার বছরের ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করার এক মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগুচ্ছে ।
এইডস (AIDS) রোগে আক্রান্ত হলে যেমন কোন রোগীর বাচার আশা থাকে না, তেমনি অপসংষ্কৃতির আগ্রাসনে কোন জাতি আক্রান্ত হলে সে জাতির অপমৃত্যু হতে বেশী সময় লাগে না । তাই সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন হচ্ছে ‘এইডস’-এর মত মরণব্যাধি, যার স্বাভাবিক পরিণতি অবধারিত মৃত্যু । কোন মুসলমান এই অপসংষ্কৃতির আগ্রাসনের শিকার হলে প্রথমে তার ঈমানের উপর দুর্বলতা আসে । ঈমান দুর্বল হওয়ার সাথে সাথে তার সৎ আমলও কমতে থাকে এবং নেক আমল কমতে কমতে এক সময় শূন্যের কোটায় নেমে আসে । তখন সে সত্যিকারের মুসলমানিত্ব হারিয়ে ফেলে । সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে মুসলমানিত্বের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এভাবেই । আর ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছে মুসলমানদের ভিতর উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা ইসলামের কল্যাণকামিতার শাশ্বত ও পরিশীলিত মানসিকতা । অপসংষ্কৃতির আগ্রাসনের ফলে আমরা আজ পাপচার, কামাচার, যৌনাচার, অত্যাচার, বর্বরতা, হঠকারিতা, স্বজনপ্রীতি,দুর্নীতি আর উচ্ছৃংখলতায় জর্জরিত ।
মুসলিম বাংলার গৌরবময় জনপদের হাযার বছরের কালোত্তীর্ণ মুসলিম সংষ্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করার নীল নকশা প্রণয়ন করেছে খৃষ্টান-ইহুদী ও ত্বাগূতী শক্তির পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী ভারতীয় আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা । তারা মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা, তাওহীদী মূল্যবোধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার, সুসংগত কল্যাণকামী মুসলিম সমাজ ব্যবস্থাকে নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়ে সবচেয়ে পরিকল্পিত ও কার্যকরীভাবে যে কাজটি করেছে, তা হল তাদের নিয়ন্ত্রিত অর্ধশতকেরও অধিক টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন । প্রতিবেশী দেশ ছাড়াও পাশ্চাত্য দেশগুলি থেকে আসা প্লে-বয়, পেন্ট হাউক জাতীয় যৌন উত্তেজক বই, রাস্তার পাশে নগ্ন-অর্ধনগ্ন নারীদেহের পোষ্টার, ভারতীয় চ্যানেল দিয়ে ২৪ ঘন্টাব্যাপী যৌনতায় ঠাসা চলচ্চিত্র, নাটক, নাচ আর গান এদেশের যুবসমাজকে কু-পথে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত । ভারতীয় যৌন উত্তেজক চলচ্চিত্রের আকর্ষণে হারিয়ে যাচ্ছে এদেশের সুস্থবিনোদনমূলক চলচ্চিত্র । ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের দর্শক রুচির বিকৃতি ঘটায় এদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারাও যৌন সুড়সুড়ি মূলক ছবি তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছেন । এসবই হল সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের ফসল ।
সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন যে কত ভয়াবহ এবং মারাত্নক, তা সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ, ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতা ও কর্মীর নিকটও সুস্পষ্ট নয় । উল্লেখ্য যে, ব্রাহ্মণ্যবাদী সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের মূল টার্গেট হল মুসলিম বিশ্ব । মুসলিম বিশ্বে এমন কোন দেশ নেই , যেদেশ ভারতীয় পৌত্তলিক সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুক্ত । সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন যেহেতু অন্তর্প্লাবী, তাই সহজে চোখে পড়ে না । প্রত্যক্ষ ও তাৎক্ষণিক নয় বলে আমরা সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন বা আকাশ সংষ্কৃতিকে এতদিন প্রতিহত কিংবা গুরুত্ব দেইনি । অথচ এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল এবং প্রভাব যে কত ভয়ংকর আজ মুসলিম বিশ্ব বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে । সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে পড়ে আমাদের প্রচলিত ও ন্যায়ভিত্তিক ধর্মীয় সমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে । লজ্জাহীনতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, অভদ্রতা সমাজের প্রতিটি স্তরে ভাইরাসের মত প্রসার লাভ করেছে এবং তা দেশের সর্বোচ্চ জনপ্রতিনিধিদের কর্মস্থল ‘জাতীয় সংসদ’ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে ।
সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের লক্ষ্যই হচ্ছে লজ্জাবোধ, শালীনতা, বিশ্বস্ততা, দেশপ্রেম, ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি ও প্রচলিত বিশ্বাসকে নিঃশেষ করে দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে পদলেহনকারী ক্রীতদাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করা; নগত অর্থপ্রাপ্তির লোভে মগজ বিক্রি করে বিদেশের দালাল শ্রেণীতে রূপান্তরিত করা, দেশীয় রাজনীতিতে বিদেশী বশংবদ বৃদ্ধি করা । এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম দরকার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পৌত্তলিকতা কিংবা নাস্তিকতায় বিশ্বাসী ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করা । ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলি এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে অবিরত ও নিখুতভাবে । ভারতীয় সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে এদেশের জনগণকে আফিম খেয়ে ঘুমানোর যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখান থেকে এ মুহূর্তে জাতিকে জাগ্রত না করতে পারলে দেশের সংষ্কৃতি যে ভারতীয় পৌত্তলিক সংষ্কৃতির কাছে বিলীন হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না ।
কবি ইকবাল বলেছেন, ‘রাজনীতি নয়; ধর্মই শাসন করবে জগৎ । আর সে ধর্ম হবে ইসলাম । কারণ ইসলামে বর্ণ-বিদ্বেষ নেই; পুরোহিত প্রথা নেই । এই ধর্মে জীবনকে, জগতের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়নি । ইসলাম মানুষের কামনা-বাসনাকে স্বীকার করে কিন্তু বাড়িয়ে তুলতে চায় না । ইসলাম জীবনকে উপভোগ করতে বলে কিন্তু ভোগবাদী হতে নিষেধ করে’ । বিখ্যাত ভারতীয় মার্ক্সবাদী রাজনীতিবিদ লেনিনের সহচর মানবেন্দ্র নাথ রায় বলেছেন, ‘এক সময় ইসলামের সামাজিক কর্মসূচী ভারতীয় জনগণের সমর্থন পেয়েছিল । কারণ এ কর্মসূচীর দর্শ্নগত ভিত্তি হিন্দুদর্শ্ন থেকে উন্নততর ছিল’ ।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশটি আজ ভারতীয় সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনে মারাত্নকভাবে আক্রান্ত । বাঙ্গালী সংষ্কৃতির নামে শুরু করা হয়েছে মূর্তি নির্মাণ সংষ্কৃতি, তিলক-চন্দন, টিপ-সিঁদুর, ধুতি-পৈতা, রাখী-বন্দন, মংল-প্রদীপ, শিখা-প্রজ্বলন, শিখা চিরন্তন, শিখা অনির্বাণ ইত্যাদি সংষ্কৃতি । এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন এগুলি মুসলিম সংষ্কৃতির অঙ্গ নয় । শিখা প্রজ্বলন বা আগুন হচ্ছে কুফরী, শিরকী, জাহান্নামী সংষ্কৃতির অঙ্গ ।
বাংলাদেশের সংষ্কৃতিতে আজ ঘোলা পানির প্লাবন । উজানের বানের পানির মত ভেসে আসছে সংষ্কৃতি চর্চার নামে মিস ফটোজেনিক, ফ্যাশন শো কিংবা সুন্দরী প্রতিযোগিতার মত কিছু অপসংষ্কৃতির আবর্জনা । এই আবর্জনাগুলি নিয়ে মেতে উঠছে তথাকথিত মুক্তচিন্তার অধিকারী, প্রগতির ধ্বজাধারী, বিদেশী আগ্রাসী শক্তির দেশীয় কিছু পোষিত আত্নবিক্রিত বুদ্ধিজীবী । এছাড়া কতিপয় বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন ভোগবাদী বুদ্ধিজীবী আমাদের আধুনিক শিক্ষিত সমাজকে বিপথগামী করার জন্য ‘পরকীয়া প্রেমে পাপ নেই’ এই শ্লোগানে বিভ্রান্ত করছে । এরা আধুনিকতার নামে নিজেদের স্ত্রী-কন্যাকে অন্যের শয্যাসঙ্গিনী কিংবা ‘বৌ বদল’ সভ্যতার জন্ম দিচ্ছে । ‘থার্টি ফার্ষ্ট নাইট’ উদযাপনের মাধ্যমে অবাধ উচ্ছৃংখলা কিংবা ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ পালনের নামে লজ্জা-শরমের পর্দাও এরা খুইয়ে ফেলেছে । এসবই হচ্ছে ধর্মহীন সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের ফসল ।
এছাড়াও বৃটিশ-আমেরিকান স্ট্যাইলে বাধাহীন ব্যভিচার কালচারে উদ্ধুদ্ধ করার জন্য তথাকথিত এনজিও নারীবাদীরা এ দেশের নারীদেরকে ‘দেহ আমার সিদ্ধান্ত আমার’ এই কু-মন্ত্রে দীক্ষিত করে স্বামী-স্ত্রীর সুখকে বিপন্ন করতে ঘর ভাঙ্গার রিহার্সেল রীতিমত শুরু করেছে । অপরদিকে মস্তিষ্ক বিক্রিত কতিপয় বুদ্ধিজীবী শুরু করেছে । অপরদিকে মস্তিষ্ক বিক্রিত কতিপয় বুদ্ধিজীবী জরায়ূর স্বাধীনতা চেয়ে গোটা দেশকে পতিতালয় বানানোর ষড়যন্ত্র করছে, মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য মুয়াযযিনের আযানের ধ্বনি ‘বেশ্যার খদ্দের আহ্বানে’র সঙ্গে তুলনা করেছে । এদেশের মুসলমানদের আইডেনটিটিকে বিনষ্ট করার জন্য মুসলমানদের নামের আগে ‘মুহাম্মাদ’ ও ‘আলহাজ্জ’ শব্দ ব্যবহার না করার হুমকি দিয়েছে । বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রচলনের নামে ‘মুসলিম’ শব্দটি তারা পরিত্যাক্ত করেছে । বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে এরা সালামের পরিবর্তে শুভ সকাল, শুভ রাত্রি ইত্যাদি শব্দগুলি ব্যবহার করছে । ধর্মীয় বিশ্বাস ইসলামী অনুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে আজ মুসলিম মেয়ে ফেরদৌসী বিয়ে করেছে হিন্দু ছেলে রামেন্দ্রকে, শমী হিন্দু রিংগুকে, সাবিনা হিন্দু সুমনকে । তাওহীদপন্থীদের সাথে বহু ঈশ্বরবাদীদের পার্থক্য আজ এভাবে ধুয়ে-মুছে ফেলার প্রক্রিয়া চলছে । তার সাথে আরো চলছে দেশের সীমানা মুছে ফেলার চক্রান্ত । সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের ফসল হিসাবে এসব হচ্ছে তা অস্বীকার করা যাবে কি ?
দেশে আজ চলছে সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের বহুমুখী নগ্ন প্রয়াস । সাংষ্কৃতিক স্বাধীনতা একবার হারিয়ে গেলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা যে বিপন্ন হবে, একথা বুঝেও যারা না বোঝার ভান করেন, মনে রাখতে হবে এরাই দেশের স্বাধীনতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের শত্রু । ফসলী জমিতেও মাঝে মাঝে আগাছা জন্মে, তখন ঐ আগাছাগুলি তুলে ফেলতে হয় । ঠিক তেমনি একটা দেশেও মাঝে মাঝে পরগাছারূপী দেশদ্রোহীদের নির্মূল করতে হয়, তা না হলে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে । এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের একটি কথার উদ্ধৃতি দিতে চাই । তিনি বলেছিলেন, “The tree of liberty must be refreshed from time to time with the blood of patriots and tyrants. It is its natural manure.”
তাই সকল দেশপ্রেমিক জনগণের উচিত সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করা, এর কুফল সম্পর্কে তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, স্বাধীনতা নামক বৃক্ষকে রক্ত দিয়ে হলেও সংরক্ষিত করা এবং একটি সুন্দর-সুস্থ ইসলামী মূল্যবোধ ভিত্তিক শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মানে দেশের সকলকে একটি প্লাটফর্মে দাড় করানো । এছাড়া আমাদের আর বিকল্প নেই । কারণ আমাদের একথা মনে রাখা উচিত যে, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা সংষ্কৃতিগত বিভাজনের কারণে অস্পৃশ্য হয়ে বেঁচে থাকতে চায়নি বলেই পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল । পরবর্তীতে একই স্বাতন্ত্র্য চেতনা নিয়েই তারা বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে । একথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট যে, ইসলামী চেতনাই বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা করে রেখেছে । ইসলামী চেতনা দুর্বল বা নষ্ট হয়ে গেলে এদেশের স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্যও বিলীন হবে । অতএব, সকল দেশপ্রেমিক সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তিদেরকে বাংলাদেশের সংষ্কৃতির স্বরূপ অন্বেষণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত যরূরী ।
(সূত্র: পুরনো আত-তাহরীক)

মতামত দিন