পর্যালোচনা

দল, ইমারত ও বায়আত সম্পর্কে উলামাগণের বক্তব্য (পর্ব ৬)

দল, সংগঠন, ইমারত ও বায়‘আত সম্পর্কে বিশিষ্ট উলামায়ে কেরামের বক্তব্য (ষষ্ঠ পর্ব)

            সঊদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য শায়খ ছালেহ আল-ফাওযান

মুহতারাম শায়খ বলেন, আল্লাহ্‌র রাস্তায় দা‘ওয়াত দেওয়া ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ ﴾ [النحل: ١٢٥] 

‘আপনি আপনার পালনকর্তার পথের দিকে দা‘ওয়াত দিন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে এবং উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে’ (আননাহ্‌ল ১২৫) তবে মুসলিমদের পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং অন্যকে হক মনে না করে শুধুমাত্র নিজেকে হক মনে করা দা‘ওয়াতের কোনো পদ্ধতি ও মূলনীতি হতে পারে না। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন দলের বাস্তব চিত্র তা-ই। যাহোক, যে মুসলিমের জ্ঞান ও সামর্থ্য আছে, তার উপর কর্তব্য হচ্ছে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞান সহকারে মানুষকে আল্লাহ্‌র পথে ডাকা এবং অন্যদেরকে সহযোগিতা করা। তবে যেন এমন না হয় যে, প্রত্যেকটি জামা‘আতের নিজেদের জন্য আলাদা নিয়মনীতি নির্দিষ্ট  করে নেয়, যা অন্য জামা‘আতের বিরোধী। বরং গোটা মুসলিম উম্মাহ্‌র জন্য উচিত একটিমাত্র নিয়মনীতি থাকা, সবাই পারস্পরিক সহযোগিতা করা এবং একে অন্যের সাথে পরামর্শ করে চলা। বিভিন্ন দল এবং ভিন্ন ভিন্ন পথ ও মত সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এগুলি মুসলিম ঐক্য ধ্বংস করে এবং মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করে, যেমনটি মুসলিম ও অমুসলিম দেশে বিভিন্ন দলের মধ্যে আজ এই বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে। সুতরাং দা‘ওয়াতী ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দল গঠন করার কোনো প্রয়োজনই নেই; বরং এক্ষেত্রে যরূরী বিষয় হচ্ছে, যার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আছে, সে একাকী হলেও মানুষকে আল্লাহ্‌র পথে দা‘ওয়াত দিবে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে থাকলেও দাঈদের দা‘ওয়াতী মূলনীতি এক এবং হকের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।([1])

         সঊদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য শায়খ বকর আবু যায়েদ([2])

তিনি বায়‘আত সম্পর্কে বলেন, ‘আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ’([3]) কর্তৃক মনোনীত মুসলিম সরকারের বায়‘আত ছাড়া ইসলামে দ্বিতীয় কোনো বায়‘আত নেই। আজ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দলে যেসব বায়‘আত দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর শর‘ঈ কোনো ভিত্তি নেই। কুরআন ও হাদীছে এগুলির ভিত্তি থাকা তো দূরের কথা, এমনকি কোনো ছাহাবী বা তাবে‘ঈর আমল থেকেও এর সপক্ষে  কোনো প্রমাণ মিলে না। সুতরাং এগুলির সবই বিদ‘আতী বায়‘আত আর প্রত্যেকটি বিদ‘আতই পথভ্রষ্ট।

যেসব বায়‘আতের শর‘ঈ কোনো ভিত্তি নেই, সেগুলো ভঙ্গ করলে কোনো দোষ নেই; বরং সেসব বায়‘আত সম্পন্ন হলেই পাপ হবে। কেননা এসব বায়‘আতের একদিকে যেমন শর‘ঈ কোনো ভিত্তি নেই, অন্যদিকে তেমনি সেগুলোর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্‌র মধ্যে বিভক্তি ও দলাদলির সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে ফেৎনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে। উপরন্তু একজনকে আরেক জনের উপর ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। অতএব, বায়‘আত, শপথ, চুক্তি বা অন্য যে নামই দেওয়া হোক না কেন এসব বায়‘আত শরী‘আতের গণ্ডির বাইরে।([4])

তিনি অন্যত্র বলেন, দল বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, একই দেশে অনেকগুলি দল পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলির অন্তরালে রয়েছে অসংখ্য বায়‘আত, চুক্তি আর শপথ। প্রত্যেকটি দল অন্যদের তোয়াক্কা না করে তার নিজস্ব মতবাদের দিকে আহ্বান করছে। সে কারণে তাদের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষিত মুসলিম জামা‘আতের শাশ্বত মূলনীতি ‘আমি এবং আমার ছাহাবীরা যে পথে আছে’ বিনষ্ট হচ্ছে। এভাবে মুসলিম উম্মাহ আজ বিভিন্ন বায়‘আতের খপ্পরে পড়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যুবকেরা আজ গোলক-ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছে যে, কোন্‌ দলে তারা যোগ দিবে, কোন্‌ সংগঠন প্রধানের হাতেইবা বায়‘আত করবে?! কারণ বায়‘আত এমন শপথ ও অঙ্গীকার, যা ‘অলা ও বারা’ অর্থাৎ শত্রুতা ও মিত্রতা পোষণ অবধারিত করে।([5])

তিনি অন্যত্র বলেন, ইসলামে কোনো প্রকার যোজন বা বিয়োজন ঘটিয়ে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো নামে বা রসম-রেওয়াজে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে নির্দিষ্ট কোনো দলের অধীনে থেকে অন্যদেরকে বাদ দিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলাও বৈধ নয়। সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেখানো পদ্ধতিতে ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’([6])-এর সাথে থাকতে হবে। অতএব, আল্লাহ্‌র কিছু নির্দেশনা বাদ দিয়ে কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কোনো দল প্রতিষ্ঠিত হলে, অন্যদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজ দলের সমর্থকদের সাথে মিত্রতা পোষণের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে কোনো দল প্রতিষ্ঠিত হলে, কোনো দেশের অধিবাসীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মূলনীতি তথা আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় তাদের সম্পূর্ণ বা আংশিক বিরোধিতায় ভিন্ন কোনো নামে কোনো দল গড়ে উঠলে এগুলি হারাম বলে বিবেচিত হবে।([7])

আল্লামা বকর আবু যায়েদ দলাদলির অনেকগুলি লক্ষণ এবং ক্ষতির দিক উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর কয়েকটি নীচে তুলে ধরা হলোঃ

  • বিভিন্ন ইসলামী দলকে বাহ্যতঃ দা‘ওয়াতী সুসংগঠিত মাধ্যম মনে হলেও বেশীর ক্ষেত্রে সেগুলো মুসলিম উম্মাহ্‌র দেহে অদ্ভূত এক আকৃতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের সবার ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে, রয়েছে দ্বীনী কার্যক্রমের নির্দিষ্ট কেন্দ্র, যেসব কেন্দ্র অন্যান্য দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৎওয়া জারী করছে। অন্যদিকে এসব দল কখনো কখনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা জোরদারেরও চেষ্টা করছে। এছাড়া সম্পদ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ক্ষমতার মসনদ দখলের বিষয়টিতো রয়েছেই।
  • দলাদলি করলে ইসলামকে নির্দিষ্ট একটি পরিমণ্ডলে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে দলের লোকজন শুধুমাত্র দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই ইসলামকে দেখে। আর যে কোনো দল নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নির্দিষ্ট নেতৃত্ব এবং নির্দিষ্ট মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেকারণে যে কোনো দল সাধারণত নবুঅতী আলোর খুব সামান্য পরিমাণই ধারণ করে থাকে।
  • যে কোনো দল নিজেকে নির্দিষ্ট কোড, সংকীর্ণ নাম ও উপনামের মধ্যে বন্দী করে ফেলে। ফলে সে নির্দিষ্ট প্রতীক নিয়ে সবার চেয়ে ব্যতিক্রম থাকতে চায়। সেকারণে সে নীচের আয়াতে কারীমায় বর্ণিত ব্যাপক অর্থ বোধক নাম থেকে বঞ্চিত হয় ﴿ هُوَ سَمَّىٰكُمُ ٱلۡمُسۡلِمِين﴾ [الحج: ٧٨]  ‘তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম’ (আলহাজ্জ ৭৮)
  • দলাদলি দলের অভিমতের প্রতি আত্মসমর্পণের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উক্ত অভিমত প্রচার-প্রসারে ব্রতী হয়। পাশাপাশি দলাদলি দলের সমালোচনার পথ বন্ধ করে দেয়। এই কঠিন বাস্তবতা ইসলামী দা‘ওয়াতের পরিপন্থী।
  • দলাদলিতে নেতৃত্ব দলীয় চিন্তা-চেতনা, কর্মপদ্ধতি এবং মূলনীতির উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। ফলে দলাদলি দলীয় লোকজনকে মূল লক্ষ্য দা‘ওয়াতী কার্যক্রমের সৈনিক না বানিয়ে নেতৃত্বের সৈনিক বানায়। সেকারণে দলাদলি ব্যক্তির সেবা করে, দা‘ওয়াতের নয়।
  • বিভিন্ন দল আল্লাহ্‌র রাস্তায় দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বেড়ী পরে ফেলে। সেকারণে দ্বীনের দা‘ওয়াত দিতে গিয়ে দা‘ঈকে দলীয় কার্ড বহন করতে হয়। দলীয় কার্ড না থাকলে অন্ততঃ তাকে দলের সদস্য হতে হয়। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পদ্ধতি অনুযায়ী আল্লাহ্‌র পথের দা‘ঈ হওয়ার জন্য ইসলাম দা‘ঈকে দুই কালিমার সাক্ষ্য প্রদান এবং ইসলাম প্রচারকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। দলাদলির গণ্ডিতে প্রবেশের কোনো শর্তই ইসলাম আরোপ করেনি; বরং সকল দলাদলির ঊর্ধ্বে থাকতে বলা হয়েছে।
  • দলাদলি মুসলিম উম্মাহ্‌র যুবকদের অন্তরে দলীয় চিন্তাধারা এবং আল্লাহ্‌র পথে দা‘ওয়াতের মধ্যকার সুদৃঢ় সম্পর্কের অবান্তর চিন্তার বীজ বপন করেছে। অর্থাৎ দল ছাড়া দা‘ওয়াতী কার্যক্রম সম্ভব নয় মর্মে একটি বিশ্বাস তাদের অন্তরে সৃষ্টি করেছে।

এক্ষণে একটি প্রশ্ন রয়ে যায়, যার কোনো জবাব নেই; প্রশ্নটি হচ্ছে, একজন মুসলিম কোন্‌ দলে যোগ দিবে? এখানে আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত তরীকায় এবং ইসলামের ব্যাপক অর্থ বোধক পদ্ধতিতে আল্লাহ্‌র পথে দা‘ওয়াত দেওয়া কি বেশী ভাল নাকি দলীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকে দলের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দা‘ওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা বেশী উত্তম?([8])


           ইয়েমেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদে‘ঈ([9])

প্রশ্ন: দিনে দিনে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যারা কর্ম পদ্ধতি, দা‘ওয়াতী মূলনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরস্পরে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী। আর হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হক জামা‘আত হবে একটিই। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দল ও সংগঠনের হুকুম কি?

উত্তর: এসব দল ও সংগঠনের ব্যাপারে শরীআতের হুকুম হচ্ছে, এগুলি হারাম এবং বিদ‘আত। সেজন্য এগুলি থেকে দূরে থেকে কিতাব ও সুন্নাহ্‌র দিকে দা‘ওয়াত দেওয়া একজন মুসলিমের কর্তব্য। তবে কেউ যেন কিছুতেই ধারণা না করে যে, আমরা কোনো মুসলিমকে ইসলামের জন্য একাকী কাজ করতে বলছি; বরং আমরা একজন মুসলিমকে আরব-অনারব, সাদা-কালো সকল মুসলিমের সাথে কাজ করতে বলছি। কারণ দলবদ্ধভাবে কাজ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ ﴾ [المائ‍دة: ٢] 

‘সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না’ (আল-মায়েদাহ ২) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেন, পারস্পরিক ভালবাসা, দয়ার্দ্রতা এবং সহানুভূতিশীলতার ক্ষেত্রে গোটা মুমিন সম্প্রদায় একটি দেহের মত। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে তার জন্য পুরো দেহ ব্যথা অনুভব করে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ‘আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ’ যদি তাদের দা‘ওয়াতী দায়িত্ব যথারীতি পালন করে, তাহলে এতসব দলাদলি পানিতে লবণ গলে যাওয়ার মত গলে যাবে। কেননা এসব দলাদলি ধোঁকার উপর প্রতিষ্ঠিত।([10])

প্রশ্ন: দা‘ওয়াতের মহান উদ্দেশ্যে মুক্বীম অবস্থায় কাউকে ‘আমীর’ বানানোর ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

উত্তর: মুক্বীম অবস্থায় মুসলিম খলীফা বা তাঁর নিযুক্ত আমীর ও গভর্ণর ছাড়া অন্য কাউকে আমীর বানানো প্রমাণিত নয়। কিন্তু বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে খেলা শুরু হয়ে গেছে; ফলে তিন জনের একটি গ্রুপ থাকলে তাদেরও একজন ‘আমীরুল মুমিনীন’ সেজে বসে থাকছে। নিঃসন্দেহে এটি বিদ‘আত, যা মুসলিম ঐক্যকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।([11])

প্রশ্ন: বর্তমান যুব সমাজে ব্যাপক আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে, তারা বলছে, কেউ কেউ বায়‘আতকে বৈধ মনে করে, আবার কেউ কেউ বৈধ মনে করে না। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্চে, বায়‘আত কি? বায়‘আতের শর্ত কি? আমাদের কি কারো হাতে বায়‘আত গ্রহণ যরূরী?

উত্তর: কুরাইশ বংশের কোনো ব্যক্তিকে ‘আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ’ নির্বাচন করলে অথবা তিনি নিজে খলীফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তার হাতে বায়‘আত করা ওয়াজিব। কুরাইশ বংশের বাইরে যদি কেউ খলীফা হয়ে জনগণের কাছ থেকে বায়‘আত তলব করে, তাহলে তার হাতেও বায়‘আত করতে হবে।

তবে যেসব দল ও সংগঠন মুসলিমদেরকে বিভক্ত করেছে, তাদের ঐক্য ও শক্তি বিনষ্ট করেছে, তাদের বায়‘আত গ্রহণতো দূরের কথা, বরং তাদের এই দলাদলির বিরোধিতা করতে হবে। আমরা আগেই বলেছি, মুসলিমদেরকে দলে দলে বিভক্ত করে ফেলা বর্তমান সময়ের একটি নিকৃষ্ট বিদ‘আত। সেকারণে তাদের বায়‘আতও বিদ‘আত।

যদি কেউ প্রশ্ন করে, নিম্নোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বায়‘আতের প্রশংসা করেছেন:

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ ٱللَّهَ يَدُ ٱللَّهِ فَوۡقَ أَيۡدِيهِمۡۚ ﴾ [الفتح: ١٠] 

 ‘যারা আপনার কাছে বায়‘আত করে, তারা তো আল্লাহর কাছেই বায়‘আত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর’ (আল-ফাত্‌হ ১০); তাহলে আপনারা কিভাবে বায়‘আতকে বিদ‘আত বলছেন? জবাবে বলব, উক্ত আয়াতে উল্লেখিত বায়‘আত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং কুরাইশ বংশের খলীফার জন্য নির্দিষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার কাঁধে বায়‘আত না থাকা অবস্থায় মারা যাবে, তার মৃত্যু হবে জাহেলী মৃত্যু’। উক্ত হাদীছে উল্লেখিত বায়‘আতও কুরাইশ বংশের খলীফা বা ক্ষমতায় চলে আসা অন্য যে কোনো খলীফার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ অন্য বংশের কেউ ক্ষমতায় চলে আসলে যদি তার বায়‘আত গ্রহণ না করা হয়, তাহলে মুসলিমদের রক্তের হেফাযত সম্ভব হবে না। অতএব, যে ব্যক্তি মানুষকে এসব বায়‘আতের দা‘ওয়াত দেয়, তার বিরোধিতা করতে হবে; যে বায়‘আত থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, তার বিরোধিতা নয়।

যদি কেউ বলে, নিম্নোক্ত হাদীছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়‘আতের কথা বলেছেন, ‘যখন তিন জন সফরে বের হবে, তখন তারা তাদের একজনকে আমীর বানাবে’। জবাব হচ্ছে, এই বায়‘আত সফর অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট। …সেকারণে বিভিন্ন জামা‘আতের আমীরদের বায়‘আত বর্তমান যুগের একটি অন্যতম বিদ‘আত। প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে যখন প্রহার করা হয়েছিল, বিখ্যাত ছাহাবী আনাস ইবনে মালেককে যখন হাজ্জাজ অপমান করতে চেয়েছিল, ইমাম মালেককে যখন প্রহার করা হয়েছিল, ইমাম শাফেঈকে যখন লোহার বেড়ী পরিয়ে হাযির করা হয়েছিল, ইমাম বুখারীকে যখন নিশাপুর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তখন বায়‘আত কোথায় ছিল? এভাবে আমাদের মুসলিম উম্মাহ্‌র স্বনামধন্য বহু আলেমে দ্বীনকে প্রহার করা হয়েছিল, তাদেরকে জেল-যুলম ভোগ করতে হয়েছিল এবং তাদেরকে নানাভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও তারা মানুষকে বায়‘আতের দা‘ওয়াত দেননি। অতএব, এসব বায়‘আত বর্তমান যুগের বিদ‘আত ছাড়া আর কিছুই নয়।([12])

তথ্যসূত্র :

([1])  নিম্নোক্ত লিঙ্ক থেকে ১১/১২/২০১২ তারিখ দুপুর ১৮:৪৪ টায় সংগৃহীত:

http://www.ahlelhadith.com/vb/showthread.php?t=6786

([2]) শায়খ বকর আবু যায়েদ ১৩৬৫ হিজরীতে নাজদ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। রিয়াদ, মক্কা ও মদীনায় তিনি শিক্ষা অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে শায়খ ইবনে বায, শায়খ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীতী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি মদীনার উচ্চ বিচারালয়ের বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং মসজিদে নববীর শিক্ষক, ইমাম ও খত্বীবের দায়িত্ব পান। ১৪১২ হিজরীতে সঊদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদ এবং ফৎওয়া বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত হন। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহ, অন্যদিকে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তিনি ষাটেরও অধিক অতিমূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ১. ফিক্বহুল ক্বযাইয়া আল-মু‘আছেরাহ, ২. ফাতওয়াস্‌-সায়েল আন মুহিম্মাতিল মাসায়েল, ৩. আত-তা‘ছীল লিউছূলিত-তাখরীজি ওয়া ক্বওয়া‘ইদিল জারহি ওয়াত-তা‘দীল, ৪. হুকমুল ইনতিমা ইলাল ফিরাক্ব ওয়াল আহযাব ওয়াল জামা‘আত আল-ইসলামিইয়াহ, ৫. আর-রুদূদ ইত্যাদি।

([3]) ‘আহলুল হাল্ ওয়াল আক্বদ’ পরিভাষাটি তিন শ্রেণীর মানুষকে শামিল করেঃ উলামায়ে কেরাম, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং সমাজের গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ (আব্দুল্লাহ ইবরাহীম, আহলুল হাল্লি ওয়াল-আক্বদ: ছিফাতুহুম ওয়া ওয়াযায়েফুহুম, পৃ: ১৬৪)।

([4]) আব্দুল্লাহ আত-তামীমী, মুহাযযাবু হুকমিল ইনতিমা ইলাল ফিরাক্ব ওয়াল আহযাব ওয়াল জামা‘আত আল-ইসলামিইয়াহ, পৃ: ৯৭ (মূল গ্রন্থটি শায়খ বকর আবূ যায়েদের)।

([5]) প্রাগুক্ত, পৃ: ৯৬।

([6]) এখানে ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’ বলতে ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’ নামধারী ভুঁইফোড় সংকীর্ণ কোন সংগঠনের কথা বুঝানো হয়নি। বরং ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের পথের যথাযথ অনুসারীদেরকে বুঝানো হয়েছে (ওবাইদুল্লাহ মুবারকপুরী, মির‘আতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ, ১/২৭৮)।

([7])  প্রাগুক্ত, পৃ: ৪০-৪১।

([8]) প্রাগুক্ত, পৃ: ৮০-৮৭।

([9]) শায়খ মুক্ববিল ইয়েমেনের দাম্মাজ নগরীর ওয়াদেআহ এলাকায় ১৩৫০ হিজরীর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইয়েমেন, নাজদ, মক্কা ও মদীনায় শিক্ষা অর্জন করেন। তিনি ইয়েমেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছগণের অন্যতম। তাঁর গ্রন্থসমূহের মধ্যে ১. রিয়াযুল জান্নাহ ফির-রদ্দি আলা আ‘দাইস-সুন্নাহ, ২. আশ-শাফা‘আহ, ৩. ক্বম্‌উল মুআনেদ ওয়া যাজ্‌রুল হাক্বেদিল হাসেদ, ৪. ফাযায়েহ্‌ ওয়া নাছায়েহ্‌ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

([10]) মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেঈ, ক্বম্‌উল মু‘আনেদ ওয়া যাজ্‌রুল হাক্বেদিল হাসেদ, পৃ: ৩৫৫-৩৮৪ (দারুল হাদীছ, দাম্মাজ, প্রথম প্রিন্ট: ১৪১৩/১৯৯৩)।

([11]) প্রাগুক্ত, পৃ: ৫২৯-৫৩২।

([12]) মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদেঈ, ফাযায়েহ্‌ ওয়া নাছায়েহ্‌, পৃ: ৬৭-৬৯ (দারুল হারামাইন, কায়রো, প্রথম প্রিন্ট: ১৪১৯/১৯৯৯)।

মতামত দিন