পর্যালোচনা

দল, ইমারত ও বায়আত সম্পর্কে উলামাগণের বক্তব্য (পর্ব ২)

দল, সংগঠন, ইমারত ও বায়‘আত সম্পর্কে বিশিষ্ট উলামায়ে কেরামের বক্তব্য (দ্বিতীয় পর্ব)

        (১) শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ

তিনি বলেন, ‘কারো অধিকার নেই যে, সে উম্মতের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কাউকে খাঁড়া করে তার পথে মানুষকে আহ্বান করবে এবং সেই পথকে কোনো মুসলিমের সাথে আন্তরিক সুসম্পর্ক গড়া বা না গড়ার মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করবে। অনুরূপভাবে তার জন্য এটাও বৈধ নয় যে, সে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্য এবং যেসব বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ্‌র ‘ইজমা’ হয়েছে, সেগুলো ব্যতীত অন্য কোনো বক্তব্যের জন্ম দিয়ে তাকে কোনো মুসলিমের সাথে আন্তরিক সুসম্পর্ক গড়া বা না গড়ার মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করবে। বরং এটি বিদ‘আতীদের কাজ, যারা উম্মতের জন্য কোনো ব্যক্তি বা বক্তব্যকে দাঁড় করিয়ে তার মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে; ফলে তারা এই সৃষ্ট বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে মিত্রতা বা শত্রুতা পোষণ করে’।[1]

মানুষদের মধ্যে দলাদলি সৃষ্টি করা এবং তাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয় এমন কোনো কাজ করা কোনো শিক্ষকের উচিৎ নয়। বরং তারা সবাই ভাই ভাই হয়ে থাকবে এবং পরস্পরে সৎ ও তাক্বওয়ার কাজে সহযোগিতা করবে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ﴾ [المائ‍دة: ٢] 

‘সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির কাজে তোমরা একে অন্যের সাহায্য কর। আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না’ (আলমায়েদাহ ২)

অনুরূপভাবে কোনো শিক্ষকের এটাও উচিৎ নয় যে, সে কারো পক্ষ থেকে মানুষদের অঙ্গীকার গ্রহণ করবে এমর্মে যে, সে যা-ই চাইবে, তা-ই সমর্থন করতে হবে এবং সে যার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে, তার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, অনুরূপভাবে সে যার সাথে শত্রুতা পোষণ করবে, তার সাথে শত্রুতা পোষণ করতে হবে। বরং যে ব্যক্তি এমনটি করবে, সে চেঙ্গিস খানদের মত, যারা কেবল তাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে, যারা তাদেরকে সমর্থন করে, পক্ষান্তরে যারা তাদের সমর্থন করে না, তাদেরকে শত্রু গণ্য করে। মনে রাখতে হবে, তাদের এবং তাদের অনুসারীদের উপর আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর আনুগত্যের অঙ্গীকার রয়েছে।([2])

যে ব্যক্তি কাউকে দাঁড় করিয়ে তার সমর্থনকে কেন্দ্র করে কারো সাথে সুসম্পর্ক গড়ে বা শত্রুতা পোষণ করে, সে নিম্নোক্ত আয়াতের আওতায় পড়ে যাবে,

﴿ مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَكَانُواْ شِيَعٗاۖ ﴾ [الروم: ٣٢] 

‘যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে’ (আর-রূম ৩২)।([3])

যদি তারা (কোনো দল) আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর নির্দেশনার মধ্যে কোনো কিছু বৃদ্ধি করে বা কম করে, যেমন: কেউ তাদের দলে প্রবেশ করলে হক-বাতিলের তোয়াক্কা না করে তার পক্ষাবলম্বন করা, পক্ষান্তরে কেউ তাদের দলে প্রবেশ না করলে সে হকের উপরে থাকুক কিংবা বাতিলের উপরে থাকুক তাকে প্রত্যাখ্যান করা। বস্তুত: এটিই হচ্ছে সেই বিভক্তি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার নিন্দা করেছেন। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল জামা‘আতবদ্ধভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে পারস্পরিক মতপার্থক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে তাঁরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যের সহায়তা করতে নিষেধ করেছেন।([4])

        (২) মুক্বীম অবস্থায় ‘ইমারত’ বিষয়ক বিধি-বিধান সম্পর্কে সঊদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদের ফৎওয়া

প্রশ্ন: মুক্বীম অবস্থায় ‘ইমারত’ বা কাউকে আমীর বানানো জায়েয আছে কি? অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, তিনজন সফর অবস্থায় থাকলে তাদের একজন তাদের ‘আমীর’ হবে; উক্ত হাদীছের আলোকে মুক্বীম অবস্থায় কোনো দেশে কোনো দলের ‘আমীর’ হওয়া জায়েয হবে কি?

উত্তর: আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তিনজন যখন সফরে বের হবে, তখন তাদের একজনকে তাদের আমীর বানাবে’ (আবূ দাঊদ, সনদ ‘হাসান’) উক্ত হাদীছ দ্বারা সফর অবস্থায় আমীর বানানোর বিষয়টি প্রমাণিত হয়। সুতরাং মুক্বীম অবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান বা তাঁর নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি আমীর হবে।([5])

প্রশ্ন: বিভিন্ন ইসলামী দলের উত্থান হয়েছে এবং হচ্ছে, দা‘ওয়াতী ক্ষেত্রে যাদের পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন এবং তারা সবাই সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনটি অলংকৃত করতে চায়- এক্ষণে উক্ত ইসলামী দলসমূহের উত্থানের ব্যাখ্যা আমরা কিভাবে করতে পারি? তারা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর নিম্নোক্ত হাদীছের আওতায় পড়বে? ‘আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, একটি ব্যতীত তাদের সবাই জাহান্নামে যাবে’। কিভাবে আমরা বিভিন্ন দল যেমন: ইখওয়ানী, খালাফী, সালাফী, তাকফীর ওয়া হিজরা, তাবলীগী, ছূফী ইত্যাদির মধ্যে সমন্বয় সাধন করব?

উত্তর: আল্লাহ্‌র দ্বীন একটিই এবং সেদিকে আহ্বানের পদ্ধতিও একটিই। সুতরাং যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর পদ্ধতির উপর চলবে, সে-ই সঠিক কাজটি করবে। আল্লাহই একক তাওফীক্বদাতা।([6])

প্রশ্ন: আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র, আমাকে সর্বদা বিভিন্ন মতবাদ এবং দলের মধ্যে বসবাস করতে হয়। তাদের সবাই নিজের দলকে শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করে নিজেদের সহযোগী সদস্য বাড়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। যেমন: ‘জামা‘আতুল ইখওয়ান’, ‘তাবলীগ জামা‘আত (যারা ৪০ দিন, ৪ মাস চিল্লায় বের হয়)’, ‘জামা‘আতু আনছারিস-সুন্নাহ’, আব্দুল হামীদ ছাহেবের ‘জামা‘আহ ইছলাহিইয়াহ’ ইত্যাদি। এক্ষণে আমাদেরকে সঠিক পথটি বাৎলে দিবেন বলে আশা করছি।

উত্তর: নির্দিষ্টভাবে কোনো জামা‘আতের পক্ষাবলম্বন না করে হক ও দলীলভিত্তিক বিষয়কে আঁকড়ে ধরে থাকা তোমার জন্য যরূরী। তবে কোনো দল সালাফে ছালেহীনের অনুসৃত ছহীহ আক্বীদার সংরক্ষক হলে তাদেরকে সহযোগিতা করা যেতে পারে। যাহোক, তোমার কর্তব্য হচ্ছে, কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ্‌র প্রতি আমল করা এবং যাবতীয় বিদ‘আত ও কুসংস্কার বর্জন করে চলা। আল্লাহ তাওফীক্ব দান করুন।([7])

প্রশ্ন: বর্তমান বিদ্যমান বিভিন্ন দল ও জামা‘আত, যেমন: ‘ইখওয়ানী’, ‘তাবলীগী’, ‘আনছারুস-সুন্নাহ’, ‘জাম্‌ইয়্যাহ শার্‌ইয়্যাহ’, ‘সালাফী’, ‘তাকফীর ওয়াল হিজরা’, যেগুলি বর্তমানে মিশরে রয়েছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দলের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের কি ধরনের ভূমিকা হতে পারে? এসব দলের ক্ষেত্রে কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুরাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীছটি প্রযোজ্য হবে? ‘গাছের শিকড় কামড়ে ধরে হলেও মৃত্যু অবধি তুমি উক্ত দলগুলির সবই পরিত্যাগ করে চলবে’। (ছহীহ মুসলিম)

উত্তর: প্রশ্নে উল্লেখিত দলগুলির প্রত্যেকটিতে কিছু হকও আছে, কিছু বাতিলও আছে, অনুরূপভাবে আছে কিছু ভুল-ভ্রান্তি, আবার আছে কিছু সঠিক দিক। ঐসব দলগুলির কোনো কোনটি অন্যগুলির তুলনায় হকের অধিকতর নিকটবর্তী এবং অধিকতর কল্যাণময়। সেজন্য আপনার উচিৎ, প্রত্যেকটি দলকে তাদের সাথে বিদ্যমান হকের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা; আর বাতিল ও ভুল-ভ্রান্তির ক্ষেত্রে তাদেরকে নছীহত করা। যেসব বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, সেগুলো পরিত্যাগ কর। আর যেসব বিষয়ে তোমার সন্দেহ না হয়, সেগুলো গ্রহণ কর। আল্লাহই একক তাওফীক্বদাতা।([8])

প্রশ্ন: মুসলিমদেরকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেওয়া এবং তাদের ঐক্য বিনষ্ট করা সত্ত্বেও কি প্রত্যেকটি মুসলিমের কোনো না কোনো ইসলামী দলে থাকা এবং সেই দলের ‘আমীরে জামা‘আত’ থাকা যরূরী?

উত্তর: প্রত্যেক মুসলিমের কথা, কাজে ও বিশ্বাসে পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহ্‌র বক্তব্যকে অনুসরণ করে চলা উচিৎ। অনুরূপভাবে তার কর্তব্য হচ্ছে, শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালবাসা বা তাকে ঘৃণা করা এবং কেবলমাত্র তাঁর খুশীর জন্যই কারো সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বা তার সাথে শত্রুতা পোষণ করা।([9])

তথ্যসূত্র :

([1]) মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ, ২০/১৬৪ (বাদশাহ ফাহ্‌দ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স, মদীনা, ১৪২৫/২০০৪)।

([2]) প্রাগুক্ত, ২৮/১৫-১৬।

([3]) প্রাগুক্ত, ২০/৮।

([4]) প্রাগুক্ত, ১১/৯২।

([5]) সঊদী আরবের স্থায়ী ফৎওয়া বোর্ড, ১৮১৮৮ নং ফৎওয়ার দ্বিতীয় প্রশ্ন।

([6]) প্রাগুক্ত, ৬৮০০ নং ফৎওয়ার দ্বিতীয় প্রশ্ন।

([7]) প্রাগুক্ত, ৪০৯৩ নং ফৎওয়ার দ্বিতীয় প্রশ্ন।

([8]) প্রাগুক্ত, ৬২৮০ নং ফৎওয়ার চতুর্থ প্রশ্ন।

([9]) প্রাগুক্ত, ৪১৬১ নং ফৎওয়ার প্রথম প্রশ্ন।

মতামত দিন