পর্যালোচনা

বাইআত কি ও কেন? (পর্ব-৩)

আধুনিক বাইআতঃ
আধুনিক কালে বিভিন্ন সংগঠন ও দলে দলীয় প্রধান বা আমীর কর্তৃক কর্মীদের বাইআত এর বিধান দেখা যায়। তারা এই বাইআতকে ফরয মনে করেন। বাইআত বিহীন মৃত্যুকে জাহিলিয়াতের মৃত্যু হিসেবে বিশ্বাস করেন। তারা ঈমান হারানোর ভয়ে তাদের শ্রদ্ধেয় নেতার নিকট বাইআত নিয়ে ঈমান রক্ষার চেষ্ট করছেন এবং তাকেই (দলীয় প্রধানকে) খলীফার মর্যাদা দিয়ে তার প্রতি সর্বপ্রকার আনুগত্য পেশ করছেন। এই বাইআত ভঙ্গকারীকে তারা দ্বীনচ্যুত অপরাধ ভাবেন। তাদের দলীল নিম্ন অর্থবোধক হাদীস সমূহঃ

ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মারা গেল আর তার গলদেশে বাইআত নেই সে জাহিলিয়াতের অবস্থায় মৃত্যু বরন করল। (মুসলিম, কিতাবুল ইমারত অধ্যায়)

পর্যালোচনাঃ উপরোক্ত হাদীস ও অনুরূপ অর্থবোধক হাদীসের পর্যালোচনা নিম্নভাবে করা যায়-

ক. হাদীসের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করাঃ উপরোক্ত হাদীস ও অনুরূপ অর্থবোধক হাদীসের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করা হয়েছে বলে হাদীস বিশরাদগণ মনে করেন। কারণ, উপরোক্ত হাদীস ইসলামী রাষ্ট্রের শারঈ আমীর এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের আমীর নেই সেখানে বাইআত বিহীন মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে না। এ প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ বিন উমর বিন সুলাইমান বলেন, বাইআত হল শারঈ বিধান। এর রয়েছে শর্তাবলী ও ভঙ্গের কারণাবলী, শরীআত এভাবে এটা নিয়ে এসেছে। সুতরাং যখন শর্তাবলী বিদ্যমান থাকবে এবং ভঙ্গের কারণাবলী বলবত থাকবে তখন বাইআত ওয়াজিব হবে। অন্যথায় হবে না। উদাহরণ স্বরুপঃ যাকাত, এটি ইসলামের রুকন সমূহের মধ্যে তৃতীয় রুকন। যারা যাকাত দেয় না তাদের জন্যে শরীআত প্রণেতা কঠোর শাস্তির হুককি দিয়েছেন। কিন্তু এই শাস্তিতো তার উপর প্রযোজ্য যার যাকাতের মালের শর্ত ও নিসাব মাফিক মালিক হয়েছে, মালিক হওয়ার পর যদি সে যাকাত দিতে অস্বীকার করে তাহলে তার প্রতি এ শাস্তি প্রযোজ্য হবে। অনুরূপভাবে, বাইআত এর জন্যে লাগবে শারঈ ইমাম বা রাষ্ট্র প্রধান। এটা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি কেউ তা অস্বীকার করে তাহলে বাইআত সংক্রান্ত হাদীস তার উপর প্রযোজ্য হবে। অন্যথায় হবে না। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ
ইমাম আহমদ রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হল, “যে মারা গেল অথচ তার ইমাম নেই তাহলে সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল” এর ভাবার্থ কি? তিনি বললেন, তুনি জান ইমাম বা নেতার পরিভাষাটা কি? ইমাম হল ঐ নেতা যার বিষয়ে সমস্ত মুসলিম একমত, ইনিই হলেন ইমাম, আর হাদীসের অর্থ হলো এটাই”। (আবু বকর বিন আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন হারুন, আল মুসনাদ বিন মাসাঈলিল ইমাম আহমদ [পান্ডুলিপি ফটোকপি] ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মদীনা লাইব্রেরী)

আল্লামা আলবানী রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ
জেনে রাখ! হাদীসে উল্লেখিত ধমক (জাহিলিয়াতের মৃত্যু), এটা হলো যে ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফার নিকট বাইআত করেন না এবং তাদের (সরকারের) আনুগত্য থেকে বের হয়ে যায়। এটা প্রত্যেক দল বা সংগঠনের বাইআত নয়। যেমন কেউ কেউ ধারণা করে থাকে। বরং এ ধরণের বাইআত হলো ফিরকাবন্দী বা দলাদলী সৃষ্টি করা। আর আল কুরআনে এ ধরনের দলাদলী নিষেধ করা হয়েছে। (সিলসিলাতুল আহাদিস ছহীফা হা/৯৮৪ এর আলোচনা)

খ. বাইআত এর হুকুম হলো ফরযে কেফায়া বা কিছু সংখ্যক মানুষ আদায় করলেই বাকীদের আদায় হয়ে যাবে। সুতরাং সর্বসাধারণ মানুষ বাইআত বিহীন মারা গেলে জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে না।

গ. বাইআত গ্রহণ করবেন একজন আমীর (ইসলামী রাষ্ট্রের)। অন্য কোন আমীর বাইআত প্রদান করলে দ্বিতীয় জন হত্যাযোগ্য অপরাধী হিসেবে হাদীসে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুতরাং উপরোক্ত হাদীস অনুযায় বাইআত যদি আধুনিক প্রক্রিয়ায় জায়েয হয় তাহলে প্রশ্ন আসবে কার বাইআত চলবে আর কারা হত্যাযোগ্য হবেন। অতএব এসব ক্ষেত্রে উপরোক্ত হাদীস প্রযোজ্য নয়।

আগের পর্বগুলো

বাইআত কি ও কেন? (পর্ব-১)

বাইআত কি ও কেন? (পর্ব-২)

মতামত দিন