সাম্প্রতিক বিষয়

গৃহ যুদ্ধের দাবানলে জ্বলছে সিরিয়া: এক মহা সংকটের কবলে মুসলিম বিশ্ব (১ম পর্ব)

গৃহ যুদ্ধের দাবানলে জ্বলছে সিরিয়া: এক মহা সংকটের কবলে মুসলিম বিশ্ব

লেখক: আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
আজ থেকে প্রায় ২ বছর আগে সিরিয়াতে আরব বসন্তের ঢেউ লাগে। দীর্ঘ দিনের স্বৈরাচারী আসাদ পরিবারের শাসনের বিরুদ্ধে সিরিয়ার মানুষ ফুঁসে উঠে। কিন্তু এখানে বসন্তের ঢেউ লাগলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি, এখানে এখনো গ্রীষ্মের অস্থিরতা বিরাজ করছে। মিসর ও তিউনিসিয়ার মত এখানে বিনা রক্তপাতে ফল নির্ধারণের মত কিছুই ঘটেনি। লিবিয়ার মত এখানকার বিদ্রোহ সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে পা বাড়ালেও সফলতা যেন এখনো আধরা। বরং দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। একদিকে স্বৈরাচারী বাশার আল আসাদের অনমনীয় মনোভাব, রাশিয়া ও কট্টর শিয়া-পন্থী হিযবুল্লাহ এবং তার পৃষ্ঠপোষক ইরানের সমর্থন অন্যদিকে বিদ্রোহীদের প্রতি সৌদি,কুয়েত এবং তুরস্কের সমর্থন এই যুদ্ধকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর হিযবুল্লাহের যোগদান এই যুদ্ধকে শিয়া সুন্নি যুদ্ধে পরিণত করে দিয়েছে। ফলত আজ মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র শিয়া সুন্নি উত্তেজনা বিরাজ করছে।আজ মধ্যপ্রাচ্য এক অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার আবাল বৃদ্ধ বণিতার ছোপ ছোপ রক্তে সিরিয়ার মাটি আজ রঞ্জিত। লাখ লাখ মানুষ গৃহ হারা হয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।বিশ্ব মোড়লরা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তোড়জোড় যা করা হচ্ছে তা নামে মাত্র, এতে আন্তরিকতার চরম অভাব রয়েছে।একটু বাড়িয়ে বললে ভুল হবেনা যে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে ইচ্ছা কৃত ভাবে বিলম্বিত করা হচ্ছে। সিরিয়ার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মুসলিম বিশ্বকে এক মহা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।বাশার আল আসাদ এবং তার আলাভী সম্প্রদায় ও তার সহযোগী ইরান এবং হিযবুল্লাহ সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বকে আরেকবার ভাবতে হচ্ছে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সিরিয়ার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

সিরিয়ার ফযিলত:

রসুল ছা: সিরিয়ার জন্য বরকতের দোয়া করেছেন। তিনি বলেন
اللهم بارك لنا في شامنا اللهم بارك لنا في يمننا
তথা: হে আল্লাহ আমাদের শামে বরকত দাও।হে আল্লাহ আমাদের ইয়েমেনে বরকত দাও। এই দোয়া তিনি তিন বার করেন।
বুখারী, মিশকাত, হা/ ৬২৬২
অন্য এক বর্ণনায় রাসুল ছা: বলেন,
طوبى للشام ” قلنا : لأي ذلك يا رسول الله ؟ قال : ” لأن ملائكة الرحمن باسطة أجنحتها عليها
তথা: সিরিয়ার জন্য সুসংবাদ । রাবী বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম কেন হে রাসুল ছা:? জবাবে তিনি বলেন কেননা আল্লাহর ফেরেশতারা এর উপর তাদের পাখা বিছিয়ে থাকে।
মিশকাত, হা/ ৬২৬৪
রাসুল ছা: আরও বলেন,
سيصير الأمر إلى أن تكونوا جنودا مجندة جند بالشام وجند باليمن وجند بالعراق ” . فقال ابن حوالة : خر لي يا رسول الله . إن أدركت ذلك . فقال : ” عليك بالشام فإنها خيرة الله من أرضه يجتبي إليها خيرته من عباده فأما إن أبيتم فعليكم بيمنكم واسقوا من غدركم فإن الله توكل لي بالشام وأهله ” . رواه أحمد وأبو داود
তথা: “পরিস্থিতি তার কাজের ধারা অনুযায়ী চলতে থাকবে যতক্ষণ না তোমরা তিনটি বাহিনীতে পরিণত হও একটি বাহিনী শামের, এবং একটি বাহিনী ইয়েমেনের আর আরেকটি ইরাকের।”
ইবনে হাওয়ালাহ (রা:) বললেন:
“হে আল্লাহ্‌*র রাসুল (সা:)! যদি আমি সেই দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকি তবে আমার জন্য একটি নির্ধারণ করে দিন।”
আল্লাহ্‌*র রাসুল(সা) উত্তর দিলেন,
“তোমার শামে যাওয়া উচিত হবে কারন এটি আল্লাহ্‌*র ভূমিদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম, এবং উনার সবচেয়ে ভাল বান্দারাই সেখানে জড়ো হবে! এবং যদি তুমি তা না চাও তবে তোমার ইয়েমেনে যাওয়া উচিত এবং সেখানকার কূপ থেকে পানি পান করা উচিত। কারণ আল্লাহ্‌* আমাকে নিশ্চিত করেছেন যে উনি শাম এবং তার মানুষের উপর খেয়াল রাখবেন!”
ইমাম আহমেদ ৪/১১০, আবু দাউদ ২৪৮৩
মিশকাত, হা/ ৬২৬৭
তিনি বলেন,
رأيت عمودا من نور خرج من تحت رأسي ساطعا حتى استقر بالشام ” . رواهما البيهقي في ” دلائل النبوة ”

তথা: আমি আমার মাথার নিচ থেকে নূরের একটি স্তম্ভকে বের হতে দেখলাম যা শাম বা সিরিয়াতে গিয়ে স্থির হল।এখানে নুর থেকে হেদায়েতের আলো উদ্দেশ্য।
মিশকাত, হা/ ৬২৭১
” إن فسطاط المسلمين يوم الملحمة بالغوطة إلى جانب مدينة يقال لها : دمشق من خير مدائن الشام ” . رواه أبو داود
কুফফার মুশরিকদের সাথে মহাযুদ্ধের দিন(কিয়ামতের পূর্বের কোন যুদ্ধ বা দাজ্জালের সাথে যে যুদ্ধ হবে সেই যুদ্ধ উদ্দেশ্য] মুসলমানদের তাঁবু[ফিল্ড হেডকোয়ার্টার] গুতা নামক স্থানে হবে যা একটি শহরের পাশে অবস্থিত যার নাম দিমাশক যা শামের শ্রেষ্ঠ শহর। মিশকাত, হা/ ৬২৭২। উল্লেখ্য যে গুঁতা নামক জায়গাটা বর্তমানে সিরিয়ার রাজধানী দেমাশক থেকে ৮ কিঃমিঃ পূর্বে অবস্থিত। এখানকার মওসুম শুষ্ক ও গরম।[তিসরি জঙ্গে আজিম আওর দাজ্জাল,মুহাম্মাদ আসেম উমর,ফরিদ বুক ডিপো, দিল্লী,পৃ, ৬৯]
উপরের হদিসগুলো প্রমান করে শাম বাঁ সিরিয়া একটি বরকতময় জায়গা।

সিরিয়া সম্পর্কে রাসুল ছা: এর ভবিষ্যৎ বাণী:

কিয়ামতের পূর্বে সংঘটিত ফিতনা ফাসাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যাপারে রাসুল ছা: অনেক আগেই ভবিষ্যৎবাণী করে গেছেন। যার অনেক কিছুই সিরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। নিচে তার কিছু তুলে ধরা হল। আবু হুরাইরা রা: বলেন রাসুল ছা: বলেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবেনা যতক্ষণ রোমকগণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমাক এবং দাবাক নামক স্থানে অবতরণ না করেছে।ঐ সময় তাদের মোকাবেলা করার জন্য মদিনার এক উত্তম সেনা দল বের হবে। লড়াইয়ের জন্য যখন মুসলমান সারিবদ্ধ হবে তখন রোমক গন বলবে তোমরা আমাদের জন্য ঐ সব লোকদের রাস্তা ছেড়ে দাও।যারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করে আমাদের কিছু লোককে বন্দি করে নিয়ে এসেছে। আমরা একমাত্র তাদের সাথে যুদ্ধ করব। মুসলমান গন বলবেন আল্লাহর কসম এ কখনো হতে পারেনা। আমরা ঐ সমস্ত মুসলমান ভাইকে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ছেড়ে দিতে পারিনা।এরপর মুসলিম সেনা গ ন রোমকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
কিন্তু মুসলমানদের এক তৃতীয়াংশ যুদ্ধ থেকে পলায়ন করবে। আল্লাহ পলায়নকারীদের তওবা কখনো কবুল করবেন না। আর এক তৃতীয়াংশ শহীদ হবে আর এক তৃতীয়াংশ রোমকদের উপর বিজয়ী হবে। এরা কখনো ফিতনা ফাসাদে পতিত হবেনা। এরাই কনষ্টান্টিনেপোল[বর্তমান ইস্তাম্বুল] বিজয় করবে। অতঃপর তারা যখন গনিমতের মাল বণ্টনে ব্যস্ত হবে এবং তাদের তরবারি যায়তুন গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে।ইতিমধ্যে শয়তান চিৎকার করে বলবে দাজ্জাল তোমাদের অনুপস্থিতিতে তোমাদের বাড়ীতে ঢুকে পড়েছে। একথা শুনেই মদিনার সে সেনাদল সেই দিকে বের হয়ে যাবে। কিন্তু এই ঘোষণাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যখন মুসলমান গন কনষ্টান্টিনেপোল ছেড়ে সিরিয়াতে প্রবেশ করবে তখন দাজ্জাল বের হবে।তার পর মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকবে এবং সারিবদ্ধ হবে। তৎক্ষণাৎ সালাতের জন্য ইকামাত দেয়া হবে এবং ঈসা আঃ অবতরণ করবেন এবং তাদের ইমামতি করবেন। অতঃপর দাজ্জাল যখন ঈসা আঃ কে দেখতে পাবে তখন সে ঐ ভাবে গলতে থাকবে যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। যদি তাকে এভাবেই ছেড়ে দেন তাও সে ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি তাকে হত্যা করবেন, এবং যেই বর্শা তাকে হত্যা করবেন তা তিনি মানুষকে দেখাবেন। [মিস কাত,৫৪২১, যুদ্ধ বিগ্রহ অধ্যায়]

উল্লেখ্য যে দাবাক সিরিয়ার হালব শহর থেকে ৪৫ কিঃমিঃ উত্তরে তুর্কীর সীমান্তে অবস্থিত একটি গ্রাম। এখান থেকে তুর্কী সীমান্ত ১৪ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। আমাক দাবাকের পাশেই অবস্থিত। এখানেই এই যুদ্ধ সংঘটিত হবে।[[তিসরি জঙ্গে আজিম আওর দাজ্জাল,মুহাম্মাদ আসেম উমর,ফরিদ বুক ডিপো, দিল্লী,পৃ, ৭৩]
লক্ষণীয় যে ইস্তাম্বুল বা কনষ্টান্টিনেপোল একবার বিজয় করা হয়েছে কিয়ামতের পূর্বে আবার বিজয়ের অর্থ এটা হতে পারে যে ইস্তাম্বুল পুনরায় ইসলাম বিদ্বেষীদের হাতে চলে যাবে।
আব্দুল্লাহ বইন মাসুদ রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হবেনা যে পর্যন্ত না মানুষের পৈত্রিক সম্পত্তি অংশীদার না থাকার কারণে বণ্টন হবেনা, এবং গনিমতের মালে মানুষ খুশি হবেনা। এর ব্যাখ্যায় ইবনে মাস উদ রা: বলেন, রোমকরা সিরিয়ার মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক বিরাট সেনা দল সমাবেশ করবে আর মুসলমানরাও মুজাহিদ সমাবেশ করবে। তারপর তাদের একদল কে মরা পর্যন্ত লড়াই করার জন্য পাঠাবে তারা বিজিত না হয়ে ফিরে আসবেনা, তারা যুদ্ধ করতে থাকবে ইতিমধ্যে রাত হয়ে যাবে উভয় দলই বিনা বিজয়ে তাবুতে ফিরে যাবে। এবং মুসলমানদের অগ্রগামী দলটি শেষ হয়ে যাবে। পরদিন মুসলমানরা আবার একটি দলকে মরা পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য পাঠাবে যারা বিনা বিজয়ে ফিরে আসবেনা। আজকেও যুদ্ধ করতে করতে রাত হয়ে যাবে এবং উভয় দলই নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরে যাবে। এবারো মুসলমানদের অগ্রগামী দলটি শেষ হয়ে যাবে। এরপর তৃতীয় দিনও অনুরূপ হবে।এবার ৪র্থ দিনে অবশিষ্ট সকল মুসলমান যুদ্ধের জন্য তৈরি হবে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে কাফেরদের উপর বিজয় দান করবেন। এ যুদ্ধে মুসলমানরা এমন লড়াই করবে যে ইতিপূর্বে এ রকম ঘোরতর যুদ্ধ কেউ দেখেনি। এমনকি কোন পাখি যদি যুদ্ধের ময়দানের পাশ দিয়ে উড়ে যায় তাহলে সে উড়তে সক্ষম হবেনা। কোন পিতা বাঁ পরিবারের একশ সন্তান থাকলে যুদ্ধ শেষে তারা গুনে দেখবে যে মাত্র একজন বেচে আছে। তাহলে কিভাবে তারা গনিমতে খুশি হবে, আর কিভাবেই বাঁ মাল-বণ্টন হবে? ইতিমধ্যেই তারা এর চাইতে ভয়াবহ যুদ্ধের আহ্বান শুনতে পাবে, তারা শুনবে যে দাজ্জাল তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের ঘর বাড়ীতে ঢুকে গেছে। এ সংবাদ শুনেই তাদের হাতে যা কিছু ছিল তা ফেলে দিয়ে তারা দাজ্জালের উদ্দেশে ছুটবে। এবং শত্রুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য দশ জনের একটি অগ্রগামী দল পাঠাবে, রাসুল ছা: বলেন আমি তাদের নাম তাদের পিতার নাম এবং তাদের ঘোড়ার সম্পর্কে অবগত আছি। তারা ঐ সময়ের সর্বাপেক্ষা উত্তম সওয়ারী হবে। [ মুসলিম মিশকাত ৫৪২২, যুদ্ধ বিগ্রহ অধ্যায়]
উপরের হাদিস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে দাজ্জাল আবির্ভাবের পূর্বে মুসলমানরা যে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হবে তা সিরিয়ার মাটিতেই হবে। উল্লেখ্য যে মুহাদ্দেসীন্দের ধারনা অনুযায়ী এই ভয়াবহ যুদ্ধের সময়ই মুসলমানদের হেডকোয়ার্টার গুঁতা নামক জায়গায় হবে যার বিবরণ পূর্বে চলে গেছে।

(চলবে)

উত্স

মতামত দিন