আক্বীদা বিজ্ঞান ও ইসলাম

‘এক’ এর উপপাদ্য – Theorem of ‘The One’

একজন মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করলেন। কিন্তু সে আরামের ঘুম ছেড়ে উঠছে না তো উঠছেই না। এদিকে আরও অনেকেই ঘুমিয়ে রয়েছে, তাদেরও ডেকে দিতে হবে। তাছাড়া আপনার নিজেরও কাজ রয়েছে। আরও কয়েকবার ডেকে আপনি বুঝলেন সে আসলে ঘুমিয়ে নেই, ঘুমের ভান করে রয়েছে।

ডাকাডাকির বেলাও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এহেন পরিস্থিতিতে বোঝা উচিত – যে ঘুমিয়ে আছে, তাকে ডাকা যেতে পারে। কিন্তু যে ঘুমের ভান করে পড়ে রয়েছে আর এভাবেই পড়ে থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে ডেকে সময় নষ্ট করা মোটেও যুক্তিপূর্ণ নয়।

[১]

যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছোবার প্রধানত দু’টো বৈজ্ঞানিক উপায় রয়েছে।

১) Deductive Reasoning বা সূত্রাবরোহী পদ্ধতি

২) Inductive Reasoning বা আবেশীয়/আরোহী পদ্ধতি

দু’টো একটু উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। বাংলার চেয়ে ইংরেজি শব্দ দু’টোই অধিক প্রচলিত বলে আমরা ইংরেজি শব্দদু’টোই ব্যবহার করছি।

Deductive Reasoning এ মূলত এক বা একাধিক সূত্র/তথ্য/প্রস্তাবনা/Premise থেকে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসা হয়। সিদ্ধান্তে আসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্ন ও তার আলোচনা করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতির বিশেষত্ব হল, যদি সূত্র/তথ্য/প্রস্তাবনা বা Premise সত্য হয়, তবে এর থেকে যে সিদ্ধান্ত বা Conclusion টানা হবে তা অবশ্যই অবশ্যই সত্য হবে। বাংলা সূত্রাবরোহী (সূত্র+অবরোহী) অর্থই হল সূত্র হতে উদ্ভূত।

এই পদ্ধতিতে নেওয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণিত করবার একমাত্র উপায় হল সূত্রে বা প্রস্তাবনায় ভুল প্রমাণ করা। উদাহরণস্বরূপ, আমরা একটি প্রস্তাবনা/Premise বা সূত্র পেশ করলাম যে ‘সমস্ত গাড়ির রঙ লাল’; এরপর যদি বলা হয় আপনার বন্ধুর একটি গাড়ি রয়েছে। তাহলে আমরা সূত্রানুযায়ী সহজেই এই সিদ্ধান্তে আসতে পারব যে আপনার বন্ধুর গাড়িটির রঙও লাল হবে। সূত্রানুযায়ী গাড়ির রঙ লাল ব্যতীত অন্য কোনও রঙ হওয়া সম্ভব না। ‘আপনার বন্ধুর গাড়ির রঙ লাল নয়’ কেবল তখনই প্রমাণ করা যাবে যখন ‘সমস্ত গাড়ির রঙ লাল নয়’ প্রমাণিত হবে, অর্থাৎ যখন সূত্রে ভুল প্রমাণ করা হবে। এই হল Deductive Reasoning বা সূত্রাবরোহী পদ্ধতি।

Deductive Reasoning এর প্রস্তাবনায় ভুল থাকলে বা প্রাপ্ত কোনো সিদ্ধান্তে ভুল থাকলে সেটা নিয়ে আরও আলোচনা আর প্রশ্ন করতে করতে একসময় স্ববিরোধী বক্তব্য চলে আসে। তখন ‘যা ধরে নেওয়া হয়েছিল তা সত্য নয়’ – এই সিদ্ধান্তে আসা হয়। স্ববিরোধীতা বা অসঙ্গতি সৃষ্টি করে প্রস্তাবনা সত্য নয় – এভাবে সিদ্ধান্তে আসাকে আলাদা করে ‘Contradiction method’ বা স্ববিরোধী/অসঙ্গতি পদ্ধতিও বলা হয়। সাধারণত গণিতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও অনেকগুলো বিকল্প (option) থেকে ভুলগুলো বাতিল (eliminate) করে সঠিক সিদ্ধান্ত বেছে নিতেও এই পদ্ধতি অহরহ ব্যবহার করা হয়।

Inductive reasoning বা আবেশীয় পদ্ধতি হল কিছু পর্যবেক্ষণ বা Observation থেকে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে Conclusion বা সিদ্ধান্তে আসা। এই পদ্ধতিতে সাধারণত পরবর্তী পর্যবেক্ষণগুলোর ব্যাপারে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে আসা হয়।

উদাহরণস্বরূপ, কাওকে জিজ্ঞাসা করা হল, অমুক শহরের কবুতরগুলোর রঙ কী? সে উত্তর জানবার জন্য কয়েকদিন ধরে ও শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ফিরে মোটামোটি ১০,০০০ কবুতর যাচাই করে দেখল যে সবগুলোর রঙই সাদা। তাই সে এই সিদ্ধান্তে আসলো যে, এই শহরের কবুতরগুলোর রঙ সাদা।

কিন্তু তার এই সিদ্ধান্ত আসলে নেওয়া হয়েছে ১০,০০০ কবুতর পর্যবেক্ষণ করে। ১০,০০১ তম কবুতরটি সবসময়ই ধূসর বা বাদামি হতেই পারে। তাই Inductive reasoning বা আবেশীয় পদ্ধতির সিদ্ধান্ত কখনোই পরম বা Absolute হয় না, বরং একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত হয়। যেহেতু একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যবেক্ষণ থেকে সিদ্ধান্তে আসা হয়, তাই পরবর্তী পর্যবেক্ষণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য আসবার সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে। এই হল Inductive Reasoning বা আবেশী পদ্ধতি।

[২]

স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে নাকি নেই সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে আমরা মূলত Deductive reasoning method অনুসরণ করব। এতে করে আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বা Conclusion এ কোনোরকম সন্দেহের অবকাশ থাকবে না।

প্রথমেই তাহলে সূত্র নির্বাচন করা যাক। সূত্র হিসেবে যে ধ্রুবসত্যকে বাছাই করছি তা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে। আর সেটা হল “আমাদের, এই মহাবিশ্বের বাস্তব অস্তিত্ব”; পৃথিবী, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র এককথায় এই বিশ্বজগতের অস্তিত্ব রয়েছে – এটাই হবে আমাদের সূত্র বা Premise.

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আমাদের সূত্রে কোনোই ভুল নেই। অর্থাৎ, আমরা রয়েছি বা আমাদের অস্তিত্ব আসলেও রয়েছে। ব্যাপারটা এভাবে জোর দিয়ে বলায় হাস্যকর শোনালেও এর কিছু কারণ রয়েছে। এখানে আমাদের দু’টি বিষয় মাথায় রাখতে হবে,

প্রথমত, ‘তত্ত্ব’ (Theory) আর ‘সত্য’ (fact/law) এই দুইয়ের পার্থক্য। একদম সহজকথায়, তত্ত্ব হল যা কিছু ‘হতে পারে’ বলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চালিয়ে দেওয়া যায়। সেই নির্দিষ্ট সময় বছর, যুগ বা শতাব্দীও হতে পারে। পর্যবেক্ষণ, গবেষণা, নতুন আবিষ্কার ইত্যাদির মাধ্যমে সেই সময়টুকু শেষ হয় আর তখন কেবল দু’টো ঘটনাই ঘটতে পারে। এক, Theory টি সত্যে বা Fact এ পরিণত হয়। অথবা দুই, Theory টি অসার ধারণায় অন্যকথায় ‘মিথ্যায়’ পরিণত হয়। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত তা Theory বা তত্ত্বই থাকে, সত্য নয়। অথচ আমরা অনেকসময় মানুষের চিন্তাধারণাগুলো কেবল Theory থাকা অবস্থাতেই সেগুলোকে প্রমাণ পাবার আগেই, যৌক্তিক বিশ্লেষণ ছাড়াই সত্য ভেবে বসি যেটা আসলে চরম বোকামি।

দ্বিতীয়ত, প্রমাণের অযোগ্য সবকিছু অযৌক্তিক, মিথ্যা মেনে নিতে হবে। যেমনঃ আমরা সবাই আসলে কারও স্বপ্নে রয়েছি। কিন্তু আমরা তা কখনো বুঝতে পারব না। যখনই ওই সত্ত্বার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে তখনই এই বিশ্বজগতের বিলুপ্তি হবে। অথবা, আমরা আসলে এলিয়েনদের বানানো কম্পিউটার সিম্যুলেটরে রয়েছি। কিন্তু জগতটা এতই বাস্তব যে আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু এসবের সবই প্রমাণের অযোগ্য বলে এগুলোকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

বিষয়গুলো হাস্যকর শোনালেও হিন্দু ধর্মমতে, এই বিশ্বজগত হল বিষ্ণুর স্বপ্ন। পৃথিবীতে খারাপ বিষয়াদি কেন হয় সেই প্রশ্নের জবাব দিতে তারা এটা আবিষ্কার করেছে। এ বিষয়ে আলোচনা পরে করা যাবে। এই ধরনের বিষয়গুলোর একটা বৈশিষ্ট্য হল এগুলো আসলে আমাদের Observation বা পর্যবেক্ষণেরই আওতার বাইরে। অর্থাৎ, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ম্যাট্রিক্সের জগতের বাইরে আমাদের পর্যবেক্ষণ যেমন সম্ভব না, তেমনি সত্যও কোনকালে জানা সম্ভব হবে না। আবার কারও স্বপ্নে অবস্থান করলেও তার স্বপ্নের বাইরে গিয়ে সে সত্য জানা সম্ভব না। এমনকি সে স্বপ্ন ভেঙ্গে উঠে পড়লেও না। কারণ তখন তো আমাদের অস্তিত্বই থাকবে না। মানুষ চিন্তা, বুদ্ধি আর যৌক্তিকতার অতলে নামতে নামতে এমন অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে যে আজ এ ধরনের ফালতু প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হচ্ছে!

পর্যবেক্ষণের আওতামুক্ত হলেও শুধুমাত্র যে একটি ক্ষেত্রে বিশ্বাস স্থাপন করা যায় তা হল যদি Deductive reasoning বা পর্যবেক্ষণ দ্বারা শেষমেশ অকাট্যভাবে কোনোকিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়। এ সংক্রান্ত উদাহরণ একটু পরেই আলোচিত হবে। কিন্তু অস্তিত্বেরও প্রমাণ ব্যতিরেকেই কোনোকিছুকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না।

মজার ব্যাপার হল, ‘Multiverse Theory’ বা ‘বহু মহাবিশ্ব তত্ত্ব’ উপরের দুই পয়েন্টের দু’টোতেই পড়ে। একে তো তত্ত্ব কারণ নামডাকওয়ালা বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন। তাও আবার প্রমাণের অযোগ্য এবং আমাদের পর্যবেক্ষণ আওতারই বাহিরে। কোটি কোটি বাদ দিলাম, শুধুমাত্র দুটো মহাবিশ্ব থাকলেও এই নিজেদেরটি বাদে দ্বিতীয়টি আমাদের কখনোই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয় (নিজেদের মহাবিশ্বই যে আসলে ৫% ও পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয় নাই তার কথা তো বাদই দিলাম)। অপ্রমাণ্যতা স্বত্বেও নাস্তিক্যবাদী বিজ্ঞানীদের টানাহেঁচড়ার কারণে এই মাল্টিভার্স থিউরি জনপ্রিয়তা হারাবে না সেকথা সহজে অনুমেয়। যেন স্রষ্টাকে অবিশ্বাসের জন্যই এতসব আয়োজন। প্রশ্ন হল, মহাবিশ্বের শুরু নিয়ে যদি পর্যবেক্ষণের আওতামুক্ত ‘মাল্টিভার্স থিউরি’ র মত জটিল অকল্পপনীয় কিছুতে বিশ্বাস করা যায় – তবে একজন স্রষ্টা সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন তা বিশ্বাস করতে সমস্যা কোথায়?

যাই হোক, উপরের বিষয়গুলো বুঝতে পারলে আমাদের প্রথমে ধরে নেওয়া সূত্র বা প্রস্তাবনাকে নিখাদ সত্য মেনে নিতে কারও বেগ পেতে হবে না। আবার স্মরণ করিয়ে দিই। আমাদের সূত্র বা Premise ছিল ‘আমাদের নিজেদের, সমস্ত বিশ্বজগতের বাস্তব অস্তিত্ব’।

[৩]

এই মহাবিশ্বের বাস্তব অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়ার পর এখন মহাবিশ্বের শুরুটা নিয়ে আলোচনা করি। একটু চিন্তা করলে বুঝবেন, মহাবিশ্বের আসলেও কোনো শুরু ছিল কিনা সেবিষয়ে কেবল দু’টো বিকল্পই থাকতে পারেঃ

১) মহাবিশ্বের কোনও শুরু ছিল না অর্থাৎ মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে বিরাজমান

অথবা,

২) মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল অর্থাৎ মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে নয়, বরং সসীম সময় ধরে বিরাজ করছে।

এই পর্যায়ে একটু ইতিহাসের গল্প না করলেই নয়। মহাবিশ্ব যে অনন্তকাল ধরে চলে আসছে এর পক্ষে বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশেও অনেক নামকরা বিজ্ঞানীদের রায় ছিল। এটাকে বলা হতো ‘Steady-state model’। কিন্তু এখন আমরা জানি, মহাবিশ্ব ১২-১৫ বিলিয়ন বছরের পুরোনো। যার অর্থ ১২-১৫ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছে বা অন্যকথায় মহাবিশ্ব অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে।

১৯২৯ সালে বিজ্ঞানী Edwin Huble এর পর্যবেক্ষণে যখন পাওয়া গেল যে মহাবিশ্ব আসলে স্থির অবস্থায় নেই, বরং ক্রমাগত সম্প্রসারণশীল তা তখনকার Scientific Community গুলোর জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিল। কারণ নাস্তিক্যবাদের চর্চা করা বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন, এই পর্যবেক্ষণ আসলে স্রষ্টার থাকার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে দিচ্ছে। বিজ্ঞানী Edwin Huble এর পর্যবেক্ষণ ‘Big Bang Theory’ কে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। পরবর্তীতে ‘Cosmic background radiation’ এর আবিষ্কার নাস্তিক্যবাদী বিজ্ঞানীদের ‘Steady-state-model’ এর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। কেউ আর অমত করতে পারে না যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল আর এটি অনন্তকাল ধরে চলে আসছে না, বরং এর একটা শুরু হয়েছিল।

Bartrand Russel এর “The Universe is just there” এর মত উক্তিগুলো তাই এখন অসার হয়ে গেছে। সকলেই জানে মহাবিশ্বের একটা শুরু ছিল আর তাই এখন সবাই যে প্রশ্নটি নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয় তা হল মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল। মহাবিশ্বের যে একটা শুরু ছিল তা ‘Thermodynamics’ বা তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র থেকেও যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করা যায়। Thermodynamics এর ২য় সূত্র মূলত Entropy নিয়ে কথা বলে। সহজ ভাষায়, সবকিছু ধীরে ধীরে এলোমেলো অবস্থার দিকে এগোচ্ছে। আর এলোমেলো অবস্থার দিকে যেতে যেতে মহাবিশ্ব একসময় চূড়ান্ত এক অবস্থায় পৌঁছাবে যখন এর আসলে বিলুপ্তি ঘটবে। তাহলে কথা হল, মহাবিশ্ব যদি অনন্তকাল ধরে বিরাজ করে, তবে ইতোমধ্যেই তো সেই চূড়ান্ত এলোমেলো অবস্থা অর্জন করে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ সে তো অসীম সময় পেয়েছে। কিন্তু সেই চূড়ান্ত এলোমেলো অবস্থা তো নয়ই, বরং আমরা মহাবিশ্বে নিখুঁত ভারসাম্য (Fine Tuning) দেখতে পাই।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে আরও আগেই যখন ‘Big-Bang’ কে সাপোর্ট করা ‘Expanding Universe’ মানুষ পর্যবেক্ষণ করে নাই বা ‘Thermodynamics’ এর সূত্রগুলোও আবিষ্কৃত হয় নাই তখনও কেবল যুক্তি দিয়ে মহাবিশ্ব যে অসীম সময় ধরে নয়, বরং সসীম সময় ধরে চলে আসছে তা প্রমাণ করা যেত। সেটা হচ্ছে The problem of Infinity এর যুক্তি।

এই লজিকের একই ধরনের উদাহরণ বহু রয়েছে। এর মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে যেটা সুন্দর মনে হয়েছে সেটিই দিলাম। একটি দোকানে Sale চলছে। তাই আপনি দোকানটিতে প্রবেশের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন। (উল্লেখ্য, সামনের কেউ লাইন থেকে সরে যাবে না আর পিছন থেকেও কেউ লাইন ভেঙ্গে লাইনে আসতে পারবে না। যারা অযথা তর্ক করতে চায় তারা এসব খুঁটিনাটি নিয়ে পড়ে থাকবে) এখন আপনার সামনে যদি ৫ জন মানুষ থাকে, তবে আপনি পাঁচ জনের পরে প্রবেশ করবেন। আর যদি ২০ জন থাকে তবে আপনি ২০ জনের পরেই দোকানে প্রবেশ করবেন। তাহলে প্রশ্ন হল, আপনার সামনে যদি অসীম সংখ্যক মানুষ থাকে তাহলে আপনি কি কখনও দোকানে প্রবেশ করতে পারবেন?

উত্তরটা হলঃ না – আপনি কখনোই সেই দোকানে প্রবেশ করতে পারবেন না। কারণ আপনার পালা আসতে সামনের অসীম সংখ্যক মানুষকে আগে সেই দোকানে প্রবেশ করতে হবে। আর অসীম কখনও ফুরোবার নয়।

এখন আপনার সামনের প্রত্যেক মানুষ প্রবেশ করাকে যদি ‘একটা ঘটনা’ (event) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রথম ক্ষেত্রে আপনি ৫ টি ঘটনার পরে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ২০ টি ঘটনার পরে আর শেষ ক্ষেত্রে আপনি অসীম সংখ্যক ঘটনার পরে আপনার পালা আসছে। সুতরাং, অসীমের ক্ষেত্রে আপনি যে আসলে কখনোই সেই দোকানে প্রবেশ করতে পারবেন না তা আসলে নির্দেশ করে – একটি ঘটনা ঘটার আগে অসীম সংখ্যক ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়। কারণ তা হলে বর্তমানে যে ঘটনাগুলো হচ্ছে তার পালাই কখনও আসতো না।

এখন পৃথিবীর জন্ম, তার আগে সূর্যের জন্ম, তারও আগে গ্যালাক্সিগুলোর জন্ম ইত্যাদি তো এক একটি মহাজাগতিক ঘটনা (cosmological event). তাহলে মহাবিশ্ব যদি অনন্তকাল ধরে অবস্থান করে, তো এই পৃথিবী, সূর্য, গ্যালাক্সিসমূহের জন্মের আগেই অনন্তসময়ে অনন্ত/অসীম সংখ্যক ঘটনা ঘটে তবেই এইসব ঘটবার পালা আসার কথা। কিন্তু অসীমের যেহেতু শেষ নেই – তাই গ্যালাক্সি, সূর্য কোনোকিছুর জন্মই হওয়ার কথা না। এখনও সেই অসীম সংখ্যক ঘটনা ঘটবার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবার কথা।

কিন্তু বাস্তবতা হল – গ্যালাক্সিগুলোর, আমাদের সোলার সিস্টেমের সূর্যের আর আমাদের পৃথিবীর জন্ম তো হয়েছেই বরং আরও বিলিয়ন বছর ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন সংখ্যক ঘটনাও ঘটে গেছে। অর্থাৎ, সেই দোকানের উদাহরণে আপনি শুধু লাইন শেষ করে দোকানে প্রবেশই করেন নাই, রীতিমত বহু কেনাকাটাও করে ফেলেছেন। আর এর সবই সম্ভব হয়েছে আপনার আগে সসীম সংখ্যক মানুষ দাঁড়িয়ে থাকবার ফলে। মানুষের সংখ্যা সসীম ছিল বলেই আপনার পালা এসেছিল। তেমনি মহাবিশ্বের অতীতও সসীম অর্থাৎ মহাবিশ্বের একটা শুরু ছিল বলেই তা আজকের এই অবস্থানে এসেছে।

এই যুক্তিটি অন্য কোনও পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর না করেই এই সিদ্ধান্তে এনে দেয় যে মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল। যারা বিজ্ঞানের ছাত্র নন বা কোনও কারণে এখনও Edwin Huble এর পর্যবেক্ষণ বা Thermodynamics এর ২য় সূত্র সম্পর্কে জানেন না তারাও খুব সহজে এই যুক্তিটি ধাতস্থ করতে পারবেন। আর মানুষের পর্যবেক্ষণ আর ক্ষমতার উপর ভরসা করা ঠিক না, কারণ মানুষের পর্যবেক্ষণ আর সক্ষমতা সবসময়ই অসম্পূর্ণ। যেমনঃ আমরা যদি মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল এটা পর্যবেক্ষণের জন্য টেলিস্কোপ বা উপযুক্ত যন্ত্রপাতি কখনো তৈরিই করতে না পারতাম, তবে কি মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল থাকত না? বস্তুত, আমরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে সক্ষম হই বা না হই আর পর্যবেক্ষণ করতে পারি বা না পারি সত্য কখনো পরিবর্তন হবে না… সেটা মানুষ নিজেকে যতই পণ্ডিত মনে করে সত্যকে ছুঁড়ে ফেলুক না কেন।

সুতরাং ‘মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে চলে আসছে না, বরং এর একটা শুরু ছিল’ তা প্রমাণিত হল। এখন প্রশ্ন হল, এই মহাবিশ্ব একসময় ছিল না। কিন্তু এখন তা আছে। এখনও তো তা অনস্তিত্বেই থেকে যেতে পারতো – তাহলে মহাবিশ্বের অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আসবার বা সৃষ্টি হওয়ার কারণ কী?

[৪]

মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনে কেবলমাত্র চার ধরনের কারণ থাকতে পারে। সেগুলো হল –

(১) মহাবিশ্ব শূন্য থেকে কোনো ‘কারণ ছাড়াই’ সৃষ্টি হয়েছে (The Universe was created from nothing via nothing)

(২) মহাবিশ্ব নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে (The Universe created itself)

(৩) মহাবিশ্ব অন্যকোনো সৃষ্ট কারণ থেকে সৃষ্ট হয়েছে: যেমন অন্য একটি মহাবিশ্ব থেকে (The Universe was created from something created. For example, from another universe)

(৪) মহাবিশ্ব কোনো অসৃষ্ট কারণ থেকে সৃষ্টি হয়েছে (The universe was created by something uncreated)

Hawking এর Law of Gravitation, Krauss এর Universe from Nothing বা Dawkins এর Delusion সবকিছুই উপরের কোনো না কোনটির আলোচনায় অবশ্যই চলে আসবে। কারণ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার পিছনে উপরের চারটি ‘ধরণ’ বা ‘প্রকার’ ব্যতীত আর কোনও প্রকার সম্ভব না।

এখানে লক্ষণীয়, মহাবিশ্ব একসময় ছিল না, পরে এসেছে সেটা আগেই যৌক্তিক প্রমাণাদি দিয়ে আমরা দেখিয়েছি। অর্থাৎ, বস্তুগত বা Materialistic/Physical দিক থেকে মহাবিশ্ব শূন্য থেকেই এসেছিল। আর এটি উল্লিখিত চারটি বিকল্পের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু কেবল প্রথমটিতে এর ‘কোনো কারণ নেই’ বলা হয়েছে আর বাকি ধরনগুলোয় ভিন্ন ভিন্ন কারণ বা Cause দেখানো হয়েছে, কিন্তু সেগুলোতে বার বার ‘শূন্য থেকে’ উল্লেখিত হয় নি।

এখন যেহেতু চারটি বিকল্প একইসাথে সত্য হতে পারে না, সুতরাং আমরা একটি একটি করে যাচাই করে দেখব – কোনটি সবচেয়ে যৌক্তিক হতে পারে।

[৪.১]

(১) মহাবিশ্ব শূন্য থেকে কোনো কারণ ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে (The Universe was created from nothing via nothing)

প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে এখানে ‘শূন্য’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে। শূন্য বলতে সাধারণত ‘কোনোকিছুর’ অনুপস্থিতি বোঝায় আর এখানে সেই ‘কোনোকিছু’ হল গোটা মহাবিশ্ব – এর সময়, এর স্থান, পদার্থ, শক্তি (time, space, matter & energy) সবকিছুর অনুপস্থিতি! এখন প্রশ্ন হল, কোনোকিছু কি শূন্য থেকে কোনও কারণ ছাড়াই হয়ে যেতে পারে?

সময় মহাবিশ্বের অংশ। মহাবিশ্বের জন্মের প্রথম সেকেন্ডে কী হয়েছিল সেটা নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা হতে পারে – কিন্তু t=o সেকেন্ডে কোনও কিছুই হওয়া সম্ভব না যদি না সময়ের ঊর্ধ্বে কোনকিছু থেকে থাকে আর যদি না সেই ‘কিছু’ সময় শুরু হওয়ার নির্দেশ দেয়। শুধু মহাবিশ্ব জন্মের সময়ই না, এখনও t=0 সেকেন্ডে কোনোকিছু হওয়া সম্ভব না।

এছাড়া শূন্যের কোনো explanatory power বা গড়বার শক্তি নেই তা গাণিতিকভাবেও এটা প্রমাণিত। ০+০+০+০+… … … + ০ = ০ ই হবে। অগণিত শূন্য বা অগণিত ‘Nothing’ মিলিয়েও মহাবিশ্ব তো দূরের কথা, একটা কণাও সৃষ্টি করতে পারে না। এটা হল কমন সেন্স।

অর্থাৎ, মহাবিশ্ব পরম শূন্য থেকে কোনও কারণ ব্যতিরেকেই সৃষ্টি হতে পারে না। কিন্তু তবু যৌক্তিক বিচারবুদ্ধিহীন বিজ্ঞানীদের শূন্য থেকে ‘কোনও কারণ ছাড়াই’ নিজে নিজে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার চেষ্টা অক্ষুণ্ণ থাকবে – যেন স্রষ্টাকে অবিশ্বাস করতেই এত আয়োজন।

[৪.২]

(২) মহাবিশ্ব নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে (The Universe created itself)

ভেবে দেখুন, কোনও কিছুকে সৃষ্টি করতে হলে তার নিজের অস্তিত্ব থাকতে হবে। এখানে বলা হয়েছে ‘মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছে’। কিন্তু তার তো অস্তিত্বই ছিল না। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আর অনস্তিত্ব একইসাথে বিদ্যমান – যা কিনা স্ববিরোধী বক্তব্য। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারে না। আসলে কোনওকিছুই নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারে না। আর এখানে তো পুরো মহাবিশ্বের কথা বলা হচ্ছে!

এই পর্যায়ে এসে কিছু নামডাকওয়ালা বিজ্ঞানীর অযৌক্তিক ধারণায় আলোকপাত করতেই হয়। কেউ কেউ দাবি করতে পারে যে, প্রথম পয়েন্টের ‘শূন্য’ আসলে ‘পরম শূন্য’ নয়। সেখানে শক্তির এক অতিবিরাজমান অবস্থা ছিল বা ‘শূন্য’ আসলে ‘কোয়ান্টাম ভ্যাকিউম’ যেখানে সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের মধ্যে একটা কণা (matter) ও একটা প্রতিকণা (anti-matter) তৈরি হয়ে একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কিন্তু সেটা হতেও তো সময়ের প্রয়োজন। তাহলে এবার হয়ত কেউ কেউ বলবেন, সময় ছিল কিন্তু তার আচরণ এখনকার মত ছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে প্রশ্ন চলে আসে, সময়ের আচরণ এখন কেমন? তখন কেমন ছিল? কেন ঐরকম ছিল? সেই আচরণ পরিবর্তন করল কে বা পরিবর্তনের কারণ কী ছিল?

উপরের ধারণাগুলো মূলত বিজ্ঞানী হকিংয়ের মস্তিষ্কপ্রসূত। The Grand Design এর কথাবার্তা থিউরি পর্যায়ে থাকলেও এর অসারতা নিয়ে একটু আলোচনা দরকার যাতে কিছু মানুষের উপকার হয়। কারণ ভাষাশৈলীর কারণে সাধারণ মানুষ অনেকসময় যৌক্তিক ভ্রান্তি (logical fallacy) ধরতে পারে না।

একদম সহজভাষায় হকিং যা বুঝিয়েছে তা হল পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো (Laws of Physics) ছিল বলেই মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজে নিজেই সৃষ্টি হতে পারে। হকিং সমস্ত সূত্রও বোঝান নি। কেবল মহাকর্ষ বলের সূত্র (laws of gravitation) বুঝিয়েছেন। সূত্র বললেও যাদের বুঝতে কষ্ট হচ্ছে তাদের জন্য আরও সহজ করে দিইঃ মহাকর্ষ বলের যে চিরাচরিত আচরণ (গাণিতিকভাবে প্রকাশ করলে তা সূত্র) তার কারণেই মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারবে।

সরাসরি হকিং এর ভাষায়, “Because There is a law of gravity the universe can and will create itself from nothing.” – The Grand Design by Stephen Hawking

শুনতে ভাল শোনালেও যারা একটু চিন্তা করতে পারেন তারা প্রথমেই ধরে ফেলতে পারবেন যে এটা একটা স্ববিরোধী বক্তব্য – “Because there is a law of gravity…” অর্থাৎ, “Because there is something the universe … create itself from nothing.” অর্থাৎ, মহাকর্ষ বলের সূত্রও তো কোনকিছু বা something, তাহলে তা nothing বা শূন্যে কীভাবে থাকতে পারে? আর মহাকর্ষ হল মহাবিশ্বের যেকোন দু’টি কণার মধ্যকার আকর্ষণ। যখন কোনও কণাই ছিল না তখন কীভাবে মহাকর্ষের সূত্র কাজ করে? আচ্ছা তারপরও ধরে নিলাম যে মহাকর্ষ ছিল না কিন্তু মহাকর্ষের আচরণ ছিল অর্থাৎ, কণা ছিল না ঠিক – তবে যদি থাকত তা ঐ কণাদ্বয়ের সাথে ঐরকম আচরণে কাজ করত। অর্থাৎ, স্ববিরোধী হলেও আমরা তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম যে শূন্যতেও আসলে কিছু ছিল!

কিন্তু তা মেনে নিলেও হকিংয়ের বক্তব্যের শেষ অংশটি অসারই রয়ে যায় প্রধানত দুইটি কারণে।

১ম টি হল, (২) এ উল্লিখিত স্ববিরোধী কারণ অর্থাৎ, ‘মহাবিশ্ব নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করতে পারবে’। কারণ আগেই বলেছি এর অর্থ হল মহাবিশ্বের একইসাথে অস্তিত্বে আবার অনস্তিত্বে থাকা; যা আসলে স্ববিরোধী। এক্ষেত্রে আরেকটা উদাহরণ দিই। ধরুন, x সৃষ্টি করেছে yকে। অর্থাৎ, আপনার কাছে যদি x থাকে তাহলে আপনি y পাবেন। কিন্তু এখন যদি বলি, x সৃষ্টি করেছে x কে। তাহলে অর্থ কী দাঁড়ায়? এর অর্থ দাঁড়ায়, আপনার কাছে যদি x থাকে তাহলে আপনি x পাবেন! আপনার কাছে যদি x নাই থাকে, তাহলে আপনি x পেলেন কোথা থেকে? আর যদি x থেকেই থাকে তাহলে তো আছেই, নতুন করে পাবার দরকার কী? অর্থাৎ, বোকামিপূর্ণ অসার কথা অসারই থেকে যায়, এমনকি তা বিশ্বজোড়া বিজ্ঞানী থেকে এলেও।

আর ২য় যে কারণে হকিং এর বক্তব্য অসার হয় শুধু সেটা নিয়েই ছোটখাটো একটা বই লিখা যাবে। কারণ হকিং এমন এক চিন্তার ফাঁদে পড়েছে যেখানে সে ভাবছে ‘সূত্র বা law কোনোকিছু সৃষ্টি করতে পারে’। অথচ মহাকর্ষের সূত্র মহাকর্ষ বল তৈরি করে না। এটা শুধুমাত্র মহাকর্ষ বলের ধরন বা আচরণ ব্যাখ্যা করে। আর পদার্থবিজ্ঞানের, রসায়নের প্রত্যেক সূত্রই এরূপ কেবল প্রকৃতির ব্যাখ্যা করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ সম্পন্ন হতে একজন কর্ম সম্পাদনকারী প্রয়োজন হয়। সূত্রগুলো আছে বলেই কোন কাজ নিজে নিজে হতে পারে না।

যেমনঃ নিউটনের গতির সূত্র F=ma কখনও কোনও বস্তুতে গতির সঞ্চার করে নি, বরং গতিশীল বস্তুর গতির প্রকৃতি কেমন হবে সেকথা ব্যাখ্যা করেছে। বস্তুটি গতিশীল হতে গতি সঞ্চারণকারী কাওকে প্রয়োজন। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ধারণা। কারণ অনেকেই এই সহজ ব্যাপারটা আজ বুঝতে পারছে না, এমনকি জনপ্রিয় বিজ্ঞানীরাও চিন্তার এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন কিছু সাধারণ তাত্ত্বিক জ্ঞান না থাকবার কারণে।

আরেকটা সহজ উদাহরণ দিয়ে এই বিষয়ের ইতি টানব। ধরে নিন, পুরো মহাবিশ্বটি একটি জেট ইঞ্জিন। এখন এই জেট ইঞ্জিনে বিজ্ঞানের অনেকগুলো সূত্র প্রয়োগ হয়েছে। কিন্তু তার মানে কি এই যে এইসব সূত্র থাকার কারণে জেট ইঞ্জিনটি নিজে নিজেই অস্তিত্বে চলে আসতে পারে? বরং ইঞ্জিনটিতে কেউ সূত্রগুলো প্রয়োগের ফলেই সেটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু পদার্থ থেকে পরিপূর্ণ একটি ইঞ্জিন হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, সূত্র থাকলেও একজন কর্ম সম্পাদনকারী সত্ত্বা বা একটি কর্ম সম্পাদনকারী কারণ প্রয়োজন।

বস্তুত মহাবিশ্বের অনস্তিত্বের সময় কোনও সূত্রের অস্তিত্বও থাকা সম্ভব না কারণ সূত্রগুলো মহাবিশ্বেরই অংশ। তবুও হকিংয়ের থিউরি মেনে নিয়েও তার অসারতা প্রমাণ করা হল।

[৪.৩]

(৩) মহাবিশ্ব অন্যকোনো সৃষ্ট কারণ থেকে সৃষ্ট হয়েছে: যেমন অন্য একটি মহাবিশ্ব থেকে (The Universe was created from something created. For example, from another universe)

মহাবিশ্ব যদি অন্য কোনও সৃষ্ট কারণ থেকে সৃষ্টি হয় তাহলে প্রশ্ন আসে সেই কারণটা ঘটবার কারণ কী? তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন আসে সেই কারণের কারণের কারণ ঘটবার কারণ কী?… এভাবে চলতেই থাকে। অর্থাৎ, অন্য কোন মহাবিশ্ব থেকে সৃষ্টি হলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, সেই মহাবিশ্বটি কোথা থেকে এল? আর সেই মহাবিশ্বটি যদি আরেকটি মহাবিশ্ব থেকে সৃষ্টি হয় তাহলে সেটা কোত্থেকে এল?… এভাবে চলতেই থাকে আর তা আবারও Infinite বা অসীমের সমস্যায় আক্রান্ত হয়। আর সেটা আমরা আমাদের দ্বিতীয় সূত্রের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যাখ্যা করেছি। অর্থাৎ, অসীম সংখ্যক সৃষ্ট কারণের সিরিজ শেষ করে বর্তমান মহাবিশ্বই কখনও অস্তিত্বে আসতে পারতো না।

তাহলে সিদ্ধান্তগুলো যাচাই করে অসম্ভব আর স্ববিরোধীগুলো eliminate বা বাতিল করে শেষমেশ আমাদের কাছে একটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাকি থাকে। অন্যান্য সিদ্ধান্তগুলো পর্যায়ক্রমে বাতিল হওয়ায় এটিই সত্য প্রতিপণ্য হয়। আর তা হলঃ

মহাবিশ্ব কোনো অসৃষ্ট কারণ থেকে সৃষ্টি হয়েছে (the universe was created by something uncreated/uncaused).

[৪.৪]

(৪) মহাবিশ্ব কোনো অসৃষ্ট কারণ থেকে সৃষ্টি হয়েছে (the universe was created by something uncreated/uncaused)

অসৃষ্ট কারণ বা Uncaused/Eternal Cause এর স্বরূপ উপলব্ধি করতে গেলেই একে যাচাই করা হয়ে যাবে। তাহলে এই অসৃষ্ট কারণের স্বরূপটি কেমন?

প্রথমত,

মহাবিশ্ব একসময় ছিল না (তা আমরা আগেই প্রমাণ করে এসেছি)। অতঃপর এই কারণটি মহাবিশ্বকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছে। এই বিষয়টি সেই ‘কারণ বা Cause’ এর ইচ্ছাশক্তি নির্দেশ করে। এটি তো মহাবিশ্বকে অস্তিত্বে নাও আনতে পারতো। অতএব ‘কারণ’টির ইচ্ছাশক্তি রয়েছে আর ইচ্ছাশক্তি নির্দেশ করে কোনো ‘সত্ত্বা’ বা Personality কে। এখন কোনো সত্ত্বাকে ‘এটি/এটার’ না বলে ‘তিনি/তাঁর’ বলাই শ্রেয়। তাই আমরা সেটাই বলব। আর এই সত্ত্বা যেহেতু শূন্য থেকে সমস্তকিছু সৃষ্টি করেছেন তাই তাঁকে আমরা ‘স্রষ্টা/ সৃষ্টিকর্তা’ বা The Creator বলব।

দ্বিতীয়ত,

অসৃষ্ট এই সৃষ্টিকর্তা হলেন সমস্তকিছু থেকে ঊর্ধ্বে অর্থাৎ, পরম (Absolute). আর ‘সবকিছুর ঊর্ধ্বে পরম সত্ত্বা’ বললে কেবল ‘একক’ সত্ত্বাকেই নির্দেশ করা হয়। প্রশ্ন আসতে পারে, সেটা কীভাবে? কারণ ‘অনন্ত’, ‘অসীম’, ‘পরম’ স্বাভাবিকভাবেই ‘এক’ এর বেশি হতে পারে না। Absolute বা পরম মানেই হল সবকিছুর ঊর্ধ্বে – আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে কেবল ‘একক’ সংখ্যক সত্ত্বাই থাকতে পারে। তাঁর উপর বা সমান কিছু থাকলে সে সংজ্ঞা অনুসারেই আর পরম বা সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকে না। অথচ এমন অসৃষ্ট সত্ত্বা রয়েছে তা আমরা আগেই Deductive reasoning দিয়ে প্রমাণ করেছি। সুতরাং, এমন অসৃষ্ট পরম একজন সত্ত্বা রয়েছেন এবং ‘একজন’ ই রয়েছে।

এই বিষয়টা এতই সহজবোধ্য যে ভাষাগতভাবেও শুধুমাত্র ‘পরম’ শব্দটির সমার্থক হিসেবে পরিপূর্ণ, অসীম, সর্বশ্রেষ্ঠ, অদ্বিতীয় ইত্যাদি পাবেন। আর ইংরেজি ‘Absolute’ খুঁজলে পাবেন Ultimate, Supreme, Unparalleled, Unique ইত্যাদি। অর্থাৎ এইসমস্ত পরম বিষয়গুলো একইসাথে একজনেরই হতে পারে, এর দ্বিতীয় বলতে কিছু নেই।

বিজ্ঞানী হকিং এর কথা আবার মনে পড়ল। “মহাবিশ্বের উৎপত্তি ব্যাখ্যায় সৃষ্টিকর্তার কোনও প্রয়োজন নেই, পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো থাকবার কারণে মহাবিশ্ব নিজে নিজে জন্ম হওয়াই বাঞ্চনীয় ছিল।” কিন্তু সূত্রের কেবল ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা আছে, ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষমতা নেই তা তো আগেই ব্যাখ্যা করেছি। আর অসৃষ্ট কারণই যে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত তাও ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করেছি। সেই অসৃষ্ট কারণ বা Uncaused cause যে আসলে একজন ব্যক্তিত্ব বা সত্ত্বা “সৃষ্টিকর্তা” তাও দেখিয়েছি। তবুও এখন মনে পড়ল কারণ প্রকৃত বক্তব্য আসলে হওয়া উচিত এমন –

“মহাবিশ্বের সৃষ্টি ব্যখ্যায় একজন সৃষ্টিকর্তাই যথেষ্ট।”

তৃতীয়ত,

স্রষ্টার স্বরূপ সৃষ্টি থেকে ভিন্ন। যেমনঃ মহাবিশ্ব সসীম, কিন্তু স্রষ্টা অসীম। তেমনি সৃষ্টির আর কোনো বৈশিষ্ট্যই তার মত নয়। কেউ একটি চেয়ার বানালে সেই চেয়ারের স্রষ্টা তাতে রূপান্তর হয়ে যায় না, বরং তার সত্ত্বা আলাদাই থাকে। স্রষ্টা সম্পর্কে আমরা ততক্ষণ কিছু নিশ্চিত জানব না যতক্ষণ না তিনি নিজে আমাদের সেকথা জানাবেন। আমাদের পক্ষে স্রষ্টার সত্ত্বা কল্পনাও অসম্ভব, আমরা চেষ্টা করতে পারি কিন্তু কোনও ফল হবে না। কারণ একটা Unknown reality কে কখনোই Known reality দিয়ে বিচার করা যায় না। যেমনঃ যে ব্যক্তি আগে কখনোই মিষ্টি স্বাদ পায় নি, তাকে যতই বোঝানো হোক না কেন – মিষ্টি স্বাদ আসলে কেমন তা কখনোই বোঝানো যাবে না। অথবা মনে করেন এক ব্যক্তি চোখ ঠিক থাকা সত্ত্বেও কখনো লাল রঙ দেখে নাই, তাহলে আপনি তাকে কখনোই লাল আসলে দেখতে কেমন তা বলে বুঝাতে পারবেন না। আর এবার চিন্তা করুন, এমন এক রঙ – বিচারবুদ্ধি দিয়ে শুধুমাত্র এর অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছেন কিন্তু আপনিও কক্ষনো দেখেন নাই, আবার আরেক লোক যাকে বুঝাতে চান সেও কখনো দেখে নাই, । তাহলে সেটা আসলেই কেমন তা নিয়ে পড়ে থাকা তো বাড়াবাড়ি আর অযথা সময় নষত ছাড়া কিছু না।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, পর্যবেক্ষণ আওতার বাহিরে না সবকিছুকে আমরা মিথ্যা সাব্যস্ত করব বলে বিবেচনা করেছিলাম। তাহলে স্রষ্টা পর্যবেক্ষণ আওতার বাহিরে হলেও কেন অসম্ভব সাব্যস্ত করছি না। মনে করিয়ে দিই, শুধুমাত্র একটা ব্যতিক্রম উল্লেখ করা হয়েছিল। আর তা হল অকাট্য Premise বা সূত্র থেকে যদি Deductive reasoning করে নিশ্চিতভাবে কোনোকিছু প্রমাণ করা যায় তাহলে পর্যবেক্ষণাতীত হলেও তা সত্য হবে। আমরাও Deductive reasoning করে শেষমেশ একটিমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি – আর তা হল ‘একজন অসৃষ্ট স্রষ্টার অস্তিত্ব’। আর আমাদের আলোচনার Deductive nature এর কারণে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ‘একজন অসৃষ্ট স্রষ্টা’ সম্পর্কে আরও জ্ঞান অর্জন সম্ভব না হলেও তা অকাট্যই রয়ে যাবে। একটা উদাহরণ দিই।

যেমন মনে করুন, ভূতত্ত্ববিদরা মাটি খুঁড়ে গভীরে কিছু বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, আসবাবপত্র তথা সভ্যতার নিদর্শনাদি পেল। তাহলে এ সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান অর্জন ছাড়াই বলে দেওয়া যায় যে একসময় সেখানে মানুষের কোনও সভ্যতা ছিল কিন্তু কালক্রমে তা চাপা পড়েছে। কেউ একথা বলবে না যে তারা দেখতে কেমন ছিল, তাদের স্বভাব কেমন ছিল এসব না জানলে তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করব না। বরং তাদের না দেখেই অন্তত সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল সেকথা বলা যাবে।

আরেকটি উদাহরণ দিই। চাঁদের অন্ধকার পৃষ্ঠ, যে অংশটা সাধারণত পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান না, সেখানে এমন কোনও প্রযুক্তি পাওয়া গেল যেটা আপনি জানেন যে কোনো মানুষের পাঠানো নয়। আমেরিকা, জাপান, রাশিয়া কারও নয়। কেউ স্বীকার করছে না – এমন নয়, বরং সেই প্রযুক্তি আসলেই কোনো মানুষের নয়। তাহলে তো আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারব যে সেটা মানুষ ভিন্ন অন্যকোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর রেখে যাওয়া। কেউ এটা বুঝে নিতে মোটেও বুদ্ধিমান প্রাণীগুলো দেখতে কেমন, কোথায় থাকে, তাদের বুদ্ধিমত্তা কোন স্তরের এসব জিজ্ঞেস করবে না। এসব প্রশ্ন ওই বুদ্ধিমান প্রাণির অস্তিত্ব আছে মেনে নেওয়ার পরে আসবে।

অর্থাৎ, একটি কারণ বা ব্যাখ্যাকে (explanation) সবচেয়ে যৌক্তিক বলতে সবসময় সেই ব্যাখ্যার ব্যাখ্যা (explanation of the explanation) প্রয়োজন হয় না। উপরের প্রথম উদাহরণটির ক্ষেত্রে আদিম সভ্যতার অস্তিত্ব বুঝে নিতে তাদের সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে হয় না আর দ্বিতীয় উদাহরণটির ক্ষেত্রে মানুষ ভিন্ন কোনও বুদ্ধিমান প্রাণির অস্তিত্ব বুঝে নিতেও সেই প্রাণি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা অর্জন প্রয়োজন হয় না। তেমনি স্রষ্টার অস্তিত্ব বুঝে নিতেও তাঁর সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা অর্জন অপ্রয়োজনীয়।

এছাড়া ব্যাখ্যার ব্যাখ্যা প্রয়োজন হলে ব্যাখ্যার-ব্যাখ্যার ব্যাখ্যাও প্রয়োজন হত। তাহলে ব্যাখ্যার-ব্যাখ্যার-ব্যাখ্যার ব্যাখ্যা… এভাবে করে চলতেই থাকত। ফলাফল – কখনো কোনো সিদ্ধান্তেই পৌঁছানো সম্ভব হতো না। Infinte সংখ্যক ব্যাখ্যা দরকার হতো – যা Infinite Problem এরই আরেক ভার্সন বলা যেতে পারে।

Unknown Reality কে তাই Known reality দিয়ে ব্যাখ্যা করা না যাক, কিন্তু সেই Unknown reality একারণে False বা মিথ্যা হয়ে যায় না। আর আমরা যেহেতু Deductive Reasoning করে দেখিয়েছি একজন ‘অসৃষ্ট অসীম স্রষ্টা’ রয়েছেন তাই আরও পর্যবেক্ষণ, ব্যাখ্যা বা স্রষ্টা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাওয়া ছাড়াই এটা সত্য বলে মেনে নিতে হবে।

‘মাল্টিভার্স থিউরি’ বা ‘আমরা কারও স্বপ্নে রয়েছি’ এসমস্ত কথাবার্তা অসার হয় কারণ এগুলোর অস্তিত্বের প্রমাণও মেলে না, পর্যবেক্ষণও সম্ভব হয় না। কিন্তু আমরা যৌক্তিকভাবে Deductive reasoning দিয়ে দেখিয়েছি যে, একজন অসৃষ্ট স্রষ্টা রয়েছেন। তাছাড়া যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে মাল্টিভার্স তত্ত্ব সত্য, তবুও একজন পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে কোটি কোটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি একটি মহাবিশ্ব সৃষ্টির মতোই সহজ। তাই মাল্টিভার্স থিউরিও আস্তিকতার বিলুপ্তি ঘটায় না।

এখন, Unknown Reality কে কখনো Known Reality দিয়ে ধারণ করা যায় না বলে স্রষ্টার কোনো মূর্তি, ছবি, প্রতিমূর্তি ইত্যাদি যাকিছু আমরা কল্পনা করতে পারি তা থাকা সম্ভব নয়। এমন যা কিছু আছে তা মোটেও স্রষ্টা হতে পারে না। স্রষ্টাকে এসবে ধারণ করার চেষ্টা অন্ধদের হাতি দেখার মতই হাস্যকর। হাতি হাতড়ে হাতড়ে শেষমেশ কেউ বলবে হাতি কুলার মত, কেউ বলবে খাম্বার মত ইত্যাদি। কিন্তু এখানেও তো অন্ধেরা হাতড়ে দেখেছে অর্থাৎ অন্তত কোনওভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে, কিন্তু স্রষ্টার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েও তো আমরা তাঁকে পুরোপুরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছি না। স্রষ্টার স্বরূপ তাই ছবি মূর্তিতে ধারণ করার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ এবং ফলাফল মিথ্যা – আসলে এর চেয়ে বিরাট আর শ্রেষ্ঠ মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না। কারণ এতে আমার আপনার মতো সৃষ্টির ওপর মিথ্যা আরোপ করা হয় না, বরং স্বয়ং সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টার ওপর মিথ্যা আরোপ করা হয়। আর আন্দাজে ছবি মূর্তি ইত্যাদি বানিয়ে পূজা করা কেবল মিথ্যা আরোপ করেই বসে থাকা না, বরং সেটাতো ‘সমস্ত মিথ্যার শ্রেষ্ঠ মিথ্যা’ কেই উপাসনা করা, বাড়াবাড়ি করা।

চতুর্থত,

স্রষ্টা সমস্ত সৃষ্টির ঊর্ধ্বে অর্থাৎ, বস্তুগত কোনোকিছু স্রষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু এর অর্থ এও নয় যে স্রষ্টা দয়াবান, ক্ষমাকারী, বিচারক ইত্যাদি হতে পারবেন না। কারণ এগুলো বস্তুবাচক বিষয় নয়, বরং গুণবাচক বিষয়াদি। গুণবাচক বিষয়াদি বস্তুগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ ও প্রযোজ্য নয়।

গুণবাচক বৈশিষ্টাবলি কখনোই বস্তুগত জিনিসে প্রযোজ্য তো নয়ই, বরং সেগুলো কোনো Personality বা সত্ত্বার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। Personification কেবল Person, Entity বা সত্ত্বার ক্ষেত্রেই সম্ভব আর গুণবাচক বৈশিষ্টাবলি আরোপ Personification এর একটি অংশমাত্র। তাই ‘টেবিলটি অনেক দয়ালু’ কথাটা যেমনি হাস্যকর, মিথ্যা, অযৌক্তিক তেমনি ‘মহাবিশ্বের কি দয়া’, ‘প্রকৃতির কী আজব খেয়াল’, ‘প্রকৃতি চাইল এটা করতে’, ‘প্রকৃতি আপন মনে ওটা বেছে নিল’ ইত্যাদি কথাবার্তাও হাস্যকর, মিথ্যা, অযৌক্তিক। এগুলো কল্পনার বিষয়বস্তু হতে পারে, বাস্তব জগতের নয়। এমনসব বস্তুগত বিষয়ে Personification অসম্ভব আর হাস্যকর হলেও কিছু মানুষ অহরহ এসব ব্যবহার করে আসছে – যেন স্রষ্টাকে অস্বীকার করতেই এত আয়োজন।

পঞ্চমত,

অসৃষ্ট স্রষ্টা ‘অনন্ত-অসীম’ সত্ত্বা হওয়ায় তাঁর কোনো আদি অন্ত নেই। অতএব স্রষ্টা সময়ের ঊর্ধ্বে। সময় দ্বারা তিনি আবদ্ধ নন। বরং সময় তাঁরই সৃষ্টি এবং মহাবিশ্বকে তিনি সময়ের ফ্রেমে আবদ্ধ করেছেন। সময়ের ফ্রেম বলতে মূলত ‘Present’ বা ‘বর্তমান’ এর ফ্রেম বোঝাচ্ছি। আমরা কখনোই বর্তমানকে অতিক্রম করে যেতে পারি না। আপনি প্রতি মুহুর্তে বর্তমানেই আছেন। কিছুক্ষণ আগের অতীতেও ফিরে যেতে পারবেন না, বর্তমানকে পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যতেও চলে যেতে পারবেন না। ফিকশনগুলোতে এমন বহুকিছু দেখানো হলেও এটাই ফ্যাক্ট। আমাদের জন্য সময় ধীরে বা দ্রুত যেতে পারে – সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সময়ের ঊর্ধ্বে উঠে একে অতিক্রম করা আমাদের জন্য অসম্ভব।

তাহলে ভাবুন তো, সময়ের ঊর্ধ্বে কোনও একজন সত্ত্বার জন্য কি একই জিনিস খাটে? উত্তরটা সহজ – না, খাটে না। যখন সময়ই ছিল না তখনও স্রষ্টা ছিলেন। তিনি আমাদেরকে সময় দ্বারা আবদ্ধ করেছেন কিন্তু তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে বলে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত তাঁর কাছে একইসাথে বিরাজ করে। তাই স্রষ্টা অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান রাখবেন – সেটাই স্বাভাবিক। এখন তিনি যদি আপনার ভবিষ্যত দেখে সেটা লিখে রাখেন তাহলে সেটা মোটেও আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে না, বরং আপনার নিজ থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তই হবে। কারণ আপনি ভবিষ্যত সম্পর্কে জানেন না বলে একটু পর ডানে যাবেন নাকি বামে যাবেন সেটা আপনার নিকট সিদ্ধান্ত হিসেবেই আবির্ভূত হবে। আমরা বর্তমানের ফ্রেমে বন্দি বলে আমরা যে ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু জানি না – এই না জানাই আমাদেরকে নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর জন্য এককভাবে দায়ী করে।

এই হল স্রষ্টার পক্ষ থেকে ‘Free will বা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি’ দেওয়া সত্ত্বেও তাঁর আগে থেকে সবকিছু জানা থাকার একটি ব্যাখ্যা – তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে, আমরা নই। বর্তমানের ফ্রেমে বন্দি আমাদের কাছে বিকল্প কাজগুলো সব অজানা Option বা সিদ্ধান্ত হিসেবেই এসেছিল। তাই স্রষ্টা আগে থেকে জেনে থাকলেও আমাদের সমস্ত কাজের দায়ভার আমাদেরই। এখন কেউ বলতে পারে, স্রষ্টা চাইলে আমাদেরকে দিয়ে জোর করে শুধু ভালটাই করিয়ে নিতে পারতেন – কিন্তু তা হলে সেটা আর আমাদের Free will থাকত না।

ষষ্ঠত,

মহাবিশ্ব একসময় ছিল না, পরে এসেছে সেটা আগেই যৌক্তিক প্রমাণাদি দিয়ে আমরা দেখিয়েছি। অর্থাৎ, বস্তুগত বা Materialistic/Physical দিক থেকে মহাবিশ্ব শূন্য থেকেই এসেছিল। কিন্তু শূন্য থেকে আসবার জন্য ‘কোনো কারণ ছিল না’ – এই বিকল্পটি অসম্ভব – তা আমরা মূলত [৪.১] এর আলোচনায় দেখিয়েছি। আর বাকি [৪.২], [৪.৩], [৪.৪] এ বস্তুগতভাবে ‘শূন্য’ থেকে সৃষ্টি হলেও তার সম্ভাব্য সকল কারণ নিয়ে আলোচনা করেছি ও শেষে একজন অসৃষ্ট সৃষ্টিকর্তাই হল সবেচেয়ে যৌক্তিক কারণ তা দেখিয়েছি।

অর্থাৎ, সৃষ্টিকর্তা ‘শূন্য থেকে’ই সব সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি অনন্ত, অসীম, পরম ও অসৃষ্ট বলে মহাবিশ্বের এবং সমস্ত সৃষ্টির বস্তুগত শূন্যতাতেও তিনি ছিলেন, আবার সমস্ত সৃষ্টির বিলুপ্তি ঘটলেও তিনি থাকবেন।

সপ্তমত,

“স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল?”

মজার ব্যাপার হল এর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে রিচার্ড ডকিন্সের ‘The God Delusion’ এর প্রধান যুক্তিগুলোতেও আলোকপাত করা হয়ে যাবে। সহজকথায় বাচ্চাদের মতই সে মন্তব্য করেছে ‘যদি মহাবিশ্ব একজন স্রষ্টা সৃষ্টি করে থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করেছে (তার ভাষায় মহাবিশ্বের যদি designer থাকে তবে সেই designer এর design কে করেছে)। আর এই প্রশ্ন চলতেই থাকে বলে স্রষ্টার অস্তিত্বই অসম্ভব।’

খেয়াল করুন, ডকিন্স ধরেই নিয়েছে একজন ‘সৃষ্ট স্রষ্টা’র কথা অর্থাৎ, স্রষ্টাকে কেউ একজন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমরা যৌক্তিক বিচার করেই দেখিয়েছি যে মহাবিশ্ব সৃষ্টির কারণটি হবে Uncaused/ Uncreated বা অসৃষ্ট। অর্থাৎ, স্রষ্টা এমন এক সত্ত্বা যাকে কেউ সৃষ্টি করে নাই; তিনি অসৃষ্ট, পরম ও অনন্ত বিরাজমান। স্রষ্টা যদি অসৃষ্ট না হন, তবে মহাবিশ্বই সৃষ্টি হয়ে বর্তমান পর্যায়ে আসতো না সেটা আমরা আমাদের [৩] এর আলোচনায় ‘দোকানের লাইন’ উদাহরণটিতেই উল্লেখ করেছিলাম। অর্থাৎ, ডকিন্সের স্রষ্টাকে যেমন ধারণা করছে (সৃষ্ট) তা আমরা ন ইজেরাই বাদ প্রমাণ করেছি।

(‘কোন সৃষ্ট স্রষ্টা অসম্ভব’ তা মূলত [৪.৩]“মহাবিশ্ব কোনো সৃষ্ট কারণ থেকে সৃষ্ট হয়েছে” (The Universe was created from something created) এ আলোচনা করার কথা থাকলেও তখন ‘অসৃষ্ট কারণ’ এর স্বরূপ যে আসলে ‘সত্ত্বা’ আর সেই সত্ত্বা যে ‘সৃষ্টিকর্তা’ তা ধারাবাহিকভাবে পরে এসেছে – আর তাই ধারাবাহিকতা ঠিক রেখে ‘সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করলো’ এমন প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার আগে মহাবিশ্ব সৃষ্টির কারণ যে ‘অসৃষ্ট একক সৃষ্টিকর্তা’ তা আমরা আগে প্রমাণ করে নিয়েছি।)

বোকারা হয়ত এখানে ডারউইনিজম টেনে আনতে পারে। কিন্তু ডারউনিজম এখানে আদতে আলোচনার অংশই হতে পারে না। ডারউইনিজম প্রাণসৃষ্টির সাথে জড়িত, মহাবিশ্ব সৃষ্টির সাথে নয়। যদিও ডারউইনিজম প্রাণসৃষ্টিরও অপব্যাখ্যা করে, আজ এ বিষয়ে আলোচনা হবে না। কারণ, মহাবিশ্বের শুরু আর এর অসৃষ্ট কারণ ‘একক সৃষ্টিকর্তা’ এর সাথে ডারউইনিজম এর কোনো সম্পর্কই নেই।

খেয়াল করলে দেখবেন, নাস্তিকেরা নিজেদের ধারণাগুলোকে সৃষ্টিকর্তার স্বরূপে চাপিয়ে তারপর অস্বীকার করতে চায়। যেমনঃ ডকিন্স ধরেই নিয়েছে সৃষ্টিকর্তাকে কেউ সৃষ্টি করেছে – সৃষ্ট সৃষ্টিকর্তা। সেই হিসেবে ডকিন্সের বই ‘The God Delusion’ না হয়ে ‘The Created God Delusion’ হওয়া উচিত ছিল! সৃষ্টিকর্তা নিজের সম্পর্কে যা কিছু জানিয়েছেন তা বাদ দিয়ে নিজের ধ্যান ধারণা মত স্রষ্টা বানিয়ে নিয়ে তার পূজা করা বা ধ্যান ধারণা থেকে ‘কোনো সৃষ্টিকর্তাই নেই’ উপসংহার টানা তাই একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। তাই প্রকৃত স্রষ্টাকে চিনতে তাঁকে সঠিক ধারণায় সংজ্ঞায়িত করা অপরিহার্য।

এখন আলোচনার সুবিধার্থে পুরোটা অনেক সংক্ষেপে একবার চোখ বুলিয়ে নিন –

[১] আমরা প্রথমে সিদ্ধান্তে পৌঁছোবার Deductive আর Inductive দুই ধরনের পথ ব্যাখ্যা করেছিলাম।

[২] এরপর আমরা Deductive reasoning পদ্ধতিতে এগিয়েছি এবং সূত্র বা Premise হিসেবে ‘আমাদের মহাবিশ্বের বাস্তব অস্তিত্ব আছে’ ধরে নিয়েছিলাম।

[৩] সেখান থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন করে ‘মহাবিশ্বের একটি শুরু হয়েছিল’ প্রমাণ করেছিলাম।

[৪] এরপর এই শুরুর কারণ হিসেবে চার ধরনের সম্ভাব্য সকল কারণ দাঁড় করিয়েছিলাম –

প্রথমটি ছিল – শূন্য থেকে কোনো ‘কারণ ছাড়াই’ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে যাওয়া,

দ্বিতীয়টি ছিল – মহাবিশ্ব নিজেকে নিজে সৃষ্টি করা,

তৃতীয়টি ছিল – কোনো ‘সৃষ্ট’ কারণে মহাবিশ্বের সূচনা আর

শেষটি ছিল – কোনো ‘অসৃষ্ট’ কারণে তা হওয়া।

[৪.১], [৪.২], [৪.৩] এ একে একে প্রত্যেক বিকল্পকে যাচাই করে স্ববিরোধীতা আর অসম্ভাব্যতার কারণে বাদ দিতে দিতে শেষমেশ আমরা পৌঁছেছি একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্তে – মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে কোনও অসৃষ্ট কারণ অর্থাৎ, Uncreated or Uncaused Cause এর ফলে।

[৪.৪] এরপর আমরা এই অসৃষ্ট কারণ সম্পর্কে বিশ্লেষণ করে এর সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি –

প্রথমত, এর ইচ্ছাশক্তি রয়েছে সুতরাং এটি ‘সত্ত্বা’ বা Personality. এই সত্ত্বা যেহেতু শূন্য থেকে সমস্তকিছু সৃষ্টি করেছেন তাই তিনি স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা।

দ্বিতীয়ত, অনন্ত, অসীম, পরম সত্ত্বা কেবল একক সংখ্যক থাকতে পারে বলে স্রষ্টাও একজনই রয়েছেন।

তৃতীয়ত, আমাদের Deductive reasoning এর কারণে স্রষ্টার অস্তিত্ব নিশ্চিত হতে আমাদের তাঁর সম্পর্কে পুরোপুরি জানা লাগে না। আর স্রষ্টা আমাদের প্রেক্ষিতে Unknown Reality তে অবস্থান করেন বলে তাঁর কোনো ছবি, মূর্তি ইত্যাদি থাকতে পারে না।

চতুর্থত, গুণবাচক বৈশিষ্টাবলি বস্তুগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ ও প্রযোজ্য নয়। তাই স্রষ্টার ক্ষেত্রে গুণগুলোর প্রযোজ্যতাও স্রষ্টার সত্ত্বাকে সসীম করে দেয় না। তাছাড়া, গুণবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহের আরোপ Personification এর অংশ এবং বস্তুগত কিছুতে এর আরোপ অযৌক্তিক ও হাস্যকর।

পঞ্চমত, তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে বলে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন আর আমরা সময় দ্বারা সীমাবদ্ধ বলে আর ভবিষ্যত জানি না বলে সব সম্ভাবনাই আমাদের কাছে বিকল্প বা Option হিসেবে আসে। আর তাই আমরা নিজেদের সিদ্ধান্তের কারণে নিজেরাই দায়ী থাকব।

ষষ্ঠত, সৃষ্টিকর্তা ‘শূন্য থেকে’ই সব সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি অনন্ত, অসীম, পরম ও অসৃষ্ট বলে মহাবিশ্বের এবং সমস্ত সৃষ্টির বস্তুগত শূন্যতাতেও তিনি ছিলেন, আবার সমস্ত সৃষ্টির বিলুপ্তি ঘটলেও তিনি থাকবেন।

সপ্তমত, ‘স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল’ এমন প্রশ্ন অবান্তর কারণ এখানে ধরেই নেওয়া হয়েছে স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করেছে। ‘সৃষ্ট স্রষ্টা’ বা অন্য কোনও সৃষ্ট বিষয়াদি থেকে মহাবিশ্ব জন্ম হয়ে বর্তমান পর্যন্ত আসাই সম্ভব ছিল না। আর আমরাও শেষ কারণটিকে ‘অসৃষ্ট’ বলে এসেছি। স্রষ্টার স্বরূপই হল তিনি অসৃষ্ট – তাই যারা স্রষ্টার সংজ্ঞায়ন করতেই ভুল করবে সেগুলো তো অসম্ভাব্যতা সৃষ্টি করবেই।

সংক্ষেপে এই ছিল আমাদের পুরো আলোচনা।

Deductive Reasoning করে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করা মানে হল, যে সূত্র বা প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছিল, তাকেই অস্বীকার করা। আমাদের সূত্রটি ছিল, “মহাবিশ্বের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে”। সুতরাং, আমাদের প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত – ‘মহাবিশ্ব সৃষ্টির কারণ হলেন একজন অসৃষ্ট, পরম, অনন্ত, অসীম সৃষ্টিকর্তা’ একথা অস্বীকার করার অর্থ হল পুরো মহাবিশ্বের অস্তিত্বই অস্বীকার করা… নিজের অস্তিত্বই অস্বীকার করা।

সুতরাং, একজন অসৃষ্ট পরম স্রষ্টা রয়েছেন এবং একজনই রয়েছেন।

(প্রমাণিত)

শেষের আলাপঃ

بِسۡمِ ٱللهِ ٱلرَّحۡمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থঃ

(১) বলুন, তিনি আল্লাহ আল-আহাদ (এক ও অদ্বিতীয়), (২) আল্লাহ আস-সামাদ (অনন্ত, অসীম, পরম, অমুখাপেক্ষী ইত্যাদি) (৩) তিনি কাউকে জন্ম দেন নাই, এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয় নাই (অর্থাৎ কেউ তাঁকে সৃষ্টি করে নাই ) (৪) এবং আর কোনোকিছুই তাঁর সমতুল্য নয়। [সূরা ইখলাস]

আমি একজন মুসলিম, আমি একজন মু’মিন। আর মুমিনদের উপরের এত্তসব কথাবার্তা প্রয়োজন ছিল না। আল্লাহ সুবহানাহুতা’লা অনেক আগেই নিজের সম্পর্কে তাঁর বান্দাদের জানিয়ে উপরে উল্লিখিত সূরা ইখলাস নাযিল করেছিলেন। আর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী আদম (আ’লাইহস সালাম) থেকে শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ পর্যন্ত সকল নবী রাসূলগণ তাওহীদ বা একত্ববাদের কথাই প্রচার করেছেন।

ভাবতেও অবাক লাগে, এত এত কথাবার্তা বলে এসে শেষমেশ সূরা ইখলাসেই ফিরে এলাম! মু’মিনরা এভাবেই এগিয়ে থাকে। মু’মিনরা ‘গায়েবে’ অর্থাৎ না দেখেও যুক্তিতর্ক ছাড়াই একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। একারণেই তারা মু’মিন বা বিশ্বাসী হয়। আরও বিস্তারিত বললে, অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস স্থাপন করে বলেই তারা মু’মিন হয়। কোনো প্রমাণ বা নিদর্শন এলে তাদের ঈমান বাড়ে, কিন্তু নিদর্শনের অভাব তাদের মনকে বিষন্ন করে না। অকাট্য প্রমাণ থাকলে তো সবাই-ই বিশ্বাস স্থাপন করতো! না দেখে বা অকাট্য প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস স্থাপনই তো পরীক্ষা!

আসলে যারা বিশ্বাস স্থাপন করতে চায়, তারা প্রমাণাদিতে আল্লাহর অস্তিত্বের অকাট্যতা খুঁজে পায়। আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করতে চায় না, তারা সবসময় সংশয়েই ডুবে থাকে। উপরে যে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে ‘একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব’ প্রমাণ করেছি এটিও তার ব্যতিক্রম নয়। যে অবিশ্বাসীই থাকতে চায়, সংশয় সন্দেহে থাকতে চায় – সে ঠিকই এর ভেতর থেকেও প্রশ্ন বের করে নেবে। সে নিয়্যাতই ওইরকম করে নিয়েছে। তাই বিশ্বাস না করার জন্য পাল্টা যুক্তিতর্কে মেতে উঠবে।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে যেকোনো ধর্মেই বিশ্বাস স্থাপন করা যায়। সেই একক স্রষ্টার মনোনীত ধর্মটি চেনার জন্য একটি নির্দেশনাই যথেষ্ট – সৃষ্টিকর্তার বাণীতে কোনো ভুল বা স্ববিরোধিতা নেই। এটা আরেকদিনের আলোচনা।

কিন্তু সেজন্যও নিয়্যাতকে ঠিক করে নেওয়া অপরিহার্য।

যারা বলবে আমি আস্তিক দেখে আমার লিখায় শেষমেশ আস্তিকতারই জয় হয়েছে, তাদের বলি – তোমরাও তাহলে নাস্তিক দেখে তোমাদের কথাবার্তা, লিখাও তো নাস্তিকতার পক্ষেই যাবে। তাহলে তোমাদের কথা কেন শুনব?

তুমি নাস্তিক নও? তুমি কেবলই নিরপেক্ষ মুক্তমনা? তোমার এই দাবি প্রমাণ করতে পারবে? তোমার মস্তিষ্ক ছিঁড়ে তোমার চিন্তাগুলো নিরপেক্ষ – তা কি পারবে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিতে? তোমার মুখের কথায় তোমাকে ‘নিরপেক্ষ’ বিশ্বাস করতে বলছ? তুমি আমার কথা, আমার উপস্থাপিত প্রমাণ বিশ্বাস করতে চাও না – তবে আমিও তোমার কথা কেন বিশ্বাস করব?!

বিজ্ঞান আজ এককথা তো কাল আরেককথা বলে। যে স্কেলের দাগগুলো আজ একরকম তো কাল আরেকরকম, তা দিয়ে কখনও কিছু মাপা যায় না। বিজ্ঞান এই চির পরিবর্তনশীল স্কেল। একে দিয়ে ধর্মকে মাপতে গেলেও আজ নাস্তিকতা পাবেন তো কাল আস্তিকতা।

আর সত্য কোনো বিজ্ঞানীর বক্তব্যের উপর নির্ভর করে না। যত বড় বিজ্ঞানীই হোক না কেন, সবাই ভুল করতেই পারে। তাছাড়া, আস্তিকতা আর নাস্তিকতা উভয় পক্ষেই বিজ্ঞানীরা রয়েছেন।

হয়তো ভাবছেন, যে পক্ষের কথা অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয় সে পক্ষেই যাবেন। কিন্তু আসলে যে পক্ষে আগে থেকেই যেতে চান, সে পক্ষকেই অধিক যুক্তিযুক্ত ভেবে নিচ্ছেন।

অনেকের জন্য পৃথিবীর সময়টা আরামে ঘুমিয়ে থাকার মতোই কেবল উপভোগের ক্ষেত্র। তাই আজ যতো পারে, উপভোগ করে নিতে চায়। আগামীকাল যে আজকের এই সময়ের হিসেব দিতে হবে তা মানতেও চায় না, শুনতেও চায় না। বরং প্রমাণ করতে চায় যে আগামীকাল বলে কিছু নেই, হিসাব নেবার কেউ নেই। এই ধরনের মানুষেরা ঘুমিয়ে নেই, বরং ঘুমের ভান করে পড়ে রয়েছে। এরা ডাক শুনেছে ঠিকই, কিন্তু আজকের করণীয় অস্বীকার করে পড়ে থেকে আরাম করাই বেছে নিয়েছে। তাই তারা করে নিক কিছুক্ষণ আরাম।

“… শীঘ্রই তারা জানতে পারবে। বরং না, অতিশীঘ্রই তারা জানতে পারবে।” [সূরা নাবা, ৪-৫]

রচনায় : তানভীর আহমেদ

মতামত দিন