আক্বীদা

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সঠিক ব্যাখ্যা এবং অতিরঞ্জন নিরসনে তার প্রভাব

কুয়েতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনি ঘোষণা

[উক্ত সম্মেলনে কুয়েত, সউদী আরব, আরব আমীরশাহী, কাতার, সুডান, মিসর, জর্ডান, লেবানন, ইরাক, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, মালি, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্থান সহ ২০টি দেশের বিশিষ্ট গবেষক, লেখক ও ইসলামী চিন্তাবিদ অংশগ্রহণ করেন]

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্যে এবং প্রিয় নবী মুহাম্মাদ স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অসংখ্য দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।

বিগত নভেম্বর ২০১৬ খৃষ্টাব্দে  “স্বেচ্ছাসেবক রাব্বানী গ্রুপ” এবং “রাফিদ রিসার্চ ও গবেষণা সংস্থা”র আহব্বানে বিভিন্ন দেশের আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বরেণ্য উলামায়ে কেরামের উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণে কুয়েতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত সম্মেলনের বিবরণী নিম্নে প্রদত্ত হলঃ

১- নবী (স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর সাথীগণ এবং জ্ঞানী ইমামগণ তন্মধ্যে ইমাম চতুষ্টয় যেই নীতি-নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন সে সম্পর্কে উম্মতকে অবগত করা।

২- আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতির সুরক্ষা প্রদান এবং সে সম্পর্কে বিভ্রান্তকারী বাতিল পন্থী ও অজ্ঞদের বিকৃত ভুল অপব্যাখ্যার খন্ডন করা।

৩- এই পন্থা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন এবং তা দৃঢ়রূপে ধারণ করাই হচ্ছে উম্মতের ঐক্য ও সঠিকতার একমাত্র পথ; কেননা এই উম্মতের পরবর্তী লোকদের সঠিকতা পূর্ববর্তী লোকদের পন্থার উপর নির্ভরশীল।

৪- উম্মাহর ঐক্যের সুন্দর নিয়ম হচ্ছে; আপসে সদুপদেশ প্রদান, সৎ কাজ ও তাকওয়ার ভিত্তিতে একে অপরের সাহায্য করা, সৎ কাজের উপদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।

সম্মেলনের এজেন্ডা এবং কর্মসূচি পর্যালোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীগণ নিম্নোক্ত বিবৃতি পেশ করেনঃ

১-আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ যেই মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তা হচ্ছে, নিঃসন্দেহে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতই হচ্ছে কিতাব ও সুন্নতের অনুসারী, তার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্তকারী, তাতে যা রয়েছে তার বাস্তবায়নকারী। অন্য সবকিছুর ঊর্দ্ধে কিতাব ও সুন্নাহকে প্রাধান্য দানকারী। এই কারণে তাদের আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বলা হয়। তাদের বিভিন্ন পরিচিত উপনামগুলির মধ্যে আহলুল হাদীস, আহলুল আছার, ফেরকা নাজিয়া, (নাজাতপ্রাপ্ত দল) তাঈফা মানসূরাহ, (সাহায্যপ্রাপ্ত দল) মধ্যম পন্থী উম্মত, আহলে হক্ক ও সালাফী ইত্যাদি। এদের বরণীয় ব্যক্তিগণ হচ্ছেন যথাক্রমে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে এযাম, যেমন সাঈদ বিন মুসাইয়্যিব, ইবনু সীরীন, আতা বিন আবী রাবাহ, হাসান বাসরী এবং যুহরী। অতঃপর তাবা তাবেঈন যেমন আবু হানীফা, সাউরী, মালিক, আউযাঈ, লায়স বিন সাদ এবং যারা তাদের পরে এসছেন এবং তাদের পদাংক অনুসরণ করেছেন যেমন ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমদ, ইমাম বুখারী এবং ইবনু খুযাইমাহ। এটি একটি প্রাচীন পন্থা যা, ইমাম আহমাদ কিংবা ইবনু তায়মিয়াহ কিংবা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব দ্বারা আবিষ্কৃত নয়; বরং তা সাহাবা তাবেঈ ও তাবা তাবেঈদের পন্থা। তবে তারা সেই সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত যারা এই প্রাচীন পন্থাকে জীবিত করেছেন এবং তার প্রকাশ ও প্রচারকার্য চালিয়েছেন। বিশেষ করে দ্বীনে বিদআত অন্তর্ভুক্তির পর। এই সেই দ্বীনের পন্থা যার সংরক্ষণের দায়িত্ব মহান আল্লাহ নিয়েছেন, তার দিকে লোকদের আহব্বান করেছেন, অন্যান্য দ্বীনের উপর এটাকে জয়ী ঘোষণা করেছেন এবং এই দ্বীনের অনুসারীদের জন্য মান-মর্যাদা সহ ক্ষমা-দয়া প্রদান করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেনঃ

(আর যে সব মুহাজির ও আনসার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাত্ত তাতে সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদীমালা প্রবাহিত, যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, এ হল বিরাট সফলতা।) [তাওবা/১০০]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বহু সূত্রে প্রমাণিত, তিনি বলেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সবসময় হকের উপর বিজয়ী রূপে অবস্থান করবে, তাদের যারা অপদস্ত করবে তারা তাদের পরোয়া করবে না। অতঃপর এই অবস্থাতেই কিয়ামত এসে যাবে”।

এই স্থানে আমরা ইমাম শাফেঈ (রাহেঃ) এর মন্তব্য উল্লেখ করবো, যা তিনি সালাফ তথা পূর্বসূরীদের সম্বন্ধে বলেছিলেনঃ “তাঁরা ইলম, বুদ্ধি, দ্বীন ও মর্যাদার ক্ষেত্রে আমাদের ঊর্দ্ধে এবং তাদের সিদ্ধান্ত আমাদের সিদ্ধান্ত অপেক্ষা উত্তম”। [আল্ মাদখাল্ ইলাস্ সুনান ১/১০৯]

হাফিয আবুল ক্বাসিম তাইমী (রাহিঃ) বলেনঃ “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ কিতাব, সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনদের ঐকমত্য উল্লংঘন করেন না আর না মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট) দলীল ও তার ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করেন; বরং তারা কাজে কর্মে সাহাবা ও তাবেঈন এবং মুসলিমগণ যে সমস্ত বিষয়ে একমত তার অনুসরণ করেন।  [আল্ হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ ২/৪১০]

২- আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতি অভিন্ন। তাদের প্রতীক এক তাদের বাস্তবতা এক। তাদের সততাতে বাতিলের মিশ্রণ নেই। তারা মধ্যমপন্থী তাতে বাড়াবাড়ির অবকাশ নেই। এই পথের পথিকরাই হক্ক ও সত্যের বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। তারা সৃষ্টিকুলের জন্য বেশী দয়ালু। বিচারের ক্ষেত্রে বেশী ন্যায়পরায়ণ। চলার ক্ষেত্রে অধিক সঠিক পথ অনুসন্ধানকারী। তারা কোনো ব্যক্তির দিকে নিজেকে সম্পর্কিত না করে কেবল তাদের নবীর দিকে নিজেকে সম্পর্কিত করে। নবীর মুকাবিলায় কাউকে অগ্রাধিকার দেয় না। রায়, কিয়াস, বিবেক, ফিলোসফি, যুক্তিবাদী নীতি, সূফীতত্ব বা মুজতাহিদের ইজতিহাদের কারণে সুন্নাতের বরখেলাপ করে না। কারণ তারা দৃঢ়বিশ্বাস রাখে যে, সঠিক তাই যা নবী (সাঃ) বলেছেন, করেছেন এবং সম্মতি জানিয়েছেন।   নবী (স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রচারের দায়িত্বে কোনো প্রকার ভুল- ত্রুটি নেই বরং তিনি এ বিষয়ে মাসূম। তার প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।  তিনি ব্যতীত অন্যের কথা এবং কাজ কিতাব ও সুন্নতের মাপকাঠিতে পেশ করা হবে। যদি তা কিতাব ও সুন্নাতের অনুকুলে হয় তাহলে গ্রহণীয় হবে নচেৎ তা প্রত্যাখ্যাত হবে সে যে কেউই হোক না কেন। তারা কোনো দল, গোষ্ঠী, জামাআত কিংবা বিশেষ চিন্তা ধারায় বিশ্বাসী দলের সাথে সম্পৃক্ত নয়। তারা ইসলাম ও সুন্নাতের দিকে নিজের নিসবত তথা সম্পর্ক করা এবং নিজের জন্য শারঈ উপাধিই যথেষ্ট মনে করে।

৩-আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মাযহাব তাওহীদ তথা এক আল্লাহর ইবাদত এবং তার সাথে অন্য কাউকে অংশী না করা এবং রাসূলের অনুসরণের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। তারা ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো সম্মানিত ফেরেশতা কিংবা প্রেরিত রাসূল কিংবা কোনো সৎ ব্যক্তিকে নিজেদের ও আল্লাহর মাঝে মাধ্যম বা অসীলা করে না। কারণ ইবাদত কেবল আল্লাহর অধিকার। এই অধিকার তাঁর উদ্দেশ্যে সুনিশ্চিত করার সাথে সাথে তাঁর যথাযথ সম্মান, তাঁকে পূর্ণাজ্ঞ গুণে গুণান্বিত করা এবং তাঁর জন্য যা অপ্রযোজ্য তা থেকে তাঁকে মুক্ত করতে হবে। রিসালাতের বিষয়ে তারা নিজের ও আল্লাহর মাঝে রাসূল ছাড়া কাউকে মাধ্যম মনে করে না। আর এ কারণে তারা কেবল এমন ইবাদত করে যার পক্ষে আল্লাহর কিতাব কিংবা রাসূলের সুন্নাত প্রমাণিত।

৪-ফিকহী চার মাযহাবের (হানাফী, মালেকী, শাফেঈ এবং হাম্বালী) ইমামগণ এই উম্মাতের মুজতাহিদবর্গের অন্তর্ভুক্ত।  যে সকল মাসআলা-মাসাইল এবং শারঈ নীতি তাঁরা উল্লেখ করেছেন (আমরা মনে করি) এসবের ক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য ছিল সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। এখন উম্মতের উপর জরুরি হচ্ছে, তাঁদের সম্মান করা, তাঁদের মান-মর্যাদার সংরক্ষণ করা, এ ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রনী ভূমিকার প্রশংসা করা এই বিশ্বাসের সাথে যে, তারা ভুল-ত্রুটির ঊর্দ্ধে নয়। তাঁরা ভুলও করেন আবার সঠিকও করেন আর উভয় অবস্থায় তাঁরা সওয়াব প্রাপ্ত হবেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিবেচনাকারীদের কর্তব্য হচ্ছে, তাদের যে সব সিদ্ধান্ত দলীল সমর্থিত তা গ্রহণ করার সাথে সাথে তাঁদের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দুআ করা। কেবল পরিচয়ের জন্য তাঁদের দিকে নিজেকে সম্পর্কিত করতে কোনো বাধা নেই। উম্মতের উলামাগণ এই নিয়মের উপর পরিচালিত।

৫-ইমাম চতুষ্টয়, আবু হানীফা, মালেক, শাফেঈ এবং আহমাদ যেমন তাঁরা ফেকাহ শাস্ত্রের ইমাম তেমন তাঁরা তাওহীদের বিষয়েও ইমাম। যেসব তথ্য তাদের বিশ্বস্ত অনুসারীগণ সহীহ সূত্রে নকল করেছেন, যেমন আবু জাফর ত্বাহাবী ইমাম আবু হানীফার আক্বীদার বিবরণ নকল করেছেন। আবু যাইদ কিরোয়ানী ইমাম মালেকের আক্বীদা বর্ণনা করেছেন, রাবী বিন সুলাইমান ও ইউনুস বিন আব্দুল আলা ইমাম শাফেঈর আক্বীদা উল্লেখ করেছেন এবং আবু বকর খাল্লাল ইমাম আহমাদের আক্বীদার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁরা সকলে সুলূক ও শুদ্ধিকরণেরও ইমাম। তাদের অনুসরণ কেবল ফিকহী বিষয়ে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া আর আক্বীদা ও সুলূককে প্রত্যাখ্যান করাই হচ্ছে মূল ভুল এবং ভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তির কারণ। এটা হচ্ছে ইমামদের অবহেলা করা, তাদের বিপথগামী মনে করা ও তাদের অবজ্ঞা করার নামান্তর, জ্ঞানীরা এটা সমর্থন করতে পারে না।

৬- ইজতেহাদী বিষয়ে (যে সব মাসআলায় নস্ কিংবা ইজমা নেই) উদার মনোভাবী হত্তয়া কাম্য। এটা মন্দ, দলাদলি কিংবা আক্রমণাত্মকের কারণ হতে পারে না; কারণ এসব বিষয়ে প্রথম যুগ থেকেই মতভেদ বিদ্যমান কিন্তু এমনটা তাদের দলে দলে বিভক্ত করে নি।  বরং তারা এটাকে উম্মতের জন্য দয়া ও প্রশস্ততা মনে করেছেন।  তবে এমন বিতর্ক ও সমালোচনা যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, তা আপত্তিকর নয়। এমন বিষয়ে মতভেদ করা সুন্নাত থেকে বের হয়ে যাওয়া নয়, আর না দলে দলে বিভক্ত হওয়ার অবকাশ রাখে, আর না মতভেদকারীকে বিশেষ ফেরকা ও বিশেষ দল হিসেবে নামকরণ করার সুযোগ রয়েছে, আর না তাদের বিদআতী আখ্যা দেয়া সমীচীন। অনুরূপ আহলুস সুন্নাহকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা বৈধ নয় যেমন সালাফিয়াতকে বিভিন্ন ভাগে ও বিভিন্ন চিন্তা-ধারায় বিভক্ত করা; যেমনটা সম্প্রতি কিছু অজ্ঞ, দুর্নামকারী এবং উম্মতের মাঝে বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারীরা করছে।

৭-কতিপয় মুজতাহিদ উলামা কর্তৃক আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের পন্থার বিপরীত যে সব সিদ্ধান্ত সংঘটিত হয়েছে, তা অসুসরণ করা এবং তা দ্বারা দলীল দেত্তয়া অবৈধ; বরং তা প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। পক্ষান্তরে তাদের সৎ কাজগুলিকে ধুলিস্মাত করা যাবে না, তাদের সম্ভ্রমে আঘাত করা যাবে না বরং তাদের মান-মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে হবে।

৮-সালাফদের পন্থাকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের একটি উপাদান মনে করা চরম ভুল; বরং তারাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। আর অন্যান্য ফিরকা যারা তাদের মৌলনীতির বিপরীত অবস্থান করেছে এবং তাদের প্রতীক ছাড়া অন্য প্রতীক গ্রহণ করেছে তারা এমন ফিরকা যাদের রাসূল স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মন্দ বলেছেন। যেমন তারা যারা মানবীয় বিবেককে অহী অর্থাৎ কিতাব ও সুন্নাতের প্রতি প্রাধান্য দেয়, মানবীয় রায়কে কিতাব ও সুন্নাতের বিপক্ষে ফয়সালাকারী মনে করে কিংবা ইতিকাদী বিষয়ে (বিশ্বাসগত বিষয়ে) খবরে আহাদকে প্রত্যাখ্যান করে কিংবা কিতাব ও সুন্নতে বর্ণিত আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করে কিংবা সে সব গুণের মূল অর্থ বর্জন করে অপব্যাখ্যা দেয় কিংবা সে সবের অর্থ অন্যের উপর সোপর্দ করে দেয়; এ ভেবে যে, সৃষ্টির সাথে সদৃশ্য দেত্তয়া থেকে আমরা তাঁকে পবিত্র করছি। কিংবা মহান আল্লাহর আরশে সমুন্নত হত্তয়া অস্বীকার করে কিংবা তাঁর সৃষ্টিকুলের উপরে হওয়াকে অস্বীকার করে কিংবা নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করে, পাপের কারণে কাফের বলে, মুসলিম জামাআত ও তাদের শাসকদের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করে, নিরপরাধদের রক্ত হালাল মনে করে কিংবা মনে করে যে, শরীয়ত (দ্বীনী বিধান) নবী (স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) তরীকা ব্যতীত অন্যান্য তরীকা যেমন কাশফ, ফয়য, স্বপ্ন এবং পীর-মাশাইখের তরীকা থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে। কিংবা যারা আল্লাহর ইবাদত বিদআতী বিরদ (অযীফা), সূফী নাচ-গান, ইত্যাদি পদ্ধতিতে করে কিংবা দ্বীনকে হকীকত ও শরীয়ত জাহের ও বাতেনে বিভক্ত করে কিংবা মনে করে যে, বেলায়েত (অলিতত্ব) নবূয়ত থেকে মর্যাদাবান কিংবা বেলায়েত বিশেষ রেয়াযত তথা সাধনার মাধ্যমে অর্জন করা যায়; নবীর অনুসরণে নয়।  যার বর্ণনা সম্মেলনের বিভিন্ন কর্মসূচী ও গবেষণামূলক লেখায় পেশ করা হয়েছে।

৯- সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ যেমন আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছেন যে, তিনি যেন সমস্ত মুসলিমদের সত্য ও হিদায়েতের উপর একত্র করেন, তেমন তারা সমস্ত দলকে আহব্বান জানিয়েছেন যারা কোনো মৌল বিষয় বা নাম বা কোনো প্রতীকের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তারা যেন কিতাব, সুন্নাহ এবং সালাফগণের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে গভীর চিন্তা ভাবনা করে, নিজের পর্যালোচনা করে, কেবল সত্যের সন্ধান করে এবং কেয়ামত দিবসে আল্লাহর সম্মুখে দন্ডায়মান হত্তয়ার অবস্থা স্মরণ করে যেই দিন মাল সম্পদ আর না সন্তানাদি কাজে দিবে বরং যে পরিষ্কার অন্তর নিয়ে তাঁর নিকট হাজির হবে; যেন তারা খাঁটি সুন্নাতের দিকে ফিরে আসে যেমন ইমাম আবুল হাসান আশআরী যুক্তিবাদীদের আক্বীদা পরিত্যাগ করে সালাফ ও আহলুল হাদীসদের আক্বীদায় ফিরে এসেছিলেন যেমনটি তাঁর দুই গ্রন্থে পাত্তয়া যায়। (আল্ ইবানাহ) এবং (মাক্বালাতুল ইসলামিইয়্যীন) ।

১০- সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সদস্যগণ সকলকে সব ধরনের বাড়াবাড়ি, অতিরঞ্জন এবং চরমপন্থী সংগঠন থেকে সতর্ক করছে এবং বর্তমান যুগের চরমপন্থী দলের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে মুসলিম জামাআতকে বিদআতী বলা তাদের কাফের ঘোষণা দেওয়া, বিভিন্ন মুসলিম সহ অন্যান্য দেশে নিরোপরাধ লোকদের হুরমত ও তাদের রক্ত হালাল মনে করার মত ঘৃণিত পদক্ষেপের নিন্দা জানাচ্ছে এবং জিহাদের নামে মুসলিম শাসকদের বিরূদ্ধে মিছিল ও স্লোগানের ছত্রছায়ায় বিদ্রোহ করার প্রতিবাদ জানাচ্ছে।  অংশগ্রহণকারীগণ বিশেষ করে মুসলিম যুবকদের আহব্বান জানাচ্ছে, যেন তারা এই ধরণের চিন্তা-ধারা, সংগঠন ও দল থেকে দূরে থাকে এবং এইরূপ বিভ্রান্তকর সংগঠণের সদস্য না হয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতির উপর অটল থাকে।  তারা এটাও বিশ্বাস করে যে, তাকফীর, তাবদী এবং তাফসীক্ব করা (কাউকে কাফের, বিদআতী ও ফাসেক ঘোষণা দেত্তয়া) একটি শারঈ বিধান, জ্ঞান ছাড়াই এ সম্পর্কে কথা বলা অবৈধ এবং কারো সম্বন্ধে এমন মন্তব্য করা অবৈধ যতক্ষণ দলীল সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান এবং সঠিক অবস্থা জানা না থাকে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্ব করতঃ মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম মনে করে; যদিও সে অত্যাচারী হয়। অনুরূপ অংশগ্রহণকারীগণ গুরুত্বের সাথে তাদের মতের খন্ডন করে যারা চরমপন্থী দলগুলিকে সংস্কারপন্থী দলগুলির সাথে সম্পৃক্ত করে থাকে বিশেষ করে শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া এবং ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাবের (রাহিঃ) দিকে সম্পৃক্ত করে থাকে; অথচ তারা এ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত যেমন তাদের বই-পুস্তক, বাস্তবতা এবং তাদের সম্পর্কে জ্ঞানীদের মতামত সাক্ষ্য বহন করে।

১১- সালাফীদের বিভিন্ন দল ও চিন্তা-ধারায় বিভক্ত করা যেমন জিহাদী সালাফী ও তাকফীরী সালাফীর প্রকার করা নিছক একটি অপবাদ, যা কেবল সেই বলতে পারে যে সালাফী মানহাজ হতে অজ্ঞ কিংবা প্রবৃত্তি পূজারী। কারণ সালাফী আদর্শ এক অভিন্ন আর তা হচ্ছে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতি অন্য কিছু নয়।  যে এছাড়া যে অন্য মন্তব্য করবে সে অপবাদদাতা অত্যাচারী। চরমপন্থী দলগুলির সালাফিয়্যাতের দিকে নিসবত সঠিক নয়; যদিও কেউ তাদের সেই দিকে সম্পৃক্ত করে থাকে। বরং এই দলগুলির সম্বন্ধে সঠিক মত এই যে তারা খারেজী সম্প্রদায় কারণ বাস্তবতা স্বীকৃত আর দাবী অস্বীকৃত।

১২-সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ মুসলিম শাসকদের আবেদন জানায় তারা যেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতিকে শক্তিশালী করে, প্রচার করে, সমর্থন করে এবং তার সংরক্ষণ করে; কারণ এটা সেই নীতি যাতে রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি, প্রতিপালকের সম্মান, রাসূলের সত্যায়ন সহ তাঁর আনুগত্ব এবং অধীকার বাস্তবায়ন। এই পন্থাই মুসলিম ঐক্য, সংহতি, ভ্রাতৃত্ব, আপসে ভালবাসা, দ্বীন ও দুনিয়ার সফলতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের জামিনদার।

১৩- সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ নিন্দা জানায় ঐসব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মিডিয়ার যারা চরমপন্থীদের সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা সালাফীদের সাথে জুড়ে দিয়ে সালাফীদের দোষারোপ করে; অথচ তারা সম্পূর্ণরূপে তা থেকে মুক্ত যেমন তাদের বই-পুস্তক, তাদের প্রচেষ্টা, উদ্যোগ এবং তাদের অবস্থান সাক্ষ্য দেয়।

১৪-সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ হুছী সম্প্রদায়ের ন্যক্কারজনক অপরাধের চরম ভাবে আপত্তি জানায়, যাতে তারা আল্লাহর ঘরকে উদ্দেশ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, বায়তুল্লাহর সম্মান নষ্ট করে, স্বয়ং মুসলিম ও মুসলিমদের  জান-মাল ও সম্মানে আঘাত হানে। সেই সাথে ইসলামী মৈত্রী জোটের প্রচেষ্টার মূল্যায়ন করে যারা ইসলামের খাতিরে মুসলিমদের সাহায্য সহানুভূতি, শত্রু  হতে তাদের রক্ষা এবং তাদের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। সাথে সাথে আল্লাহর নিকট দুআ করে যেন তিনি তাদের শ্রম সার্থক করেন, তাদের মাধ্যমে দ্বীনের হেফাযত করেন, দ্বীনের কালিমা সমুন্নত করেন, হিদায়েত ও হকের উপর প্রতিষ্ঠিত করেন, তিনিই দুআ শ্রবনকারী, কবূলকারী ও নিকটবর্তী।

অংশগ্রহণকারীগণ পরিশেষে এই সম্মেলনের আয়োজক ‘স্বেচ্ছাসেবক রাব্বানী গ্রুপ’ ও ‘রাফিদ রিসার্চ ও গবেষণা সংস্থা’র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যারা এই বরকতপূর্ণ সম্মেলন আয়োজন করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং সুন্দর প্রস্তুতি, সুষ্ঠ নিয়ম ও উদার আপ্যায়নের মাধ্যমে কনফারেন্সকে সাফল্যমন্ডিত করেছে। আমরা আল্লাহর নিকট দুআপ্রার্থী তিনি যেন তাদের কর্মে বরকত দান করেন, তাদের পদক্ষেপকে বাস্তব রূপ দান করেন এবং এসবকিছুকে সওয়াবের অন্তর্ভুক্ত করেন।

এই শুভ মূহুর্তে তারা বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র মৌরিতানিয়ার সামাহাতুল মুফতী আল্লামা শাইখ আহমদ বিন মুরাবিত হাফিযাহুল্লাহর যিনি যোগ্যতার সহিত এই সম্মেলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর ইলম, আমল ও বয়সে বরকত দান করুন।

আমরা আল্লাহর নিকট তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে দুআ করি তিনি যেন সমগ্র মুসলিম জগতকে এক করে দেন, তাদের মধ্যে ঐক্য প্রদান করেন, তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে দেন, তাদের সত্যের সন্ধান দেন, কল্যানের তাওফিক দেন, ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র এবং প্রতারণা থেকে হেফাযতে রাখেন এবং তিনি যেন তাদের নিজ দয়া, অনুকম্পা ও ক্ষমার ছায়াতলে আশ্রয় দেন এবং তাদের শাসকদের তাঁর বিধানানুযায়ী দেশ পরিচালনার তাউফিক দেন এবং তাঁর নবীর সুন্আতের অনুসরণ করার সুমতি দান করেন।

ওয়অ আখিরু দা’ত্তয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন ওয়া স্বল্লাল্লাহু আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মদ ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি আজমাঈন।

অনুবাদ : আব্দুর রাকীব মাদানী

প্রভাষকঃ জামেয়াতুল ইমাম আল বুখারী।

তাওহীদ এডুকেশনাল ট্রাস্ট, কিশানগঞ্জ, বিহার।

মতামত দিন