ইসলামী শিক্ষা

‘দুনিয়াবী পড়াশোনা’কে ইবাদাতে পরিণত করা-৬

(পূর্বের পর্বগুলি ১ম পর্ব     ২য় পর্ব     ৩য় পর্ব   ৪র্থ পর্ব     ৫ম পর্ব   ৬ষ্ঠ পর্ব   শেষ পর্ব )

মজার ব্যাপার হচ্ছে যে Islam QA ওয়েবসাইটে কো এডুকেশনে পড়া নিষেধ মর্মে যখন একটা ছেলেকে ফতওয়া দেয়া হচ্ছে তখন ব্যতিক্রম উল্লেখ করা হচ্ছে, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে- There is no need for mixing. Studying in this school is not essential; so long as a woman can read and write and knows the teachings of her religion, that is sufficient, because she was created for that, i.e., to worship Allaah. Anything beyond that is not essential. (https://islamqa.info/en/8827 )

এটা নিঃসন্দেহে ফতওয়া যিনি দিয়েছেন তার ব্যক্তিগত অভিমত, তাই এটা আমার জন্য Binding না। তবে এটা পড়ে মনে হচ্ছে যে Teaching of the religion জানার জন্য স্কুলে যাওয়ার কোনো দরকার নেই যদি Co-education ছাড়া কিছু পাওয়া না যায়। অক্ষর জ্ঞানই যথেষ্ট। এই মতটা আমাদের সময়ের জন্য কতটুকু উপযুক্ত তা আল্লাহই ভালো জানেন। কারণ আমি শুরুতেই বলেছি যে দ্বীনের জ্ঞান আর দুনিয়াবী জ্ঞান এই শ্রেণী বিভাগটা কিসের ভিত্তিতে করা হয় সেটা আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট না। অবশ্যই আমি কোনো স্কলারকে অসম্মান করছি না, শুধু তার সাথে বিনয়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি।

এখন আপনি যখন একটা ফতওয়া পড়ছেন তখন সেটার কোন অংশটুকু একজন স্কলারের মত আর কোন অংশটুকু কুরআন হাদীস থেকে সরাসরি আসছে এটা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। মানে কোন অংশটি আমাদের জন্য binding, কোন অংশটা না এটা বুঝতে হবে। যেমন উপরে ইংরেজিতে আমি যে অংশটি তুলে ধরেছি এটাকে আমি নিজের জন্য binding ভাবি না। কিছু কিছু প্র্যাক্টিসিং ভাইদের কিছু কথা শুনলে Honestly আমি খুব অবাক হয়ে যাই। একবার একজন বললেন From when did the guys of Muslim ummah started taking knowledge from women! আর একবার শুনলাম I heard at IOU some courses are taken by females. I hope they are not teaching something wrong. কথা গুলার Tone শুনে আমার মনে হইসে যে মেয়েরা মনে হয় শিয়া বা ক্বাদিয়ানী টাইপের বিভ্রান্ত কোনো গ্রুপ, যাদের কাছ থেকে knowledge নিলে আপনার পরকাল ভেস্তে যাবে।

অথচ ইতিহাস সাক্ষী যে কত মুসলিম মহিলা স্কলারের কাছ থেকে কত বড় বড় আলিম তৈরি হয়েছে। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ইসলাম প্র্যাকটিস করা শুরু করার পরও যদি আপনি মেয়েদেরকে 2nd class citizen ভাবেন, ইসলাম আপনার অন্তরে প্রবেশ করেছে নাকি এটা একটু চেক করা দরকার। আজকে এক বোন যেমন খুব সুন্দর করে বলেছেন যে কিছু ছেলেরা মনে করে রোবট সোফিয়ার সৃষ্টি আর নারী জাতির সৃষ্টি একই কারণে- তারা যা করতে বলবে সেটা করার জন্যই তাদের সৃষ্টি। অথচ আল্লাহ নারী ও পুরুষদেরকে আলাদা কারণে সৃষ্টি করেছেন কী না এমন কিছু আমার জানা নেই। কুরআনের নিচের আয়াতটা আমার খুব প্রিয়-

অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া (এই বলে) কবুল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। (৩:১৯৫)

গত পর্ব আর আজকের পর্ব পড়ে অনেকেই হয়তো ভাবছেন যে এই মেয়ের এত বড় সাহস যে সে Islam QA র ফতওয়া বিশ্লেষণ করছে! সে নিজেকে কী কুতুব ভাবে! আমি ১০০% মনে করি যে এই সাইটে যারা ফতওয়া দেন আমি তাদের পায়ের নখের যোগ্য নই, আমার ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা ABCD লেভেলের। কিন্তু আমি এখানে যা বলছি তা গত ৭-৮ বছর ধরে বিভিন্ন ঘরানার স্কলারের সাথে উঠা বসার ফলেই ডেভেলপ করেছে। IOU তে কাজ করার সুবাদে আমার একাধিক স্কলারের সাথে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। আমি আবারো বলছি- বিভিন্ন ঘরানার, কারণ আমি শুধু একই টাইপের স্কলারদের কাছে আমার জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখতে চাই নি। গত পাঁচ বছরে আমি ২টা দেশে থেকেছি, বহু মানুষের সাথে মিশেছি। এগুলো চিন্তা ভাবনার জগতকে প্রসারিত করে বলে আমি মনে করি। আমার জীবনে আমি যতগুলো Critical decision নিয়েছি যেমন ইসলামিক ফিনান্স পড়ার জন্য মালয়শিয়াতে একা রয়ে যাওয়া, এখানে পিএইচডি শুরু করা……প্রতিটা কাজের আগে আমি কমপক্ষে ৪ জন স্কলারের সাথে কথা বলেছি। আমি তাদের নাম বলতে চাই না……শুধু এটুকু বলতে পারি যে তারা কেউই এলেবেলে কেউ নন। তারা কেউ আমাকে বলেন নি যে কো এডুকেশন মাত্রই হারাম। তাদেরকে আমি আমার পরিস্থিতি বিস্তারিত বলেছি এবং বলার আগে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে নিয়েছি যেন আমি একপেশে কোনো বক্তব্য উপস্থাপন না করি অর্থ্যাৎ আমি যেন এমনভাবে আমার পরিস্থিতি বর্ণনা না করি যাতে আমি যা শুনতে চাই, ঊনারা সেটাই বলেন। And Allah knows the best.

আমি মনে হয় আবারো মূল প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি। আমরা কথা বলছিলাম আইন পেশায় পড়ে অবদান রাখার ব্যাপারে, সে প্রসঙ্গেই ফতওয়া আর শরীয়াহর মাঝে পার্থক্য বলতে গিয়ে এত কথা বলে ফেলেছি।

যাই হোক, পঞ্চমত, ‘ল’ ফিল্ডটাতে একটা খুব কমন কন্সেপ্ট হচ্ছে letter of the law and spirit of the law এর মাঝে Differentiate করা। আমাদের বর্তমান সময়েও আমরা ইস্লামিস্টরা letter of the law কে spirit of the law এর চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেই বলে মনে হয় আমার কাছে।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে মনে হয়। একবার আমার এক পরিচিত আপুর আব্বা হঠাৎ করে মারা গেলেন কানাডার একটা শহরে যেখানে শুধু ঊনারা থাকতেন। এখন একা বাসায় আন্টি মানে আপুর আম্মা একদমই থাকতে পারছিলেন না, ঊনি চাচ্ছিলেন যে দেশে চলে আসবেন। তো আমি পণ্ডিত ভাবছিলাম যে এইভাবে ইদ্দতকাল চলা অবস্থায় একা মাহরাম ছাড়া ঊনার Travel করা উচিৎ হবে নাকি। তো আমি এইটা নিয়ে IOU এর ফিকহ এর একজন টিচারের সাথে কথা বললাম। ঊনি বললেন অবশ্যই উচিৎ হবে কারণ একজন মহিলা একা একটা শহরে এভাবে থাকার চেয়ে Travel করে হলেও ঊনার দেশে মাহরামদের মাঝে থাকাটা বেশী শরীয়াহ সম্মত কারণ সেটাই Maqasid of Shariah র বেশী কাছাকাছি- মেয়েদের একটা নিরাপদ পরিবেশ দেয়া। তখন আমার মনে হয়েছিল যে এটা হচ্ছে letter of the law এর চেয়ে spirit of the law কে বেশী গুরুত্ব দেয়া।

আমি কিছু কিছু বোনকে দেখেছি প্রয়োজন হলে পুরুষ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করাকে শরীয়াহ অনুমোদন দিয়েছে এটা বলে মেয়েদের ডাক্তারী পড়াকেও ফ্রি মিক্সিং এর জন্য নিষেধ করতে। তখন আমার মনে হয়েছে যে ঊনারা Letter of Law টাই দেখছেন যে এটা অনুমোদিত, চিকিৎসার Psychological দিকটা দেখছেন না। ধরেন আপনার লেবার পেইন উঠেছে, প্রচণ্ড ব্যাথায় আপনি চিৎকার করছেন, এখন এইসময়ে একটা মহিলা ডাক্তার অথবা নার্স যদি আপনার হাত ধরে বলে ঠিক হয়ে যাবে, এইতো আর একটু, তখন আপনি যে সাহস ও স্বস্তি পাবেন সেটা কি পাবেন আপনি এক দল পুরুষ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকলে ? যদিও বা শরীয়াহ সেটার অনুমোদন দেয়?

আরো একটা অদ্ভূত লজিক আমি শুনি যে সেক্যুলার মেয়েরা আছে, অন্য ধর্মের মেয়েরা আছে, তারা ডাক্তার হবে। এই যুক্তি শুনলে আমার মনে হয় যে আমরা মুসলিমরা এক অদ্ভূত সুপারিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগি। আমি যা নিজের জন্য পছন্দ করি না, তা সেক্যুলার/ নন-মুসলিম মেয়েদের জন্য চাই? আমি কি তাহলে কখনো চাই না যে তারা ইসলামের ছায়াতলে আসুক? সবচাইতে বড় কথা আমরা কি জানি যে ইসলামিক বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ‘প্র্যাক্টিসিং ডাক্তারদের’ মতামত লাগে? ধরেন আপনি একজন মেয়ে, আপনি দেখাচ্ছেন মেয়ে ডাক্তার, নন মুসলিম। এখন আপনার শারিরীক সমস্যায় আপনি রোযা রাখতে পারবেন কী না এই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আপনার শুধু মুসলিম না বরং প্র্যাক্টিসিং ডাক্তারদের মতামত লাগবে। এটা Islam QA র ফতওয়া। আমি আমার নিজের জীবনে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি, আমি জানি এই সময়ে কেমন অসহায় লাগে যদি ডাক্তার মুসলিম/ দ্বীন বোঝা না হয়।

ডাক্তারী সেবা না হয় সেক্যুলার /নন-মুসলিম মেয়েদের কাছ থেকে নিলেন, কাউন্সেলিং এর সেবা? ধরেন আপনি প্রেগ্ন্যান্সী পরবর্তী ডিপ্রেশনে ভুগছেন। কার কাছে যাবেন? ছেলে কাউন্সেলরের কাছে? সে জীবনে জানে এই অনুভূতি? সেক্যুলার মেয়ে কাউন্সেলরের কাছে? সে আপনাকে কোনোদিনও বলবে যে মন খুব খারাপ থাকলে একটু কুরআন শুইনেন? নাকি রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে বলবে?

আমাদের ইসলামিক ইকোনমিক্সেও এটা একটা বিশাল সমস্যা। এটা নিয়ে আমার গত ৫ বছরের অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা থেকে আমি এটাই বুঝেছি যে আমরা আজকের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাতে letter of the law কে spirit of the law এর চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেই। তাই হয়তো Product গুলোর Form শারিয়াহ সম্মত হয়েছে কিন্তু সেটা সুদ নিষিদ্ধ করার যে উদ্দেশ্য, সেই উদ্দেশ্য সাধনে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে।

আমি আশা করি যে একজন আইনের শিক্ষার্থী আইন নিয়ে তার Diversified, গভীর পড়াশোনা থেকে ইসলামী আইনের এমন প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা করতে পারেন ইনশাল্লাহ।

আমি আগেই বলেছি যে আমি নিজে রিসার্চ করতে ভালোবাসি। তাই না চাইতেও উপরের পয়েন্টগুলা সবই হয়তো রিসার্চের সাথে সম্পর্কিত হয়ে গেছে। ধরুন আপনার এমন দিকে ঝোঁক নাই। তাইলে শুধু ইসলামী আইনগুলো নিয়ে ভালোভাবে জানুন, এই আইনগুলা না জানার কারণে কত মেয়ে যে Domestic Abuse এর স্বীকার হচ্ছে আমাদের ধারণাও নাই। আজকাল প্রচুর ডিভোর্স হচ্ছে দ্বীনী সার্কেলেও এবং কারণগুলো অনেক সময়েই সঙ্গত। সেখানেও মেয়েদের অনেক হেল্প দরকার। মানুষের যে কী সীমাহীণ অজ্ঞতা এসব ব্যাসিক ব্যাপারে তা মানুষের সাথে কথা না বললে বোঝা যায় না। শুধু ইসলামী আইন নিয়ে পড়লে আপনার যে প্রজ্ঞা তৈরি হবে তা অনেকাংশে বাড়বে যদি আপনি ঠিক মত প্রচলিত আইন নিয়ে পড়েন এবং তারপর ইসলামী আইন নিয়ে পড়েন। উত্তরাধিকার আইন নিয়ে পড়াশোনা থাকলে মানুষকে অনেক হেল্প করা যায়……The list can go on and on. এই সাহায্য করার জন্য আপনার পিএইচডি করতে হবে না, কোথাও চাকরি করতে হবে না……।।ছোট্ট বাচ্চার মা হলেও সমস্যা নেই। সপ্তাহে কিছুটা সময় দিবেন বোনদের সাথে স্কাইপে কিংবা অনলাইনে বা বাসাতে। ইনশাল্লাহ তাহলে আপনি হতে পারবেন People of the impact, যেটার কথা আমি শুরুতে বলেছি —

মতামত দিন