যাকাত

যাকাত বিধানের সারসংক্ষেপ (নবম পর্ব)

সদকার আরও কতিপয় শাখা-প্রশাখা

পানি ও ফসল সদকা করা, দুগ্ধদানকারী পশু সদকা করা। অর্থাৎ ফকীরকে দুধেল পশু সদকা করা, সে তার দুধ দোহন করে (খাবে, বেচবে, পনির ও ঘি তৈরি করে) পশুটি মালিককে ফেরত দিবে। এটিও এক প্রকার সদকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«ما مِن مسلم يَغرسُ غرساً، أو يزرع زرعاً، فيأكلُ منه طير أو إنسان أو بهيمة، إلا كانَ له به صدقة».

“যখনি কোনো মুসলিম কোনো গাছ রোপণ করে অথবা ফসল বুনে অতঃপর সেখান থেকে পাখি অথবা মানুষ অথবা চতুষ্পদ জন্তু খায়, এটি অবশ্যই তার জন্য সদকা হিসেবে বিবেচিত হবে”।[1]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদীসে বলেছেন:

«أربعون خَصلة (يعني من خِصال الخير)، أعلاهُنَّ أي في الأجر : مَنِيحَة العَنْز (يعني العَنزة يُعطيها صاحبها لرجل فقير لِيأخذ حَلْبَها)، ما مِن عاملٍ يَعمَلُ بخصلةٍ منها (أي من الأربعين خصلة) رجاءَ ثوابها، وتصديق مَوْعُودِها، إلا أدخله الله بها الجنة».

“চল্লিশটি স্বভাব রয়েছে, (অর্থাৎ ভালো স্বভাব) তন্মধ্যে সবচেয়ে উত্তম স্বভাব: দুধেল ছাগল দান করা, (অর্থাৎ ফকীরকে দুধেল ছাগী দিবে, যেন তার দুধ দোহন করে সে লাভবান হয়) যে কেউ সাওয়াবের আশা নিয়ে ও সদকার ওয়াদাকে সত্য জেনে চল্লিশটি স্বভাব থেকে কোনও স্বভাবের ওপর আমল করবে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন”।[2]

কতিপয় লোকের জন্য নফল ও ফরয সদকা হারাম:

১. সম্পদশালী: ধনী ও বিত্তবানদের জন্য সদকা হারাম। ধনী দ্বারা উদ্দেশ্য, যার নিজের ও পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় বাসস্থান, পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাবার ইত্যাদি রয়েছে। সম্পদশালী হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া জরুরি নয়, প্রয়োজন মোতাবেক সম্পদ থাকাই যথেষ্ট।

২. উপার্জন সক্ষম: উপার্জন সক্ষম ব্যক্তির জন্য সদকা হারাম, তবে সে যদি অপারগ হয়, যেমন তার মানানসই পেশা দিয়ে তার নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা ফকীর ও মিসকীনদের খাত থেকে যাকাত পাবে, কয়েকটি শর্তে, যার আলোচনা পূর্বে করেছি।

৩. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার ও তাদের খিদমাত আঞ্জামদানকারী দাস-দাসী ও স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য সদকা হারাম: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার, যেমন বনু হাশিম, বনু আব্দুল মুত্তালিব, তারা গণিমত থেকে এক পঞ্চমাংশ পাবে।

৪. কাফির অথবা মুশরিককে যাকাত দেওয়া হারাম: যাদের অন্তর ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা জরুরি, তারা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে, তবে তাদেরকে নফল সদকা দেওয়া বৈধ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«تصدقوا على أهل الأديان».

“তোমরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর সদকা কর”।[3]

আসমা বিনতে উমাইসের হাদীসে রয়েছে, মুশরিক অবস্থায় তার মা তাকে দেখতে এসেছিল: তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যত্ন-আত্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, তিনি বলেন: صِلِي أمك “তোমার মায়ের আত্মীয়তার হক রক্ষা কর”।[4]

কয়েকটি জরুরি বিষয়:

১. গরীব স্ত্রী প্রসঙ্গ: স্বামী যদি ধনী হয়, গরীব স্ত্রীকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়, যদি স্বামী স্ত্রী ও স্ত্রীর সন্তানদের ব্যাপারে কৃপণতা না করে। কারণ স্বামীর জন্য স্ত্রী ধনী, তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর। অনুরূপ স্বামীর নিজের সন্তানরাও তার কারণে ধনী, যাবত তার অধীন থাকবে। হ্যাঁ, যদি স্বামী কৃপণ হয়, তবে শাইখ উসাইমীন রহ. বলেছেন: “যদি কোনো স্ত্রীর স্বামী ধনী হয়, কিন্তু সে চরম কৃপণ, এই অবস্থায় স্ত্রীকে যাকাত দেওয়া বৈধ, কারণ সে ফকীর”।[5]

২. পাঁচ প্রকার সম্পদশালীর জন্য যাকাত বৈধ, যদিও তারা ধনী:

ক. যাকাতের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ: যদিও তারা নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় সম্পদের মালিক, তবুও তাদেরকে যাকাত দিবে, কারণ যাকাত বণ্টনের আয়াত তাদেরকে হকদার ঘোষণা করেছে।

খ. ঋণগ্রস্ত ধনী: যদিও তার নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় সম্পদ রয়েছে, তবে ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ্য তার নেই, তাকে যাকাত দেওয়া বৈধ, যেমন পূর্বে আলোচনা করেছি।

গ. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী, যদিও সে ধনী, তার জিহাদের খরচ যাকাত থেকে বহন করা বৈধ।

ঘ. কোনও মিসকীন যাকাত গ্রহণ করে যদি কোনও ধনীকে হাদিয়া দেয়, তাহলে ধনীর জন্য যাকাতের হাদিয়া গ্রহণ করা বৈধ।

ঙ. ফকীর থেকে যদি ধনী ব্যক্তি নিজের অর্থ দিয়ে যাকাত খরিদ করে সেই যাকাত তার জন্য বৈধ। উদাহরণত কোনও ফকীর ফল বা চতুষ্পদ জন্তু যাকাত পেয়েছে, সে তার যাকাত কোনও ধনীর নিকট বিক্রি করে দিল, ধনীর জন্য এই যাকাত হালাল। এ থেকে আরেকটি জিনিস প্রমাণ হয় যে, যাকাতের হকদার যাকাত দিয়ে ব্যবসা করতে পারবে এবং তার থেকে ধনী-গরিব সবার জন্যই ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ, তবে ফকীরকে সদকা করে সেই সদকা দানকারীর ক্রয় করা পছন্দনীয় নয়, মাকরুহ।

যাকাত সংক্রান্ত কয়েকটি মাসআলা:

১. স্ত্রী যদি ধনী হয় এবং তার নিকট নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, সে কি ফকীর স্বামীকে যাকাত দিবে?

উত্তর: হ্যাঁ, স্ত্রীর জন্য তার গরীব স্বামীকে সদকা দেওয়া বৈধ, সেটি যাকাতের ন্যায় ওয়াজিব সদকা হোক বা নফল সদকা। আলিমদের এটিই বিশুদ্ধ মত, বরং স্বামীকে সদকা দেওয়া অপরকে সদকা দেওয়া অপেক্ষা উত্তম, কারণ সে দু’টি সাওয়াব পাবে: আত্মীয়তা রক্ষা ও সদকার সাওয়াব।

২. পিতা-মাতা, সন্তান ও স্ত্রীকে যাকাত দেওয়ার বিধান: নিজের স্ত্রীকে স্বামীর যাকাত দেওয়া বৈধ নয়, যদিও সে গরীব হয়। কারণ, স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর, তাই স্বামীর কারণে স্ত্রী যাকাতের মুখাপেক্ষী নয়। অনুরূপ স্ত্রীর মতই পিতা-মাতা, সন্তান, দাদা-দাদী ও নাতি-নাতনি, তারা ফকীর হলেও তাদের যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। তারা যদি ঋণী অথবা আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ অথবা মুসাফির হয় তাদেরকে যাকাত দেওয়া বৈধ, তারা তখন যাকাতের হকদার অন্য কারণে, আত্মীয়তা তাতে বাঁধ সাধবে না। কারণ, তাদেরকে যুদ্ধে পাঠানোর ব্যবস্থা করা তার ওপর জরুরি নয় অথবা তাদের ঋণ পরিশোধ করা কিংবা তাদের অন্যান্য খরচ বহন করা তার দায়িত্ব নয়। তার দায়িত্ব শুধু তাদের ভরণ-পোষণ করা, যথা অর্থনৈতিক সামর্থ্য মোতাবেক খাবার, বাসস্থান ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا مَآ ءَاتَىٰهَاۚ ٧﴾ [الطلاق: 7]

“আল্লাহ কাউকে যা দিয়েছেন সেটার আওতার বাইরে দায়িত্ব দেন না”। [সূরা আত-ত্বালাক, আয়াত: ৭]

এ ছাড়া অন্যান্য আত্মীয় যেমন ভাই, বোন, চাচা, মামা এবং বিবাহিত ছেলে, যার সংসার পিতার সংসার থেকে পৃথক, যদি তাদের উপার্জন তাদের নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য যথেষ্ট না হয় তাদেরকে যাকাত দেওয়া বৈধ। অনুরূপ যার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তার ওপর রয়েছে সে যদি যাকাতের আট খাত থেকে কোনও এক-খাতের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাকে যাকাত দেওয়া বৈধ, কারণ সে যাকাতের হকদার, বরং অন্যদের অপেক্ষা তাকে যাকাত দেওয়া উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«صدقة ذي الرَحِم على ذي الرَحِم: صدقة وَصِلَة».

“আত্মীয়ের জন্য আত্মীয়ের সদকা: সদকা ও আত্মীয়তার সুরক্ষা দু’টি”।[6]

আরেকটি বিষয়, কেউ যদি নিজের যাকাত শরী‘আতসম্মতভাবে হকদারদের মাঝে বণ্টন করার জন্য কাউকে প্রদান করে, অতঃপর সে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করে দেয়, তার থেকে কিছু অংশ যদি যাকাত দাতার পরিবারের কেউ পায়, যার ভরণ-পোষণের দায়িত্বে তার ওপর রয়েছে তাতে কোনও সমস্যা নেই।

৩. কাফিরদের যাকাত দেওয়ার বিধান: ইসলামের সাথে বিদ্বেষ পোষণকারী কাফিরদের যাকাত দেওয়া বৈধ নয়, অনুরূপ জিম্মিদেরকেও যাকাত দেওয়া বৈধ নয়, অর্থাৎ যেসব অমুসলিম নিরাপত্তার চুক্তি নিয়ে মুসলিম দেশে বাস করে, বিশুদ্ধ মতে তাদেরকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়, তবে সদকা ও অন্যান্য দান দেওয়া বৈধ।

জ্ঞাতব্য, যার ওপর যাকাত ফরয তার উচিৎ যাকাত বণ্টনের জন্য নেককার ও আহলে ইলমদের প্রাধান্য দেওয়া, যেন তারা আল্লাহর আনুগত্য ও ইলম চর্চা করতে সক্ষম হয়। যে পাপ ও গুনাহের কাজে যাকাত খরচ করবে তাকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। কারণ, তাকে যাকাত না দেওয়া পাপ বন্ধ করার একটি উপায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ ٢﴾ [المائدة: 2]

“তোমরা পাপ ও গুনাহের ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য কর না”। [সূরা আল-মায়েদাহ্, আয়াত: ২]

যার সম্পর্কে ভালো-মন্দ জানা নেই, তাকে যাকাত দিতে সমস্যা নেই। কারণ, অপর সম্পর্কে ভালো ধারণা করাই ইসলামের নীতি, যদি তার বিপরীত স্পষ্ট না হয়। অনুরূপ কারও সম্পর্কে যদি জানা যায় সে ফাসিক, তাকে ভালো করার জন্য যাকাত দিতে বাধা নেই। কারণ, দীনের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যে আল্লাহ যাকাতে অংশ রেখেছেন, যা পূর্বে বর্ণনা করেছি।

ইবন তাইমিয়াহ রহ. বলেন: “যাকাত দাতার উচিৎ যাকাতের জন্য শরী‘আতের পাবন্দ ফকীর, মিসকীন, ঋণগ্রস্ত ও অন্যান্য হকদার অন্বেষণ করা, বিদ‘আতী ও পাপে লিপ্তদের যাকাত না দেওয়া। কারণ, তারা শাস্তির উপযুক্ত, তাদেরকে সাহায্য করা বৈধ নয়, বরং যাকাত না দিয়ে শাস্তি দেওয়া উচিৎ”।[7] তিনি আরও বলেন: “যে সালাত পড়ে না তাকে যাকাত দিবে না, যতক্ষণ না সে তাওবা করে সালাত পড়া আরম্ভ করে”।[8]

৪. উপযুক্ত হকদারকে যাকাত দেওয়ার চেষ্টা করার পরও যদি কারও যাকাত এমন লোকের হাতে যায়, যে তার হকদার নয়, তার বিধান কী?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: জনৈক ব্যক্তি বলল:لأتصدقنَّ بصدقة  (আজ আমি অবশ্যই সদকা করব), অতঃপর সে তার সদকা নিয়ে বের হলো, তার সদকা পড়ল জনৈক চোরের হাতে, সকাল বেলা লোকেরা বলাবলি করল: আজ রাতে চোরকে সদকা করা হয়েছে। সে বলল: اللهم لك الحمد، لأتصدقنَّ بصدقة (হে আল্লাহ তোমার জন্যই সকল প্রশংসা, আমি অবশ্যই সদকা করব)। সে তার সদকা নিয়ে বের হল, তার সদকা পড়ল জনৈক ব্যভিচারীর হাতে। মানুষেরা সকাল বেলা বলাবলি করল: আজ রাত ব্যভিচারীকে সদকা করা হয়েছে। সে আবার বলল: اللهم لك الحمد: على زانية!، لأتصدقنَّ بصدقة (হে আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা, ব্যভিচারী সদকা পেল! আমি অবশ্যই সদকা করব)। সে তার সদকা নিয়ে বের হল, তার সদকা পড়ল জনৈক ধনীর হাতে, তারা সকাল বেলা বলাবলি করল: আজকে ধনীকে সদকা করা হয়েছে। অতঃপর সে বলল:

«اللهم لك الحمد: على سارق، وعلى زانية، وعلى غني!!». 

“হে আল্লাহ, তোমার জন্যই সকল প্রশংসা, চোরের হাতে সদকা, ব্যভিচারীর হাতে সদকা ও ধনীরে হাতে সদকা। তাকে (স্বপ্নে) হাযির করে বলা হল: চোরের ওপর তোমার সদকার কারণ হয়তো সে চুরি থেকে বিরত থাকবে। ব্যভিচারিণীর ওপর তোমার সদকার কারণ হয়তো সে ব্যভিচার থেকে বিরত থাকবে, আর ধনীর ওপর তোমার সদকার কারণ হয়তো সে উপদেশ নিয়ে আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে সদকা করবে”।[9]

অত্র হাদীস প্রমাণ করে, সদকা দিতে কেউ ভুল করলে সদকা গ্রহণযোগ্য। গ্রহণযোগ্য অর্থ কি? এতে আলিমগণ ইখতিলাফ করেছেন, বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, কেউ যদি সঠিক স্থানে যাকাত দেওয়ার চেষ্টা করেও ভুল করে সে অপারগ, পুনরায় তাকে যাকাত দিতে হবে না। কারণ, আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে শ্রম দিতে বলেন নি। আর যদি অবহেলা অথবা ভ্রূক্ষেপহীনতা থেকে ভুল হয়, তবে যাকাত সঠিক স্থানে না দেওয়ার কারণে পুনরায় তাকে যাকাত দিতে হবে। আল্লাহ ভালো জানেন।

৫. কেউ যদি যাকাত চায়, অথচ সে দেখতে স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী, কাজ করার ধৈর্য ও সক্ষমতার অধিকারী, তাকে কি যাকাত দেব?

শাইখ ইবন উসাইমিন রহ. বলেন: আগে তাকে উপদেশ দিন, যেরূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপদেশ দিয়েছেন, যখন তার নিকট দু’জন স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি প্রার্থনা করেছিল:

«إن شئتُما أعطيتكما، وَلاَ حَظَّ فيها (أي: لا حَقَّ، ولا نصيبَ في الصدقة) لِغَنِيّ، ولا لِقَوِيٍّ مُكْتَسِب».

“যদি চাও তোমাদেরকে দিব, তবে এতে (অর্থাৎ সদকায়) ধনীদের কোনো অংশ নেই, আর না আছে কর্ম সক্ষম শক্তিশালী ব্যক্তির জন্য”।[10]  উপদেশ পেয়েও যদি সদকা গ্রহণ করে, অথচ সে সদকার হকদার নয়, তাহলে সেই পাপী হবে, সদকা দানকারীর পাপ হবে না।

৬. কাউকে যাকাত দেওয়ার সময় যাকাত বলা কি জরুরি? এতে আহলে ইলমগণ ইখতিলাফ করেছেন: যাকাত বলা জরুরি নয় মতটি অধিক বিশুদ্ধ; যখন এটা স্পষ্ট হবে যে লোকটি যাকাত নেওয়ার উপযুক্ত।

৭. কারও সম্পদ যদি বছরের মাঝখানে ধ্বংস হয়। যেমন, ক্ষতিগ্রস্ত হল অথবা কেউ আত্মসাৎ করল অথবা কেউ তার মাঝে ও তার সম্পদের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল, এই অবস্থায় তার ওপর যাকাত নেই। কারণ, আত্মসাৎ করা, ধ্বংস হওয়া বা ছিনিয়ে নেওয়া সম্পদের যাকাত দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই, এই অবস্থায় যদি তাকে যাকাত দিতে বলা হয় তার জন্য কঠিন ঠেকবে, যা আল্লাহ দূর করে দিয়েছেন, তিনি বলেছেন:

﴿وَمَا جَعَلَ عَلَيۡكُمۡ فِي ٱلدِّينِ مِنۡ حَرَجٖۚ ٧٨﴾ [الحج: 78]

“আর তিনি দীনের ভিতর কোনো সংকীর্ণতা বা সমস্যা রাখেন নি”। [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৭৮]

৮. মূল সম্পদ থেকে পৃথক করার পর যাকাত ধ্বংস হলে করণীয় কি?

যদি যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পর মূল সম্পদ থেকে পৃথক করা রাখা হয়, অতঃপর তা ধ্বংস বা চুরি হয়, যদিও তা হয় যাকাত বণ্টনের জন্য নিয়ে সাওয়ার পথে, পুনরায় তাকে যাকাত দিবে হবে, কারণ তার জিম্মায় যাকাত বাকি আছে। এটি আলিমদের বিশুদ্ধ মত। ইবন হাযম জাহিরির মাযহাবও এটি। তিনি বলেছেন: “কারণ, যাকাত তার জিম্মায় রয়ে গেছে, আল্লাহ যাকে যাকাত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তার নিকট সে পৌঁছে দিবে”।

৯. যাকাত দ্বারা যদি ফকীরদের প্রয়োজন পূরণ না হয়, তাদেরকে নফল সদকা দেওয়া ধনীদের ওপর ওয়াজিব, যেমন খাদ্য-শস্য, পোশাক-পরিচ্ছদ ও বাসস্থান ইত্যাদি। এ কথার সপক্ষে ইবন হাযম রহ. একাধিক দলীল পেশ করেছেন[11], যথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«أطعِمُوا الجائع، وَعُدُوا المريض، وفكوا العاني (أي: الأسير)».

“তোমরা ক্ষুধার্তকে খাবার দাও, রোগীকে দেখতে যাও এবং বন্দীকে মুক্ত কর”।[12]

১০. কারও ওপর যাকাত ফরয, সে যদি যাকাত না দিয়ে মারা যায়, মিরাস বণ্টন করার পূর্বে তার যাকাত দেওয়া জরুরি, ঋণের মতো ওসিয়তের আগে যাকাত আদায় করবে।

১১. নির্দিষ্ট সময় থেকে যাকাত বিলম্ব করার বিধান: যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সাথে-সাথেই যাকাত আদায় করার নিয়ম, তবে কোনো ওজর-অপারগতা অথবা ক্ষতির আশঙ্কা হলে বিলম্ব করা বৈধ। ওজরের উদাহরণ, যেমন সম্পদ কাছে নেই তাই যাকাত দিতে পারেনি। ক্ষতির উদাহরণ, যেমন ফকীরদের ভেতর অনেক চোর আছে, যদি তারা টের পায় তিনি যাকাত দিবেন, তারা জেনে যাবে তিনি বিত্তশালী, তাই যে কোনো মুহূর্তে তার ওপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

আরেকটি বিষয়: কোনও উপকারের স্বার্থে যাকাত দেরিতে দেওয়া বৈধ, যদি ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। শাইখ ইবন উসাইমীন রহ. বলেছেন: “উপকারের স্বার্থে বিলম্বে যাকাত দেওয়া বৈধ, তবে মূল সম্পদ থেকে পৃথক স্থানে বা কোথাও লিখে রাখা জরুরি। যেমন, ‘এই যাকাত ওয়াজিব হয়েছে রমযানে গরীবদের স্বার্থে শীতকালের অপেক্ষা করছি’ এরূপ লিখে রাখা। অর্থাৎ তার যাকাত হচ্ছে শীত নিবারণের পোশাক, যা শীতকালে বণ্টন করাই শ্রেয়। এরপর যদি যাকাত না দিয়ে মারা যায় ওয়ারিশদের বিষয়টি জানা থাকবে”।[13]

১২. সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যাকাত দেওয়া বৈধ, বিশেষভাবে যদি তাতে গরীবদের উপকার হয়। যেমন, জানা গেল যাকাতের জনৈক হকদার অর্থাৎ আট প্রকার থেকে কেউ হঠাৎ সমস্যার সম্মুখীন বা অর্থের মুখাপেক্ষী, তাকে সময় হওয়ার আগে যাকাত দেওয়া বৈধ। আর যদি যাকাত দানকারী নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয়, তবে এই আশায় যাকাত দিল যে, ভবিষ্যতে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তার এই দান সাধারণ সদকা হবে, যাকাত হবে না।

উল্লেখ্য, আমরা মনে করি, কেউ আছেন যিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক, যার মূল্য ৬০ হাজার টাকা, অতঃপর সে পাঁচ বছর যাকাত থেকে বিরত থাকল। তবে এই পাঁচ বছর তার সম্পদ যাকাতের নিসাব থেকে কমেনি। এমতাবস্থায় বিশুদ্ধ মতে সে এক বছরের যাকাতের পরিমাণকে পাঁচ দিয়ে গুণ দিয়ে পাঁচ বছরের যাকাত একসাথে পরিশোধ করবে, যেমন এক বছরের যাকাত ৬০,০০০*২.৫%= ১৫০০ টাকা, পাঁচ বছরের যাকাত হবে ১৫০০*৫= ৭৫০০ টাকা। একসঙ্গে এই যাকাত দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে ধীরে ধীরে দিবে।

১৩. আয়াতে উল্লিখিত আটটি খাতেই যাকাত দেওয়া উত্তম, তবে কেউ যদি এক খাতে যাকাত দেয় তাতেও সমস্যা নেই। অধিকাংশ আলিম বলেছেন এ কথা, এটিই সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ।

১৪. যাকাত নিজে বণ্টন করা বা বণ্টন করার দায়িত্ব অপরকে দেওয়া উভয়ই বৈধ, তবে ইবাদতের সাওয়াব হাসিল করার জন্য নিজের যাকাত নিজে বণ্টন করাই উত্তম, যেন সঠিক স্থানে আদায় করার নিশ্চিয়তা হাসিল হয়। বিশেষভাবে তার পক্ষে যাকাত আদায়কারী প্রতিনিধি সম্পর্কে যদি সম্যক ধারণা না থাকে। অনুরূপ একই হুকুম রাখে যদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নিকট কুরবানি করার শর্তে টাকা জমা দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে নিজের কুরবানি নিজে দেওয়াই উত্তম, তবেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা হাসিল হয়।

১৫. যাকাত বের করার সময় অন্তরে নিয়ত করা ওয়াজিব:

নিজের সম্পদ থেকে যাকাত বের করার নিয়ত করবে, সে নিজে বের করুক বা তার উকিল বের করুক। যদি তার যাকাত এমন কেউ বের করে, যাকে সে প্রতিনিধি করে নি, তবে যাকাত বের করার পর তার কর্মকে বৈধতা দেয়, এই অবস্থায় যাকাত আদায় হবে, না পুনরায় আদায় করবে?

এতে আলিমদের দু’টি মত রয়েছে: বিশুদ্ধ মতে যাকাত আদায় হবে, তবে আদায় না হওয়ার মতের মধ্যে সতর্কতা বেশি।[14]

১৬. আলিমদের বিশুদ্ধ মতে দেশের বাইরের গরীবদের জন্য যাকাত প্রেরণ করা বৈধ, বিশেষভাবে যদি তার ধারণা হয় তার নিজের দেশের গরীব অপেক্ষা বাইরের গরীবরা যাকাত দ্বারা বেশি উপকৃত হবে। যেমন, তারা বেশি গরীব অথবা তার আত্মীয়দের থেকে বেশি গরীব অথবা তাদের যাকাত দিলে নেকি বেশি হবে, যেমন তারা ইলম হাসিল করবে। যদি অপর দেশে যাকাত প্রেরণ করায় বিশেষ ফায়দা না থাকে কাছের লোকদের দেওয়াই উত্তম। কারণ, তাদের হককে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি পূরণ হয়। দ্বিতীয়ত যাকাত অন্য জায়গায় প্রেরণ করা অপেক্ষা নিজের দেশে দেওয়া অতি সহজ ও নিরাপদ, অধিকন্তু তার যাকাতের সাথে প্রতিবেশী গরীবদের অন্তর সম্পৃক্ত, বিশেষভাবে যদি যাকাত প্রকাশ্য হয়, অতএব, তারা যাকাত পেলে তাদের মহব্বত বৃদ্ধি পাবে ও তাদের অন্তর আকৃষ্ট হবে।

উল্লেখ্য যে, যাকাত স্থানান্তর করার খরচ যাকাত থেকে দেওয়া যাবে না, বরং যাকাত দানকারী নিজের পক্ষ থেকে বহন করবে।[15]

১৭. সরকারকে প্রদেয় ফি বা কর, যেমন ট্যাক্স, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল বা অন্যান্য বিল, যেভাবেই পেশ করা হোক, ফরয যাকাত থেকে গণ্য করা যাবে না, বরং এ জাতীয় বিল দেওয়ার পর যে সম্পদ বাকি থাকবে তার যাকাত দেওয়া ওয়াজিব। এসব বিল বৈধ বা অবৈধ যেভাবে গ্রহণ করা হোক তার প্রভাব যাকাতে পড়বে না।

১৮. প্রয়োজন হলে মুসলিম শাসকগণ গরীবদের জন্য ঋণ নিবেন, অতঃপর যখন যাকাত উসুল করে সেই ঋণ পরিশোধ করবেন। তাদের জন্য এরূপ করা বৈধ।

১৯. যাদের ওপর কাফফারা ওয়াজিব, তাদেরকে যাকাত দেওয়া জায়েয, যদি তারা যাকাতের হকদার হয়। অনুরূপ যার ওপর হত্যার দিয়াত ওয়াজিব, যদি হত্যাকারী চিহ্নিত না হয়, তাকেও যাকাত দেওয়া বৈধ।

চলবে……

(লেখকঃ রামি হানাফী মাহমুদ)

তথ্যসূত্রঃ

[1] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।

[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৩১।

[3] সিলসিলাহ সহীহাহ: (৬/৬২৮)।

[4] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।

[5] আশ-শারহুল মুমতি‘: (৬/২৪২)।

[6] সহীহুল জামে‘ হাদীস নং ৩৭৬৩।

[7] মাজমুউ ফাতাওয়া: ২৫/৮৭।

[8] আল-ইখতিয়ারাত আল-ফিকহিয়্যাহ: (পৃ.৬১)

[9] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।

[10] সহীহুল জামে‘, হাদীস নং (১৪১৯)।

[11] দেখুন: মুহাল্লা: (৬/২২৪)।

[12] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৩৭৩।

[13] আশ-শারহুল মুমতি‘: (৬/১৮৯)।

[14] আশ-শারহুল মুমতি‘: (৬/২০৫)।

[15] আশ-শারহুল মুমতি‘: (৬/২১৩)।

মতামত দিন