প্রবন্ধ

নেতৃত্ব এক মহান দায়িত্ব

রচনায় : কামাল উদ্দিন মোল্লা

মানুষের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলীর পরিপূর্ণতা আসে স্বভাবজাত গুণাবলী ও অর্জিত গুণাবলীর সংমিশ্রণের ফলে। সমাজের নেতা হন কম সংখক ব্যক্তি কিন্তু তাদের অনুসারী হন অনেক বেশি। নেতা যেদিকে চলেন সাধারণ মানুষ পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই তাদেরকে অনুসরণ করে থাকে। নেতার একটি ভুল বিরাট জনতাকে ধ্বংসের অতল তলে নিক্ষেপ করে থাকে। তাই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জগতের সাফল্যের জন্য সঠিক নেতৃত্বের অনুসরণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নেতাদের দায়িত্ব সাধারণ মানুষদেরকে বিপথে পরিচালিত না করে সঠিক পথে পরিচালিত করা। নয়ত বিচার দিনে তারা সাধারণ মানুষের অভিযোগের মুখোমুখি হবেন এবং কঠিন শাস্তির জন্য বিবেচিত হবেন। এ কথাটি কোরআন পাকে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরা আহযাবে এরশাদ হচ্ছে–

يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا ﴿66﴾ وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا ﴿67﴾ رَبَّنَا آَتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا ﴿68﴾

যেদিন অগ্নিতে তাদের মুখমন্ডল ওলট পালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রসূলের আনুগত্য করতাম। তারা আরো বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা আমাদের নেতা ও বড়তের কথা মেনেছিলাম, অতঃপর তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের পালনকর্তা! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদেরকে মহা অভিসম্পাত করুন। (সূরা আহযাব : ৬৬ – ৬৮)

আল্লাহর প্রতি আনুগত্যহীন নেতৃত্ব সমাজের নৈতিক কাঠামো ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে বিনষ্ট করে দেয়। এ অবস্থা থেকে বাঁচা তখনই সম্ভব যখন সমাজের ঐসব লোক, যারা সমাজের গণ্যমান্য এবং ইহার রাজনৈতিক ও চিন্তার ক্ষেত্রে দিকনির্দেশ করে থাকে, তারা কোন বিশেষ বিশ্বাস ও নীতিবোধ দ্বারা পরিচালিত হয় এবং কোন মূল্যের বিনিময়েই উহাকে পরিত্যাগ করতে রাজি থাকে না। এসব আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচারী নেতাদেরকে তাদের ধন সম্পদ ও পার্থিব উন্নতি আল্লাহর ক্রোধানল হতে বাঁচবার নিশ্চয়তা দেয়না। অসৎ নেতৃত্বের অনুসারীরা আল্লাহর রোষানল থেকে বেঁচে যাবে এমন ধারণা ঠিক নয়। উভয় দলই পাপিষ্ট। এরশাদ হচ্ছে :

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَنْ نُؤْمِنَ بِهَذَا الْقُرْآَنِ وَلَا بِالَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ مَوْقُوفُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ الْقَوْلَ يَقُولُ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لَوْلَا أَنْتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِينَ ﴿31﴾ قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا أَنَحْنُ صَدَدْنَاكُمْ عَنِ الْهُدَى بَعْدَ إِذْ جَاءَكُمْ بَلْ كُنْتُمْ مُجْرِمِينَ ﴿32﴾ وَقَالَ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُونَنَا أَنْ نَكْفُرَ بِاللَّهِ وَنَجْعَلَ لَهُ أَنْدَادًا وَأَسَرُّوا النَّدَامَةَ لَمَّا رَأَوُا الْعَذَابَ وَجَعَلْنَا الْأَغْلَالَ فِي أَعْنَاقِ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿33﴾

আপনি যদি পাপিষ্টদেরকে দেখতেন, যখন তাদেরকে তাদের পালনকর্তার সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা পরস্পর কথা কাটাকাটি করবে। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, তারা অহংকারীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা মুমিন হতাম। অহংকারীরা দুর্বলকে বলবে, তোমাদের কাছে হেদায়েত আসার পর আমরা কি তোমাদের বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরাই তো ছিলে অপরাধী। দুর্বলরা অহংকারীদেরকে বলবে, বরং তোমরাই তো চক্রান্ত করে আমাদেরকে নির্দেশ দিতে যেন আমরা আল্লাহকে না মানি এবং তার অংশীদার সাব্যস্ত করি। তারা যখন শাস্তি দেখবে, তখন মনের অনুতাপ মনেই রাখবে। (সূরা সাবা : ৩১-৩৩)

তবে কোরআনের প্রতি গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সমাজের বিপর্যয় ও অন্যায় অনাচারের জন্য অধিকতর দায়ী সমাজের বিত্তবান ও নেতারা। যেমন এরশাদ হচ্ছে :

وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ ﴿34﴾ وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَأَوْلَادًا وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ ﴿35﴾

কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করা হলেই তার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলতে শুরু করেছে, তোমরা যে বিষয়সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা মানি না। তারা আরো বলেছে, আমরা ধনে জলে সমৃদ্ধ, সুতরাং আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না। (সূরা সাবা : ৩৪ – ৩৫)

কোরআন তাদের এ দাবির প্রতিবাদ করে যে, যেহেতু তারা সম্পদ, ক্ষমতা ও সংখ্যাধিক্যের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ, কাজেই কোন রকম শাস্তি থেকে তারা নিশ্চিতরূপে মুক্ত। এ পরিপ্রেক্ষিতে কোরআনের বক্তব্য হচ্ছে, “আর তোমাদের সম্পদ এবং সন্তান এমন বস্তু নয় যে যা তোমাদেরকে মর্যাদায় আমার নিকটবর্তী করে দিতে পারে। তবে হ্যাঁ, যারা ঈমান আনবে এবং নেক কাজ করবে, পরন্তু তরুণ লোকদের জন্য তাদের কাজের দ্বিগুণ বিনিময় রয়েছে। এবং তারা উত্তমস্থানে শান্তিতে থাকবে।‌‌” যারা দীর্ঘকালব্যাপী পার্থিব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক থাকে, তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। সম্পদ ও ক্ষমতার প্রমোদ তাদেরকে সদাচার ন্যায় পরায়ণতা ও যুক্তির দাবির প্রতি বধির করে দেয়। তাদেরকে এটা বিশ্বাস করানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য যে, তারা যে পথ অনুসরণ করছে, তা শেষ পর্যন্ত তাদেরকে পার্থিব ও আধ্যাত্মিক ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। যে সমস্ত লোক এমন ধরনের নেতৃত্বের অধীনে জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হল তারা পরকাল দিবসে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলবে:

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا رَبَّنَا أَرِنَا الَّذَيْنِ أَضَلَّانَا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ نَجْعَلْهُمَا تَحْتَ أَقْدَامِنَا لِيَكُونَا مِنَ الْأَسْفَلِينَ ﴿29﴾

হে আমাদের পালনকর্তা, যেসব জিন ও মানুষ আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদের দেখিয়ে দাও, আমরা তাদের পদদলিত করব, যাতে তারা যথেষ্ট অপমানিত হয়। (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ২৯)
কোরআনের এসব আয়াত থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়ে থাকে যে দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্বের কারণে একটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্য নেমে আসে। জাতীয় দুর্ভাগ্যের একটি মারাত্মক কারণ হচ্ছে– ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্নীতিপরায়ন নেতৃত্বের উত্থান এবং জনসাধারণ কর্তৃক উহা মেনে নেয়া।
কোরআনের মতে যেকোন প্রকার পাপ ও অন্যায় কাজের বিস্তার রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব রয়েছে জাতীয় নেতৃবৃন্দের উপরই। যদি এতে তারা ব্যর্থ হন, তবে তারা যে সমাজের মধ্যমণি উহার নৈতিক অধঃপতনের দায়িত্ব তাদেরকেই বহন করতে হবে।
একটি জাতির অধঃপতন ও ধ্বংস ঠেকাতে পারে সমাজের নেতা ও মুরববীরা। এটা তাদেরই দায়িত্ব। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যখন জাতির মধ্যে কেউ পাপ কাজ করে এবং তার থেকে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী তাকে বাধা প্রদান না করে, তবে শাস্তি তাদের সবাইকে গ্রাস করে ফেলবে’’ তাই জাতির সংরক্ষণে সমাজের দায়িত্বশীলদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। নয়ত তাকেও পরকালে বহুগুণ আজাবের সম্মুখীন হতে হবে।

মতামত দিন