প্রবন্ধ

ইসলাম ও যুক্তিবাদ

ইসলাম ও যুক্তিবাদ

– আব্দুল্লাহ আল কাফী।
অনেক মানুষ ইসলামের বিভিন্ন বিষয় যুক্তি দ্বারা বুঝতে চায়। অথচ ইসলাম যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কেননা আমার যুক্তিতে যেটা সঠিক আপনার যুক্তিতে সেটা সঠিক নাও হতে পারে। একেক মানুষের যুক্তি একেক রকম। আর যুক্তি ও বিবেক কখনো সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। যারা যুক্তি ও বিবেক দিয়ে ইসলাম বুঝতে চায়, তারা বেশীর ভাগ সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। কেননা সে ইসলামের বিষয়গুলো নিজের স্থূল যুক্তি দ্বারা সত্য না মিথ্যা যাচাই করতে চায়; অথচ সে জানে না তার ঐ যুক্তি নির্ভর জ্ঞান খুবই সীমিত। যদি বলেন, যে কোন বিষয় আগে যুক্তি দিয়ে যাচাই করব, বিবেক দ্বারা বিচার করব তারপর মানব। তাহলে নির্ঘাত আপনি বিভ্রান্ত হয়ে যাবেন। শয়তান আপনাকে তার শিকারে পরিণত করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
ইবলিস প্রথম যুক্তিবাদীঃ কেননা ইবলিসই প্রথম যুক্তির অবতারণা করেছিল। সেই সর্বপ্রথম যুক্তির অযুহাত দেখিয়ে স্রষ্টার আদেশ লঙ্ঘণ করেছিল। যখন আদম (আঃ)কে সিজদার আদেশ করা হল। ইবলিস বলল, এটা কি করে সম্ভব? আপনি তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা, আর আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন দ্বারা। মাটির স্বভাব অধঃমুখী আগুনের স্বভাব উর্দ্ধমুখী। উর্দ্ধমুখী বস্তু অধঃমুখী বস্তুকে সিজদা করতে পারে না। তার দৃষ্টিতে খুব সুন্দর যুক্তি। কিন্তু আল্লাহ তার যুক্তিকে গ্রাহ্য করেননি। কেননা সে আল্লাহর আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছে যুক্তির দলীল দ্বারা।
এই জন্যে তো বিকৃত মস্তিস্ক যুক্তিবাদীরা দাবী করছেন, পুরুষ যদি চারটি স্ত্রী রাখার অনুমতি পায়, তাহলে নারী কেন সে অনুমতি ও অধিকার পাবে না? কারণ তারা উভয়েই তো মানুষ। সুতরাং কেন এই ভেদাভেদ। ফলে তারা যোগ দিল ঐ ব্যক্তি তথা ইবলিসের দলে, যে আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম যুক্তি খাড়া করেছিল। এই সমস্ত যুক্তিবাদিরা যুক্তির দলীল দেখিয়ে নিজের মা-বোন-মেয়ের সাথেও যৌনতা করতে দ্বিধা করে না। কেননা তারাও তো নারী। স্ত্রী হিসেবে যাকে বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়েছে সে যেমন নারী ওরাও তো তেমন নারী, এর নিকট যা আছে ওদের নিকটও তা আছে, কি পার্থক্য? সুতরাং একজনমাত্র স্ত্রীর কাছেই যেতে হবে এটা অযৌক্তিক।
একাধিক বিবাহঃ এ যুক্তি সঠিক যে, একজন মানুষ একজন স্ত্রী নিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দিতে সক্ষম, তাহলে তার একাধিক বিবাহের কি দরকার? কিন্তু চিন্তা করা আবশ্যক, এ যুক্তিও তো সঠিক যে, বিবাহ না করেও তো সারা জীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব। যেমন দেখুন ইসলামী জগতের অনেক মহারথি বিবাহ না করেই জীবন শেষ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম বুখারী ও ইমাম ইবনে তাইমমিয়া (রহঃ) অন্যতম। তাহলে কি এই যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে বিবাহকে নিরুৎসাহিত করা যাবে? ওটা মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ যদি বিনা বিবাহে সততার সাথে জীবন কাটিয়ে দিতে সক্ষম হয়, ইসলাম তাকে বিবাহে বাধ্য করবে না, তথা বিবাহ না করলে তার ইসলাম পূর্ণ হল না বা সে বিশেষ ছোয়াবের কাজ থেকে বঞ্চিত হল এরকম নয়। অনুরূপ কেউ যদি একজনকে বিবাহ করে সততার সাথে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। তার ব্যাপারেও একই কথা। কিন্তু কেউ যদি একাধিক বিবাহ করতে চায় তাকে বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই। ইসলাম তো অনুমতি দিয়েছেই। বাস্তবতাও তাই বলে। আমরা জানি একজন নারী সাধারণতঃ পঞ্চাশোর্ধ হলেই বৈবাহিক জীবনের আগ্র্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু পুরুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই জন্যে অনেক ক্ষেত্রে তখন পুরুষটি নারী সান্নিধ্য না পেলে বিভিন্ন অসৎ উপায় অবলম্বন করতে চায়। অনেক সময় মান-সম্মান ও লোক লজ্জার কারণে সে পথে পা বাড়ায় না। সবুর করে থেকে যায়। আবার অনেকে ঠিকই অবৈধ পথে পা বাড়ায়। যেমন বিষয়টি বর্তমান সমাজে এখন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। অতএব তার জন্যে অবৈধ পথ বন্ধ করে বৈধতার সন্ধান দেয়াই কি যুক্তি সংগত নয়?
যে সমস্ত লোকেরা ইসলামের এই পবিত্র ও বৈধ বিষয়টির বিষয়ে সোচ্চার ও তার বিরোধিতা করে নানা রকমের বুলি আওয়ড়ায় এবং কলম খুলে লিখে চলে, তাদের মুখ থেকে কি সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যভিচার নামক এই অপকর্মগুলোর বিরুদ্ধে তেমন কথা বের হয়? সেভাবে তারা সোচ্চার প্রতিবাদ করে? বরং তারা তো ঐ অপকর্মকে বৈধতা দেয়ার জন্যে তার নামও খুঁজে বের করেছে। যারা তা করে তাদের নাম দিয়েছে ‘যৌনকর্মী’। অর্থাৎ আর দশজন মানুষ যেমন শ্রম বিক্রয় করে জীবন-যাপন করে তারাও তেমন দেহ বিক্রি করে জীবন-যাপন করছে। তাতে অন্যায় কি? যুক্তিবাদীদের নিকট এটাই যুক্তি সংগত কাজ। অন্য দিকে আজ তো সমাজে মেউচিয়াল সেক্স, আর লিভ টুগেদার খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সে ক্ষেত্রে বয়স, আর সংখ্যার কোন নিয়ম-নীতি নেই। এতে দোষের কি? এটাও তাদের নিকট খুবই যুক্তি সংগত কাজ। যত দোষ ইসলামের বৈধ ব্যবস্থাপনার!! এ জন্যে শুনতে পাবেন একজন বিবাহিত পুরুষ যদি পরনারীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, আর তার স্ত্রী তা জানতে পারে, তাহলে সে তাতে যেমন প্রতিবাদ না করবে, যতি সে বৈধভাবে দ্বিতীয় বিবাহ করতে চায়, তাহলে তার স্ত্রী তার বিরুদ্ধে কিয়ামত কায়েম করে ছাড়বে। চাহে সেই স্ত্রী চিররোগা হোক বা অক্ষম হোক বা বৃদ্ধা হোক। তার মানে ব্যভিচার করুক হারাম কাজ করুক জাহান্নামের কীট হোক কোন আপত্তি নেই, কেন সে বৈধ কাজ করবে? যত দোষ বৈধ কাজে!! মোটকথা যুক্তিবাদীদের টার্গেট হচ্ছে অবৈধতাকে বৈধতা দেয়া আর বৈধতাকে অবৈধ ঘোষণা করা। আর তারা এই কাজে অনেকটাই সফল হয়ে গেছে। (আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন)
এরকম আরো কত যুক্তি নির্ভর রুচী-বিকৃত অভিমত….।

বিনা যুক্তিতে ইসলাম মানতে হবেঃ

যে আল্লাহ ইসলাম পাঠিয়েছেন তাঁর যুক্তি ও জ্ঞানের তুলনায় মানুষের যুক্তি ও জ্ঞান খুবই নগন্য। আল্লাহ বলেন, وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا “তোমাদেরকে খুব কমই জ্ঞান দেয়া হয়েছে।” (সূরা বানী ইসরাঈল: ৮৫) তাঁর প্রদত্ব জ্ঞান ব্যতীত কোন জ্ঞান নেই। ঐ জ্ঞানের বাইরে যদি কিছু জ্ঞান থাকে, তবে তা শয়তানের জ্ঞান। রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় মানুষের জ্ঞান হচ্ছে ঠিক তেমন, বিশাল সাগরের তুলনায় যেমন পাখির ঠোঁটের এক চঞ্চু পানি।” (বুখারী ও মুসলিম) এই জন্যে ইসলামের প্রমাণিত বিষয়গুলো সাধারণ যুক্তির সাথে যদি মেলে তো ভাল কথা, অন্যথা না মিললেও মাথা নত করে মেনে নিতে হবে। তাহলেই ঈমানদার হওয়া যাবে। কেননা ঈমানদার হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে যারা গায়েবী বা অদৃশ্য বিষয়গুলোকে বিশ্বাস করে। (সূরা বাকারাঃ ৩) আর গায়েবী বিষয়গুলো অধিকাংশ যুক্তির সাথে মেলে না। যেমন কবরের আযাব বা শান্তি ইত্যাদি।

এই জন্যে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمْ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالا مُبِينًا
আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রাসূল কোন আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করার কোন অধিকার নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করবে, সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হবে। (সূরা আহযাবঃ ৩৬)
তাই বলে ইসলামের বিষয়গুলো যে অযৌক্তিক তা অবশ্যই নয়। ইসলামের বিষয়গুলো আগে মেনে নিতে হবে তারপর সুস্থ বিবেক ও যুক্তির সাথে মেলাতে হবে। আমার যুক্তি ও বিবেকের সাথে না মিললে আমার চেয়ে যিনি বড় জ্ঞানী তার যুক্তির সাথে অবশ্যই মিলবে। সেখানেও যদি না মেলে তখন বলব, “বিশ্বাস করলাম ও মেনে নিলাম।” এই জন্যে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন, “বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত ইসলামের উক্তি দ্বারা সাব্যস্ত বিধান সমূহ, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী নয়।”

মতামত দিন