হাতের ইশারায় কুরআন মুখস্ত!

হাতের ইশারায় কুরআন মুখস্ত!
ইন্দোনেশিয়ার একটি আবাসিক মাদ্‌রাসা। মাদ্‌রাসার নাম DAARUL ASHOM। দেশের ইয়োগিয়াকার্তা শহরে অবস্থিত এই মাদ্‌রাসার অদ্ভূত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে বধিরদেরকে কুরআন শিক্ষা দেয়া হয়। ২০০৯ সালে মাদ্‌রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১১৫ জন বধির ছেলে মেয়ে এখানে পড়াশোনা করছে। বধির শিক্ষার্থীরা কথাও বলতে জানে না।

তাদের খুব কঠিন নিয়মের মধ্য দিয়ে পুরো কুরআন মুখস্ত করতে হয়। বধির শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতকৃত বইয়ে প্রতিটি আরবী বর্ণমালার জন্য হাত দিয়ে একেক রকমভাবে অঙ্গভঙ্গি করার চিত্র দেয়া আছে। ঠিক বইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে ওভাবে ক্রমাগতভাবে দ্রুত হাত নাড়িয়ে তাঁদের পুরো কুরআন মুখস্ত করতে হয়। বিষয়টা কতোটা জটিল ও কঠিন তা ধারণা করা যায় মাদ্‌রাসার ১৩ বছর বয়সী ছাত্র রাফার অবস্থা দেখে, সে ২ বছরে মাত্র ৯ পাড়া মুখস্ত করেছে। তাহলে পুরো কুরআন মুখস্ত করতে তার প্রায় ৭ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যাবে। স্বাভাবিকভাবে যেখানে অধিকাংশ ছাত্ররা এক, দু’ই বা তিন বছরে হাফিয হয়ে যায় সেখানে এতো কষ্টকর পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে দীর্ঘ ৭ বছর ধৈর্য্য ধরে কুরআন মুখস্ত করতে পারা কতো বড় সবরের বিষয় তা কল্পনা করাও কঠিন। শিক্ষকরাও পড়া আদায় করে ছাত্রদের দ্রুত অঙ্গভঙ্গির দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য রেখে, বিষয়টি তাদের জন্যও বড় সাধনার বটে।
.
হাত নেড়ে নেড়ে বিশেষ অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মুহাম্মাদ রাফা তাঁর স্বপ্নের কথা জানায়, সে বলে,
“আমি বাচ্চাদের জন্য এখানে কুরআনের শিক্ষক হতে চাই।”
.
২০২২ সালে বিবিসি নিউজের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে মাদ্‌রাসার প্রতিষ্ঠাতা জনাব আবু কাহফি বলেন,
“১৩ বছর আগে এটা শুরু হয়। যখন আমি জানলাম যে কিছু বধির মানুষ তাদের ধর্ম বা আল্লাহ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। আমি বাড়িতে একটি দল নিয়ে কুরআন শিক্ষা শুরু করি। আর ১৩ বছর পর আমি এখন একটি আবাসিক স্কুলই (মাদ্‌রাসা) প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি।”
.
মাদ্‌রাসার প্রতিষ্ঠাতা আবু কাহফি ও বিভিন্ন দাতারা এখানে বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন করে থাকেন। যার দ্বারা দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বই, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার সুযোগ পায়। দরিদ্ররা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনা করে থাকে। শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি তাদেরকে ইসলামী আইন, বিজ্ঞান, গণিত এবং বিদেশী ভাষাও শিক্ষা দেয়া হয়, যাতে করে তাঁরা উচ্চশিক্ষা নিতে পারে।
.
জনাব আবু কাহফি আরো বলেন,
“আমি আশা করি যে আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের বাড়িতে ফিরে যাবে। তারা কুরআন ও ইসলাম সম্পর্কিত তাদের জ্ঞান বিতরণ করবে এবং মানুষকে বলবে যে কুরআন শেখা সহজ।”
.
শত শত বালক-বালিকা শিক্ষার্থীকে এতো জটিল ও কঠিন নিয়মের মধ্য দিয়ে পুরো কুরআন মুখস্ত করানো বড়ই বিস্ময়কর বটে। (হাফিযী কুরআনের হিসেবে) ৬০০ পৃষ্ঠাব্যাপী ৬২৩৬টি আয়াত মুখস্ত করতে হয় শুধু হাত নেড়ে নেড়ে। যা শুধু মুখে বলাই সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন করা অনেক অনেক কঠিন, যদি না আল্লাহ সহজ করে দেন। তারা মানুষকে বলবে যে কুরআন শেখা সহজ- জনাব আবু কাহফির এই বক্তব্য যেন কুরআনের সেই চিরন্তন ঘোষণারই প্রতিধ্বনি, মহান রব একই সূরায় চার চারবার ঘোষণা করেছেন,
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
“আর আমরা কুরআনকে যিক্‌রের (উপদেশ গ্রহণ এবং হিফয বা মুখস্ত করার) জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব উপদশ গ্রহণকারী কেউ আছো কি?” [১]
.
মহান রব আরো বলেছেন,
إِنَّا ‌نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ‌ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ
“নিশ্চয়ই এই যিক্‌র (কুরআন) আমরাই নাযিল করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষণকারী।” [২]
.
মাদ্‌রাসার মেয়ে শাখার শিক্ষার্থী ২০ বছর বয়সী লায়লা ধিয়াউল হক বলেন,
“আমি আমার বাবা-মায়ের সাথে জান্নাতে যেতে চাই। আমি এই জায়গা ছেড়ে যেতে চাই না। এখানে আমি শিক্ষকতা করতে চাই।” [৩]
.
.
[১] সূরাতুল ক্বমারঃ ১৭, ২২, ৩২, ৪০
[২] সূরাতুল হিজ্‌রঃ ৯
[৩] মাদ্‌রাসা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্যের উৎসঃ বধিরদের কোরান শেখানো হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার যে মাদ্রাসায়, বিবিসি নিউজ বাংলা; ইউটিউব লিংকঃ 

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button