শাইখ আহমাদুল্লাহ রাহমানী নাসিরাবাদী সংক্ষিপ্ত জীবনী

আহমাদুল্লাহ ওরফে রোস্তম আহমদ,পিতা-শাইখ মহর আলী সরকার,গ্রাম -জামতলী,পো:ঈদগাহ,থানা- ত্রিশাল,জেলা-ময়মনসিংহ ,জন্ম-আনুমানিক ১৯১৪ ই;।গ্রামেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর বাগেরহাটের গওহরডাংগা মাদরাসার প্রিন্সিপাল আব্দুল আযিয সাহেবের নিকট নাহু,সরফ শিক্ষা লাভ করেন।অতপর ঢাকা আশরাফুল উলুম মাদরাসায় শামছুল হক ফরিদপুরী ও আব্দুল ওয়াহহাব মুহতামিম দ্বয়ের নিকট ফিকহ,উসুল ফিকহ সহ অন্যান্য ফুনুনাত পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন।

আশরাফুল উলুম মাদরাসায় পড়া কালীন তিনি ঢাকার মাতুয়াইল থেকে পায়ে হেটে ক্লাস করতেন।মাতুয়াইল হতে পায়ে হেটে লালবাগ আসা যাওয়া করতেন বিধায় প্রায়ই ক্লাসে দেরি হত কিন্ত ক্লাসের পড়া মুখস্ত ও পরবর্তী পড়া ঠিকমত মুতালায়া করে আসতেন তাই শিক্ষকগণ অত্যন্ত আদর ও স্নেহ করতেন।বিশেষ করে মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী ও আব্দুল ওয়াহাব সাহেবদ্বয়ের অত্যন্ত আদর করতেন। সে সময় বিদুৎ ছিলনা মানুষ কুপি, হারিকেনের আলোতে রাতের কাজকাম বা পড়াশুনা করতেন।আর্থিক সংকটের দরুন রাতে জোস্না বা চাঁদের আলোতে কিতাব মোতালায়া করতেন।অতপর জনাব কবিরুদ্দীন রাহমানী সাহেবের পরামর্শে দিল্লীর “দারুল হাদীস রাহমানীয়া মাদরাসায় গিয়ে উচ্চ মানের মানতেক, ফালসাফা, উসুলেহাদীস ,ইলমে তাফসির ও ইলমে হাদীসের কিতাব কুতুবে সিত্তাহ পাঁচ বছর যাবত অধ্যয়ন করে প্রথম নম্বরে উত্তীর্ন হয়ে সনদে ফারাগাত লাভ করেন।ছাত্র অবস্থায় আরবী ভাষায় কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল। দিল্লীতে উনার উস্তাদগনের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মিশকাতের ভাষ্যকার আল্লামা উবাইদুল্লাহ রাহমানী ও নযির আহমাদ আমলভী সাহেবদ্বয়।১৯৪৩ সালে ফারেগ হয়ে দিল্লী জামে আযম মাদরাসায় এক বছর এবং দারুল হাদীস রাহমানীয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন।পাক ভারত বিভাগের পর বহুকষ্টে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে ময়মনসিংহ জেলার কাতলাসেন কাদেরিয়া কামিল মাদরাসায় হেড মাওলানা পদে নিয়োগ লাভ করেন।অত্র প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা অবস্থায় আলিম,ফাযিল ও কামিল পরিক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ন হন।উক্ত মাদরাসায় চার বছর শিক্ষকতার পর নিজ গ্রামের মরুব্বীগনের অনুরোধে খাগাটী জামতলী ফাযিল মাদরাসায় নাযেমে আলার পদে নিয়োজিত হন।উক্ত মাদরাসা তখন আলিম পর্যন্ত ছিল।তিনি বহু চেষ্ঠা করে ফাযিল মন্জুর করেন।মাদ্রাস ভাল ভাবেই চলতে লাগল ।এ দিকে সরিষাবাড়ী আরাম নগর আলীয়া মাদরাসার কতৃপক্ষ পত্র মারফত তাদের মাদরাসায় হাদীসের খিদমত আন্জামের জন্য অনুরোধ করতে থাকেন।অতপর ১৯৬০ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী আরামনগর আলীয়া মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন।পরে উপাধ্যক্ষ পদে পদোন্নতি পান।অত্র প্রতিষ্ঠানে সুদীর্ঘ ২৭বছর খিদমতের আন্জাম দিয়ে ৩১শে মার্চ ১৯৮৭ ইং সনে রিটায়ার্ড হন।আরাম নগর মাদরাসায় থাকাকালীন যে বাড়ীতে লজিং থাকতেন তাদের খাবারের মান খুবই নিন্ম মানের ছিল বেশির ভাগ সময় বেগুন আর আলু বর্তা ব্যতীত অন্য কিছু হতনা তাই তিনি কালিজিরা পিশে কাছে রাখতেন ।উনার অনেক শুভাকাংখী লজিং পরিবর্তনের অনুরোধ করলে তাদের বলতেন যে মানুষ বলবে মাওলানা সাহেব খাবারের কারনে লজিং পরিবর্তন করেছে তাই তিনি চাকুরী জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এক বাড়ীতেই লজিং ছিলেন।২০/০৫/১৯৮৭ ইং তারিখে বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের তৎকালীন সভাপতি আল্লামা ডক্টর আব্দুল বারী স্যারের আহবানে আহলে হাদীসের সুপ্রসিদ্ধ কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান মাদরাসা মোহাম্মাদীয়া আরাবিয়ার মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন।যোগদান তারিখ হতে মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত অত্র মাদরাসায় পাঠদানে রত ছিলেন।আলিয়া ও কওমী উভয় লাইনে দেশ বিদেশে ওনার অসংখ্য ছাত্র রয়েছে ২০০৪ সালের ১২ই জানুয়ারী ইশার নামাজের পর অসুস্থ হয়ে আনুমানিক রাত ০৩:৩০ মি:রাব্বুল আলামীনের ডাকে সাড়াদিয়ে দুনিয়া হতে বিদায় নেন।উনার কামনা ছিল পাঠদান অবস্থাতেই যেন আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে পারেন।রাব্বুল আলামিন উনার ইচ্ছা পুরণ করেন।শীতকাল অথবা গরমকাল উভয় সময়েই তিনি ফজরের পর পর ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করতেন।শুক্রবার দিন জুমার নামাজের পর হতে এশার নামাজ পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করতেন।
শাইখ আব্দুল্লাহিল ওয়াহিদ মাদানী বলেন, মাদরাসা মোহাম্মাদীয়া আরাবিয়াতে আমি আব্বার সাথে একই রুমে সাত বছর অবস্থান করি।রাতে উনার ঘুমানোর নিদিষ্ট কোন সময় ছিলনা ।রাত তিনটার সময় জাগ্রত দেখেছি হয়ত কিতাব মুতালায়া না হয় নামাজে দাডিয়ে আছেন আবার কখনও কিতাবের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন।সদালপি ও মেহমান আপ্যায়নে ছিলেন খুবই আন্তরিক। শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাভাষায় বেশকিছু দ্বীনি পুস্তক সংকলন ও প্রকাশ করেন।অন্যতম ইসলামী কাফন দাফন শিক্ষা, মাসায়েল কুরবানী, সিয়ামে রাহমানী,নামাজ শিক্ষা ও ইসলামী বিবাহ পদ্ধতি ইত্যাদি।ব্যক্তিগত জীবনে তিন পুত্র ও চার কন্যা সন্তানের জনক।ছেলে মেয়ে সকলেই মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত।বাড়ী বা মাদরাসা মেহমান দারিতে ছিলেন খুবই আন্তরিক।পরিচিত অপরিচিত যিনিই উনার কাছে আসতেন খালি মুখে উঠতে দিতেন না।মাদরাসা থাকা অবস্থায় আমি সাত বছর একি রুমে আব্বার সাথে ছিলাম মেহমানদারির কারনে প্রথম দিকে মনে মনে রাগ করতাম।আর কিছু না হউক চা বিস্কিট খাওয়া ব্যতীত ছাড়তেন না।সবার সাথেই মিশতেন খোঁজ খবর নিতেন।ছোট বাচ্চাদের খুব আদর স্নেহ করতেন।ছুটিতে বাডীতে গিয়ে ছোটদের নিয়ে জামাত করে সালাত আদায় করতেন।গ্রামের লোকজন উনাকে দরবেশ বলে ডাকতেন।যারা বিড়ি সিগারেট খেত উনার সামনে পড়ত না।নিজে অত্যন্ত সাদাসিধে ভাবে চলতেন।মাদরাসা মোহাম্মাদীয়া আরাবিয়ার থাকা অবস্থায় বংশালের হাজী নওয়াব সাহেবের আর্থিক সহযোগিতায় ইসলামী বিবাহ পদ্ধতি ২য় বার প্রকাশ করেন।দক্ষিন ত্রিশালের মঠবাড়ী,মোক্ষপুর ও আমিরাবাড়ী ইউনিয়নের ১৫টি মসজিদ নিয়ে গঠিত বৃহৎ আহলে হাদীস সমাজের ঈদগাহ মাঠের খতিব ছিলেন।
সংগ্রহ করা হয়েছে তার ছেলে শাইখ আব্দুল্লাহেল ওয়াহিদ মাদানী এর পোস্ট থেকে,
পরিমার্জনেঃ মোঃ আব্দুর রহমান মাদানী
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া করছি উস্তাদজী কে সকল গোনাহ মাফ করে জান্নাতুল ফেরদৌসের সুউচ্চ মাকাম দান করুন আমিন।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
kiw kow kan