ইসলামিক গল্প

আমি কিভাবে দ্বীনে আসলাম

আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারের ‘ইসলাম’ হলো শুক্রবারের ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবী পরে জুম্মা পড়া আর দুই ঈদের নামাজে শরিক হওয়া । যদিও আমার শুরুটা ছিল ভিন্ন। আব্বুর খুব সখ ছিল একটা ছেলে হবে ,যখন শেষ বার হজ্জ করেন ,উনার শুধু একটাই চাওয়া ছিল ,একটা ছেলে সন্তান । উনার ইচ্ছা ছিল ছেলে হলে মাদ্রাসায় দিবেন, যে ইচ্ছা সেই কাজ। ১ম ক্লাসে জনাব আরবি হরফ লিখতে বললেন ,আমি পারি না বলায় যা ধমক খাইলাম ভয়ে পুরো ১ বছর গ্যাপ দিলাম! 

জামেয়ায় ৩ বছর পড়ার পর ঐ পরিবেশের সাথে খাপ না খাওয়ায় আব্বুর স্কুলে (উনি যেখানে শিক্ষকতা করতেন) ভর্তি হলাম । জামেয়ায় থাকতে নামাজ পড়তাম ,জামেয়া ছাড়ার পরো ১-২ বছর মসজিদে নামাজ পরতাম ,কিন্তু আস্তে আস্তে নামাজ ছাড়া শুরু হলো । স্কুল জীবন কেটে যায় খেলাধুলায় আর কলেজে উঠে চোখে সবকিছু রঙ্গিন দেখা শুরু করলাম । 

অনেক সময় জুম্মার নামাজেও যাওয়া হত না ,বাসায় ঘুমাতাম ,আম্মা অনেক বোকা দিতেন ,খুব বিরক্ত হতাম। আব্বু জাকির নায়েক সাহেবের লেকচার দিলে টিভির সামনে নিয়ে বসাতেন ,একটু দেখে চলে আসতাম । ভার্সিটিতে যখন ভর্তি হলাম তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে খুব এড়িয়ে চলতাম । তাই দাড়িওয়ালা কাঊকে দেখলে ভাবতাম সে নিশ্চয় রাজনীতি করে বা কোন জঙ্গি দলের কেউ হবে ।এ ধারণা জন্মানোর পেছনে মিডিয়ার কল্যাণ কম ছিল না । তাছাড়া এই ধারণা ভুল প্রমান করার মতো কোন বন্ধু আমার ছিলনা।

সেকুলার শিক্ষায় দ্বীন পালনের সুযোগ খুব কম,যদিনা আপনার নিজের ইচ্ছা থাকে। ভার্সিটি পড়ুয়া একটা সাধারণ ছেলের জীবনের লক্ষ্য থাকে একটা গার্লফ্রেণ্ড থাকবে, বন্ধুদের নিয়ে মজ-মাস্তি করবে আর পড়ালেখা শেষে একটা চাকরী জোগাড় করে ছাত্র জীবনের টাকার অভাবে যেসব দামি গেজেট, দামি খাবার খাওয়া হয়নি , মনের মত জায়গায় বেড়াতে পারেনি ,ঐসব ছোট-বড় স্বপ্নগুলো পূরণ করবে । এসব স্বপ্নে বিভোড় কারো পক্ষে সাধারণত দ্বীন নিয়ে চিন্তা করার বা দ্বীন জানার সুযোগ খুব কমই থাকে । হালাল-হারামের জ্ঞান না থাকায় অবলীলায় নফসের গুলামিতে নিজেকে মগ্ন রাখতাম।

একদিন ফেইসবুকে একটা ভিডিও দেখলাম ,যেটা হয়ত অনেকেই দেখেছেন । একটা ছেলে গাড়ী এক্সিডেন্টে মারা যায় আর তারপর তার আত্মা অতীতের খারাপ কাজের জন্য কষ্ট পায় আর অনুতপ্ত হয় কেন সময় থাকতে ভাল কাজ করলো না । ভিডিওটা আমাকে খুব নাড়া দেয় । তখন একটু একটু নামাজ পড়া শুরু করলাম । কিন্তু প্রথম দিকে যে আগ্রহ ছিল সময়ের সাথে তা হারিয়ে বসলাম।

সাধারণত প্রচণ্ড কষ্ট বা হতাশার শুরু হয় প্রিয় দুনিয়াবি কোন বস্তুর না পাওয়া থেকে। ক্ষণস্থায়ী কিছুর সাথে নিজের অনুভূতি ,ভাল লাগা যুক্ত থাকলে এক সময় না এক সময় কষ্ট পেতে হয়।বন্ধুবান্ধব ,আড্ডা কোন কিছুরই অভাব ছিলনা। তবুও একটা পর্যায়ে জীবন নিয়ে খুব হতাশা হয়ে পরি ,কোন কিছুই যেন ঠিকমত চলছিল না। নিজের কষ্টের কথা কারো সাথে শেয়ার করতে পারতাম না, নিজের পরিবারেও তেমন কেউ নেই যাকে সব বলা যায়।

তখন নামাজে দাড়ালে নিজের পাপগুলোর কথা খুব মনে পরতো, ভাবতাম নিজের পাপের জন্যই হয়ত আল্লাহ আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছেন। নিজেকে নিয়ে খুব কোন আশা ছিলনা, ভাবতাম আমাকে দিয়ে আর কিছু হবেনা। আমার ক্লাসমেটদের দেখতাম লাইফ নিয়ে অনেক সিরিয়াস, আর আমি লাইফ নিয়ে হতাশ, জীবনের কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিলনা। একদিন ফেইসবুকে কে যেন “How Surah Ad-Dhuha can change your life – Sh Tawfique Chowdhury” ভিডিওটা শেয়ার করলেন। 

ভিডিওটা দেখে অনেক কেঁদেছি, দেখছিলাম আর মনে হচ্ছিলো যেন শুধু আমার জন্যই ভিডিওটা বানানো হয়েছে । এরপর অনেক রাতে কেটেছে আমার রবের সামনে দাড়িয়ে নির্দ্বিধায় চোখের পানি ফেলে ,তাহাজ্জুদের নামাজে এত প্রশান্তি আগে জানতাম না। ওয়াল্লাহি এরপর থেকে যতদিন আমার রবের কাছে কিছু চেয়েছি ,আমার রব আমাকে হতাশ করেন নি । অনেক কিছুই অসম্ভব মনে হলেও একমাত্র দোয়ার কারণে তা সম্ভব হয়েছে। 

আর হঠাৎ করে দ্বীন পালন করা শুরু করার সময়টা বেশ কঠিন ,অনেক পরিচিত মুখ থেকে কটূক্তি শুনবেন ,অনেকে অতীতের পাপের কথা মনে করিয়ে দিবে ,এদের থেকে দূরে থাকুন ।জীবনের কোন কষ্টকে কষ্ট মনে করবেন না ,হয়তো এই কষ্টই আপনাকে আপনার রবের অনেক নিকটে নিয়ে যাবে।আর ফেইসবুকে যেসব ভাইয়েরা ইসলাম নিয়ে লেখালেখি করেন তাদের কে অনুরোধ আপনাদের লেখা চালিয়ে যান ,কার লেখা কখন কার মনে ধরে বলা যায় না ,অবশ্যই হেদায়াতের মালিক আল্লাহ্‌।

সর্বশেষ, লেখাটার শিরোনাম আমি কিভাবে দ্বীনে এলাম। আসলে আমি এখনো পুরোপুরি দ্বীনে আসতে পারিনি তবুও মাঝে মাঝে চেষ্টা করি সব কাজে আল্লাহ্‌ কে মনে রাখার ,আসলেই পারি কিনা আল্লাহ্‌ ভালো জানেন । কষ্ট করে লেখাটা পড়ার জন্য আল্লাহ্‌ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন । দোয়া প্রার্থী ।

লিখেছেনঃ Nashat Choudhury

source: facebook

মতামত দিন