ইসলামী শিক্ষা

‘দুনিয়াবী পড়াশোনা’কে ইবাদাতে পরিণত করা-৩

আগের পর্ব দুটি (১ম পর্ব২য় পর্ব) পড়ে কেউ যদি ভেবে থাকেন যে আমি কো-এডুকেশনের সিস্টেমটাকে সমর্থন করছি তাহলে নিঃসন্দেহে সেটা আমার প্রতি অপবাদ হবে। আমি বরং এই সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসার জন্য একটি সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অর্থ্যাৎ যে ময়লা পরিষ্কার করবে, তাকে ময়লার মাঝে নামতে হবে। যদি কেউ মনে করে যে সে ময়লা পরিষ্কার করতে পারবে না, বরং ময়লার দুর্বিপাকে হারিয়ে যাবে, এই কাজ অবশ্যই তাদের জন্য না। আমাদের আরো মাথায় রাখতে হবে যে এই কাজে নিয়্যতের পরিশুদ্ধতা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যেনো দুনিয়ার ইঁদুর দৌঁড়ে শামিল হয়ে গিয়ে দাবী করতে না থাকি যে আমি এগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি।

আমি যে পথের কথা বলছি সেটা নিঃসন্দেহে একটা দুর্গম পথ। কারণ এই পথে হাঁটার অনেক সামাজিক উপকারিতা আছে- স্ট্যাটাস, টাকা পয়সা ইত্যাদি। তাই নিয়্যতটা কলুষিত হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এজন্য আমাদের দেখতে হবে যে আমরা এইসব অ্যাকাডেমিক বিষয়ে অধ্যয়নের সাথে সাথে কুরআন/হাদীস/ তাফসীর/ ফিকহ ইত্যাদির ফরয জ্ঞানটুকু আদায় করছি নাকি। কোন লেভেলের জ্ঞানটুকু ফরয সেটা নিয়ে অন্য একদিন আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ।এখন শুধু এটুকু বলতে চাই যে আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী IOU এর ইসলামিক স্টাডিজে ব্যাচেলর প্রোগ্রামে যা পড়ানো হয় সেটা শেষ করে ইসলামিক স্টাডিজে একটা অনার্স করে ফেলেছি এই মর্মে আত্মতৃপ্তিতে ভোগাই যায়, কিন্তু ওখানে যা পড়ানো হয় তা আদতে ফরয লেভেলের জ্ঞান।

এই ফরয লেভেলের জ্ঞান অর্জন আর অ্যাকাডেমিক যে বিষয়ে পড়ছিলাম সেটাতে এক্সিলেন্সি অর্জন-২টা একসাথে চালানো কি সম্ভব? আমার নিজের এবং চারপাশের অনেককে দেখে বুঝেছি যে এটা সম্ভব, দরকার শুধু প্রচণ্ড Determination আর Proper Time Management, সাথে আল্লাহর কাছে অহর্নিশ সাহায্যের জন্য দুআ করে যাওয়া।

আমি বুঝতে পারছি যে আমি আমার মূল প্রসংগ থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরে এসেছি। সেজন্য ক্ষমা প্রার্থী। আমাদের মূল পয়েন্টটা ছিলো যে একটা মেয়ে যে কী না Adult দ্বারা পরিবেষ্টিত, সে ‘আইন নিয়ে হায়ার স্টাডিজ’ করে উম্মাহর এমন কোনো উপকার কি করতে পারবে যার জন্য কো-এডুকেশন সিস্টেমে যাওয়াটা Lesser Evil হিসেবে পরিগণিত হবে?

এখানে ‘আইন নিয়ে হায়ার স্টাডিজ’ অংশটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যারা মেয়েদের কো-এডুকেশনে পড়া হারাম হিসেবে সাব্যস্ত করেন, তারা একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করেন মেয়েদের ডাক্তারী পড়া। এক্ষেত্রেও আমি এক অদ্ভূত সাইকোলজি দেখতে পাই- আমি নিজের মেয়েকে ডাক্তারী পড়তে দিতে চাই না কিন্তু মেয়ে বা বউ এর জন্য মেয়ে ডাক্তার খুঁজি। আমার কেন যেন মনে হয় যে গুনাহের ভয়ের চাইতে এখানে একটা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বেশী কাজ করে যে আমার বউ/ মেয়ের শরীরের গোপন অংশ কেউ দেখুক এটা আমি চাই না। আল্লাহই ভালো জানেন, কিন্তু এটা আমি বলছি কারণ আপনি যদি ইসলামিক দিক থেকে চিন্তা করেন তাহলে মেডিক্যাল কারণে পরপুরুষ আমাকে স্পর্শ করবে, আমার শরীরের স্পর্শকাতর অংশ দেখবে এর চেয়ে বহু গুণে বড় গুনাহ কিন্তু সুদে লিপ্ত হওয়ার গুনাহ।আমার যুক্তি হচ্ছে মেয়েদের পর্দা রক্ষার জন্য কো-এডুকেশনে পড়া যদি জায়েজ হয়, তাহলে মানুষকে/মেয়েদেরকে সুদের গুনাহ থেকে বাঁচানোর জন্য আমার অর্থনীতিতে পড়া জায়েজ হবে না কেন?

স্বাভাবিকভাবেই পালটা যুক্তি আসবে যে ছেলেরা অর্থনীতি পড়লেই চলবে। এখানেই আমার আপত্তি। আমার কথা হচ্ছে মেয়েরা যখন ছেলেদের কাছ থেকে কিছু জানছে/ সার্ভিস নিচ্ছে তখন সেখানে ফিত্নার আশংকা থাকছে না? আজকাল অনেক বিখ্যাত মানুষদেরই মেয়ে ঘটিত নানা পদ স্খলনের খবর শোনা যায়। সেগুলার কত অংশ গুজব আর কত অংশ সত্যি সেটা আল্লাহই ভালো জানেন কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে এগুলোর একটা মেজর কারণ সব ক্ষেত্রে মেয়ে বিকল্প না থাকা। একটা সামান্য ফিকহের জ্ঞান অথবা কাউন্সেলিং এর জন্য যদি মেয়েদের ছেলের কাছে যাওয়া লাগে আর একটা ছেলে স্কলার যদি এইভাবে শত শত Vulnerable মেয়ের মুখোমুখি হয় তাহলে তারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। Vulnerable মেয়ে এই টার্মটা গুরুত্বপূর্ণ (যেমন ডিভোর্সড, Convert, Abuse এর স্বীকার ইত্যাদি)। আমার একটা পরিচিত ক্ষেত্রে এমন ছিলো যে লোকটি পোশাক আশাকে, মুখের বুলিতে অনেক প্র্যাক্টিসিং ছিলো, কিন্তু ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা পয়সা মেরে দিতো। তার সাথে আমার এক বোনের বিয়ের কথা হয়েছিলো, কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ তার সাথে বিস্তারিত কোনো যোগাযোগ হওয়ার আগেই তার ভাই, বাবা, দুলাভাই ওই লোকের সাথে মিশে রেড সিগন্যাল দিয়েছিলো, আমার বোনটা বেঁচে গিয়েছিলো। আমরা সবাই যদি এমন Strong মাহরামদের দ্বারা বেষ্টিত থাকতাম তাহলে দুর্ঘটনা হয়তো কম হত, কিন্তু বাস্তবতা যে একদমই আলাদা তাতো আমরা জানিই!

তাই আমি এমন একটা সময়ের স্বপ্ন দেখি যখন শরীয়াহ, আইন, অর্থনীতি, সাইকোল্যোজি, এডুকেশন সব ফিল্ডে মেয়ে রিসোর্স পারসন থাকবে যেন মেয়েরা কোনো প্রশ্ন বা দরকারে একটা মেয়ের কাছেই যেতে পারে। তাই আমার মত হচ্ছে (আল্লাহই ভালো জানেন) আমি একজন মেয়ে যখন কো-এডুকেশনে পড়ে একটা রিসোর্স পারসন হচ্ছি আমার ফিল্ডে ইনশাল্লাহ, তখন আমি কমপক্ষে ১০০টা মেয়ের ফ্রি মিক্সিং এর দরজা বন্ধ করছি, কারণ তাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য এখন একজন ‘মহিলা বিকল্প’ আছে। এবং এটার একটা Dom-inno effect আছে কারণ আমার কাছ থেকে শিখে আরো ১০টা মেয়ে রিসোর্স পারসন হতে পারবে ইনশাল্লাহ।

এখন যদি কেউ বলেন যে মেয়েদেরতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার দরকার নাই, ওরা এসব জেনে কী করবে, ছেলেরা পড়বে এবং ছেলেরা ছেলেদের কাছ থেকে জানবে, তাহলে আমি বিনয়ের সাথে সেই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করতে চাই। কারণ সেটা বর্তমান বাস্তবতাকে তুলে ধরে না। সুদের ব্যাপারে মেয়েদের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে কিভাবে সুদ ভিত্তিক সিস্টেম আমাদের দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে সেটা হয়তো আমরা সবাই জানি। তাছাড়া প্রতিটা ছেলে মাত্রই জানে যে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে মেয়েরা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে যদি ঠিকমত, সহজ ভাষায় এই সুদ ভিত্তিক সিস্টেমের রক্তচোষা রুপটা মেয়েদের কাছে বুঝানো যায় তাহলে ইসলামের বুঝ থাকুক বা না থাকুক, অধিকাংশ মেয়ে এটাকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতে শিখবে। তাদের ঘৃণা ছেলেদের সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার পথে এক বিশাল প্রেরণা হবে ইনশাল্লাহ।কল্পনা করুন একটি প্রজন্মের যেখানে মেয়েরা সুদী ব্যাংকে চাকরী করা ছেলেদের বিয়ের জন্য গণহারে প্রত্যাখ্যান করছে, ছেলের আয়ে যদি সুদ থাকে তাহলে মায়েরা তাঁকে দেয়া উপহার ফিরিয়ে দিচ্ছে, মেয়েরা বাবাকে ক্রমাগত বলছে বাবা সুদ থেকে ফিরে আসো। আমাদের মা, বোন, স্ত্রীরা যদি সুদ কোনটা সেটাই না চিনে, তাহলে কিভাবে তারা এই সামাজিক বিপ্লবটা ঘটাবে?

(চলবে ইনশাল্লাহ)

 

মতামত দিন