প্রশ্ন ও উত্তর

খেতে খেতে কি কথা বলা যায়?

আমাদের সমাজের অনেকেই অজ্ঞতাবশত ধারণা করেন যে খাওয়ার সময় কথা বলা যায় না। কিন্তু খোদ রসূল (স) নিজেই খাওয়ার সময় কথা বলেছেন। তিনি খেতে খেতে বর্ণনা করেছেন বিশাল এক হাদিস। যে হাদিসটা আমরা অনেকেই কম বেশী জানি। তবে হাদিসটির শুরুর দিক দিয়ে অনেকেরই জানা নাই।

হাদিসটি হলো এইঃ আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স) -এর সাথে কোন এক খানার সমাবেশে দাওয়াতে গিয়েলিাম। তাঁর সামনে একখানা রান পরিবেশন করা হল। তিনি রানের গোশত অধিক পছন্দ করতেন। তিনি রান হতে দাত দিয়ে গোশত ছিঁড়ে নিয়ে বললেন, আমি কেয়ামতের দিন সমগ্র মানবজাতির নেতা হব। তোমরা কি জান কেন হব?

কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানবকে এক সমতল ভূমিতে একত্রিত করবেন। দর্শকরা তা দেখেতে পাবে এবং আহবানকারীর আহ্বানও তারা শুনতে পাবে। সূর্য তাদের কাছাকছি হবে। এ সময় লোকজন অসহনীয় ও অসহ্য দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হবে।

লোকজন পরস্পরকে বলবে, তোমরা কি দেখছ না তোমাদের কি অবস্থা হয়েছে এবং তোমাদের দুঃখ-দুশ্চিন্তা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে? কেন তোমরা এমন ব্যক্তির অনুসন্ধান করছ না যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন? লোকেরা তখন একে অন্যকে বলবে, তোমাদের সকলের আদি পিতা তো হযরত আদম (আ) । তাই তারা তাঁর কাছে গিয়ে বলবে, হে আদম (আ)! আপনি সমগ্র মানবকুলের পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি আপনার মধ্যে তাঁর রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, তাই তাঁরা আপনাকে সেজদা করেছে। আর তিনি আপনাকে বেহেশতে বসবাস করতে দিয়েছেন। আপনি কি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? আপনি কি দেখেছেন না আমাদের কি অবস্থা হচ্ছে এবং আমাদরে দুঃখ-দুর্দশা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে? হযরত আদম (আ) বলবেন, আমার রব আজকের দিনে ক্রোধান্বিত হয়েছেন যা ইতোপূর্বে কখনো তিনি হননি এবং পরেও কখনো হবেন না। তিনি আমাকে একটি বৃক্ষের কাছে যেতে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু আমি সে আদেশ অমান্য করেছি। হায় আমার কি হবে! হায় আমার কি হবে! তোমরা অপর কারো কাছে যাও। তোমরা বরং নূহের কাছে যাও। তাই তারা হযরত নূহের (আ) -এর কাছে ছুটে গিয়ে বলবে, হে নূহ (আ)! আপনি পৃথিবীবাসীর জন্য সর্বপ্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। আল্লাহ আপনাকে কৃতজ্ঞ বান্দা উপাধি দিয়েছেন। আপনি কি আমাদের অবস্থা দেখছেন না? আপনি কি দেখছেন না, আমাদের দুর্দশা কি চরম পরিসীমায় পৌঁছে গিয়েছে? আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করবেন না? তিনি বলবেন, আজ আমার রব এত ক্রোধান্বিত যে ইতোপূর্বে কখনো এরূপ ক্রোধান্বিত হননি এবং এরপর কখনো হবেন না। আমার একটি দোয়া করার অধিকার ছিল। আমি আমার কওমের পক্ষে সে দোয়া করেছি। ফলে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। হায় আমার কি হবে! হায় আমার কি হবে! তোমরা অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা বরং ইবরাহীমের কাছে যাও। তারা হযরত ইবরাহীমের কাছে গিয়ে বলবে, হে ইবরাহীম (আ)! আপনি আল্লাহর নবী! পৃথিবীবাসীর মধ্যে আপনিই তাঁর খলিল তথা প্রিয় বন্ধু। আপনার রবের কাছে আমাদের সুপারিশ করুন। আমাদের কি অবস্থা দেখছেন না? তিনি তাদেরকে বলবেন, আমার প্রভু আজকে এত ক্রোধিন্বিত যে ইতোপূর্বে তিনি কোন দিন এরূপ ক্রোধান্বিত হননি এবং পরেও কখনো হবেন না। আমি তিনটি মিথ্যা বলেছিলাম। (তাই আমি লজ্জিত) আমার কি হবে! আমার কি হবে! আমার কি হবে! তোমরা অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা মূসার কাছে যাও। তখন লোকজন হযরত মূসার (আ) –এর কাছে বলবে, হে মূসা (আ) ! আপনি আল্লাহর রাসূল! মানবজাতির মধ্যে আপনাকে আল্লাহ তাঁর রিসালাত ও তাঁর সাথে কথা বলার অবকাশ দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আপনি আমাদের মুক্তির জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি দুর্দশার মধ্যে পড়ে আছি? তিনি বলবেন, আজ আমার রব এত ক্রোধান্বিত হয়েছেন যে ইতোপূর্বে তিনি আর কখনো এত ক্রোধান্বিত হননি এবং পরেও আর কখনো হবেন না। তাছাড়া আমি একটি ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম। অথচ তাকে হত্যা করার আদেশ আমার জন্য ছিল না। হায় আমার কি হবে! হায় আমার কি হবে! তোমরা বরং অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা ঈসার কাছে যাও। তাই সবাই হযরত ঈসা (স) -এর কাছে গিয়ে বলবে হে ঈসা (আ) ! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং তার কালেমা যা তিনি মরিয়ামকে দিয়েছিলেন। আর আপনি রুহুল্লাহ (তাঁর দেয়া রূহ) । আপনি দোলনায় থাকতে (শৈশবেই) মানবের সাথে কথা বলেছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি দুর্গতির মধ্যে পড়ে রয়েছি? হযরত ঈসা (আ) বলবেন, আমার রব আজ ভীষণ ক্রোধান্বিত। ইতোপূর্বে তিনি কখনো এরূপ ক্রোধান্বিত হননি, আর না পরেও কখনো হবেন। হযরত ঈসা (আ) তাঁর কোন পাপের কথা উল্লেখ করবেন না। হায়, আমার কি হবে! হায়, আমার কি হবে! হায়, আমার কি হবে! তোমরা বরং অন্য কারো কাছে যাও। হ্যাঁ, তোমরা মুহাম্মদ (স) -এর কাছে যাও।

অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেন, তারা আমার কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী; আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সব ক্রটিবিচ্যুতি মাফ করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি জানেন না, আমরা কিরূপ বিপদের মধ্যে রয়েছি? রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, আমি সামনে অগ্রসর হয়ে মহান আরশের নিচে যাব এবং আমার মহামহিম রবের সামনে সিজদায় পড়ে যাব। মহান আল্লাহ আমাকে তাঁর প্রশংসা স্তুতি শিক্ষা দিবেন। আমার পূর্বে আর কাউকে ঐ প্রশংসা গাঁথা শিক্ষা দেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তুমি মাথা উঠাও, তুমি যা চাইবে তা দেয়া হবে, সুপারিশ করলে তা কবুল করা হবে। এরপর আমি মাথা তুলে বলব, হে রব! আমার উম্মাত! হে রব আমার উম্মাত! (অর্থাৎ আমার উম্মাতের কি হবে?) তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তোমার উম্মতের যে সব লোকের হিসাব নেয়া হবে না (বিনা হিসেবে বেহেশতে গমনের সুযোগ পাবে) তাদেরকে বেহেশতের ডান দিকে দিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দাও। অন্য সব বেহেশতীদের সাথে তারা বেহেশতের অন্যান্য দরজা দিয়েও যেতে পারবে। এরপর তিনি বলেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার যান। বেহেশতের প্রতিটি দরজা উভয় পাল্লার মাঝখানে এতখানি স্থান থাকবে যতখানি দূরত্ব মক্কা এবং হাজর নামক স্থানের দূরত্ব। অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তিনি বলেন, যতখানি দূরত্ব মক্কা এবং বসরার মধ্যে।
( দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনের বর্ণনা অধ্যায় : :রিয়াযুস স্বা-লিহীন,বুখারী ও মুসলিম)

মতামত দিন