ভ্রান্ত মতবাদ

কুরবানীর অর্থ খরচ হবে না কারো ইচ্ছামতো

রচনায় : শামসুজ্জোহা আঃ জাব্বার রাহমানী

কর্মরত ইসলামিক সেন্টার, তুমাইর, সউদী আরব

‘সংবাদ প্রতিদিন’ ১৪/১১/১০ রবিবার-এ প্রকাশিত সানোয়াজ খান কর্তৃক রচিত একটি আলোচ্য বিষয় ‘সামাজিক কল্যাণে খরচ হোক কুরবানীর অর্থ’-এর জবাবে প্রস্তুত করা হল কুরবানীর অর্থ খরচ হবে না কারো ইচ্ছা মতো’।

লেখক কর্তৃক লিখিত রচনাটি চারটি অনুচ্ছেদে বেষ্টিত। প্রথমটি সাড়ে তিন লাইন, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি সোয়া ছয় লাইন এবং চতুর্থটি সাড়ে চৌদ্দ লাইন বিশিষ্ট। তন্মধ্যে প্রথমোক্ত তিনটি অনুচ্ছেদের বক্তব্য প্রায় আলোচ্য বিষয়ের মূল বক্তব্য হতে সম্পর্ক-ছিন্ন বলে মনে হয়। অনুরূপ বাক্যগুলির মধ্যে পরিলক্ষিত হয় এক প্রকার অসামঞ্জস্য ও অমিল। অর্থগতভাবেও সেগুলির মাঝে তেমন একটা বিন্যাস, পরম্পরা এবং সম্পর্ক ও মিল পরিলক্ষিত হয় না। তবে তা যাইহোক, লেখক যেহেতু তার মাথায় একটি নির্দিষ্ট জিনিস রেখে লিখেছেন বিধায় আমরা ধরে নেব যে, তিনি কুরবানীর সুন্নাত মুছে দিয়ে তার অর্থে উন্নয়নমূলক দেখাবার অপচেষ্টা করেছেন এবং তাতে কিছু কটুক্তিও করেছেন। আলোচনা করা হয়েছে তাই স্পষ্ট।

যাইহোক, এবারে লেখক সাহেবের মূল আলোচনার উপর আলোচনা করার পূর্বে উপদেশ ও নসীহতস্বরূপ কিছু কথা উপস্থাপিত করতে চাই। একথা বিদিত যে, কুরবানী করা যেমন একটি ধর্মীয় অন্যতম প্রতীক, তেমন তা আল্লাহ ও তদীয় রসূলের পক্ষ থেকে বিধেয় একটি অবাধ্যতামূলক ইবাদত যা ইব্রাহীম (আঃ)-এর আমল হতে চালু হয়ে অদ্যাবধি অবিরত অবস্থায় কী বছর পালিত হয়ে আসছে। বিদ্বানগণের সঠিক মতে কুরবানী করা সুন্নাতই বটে, ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক নয়। তারপরও যেমন গরীব-ধনী নির্বিশেষে সকলেই এই সুন্নাতকে এমনভাবে বরণ ও পালন করে, যা ভাষায় বলা যায় না। কিছু লোক ছাড়া কোন ব্যক্তিই যে ঐ মৌসুমে যৎসামান্য অর্থ ব্যয় করতে কোনও কুণ্ঠ বোধ করে না, তা ঐ কুরবানীর প্রতি আগ্রহ ও ভালবাসা এবং সন্তুষ্টি ও আনুগত্যেরই প্রমাণ। লেখক যে চরম বিস্মিত হয়েই ঐ মর্মে বিস্ময় জাগানোর কথা লিখেছেন, তা বাস্তবিক বিস্ময়ের কথাই বটে।

বলাই বাহুল্য যে, লেখক সাহেব এই কুরবানীকে কেন্দ্র করে যে অবান্তর মন্তব্য করেছেন, তা আমার মনে হয় কোন মুসলিম তো দূরের কথা কোন অমুসলিমও করেনি। শরীয়ত বিশেষজ্ঞ বিদ্বানগণ থেকে মূখ পর্যন্ত, এমনকি কোন ইসলাম-বৈরীদের মধ্যেও কস্মিনকালেও এমন আপত্তির কথার উদ্রেক হয়নি যে, মুসলমানদের প্রিয়ধন তাদের ধর্মীয় ইবাদত পালনে ব্যয়িত না হয়ে, কোন জনকল্যাণের কাজে ব্যয়িত হোক। কিন্তু বড় পরিতাপের বিষয় যে, মাননীয় লেখক সাহেবকে যে কোন শয়তানে ধরলো, নাকি কোন ভূতে ধরলো যে, তিনি বিষয়টার গুরু রহস্য বুঝে উঠতে পারলেন না। বড় ভয় হয় যে, প্রতি বছর যে প্রায় ৪০ লক্ষ মুসলমান এক মোটা অংকের টাকা ব্যয় করে হজ্জ আদায় করে অর্থাৎ, প্রতিটি হাজী মোটামুটি গড়ে ১ লক্ষ করে টাকা ব্যয় করে, তাহলে বাৎসরিক কত কত টাকা খরচ হয়? সুতরাং লেখক সাহেব কখনো এমন দাবী তো করে বসবেন না যে, হজে এত টাকা খরচ না করে গরীবদুঃখীদের পিছনে ও উন্নয়নমূলক কাজে খরচ করা হোক। নিশ্চয় শয়তান তার জ্ঞান ও বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে এবং তার ঈমান নিয়ে খেলা শুরু করেছে। তাই অনুরোধ করব যে, মহাশয় যেন স্বীয় ধ্যানধারণা থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে তাওবা করেন।

এবারে লেখক সাহেবের মূল আলোচনার উপর কিছু কথা আলোচনা করা যাক। লেখক সাহেব লিখেছেন যে, ‘কুরবানীর অর্থ যদি কোনও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুঃস্থ বালক-বালিকাদের শিক্ষা ও গরীব বিধবাদের প্রতিপালন ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মের জন্য ব্যয় করা হয়, তাহলে সমাজ এবং সম্প্রদায় দুয়েরই উন্নতি হবে। এই জন্য তৈরী হোক কুরবানীর অর্থেসামাজিক উন্নয়নমূলক তহবিল’।

লেখক সাহেবের উক্ত মন্তব্য ও দাবী নিঃসন্দেহে বড় গর্হিত ও নিন্দনীয়। অপর দিকে তা কুফরমূলক বচনও বটে, তাতে সন্দেহ নেই। বক্তব্য থেকে এমন কয়েকটি বিষয় উপলব্ধ হয়, যা কুফরীর দিকেই ইঙ্গিত করে। যেমন,

১। কুরবানী না করে তার স্থানে কুরবানীর অর্থকে শিক্ষাদি ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার দাবী করার মানে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া। শরীয়তের আদেশ ও বিধানকে উপেক্ষা, অমান্য ও অস্বীকার করা বরং তার বিধিবদ্ধ বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার শামিল, যা মানুষকে কাফেরে পরিণত করে।

২। দুঃস্থ বালক ও গরীব বিধবাদের দরদের কথা যেন লেখক সাহেবই তুলে ধরলেন। আল্লাহ ও তার রসূল যেন তাদের প্রতি দরদী ও দয়াবান নন। তাই শরীয়ত তাদের জন্য কুরবানীর অর্থ ব্যয় করতে না বলে কুরবানীর বিধান দিয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)

৩। সমাজ ও সম্প্রদায়ে উন্নতি-অবনতি কিসে হবে, এ কথা আল্লাহ জানতেন না, লেখক সাহেব যেন আল্লাহকে ভুল ধরিয়ে দিতে চান যে, আল্লাহ তোমার দেওয়া বিধানে উন্নতি বা মঙ্গল নেই। কুরবানীর অর্থে উন্নয়নমূলক তহবিল তৈরী করার যে বিধান আমি গড়তে চাই, উন্নতি নিহিত আছে তাতে৷ (নাউযুবিল্লাহ)

৪। সার কথা হল, তিনি যেন আল্লার বিধানকে মুছে দিয়ে স্বরচিত বিধান প্রবর্তন করতে চান। অথবা আল্লাহর নামে নিজে বিধান রচনা করতে চান। আর নিশ্চয় যারা এমন ভাবনা ভাবে, তারা আল্লাহর দ্বীন থেকে বেরিয়ে যায়।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ

অর্থাৎ, তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা আরোপ করে বলে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করবার জন্য তোমরা বলো না, ‘এটা হালাল এবং এটা হারাম’। যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করবে তারা সফলকাম হবে না। (সূরা নাহল ১১৬ নং আয়াত)

তাহলে উক্ত আলোচনার সার বের হয় এই যে, লেখক সাহেবের দাবী ও বক্তব্য তাকে কুফরীর পানে টেনে নিয়ে আসে, যা হয়তো তিনি আদৌ ভাবেননি। আর আল্লাহ অজ্ঞানে এই শ্রেণীর কথা বলতে নিষেধ করতঃ বলেন,

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ 

অর্থাৎ, যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সে বিষয়ের পিছনে পড়ো না। (সূরা ইসরা, ৩৬ নং আয়াত)

তারপর লেখক সাহেব শেষের দিকে এক জায়গায় লিখেছেন যে, ‘ধর্ম যদি মানুষের সৎজীবন-যাপন ও মঙ্গল কামনার জন্য হয় তাহলে কুরবানীর অর্থ কোনও সামাজিক মঙ্গলের জন্য ব্যয় করাও যে ধর্মপালনেরই একটা অঙ্গ এবং তার সঙ্গে সেই জাতিরও উন্নতি। তাতে যে, সৃষ্টিকর্তা আরও বেশি সন্তুষ্ট হবেন সেটা ধর্মচারণকারীদের ভেবে দেখা উচিত’।

এই মর্মে আমি বলতে চাই যে, ধর্ম যে সত্যিকারেই মানুষের সৎজীবন-যাপন ও মঙ্গল কামনার জন্য এতে কি লেখক সাহেব কোন সন্দেহ পোষণ করেন নাকি? যদি তাই হয়, তাহলে জেনে রাখা উচিত যে, এমন ধারণা মানুষের কুফরীর চিহ্ন।

তারপর প্রশ্ন জাগে যে, ‘কুরবানীর অর্থ সামাজিক মঙ্গলের জন্য ব্যয় করা ধর্ম পালনের অঙ্গ’ এ কথা বলার অধিকার আপনি কোথেকে পেলেন? আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) কি এমন কথা কোথাও বলেছেন? নাকি আল্লাহ তাআলা কোন সূত্রে লেখক সাহেবকে এমন কথা বলার ক্ষমতা ও অধিকার দিয়েছেন? নাকি এটা লেখক সাহেবের পকেটের কথা ও স্বীয় যুক্তি ও চিন্তার ফসল?

ভাবতে অবাক লাগে! ধর্মীয় জ্ঞান-বিদ্যা ছাড়াই কি করে মানুষ এ সব অবান্তর কথা বলা ও লেখার সাহস করে? তারা কি আল্লাহকে একটুও ভয় করে না? অথচ আল্লাহ বলেন,

هَا أَنتُمْ هَٰؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُم بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

অর্থাৎ, তোমরা তো এমন যে, যে বিষয়ে তোমাদের কিছু জ্ঞান ছিল, সে বিষয়ে তর্ক করেছ। তাহলে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে কেন তর্ক করছ? বস্তুতঃ আল্লাহ জ্ঞাত আছেন এবং তোমরা জ্ঞাত নও (সূরা আল-ই-ইমরান, ৬৬ নং আয়াত)

আল্লাহ আরো বলেন,

وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّبِعُ كُلَّ شَيْطَانٍ مَّرِيدٍ

অর্থাৎ, কতক মানুষ আছে যারা জ্ঞান ও প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বিবাদ করে থাকে। (সূরা হজ্জ, ৩নং আয়াত)

এবার আসা যাক লেখক সাহেবের যুক্তি-তর্ক ও যুক্তিভিত্তিক মৌন ধ্যান-ধারণার পানে যে, তার চিন্তা-ধারার গহ্বরে লুক্কায়িত আছে কতটা যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা? সত্যিকারে মানুষ জ্ঞানী হলে তার কথা হবে জ্ঞান-সুলভ ও শরীয়তের গন্ডির ভিতরে যদি সে মুসলিম হয়। কিন্তু লেখক সাহেবের ভাষ্য থেকে যা বুঝা যায়, তা বড়ই অযৌক্তিক ও জ্ঞানবিহীন কথা। কারণ লেখক সাহেবের চিন্তিত যুক্তিটা যদি প্রকৃতই যুক্তির অনুকূলে হতো, তবে তার পূর্বেই বহু যুক্তিবাদী ও গবেষণা করা সে চিন্তা করে বসতো। কিন্তু এমনটি আজ পর্যন্ত অবিদিত ও অপরিচিত।

দ্বিতীয়তঃ, লেখকসাহেবকে গভীরে প্রবেশ ক’রে ভেবে দেখা উচিত ছিল যে, তার আলোচিত বিষয়টি কোন গ্রামাঞ্চল ও জেলাভিত্তিক নয়, রাজ্য ও রাষ্ট্রভিত্তিকও নয়, জাতীয়ও নয়, কিংবা দলগত ও পার্টিগতও নয় যে, বিষয়টি কখনো পাটি লেবেলে বিচারাধীন হতে পারে। বরং বিষয়টি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুসলিম পার্সনাল ল’ সম্পর্কিত, যার সাথে জড়িয়ে আছে মুসলমানদের ঐতিহ্য ও হাজার বছরের পুরাতন ইতিহাস। তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, লেখক সাহেবের ধারণায় তার ঐ যুক্তিযুক্ত মন্তব্যটি যদি সারা বিশ্বের মুসলমানদের সামনে পরিবেশন করা হয় তাহলে কি তারা তা মেনে নেবে? কুরবানীর ঐ সুন্নাতকে মুছে ফেলতে কি একমত হয়ে উঠবে? কখনোই সম্ভব নয়। বড় আক্ষেপের সাথে বলতে হচ্ছে যে, লেখক সাহেব কোন যুক্তিতে এতবড় অযৌক্তিক কথা চিন্তা না করেই বলেছেন? যুক্তি আঁটারও একটি সীমা আছে। সে সীমা ছাড়িয়ে গেলে যুক্তি অযুক্তিতে পরিণত হতে বাধ্য।

যুক্তি দেখাতে গিয়ে অযুক্তির ফাঁদে,

ইঁদুর ব্যাটা হাতির পোঁদে ঢুকে আজ কাঁদে।

যুক্তি দেখাবার হলে দেখাও যুক্তির যুক্তি,

যে যুক্তি কাটিবার নাই কারো শক্তি।

যুক্তিকে যুক্তি রূপে চেনাও বড় যুক্তি,

যুক্তিহীনকে যুক্তি বলা পাগলের উক্তি।

এবারে শেষে বলতে চাই যে, লেখক যদি দুস্থ বালক-বালিকা ও গরীব বিধবাদের এতই দরদী হলেন, তবে সমাজে কতশত অবৈধ পন্থায় অসংখ্য ও অগণন টাকা-কড়ি অপব্যয় করা হয়, কেন সেগুলোর বিরুদ্ধে ধ্বনি উত্তোলন করলেন না তিনি যে, এসব অবৈধ পথে অপব্যয় বন্ধ করা হোক এবং সেসব টাকায় তৈরী হোক সামাজিক উন্নয়নমূলক তহবিল।

এখন আপনি যদি জানতে চান অপব্যয়ের সেই পথগুলি, তো আসুন আপনাকে উদাহরণস্বরূপ জানাই আংশিক সেসব পথগুলির কথা।

বর্তমানে মুসলিম সমাজে বিবাহ-শাদীতে ইসলামী রীতি-নীতিকে পার্শ্বে রেখে জামাতাকে পণ ও যৌতুক প্রদান সহ অন্যান্য যে সব অবৈধ ব্যয়বহুল লৌকিকতা করা হয়, তা কারো অজানা নয়।

নবজাত শিশু সন্তানদের জন্মলগ্নে আকীকার সুন্নাত বাদ দিয়ে জন্মোৎসব, জন্ম দিবস ও খাতনা উৎসবের অনুষ্ঠানদিতে যে টাকা অপচয় করা হয়, তাও সবার জানা।

কারো মৃত্যুতে লোকদেরকে খাওয়ানোর ভোজ-ভান্ডারে এবং চালিসা নামের অনুষ্ঠানদিতে যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা সর্বজনবিদিত।

কবর ও মাযারে পীর-আলীদের নামে নৈকট্য লাভ ও আশা পূরণের উদ্দেশ্যে নযর ও মানত হিসাবে মুসলমানদের বাৎসরিক কতশত টাকা যে অপচয় হয়ে যাচ্ছে, তার কোন হিসাব নেই।

টি ভি (টেলিভিশন) থেকে শুরু করে টেপ-রেডিও, সিডি, ভিসিআর, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ইত্যাদির অপব্যবহারে যে অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। তবে বৈধ ও উপকারমূলক কাজে ব্যবহারের কথা বলছি না, তা হল ভিন্ন ব্যাপার। এছাড়া বিড়ি-সিগারেট, গুল-জর্দা, পান-খৈনী থেকে শুরু করে শারাব-মদ ইত্যাদি নেশা জাতীয় বস্তুতে বাৎসরিক মুসলমানদের কত কত অর্থ যে অপব্যয়িত হচ্ছে তার কোন সীমা সংখ্যা নেই।

অতএব লেখক সাহেবের কাছে প্রশ্ন করি যে, এ সমস্ত অবৈধ পথে খরচের বিরুদ্ধে কেন কোন সংগ্রাম করা হলো না? যদি ঐ সব অবৈধ পন্থার খরচগুলিতে উন্নয়নমূলক তহবিল তৈরী করা হতো, তাহলে কি দুস্থ বালক-বালিকাদের শিক্ষা ও গরীব-বিধবাদের প্রতিপালনের জন্য অর্থ যথেষ্ট ছিল না?

কিন্তু ব্যাপার তো আসলে তা নয়। আসল ব্যাপার হলো, লেখক সাহেবের সুস্থ ও সুষ্ঠু চিন্তাধারা শয়তান গ্রাস করে ফেলেছে এবং বিকৃত ধ্যান-ধারণার শিকার হয়ে পড়েছেন তিনি। তাই বলতে হচ্ছে যে, বাদুড় যদি দিন-দুপুরে দেখতে না পায়, তাহলে সূর্যের কী করার আছে।

বলা বাহুল্য, আজ লেখক সাহেব গরীব দুঃখীদের দরদী সাজতে চেয়েছেন। অথচ, তাদের দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটনের সমস্যা দূরীকরণে ইসলাম তার প্রভাতকালেই প্রণয়ন করেছে যাকাতের বিধান। উশর, ফিতরা, কুরবানীর চামড়া ইত্যাদি বিক্রয়ের অর্থ-সহ সাধারণ দান ইত্যাদির প্রতি উৎসাহ প্রদান বলুন তো, একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির মতো যদি সারা বিশ্বের মুসলমানেরা তাদের ধনসম্পদের যাকাত সঠিকভাবে বের করে মুক্ত হস্তে তা যথাস্থনে পৌছে দিত, তাহলে কি সেই গরীব দুঃখীদের সমস্যা বহুলাংশে লাঘব হত না? অবশ্যই হত। কিন্তু বাস্তব বলতে গেলে কি আজ অধিকাংশ মুসলমানেরা যথানিয়মে যাকাত দেয় না। তাহলে কেন সেই যাকাত প্রদানের দাবী তুলে ধরা হলো না? কেন তা সঠিক নিয়মে আদায় ও বিতরণের কথা বলা হল না? কেন আন্দোলিত হয় না যাকাত বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আইন প্রবর্তন ও তা বহাল করার কথা?

পরিতাপের বিষয় যে, মাননীয় লেখক সাহেবের মাথায় একটি মৃত ফরযকে জ্যান্ত করার কথা জাগল না, যাতে নিহিত ছিল অশেষ পুণ্য ও সওয়াব। আবার উল্টো দিকে প্রচলিত জগদ্ব্যাপী মুসলিম বরণীয় ও মহা সমারোহে পালনীয় এক সুন্নাতকে মুছে দিয়ে দাবী জানালেন, তার অর্থ দিয়ে উন্নয়নমূলক তহবিল তৈরী করা হোক। অবাক! আর শত অবাক! আল্লাহই সাহায্য প্রার্থনার কেন্দ্রস্থল এবং তিনি হিদায়াতদাতা।

বাকী থাকল লেখকের উল্লিখিত অপ্রাসঙ্গিক এই কথা যে, এবং সূদের শরীয়তি বিধি-নিষেধকে অমান্য করে—তো এটা ভিন্ন বিষয়। আল্লাহ ও তদীয় রাসূল পবিত্ৰ মলে কুরবানী করার কথা বলেছেন। এখন কেউ যদি তা না মানে এবং যে কোন হারাম পন্থায় উপর্জিত মালে কুরবানী করে, তাহলে তো আর কিছু করার ও বলার নেই। তার ভাল-মন্দ আল্লাহর কাছে গিয়ে বুঝবে সে কিংবা তার কুরবানী আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়া-না হওয়া বা তার পুণ্য পাওয়া না পাওয়া—এসব বিষয়ের বিচার আল্লাহর নিকট হবে।

উদাহরণস্বরূপ আল্লাহ মানুষকে হজ্জ করতে বলেছেন পবিত্র মাল দ্বারা। এখন যদি কেউ তা হারাম মালে আদায় করে, তাহলে তার ভাল-মন্দ পরিণাম সে আল্লাহর কাছে পাবে। তারপর সবাই যে হারাম মালেই হজ্জ করে বা সবাই সূদের টাকাতেই কুরবানী করে তাও কখনোও হতে পারে না। তাহলে কি নগণ্য কিছুসংখ্যক লোকের ঐ রকম করার ওজুহাতে সমূলে হজ্জ বা কুরবানীর বিধানকেই মুছে দিতে হবে?! এ আবার কোন দেশীয় কথা? যেমন ধরুন, কারো হাতে বা পায়ে যদি ঘা বা ফোঁড়া হয়, তাহলে কি তার গলাটাও কেটে ফেলে দিতে হবে? তাকে কি জান থেকে শেষ ক’রে ফেলে দিতে হবে ? নাকি সেই ঘায়ের চিকিৎসা করতে হবে? কোনটা যুক্তির কথা? নিশ্চয় গলা কেটে ফেলা নয়, বরং চিকিৎসা করানোটাই যুক্তির কথা হবে।

তাহলে মাননীয় লেখক সাহেবের পেশকৃত কোন যুক্তিটাই যেমন সঠিক যুক্তি বলে প্রমাণিত হয় না, তেমনি তার দাবীর পশ্চাতে কোন কথাটিই প্রামাণ্য ও গ্রহণযোগ্য বলে সাব্যস্ত হয় না। তার স্বীয় দাবী ও মতের পিছনে কোন কুরআন হাদীসের দলীলও বর্তমান নেই। সুতরাং তার কথা ও দাবী বাতিল, বাতিল, বাতিল।

আশা করি, আমার এই আলোচনা ও পর্যালোচনা পড়ার পর লেখক ও পাঠকবর্গের সামনে সত্যের আলো উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। আর লেখকের দাবীর ভ্ৰষ্টতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

পরিশেষে দুআ করি, আল্লাহ গো! তুমি মাননীয় লেখক সাহেবকে হক পাইয়ে দাও এবং তাকে ও আমাদের সবাইকে হক ও সত্য মেনে চলার সুমতি ও তাওফীক দান করো। আমীন, আল্লাহুম্মা আমীন।

মতামত দিন