প্রবন্ধ যাকাত

যাকাত বিধানের সারসংক্ষেপ (চতুর্থ পর্ব)

পঞ্চম: চতুষ্পদ প্রাণীর যাকাত

এ অধ্যায় দ্বারা উদ্দেশ্য উট, গরু ও বকরির যাকাত। কারণ, এসব প্রাণী ব্যতীত অন্যান্য প্রাণীর যাকাতের কথা হাদীসে উল্লেখ নেই। অতএব, সাধারণ পাখি, মুরগি, ঘোড়া, গাধা, খরগোশ ও অন্যান্য প্রাণীতে যাকাত নেই, তার সংখ্যা যত বেশি হোক, তবে কোনও প্রাণী ব্যবসার জন্য নির্ধারিত হলে ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। চতুষ্পদ প্রাণীর যাকাতের জন্য শর্তসমূহ:

১. নিসাব পরিমাণ হওয়া, যার ব্যাখ্যা সামনে আসছে।

২. হিজরী এক বছর পূর্ণ হওয়া।

৩. যাকাতের পশু সায়েমা হওয়া। (সায়েমার সংজ্ঞা নিম্নের প্যারাতে আসছে)

পশু যদি মালিকের কেটে আনা ঘাস খায়, তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে না, অধিকাংশ আলেমের মত এটি। আর যদি ব্যবসার জন্য পশু লালন-পালন করা হয় ব্যবসার পণ্য হবে, তাদের লালন-পালন যেভাবেই হোক না কেন। তবে লক্ষণীয় যে, কেউ যদি নিজের জমি চাষ করার জন্য পশু পালন করে তাতে যাকাত নেই, কারণ এগুলো সায়েমা নয়, গৃহপালিত পশুও ব্যবহারের আসবাব-পত্রের ন্যায়। আলিমদের বিশুদ্ধ মত এটি। কারণ সায়েমা পশুর ওপর যাকাত ওয়াজিব, অর্থাৎ যেসব পশু মাঠে-জঙ্গলে ও পাহাড়ে চরে বেড়ায় এবং বছরের অধিকাংশ দিন প্রাকৃতিক ঘাস ও তৃণলতা খায় সেসব পশুই কেবল ‘সায়েমা’।

নিম্নে উট, গরু ও বকরির যাকাতের নিসাব ও তার পরিমাণ দেওয়া হল:

ক. সায়েমা উটে যাকাতের নিসাব ও তার পরিমাণ শরী‘আত নির্ধারণ করে দিয়েছে, নীচের চার্টে দেখুন:

ক্র. উটের সংখ্যা যাকাতের পরিমাণ
১. ১-৪ যাকাত নেই, চাইলে নফল সদকা করবে।
২. ৫-৯ একটি বকরি: ছাগল বা মেষ
৩. ১০-১৪ দু’টি বকরি
৪. ১৫-১৯ তিনটি বকরি
৫. ২০-২৪ চারটি বকরি, মালিকের সুবিধা হলে চারটি বকরির স্থানে একটি উট দিবে।
৬. ২৫-৩৫ বিনতু মাখাধ মাদী: দ্বিতীয় বছরের উটনী।
৭. ৩৬-৪৫ বিনতু লাবুন মাদী: তৃতীয় বছরের উটনী।
৮. ৪৬-৬০ একটি হিক্কাহ: চতুর্থ বছরের উটনী।
৯. ৬১-৭৫ একটি জিয‘আহ: পঞ্চম বছরের উটনী।
১০. ৭৬-৯০ দু’টি বিনতু লাবুন।
১১. ৯১-১২০ দু’টি হিককাহ।

জ্ঞাতব্য: উটের সংখ্যা যদি (১২০) থেকে বেশি হয়, তখন প্রত্যেক ৪০ অংকের জন্য একটি বিনতু লাবুন এবং প্রত্যেক পঞ্চাশ অংকের জন্য একটি হিক্কাহ যাকাত দিবে। উট যত বেশি হোক এভাবে (৪০ ও ৫০) দু’টি সংখ্যায় ভাগ করবে, যেমন:

উট সংখ্যা ৪০ ও ৫০ সংখ্যা যাকাতের পরিমাণ
১৩০ ১৩০=(২*৪০)+(৫০)= ২ বিনতু লাবুন ও ১ হিককাহ
১৪০ ১৪০=(২*৫০)+(৪০)= ২ হিককাহ ও ১ বিনতু লাবুন
১৫০ ১৫০=(৩*৫০)= ৩ হিককাহ
১৬০ ১৬০=(৪*৪০)= ৪ বিনতু লাবুন
১৭০ ১৭০=(৩*৪০)+(৫০)= ৩ বিনতু লাবুন ও ১ হিককাহ
১৮০ ১৮০=(২*৫০)+(২*৪০)= ২ হিককাহ ও ২ বিনতু লাবুন
১৯০ ১৯০=(৩*৫০)+(৪০)= ৩ হিককাহ ও ১ বিনতু লাবুন
২০০ ২০০=(৪*৫০)= অথবা

২০০=(৫*৪০)=

৪ হিককাহ অথবা

৫ বিনতু লাবুন

২. যদি নির্দিষ্ট বছরের উট মালিকের ওপর ওয়াজিব হয়, যেমন চার্টে আমরা স্পষ্ট করেছি, আর সে বয়সের উট না থাকে, বরং কম বয়সের উট থাকে, যেমন একটি জিয‘আহ (চার বছরের উট) যাকাত ওয়াজিব হয়েছে কিন্তু তার নিকট জিয‘আহ নেই, আছে বিনতু লাবুন অর্থাৎ দুই বছরের উট, অথবা কারও ওপর দুই বছরের বিনতু লাবুন ওয়াজিব, কিন্তু তার নিকট বিনতু লাবুন নেই, আছে বিনতু মাখাধ অর্থাৎ এক বছরের উট, এই অবস্থায় তার থেকে কম বয়সের উট এবং তার সাথে দু’টি বকরি অথবা দু’টি বকরির বাজার দর গ্রহণ করা হবে, যে কোনো একটি গ্রহণ করলে সমস্যা নেই।[1] এটাকে বলা হয় (جُبرَان) অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ।

৩. উপরের অবস্থার বিপরীত, মালিকের ওপর কম বয়সের উট ওয়াজিব, কিন্তু সেই বয়সের উট নেই, তার চেয়ে বেশি বয়সের উট আছে, যেমন বিনতু মাখাধ ওয়াজিব, কিন্তু বিনতু মাখাধ নেই, বিনতু লাবুন আছে। অথবা বিনতু লাবুন ওয়াজিব, কিন্তু বিনতু লাবুন নেই, তার চেয়ে বেশি বয়সের হিককাহ আছে। অথবা হিককাহ ওয়াজিব, কিন্তু হিককাহ নেই, তার চেয়ে বেশি বয়সের জিয‘আহ আছে। এসব অবস্থায় বেশি বয়সের উট গ্রহণ করবে, আর বেশির বিনিময় যাকাত উসুলকারী থেকে মালিক দু’টি বকরি অথবা তার মূল্য গ্রহণ করবে, যাকাত উসুলকারী যা-ই দিবে গ্রহণ করবে। যাকাত উসুলকারী বর্তমান যুগে অনেকটা ট্যাক্স উসুলকারীর ন্যায়।

৪. যে প্রকার উট যাকাত দাতার ওপর ওয়াজিব, যদি সে প্রকার থেকে সরাসরি নিচের স্তর অথবা সরাসরি তার উপরের স্তরের উট পাওয়া না যায়, বরং এক স্তর থেকে নীচের উট অথবা এক স্তর থেকে উপরের উট পাওয়া যায়, তাহলে মালিককে নির্দিষ্ট প্রকার উট হাযির করতে বাধ্য করা হবে। যেমন কারও ওপর জিয‘আহ ওয়াজিব, কিন্তু জিয‘আহ নেই এবং সরাসরি তার নীচের স্তরের উট, অর্থাৎ হিককাহও নেই, তবে এক স্তর থেকে নীচের উট অর্থাৎ বিনতু লাবুন আছে। এই অবস্থায় মালিক থেকে বিনতু লাবুন গ্রহণ করা হবে না, বরং নির্ধারিত উট হাযির করতে তাকে বাধ্য করবে। অনুরূপ কারও ওপর বিনতু মাখাধ ওয়াজিব, কিন্তু বিনতু মাখাধ নেই এবং সরাসরি তার উপরের স্তরের উট, অর্থাৎ বিনতু লাবুনও নেই, তবে এক স্তর থেকে উপরের উট, অর্থাৎ হিককাহ বা জিয‘আহ আছে। এই অবস্থায় তার থেকে উট গ্রহণ করা হবে না, বরং নির্দিষ্ট প্রকার উট হাজির করতে তাকে বাধ্য করা হবে, তবে মালিক যদি নিজের ইচ্ছায় এক স্তর থেকে উপরের উট প্রদান করে, তখন তা গ্রহণ করতে সমস্যা নেই।

৫. যাকাত হিসেবে যার ওপর উট ওয়াজিব, সে উপরের বর্ণনা মোতাবেক উট দিবে, উটের মূল্য পরিশোধ করা যথেষ্ট নয়। অনুরূপভাবে যা ওয়াজিব হয় তার পরিবর্তে অন্য বস্তু প্রদান করা যথেষ্ট নয়, যেমন উটের পরিবর্তে গরু দেওয়া যথেষ্ট নয়।

ইবন তাইমিয়াহ রহ. মনে করেন, মুসলিমদের উপকার ও প্রয়োজন হলে মূল্য দিয়ে যাকাত দেওয়া বৈধ। যেমন, কারও ওপর উটের যাকাত বকরি ওয়াজিব, তার নিকট বকরি নেই, সে তার মূল্য দিলে যথেষ্ট হবে। বকরি ক্রয় করার জন্য তাকে সফর করতে বাধ্য করবে না অথবা তার ঘনিষ্ঠ কেউ যাকাতের হকদার, সে পশুর যাকাতের মূল্য চায়, মূল্যই তার জন্য উপকারী, এমন হলে তাকে মূল্য দেওয়া বৈধ।[2]

শাইখ আদিল আয্যাযী বলেন: “ইখতিলাফ থেকে বাচার জন্য শিথিলতা ত্যাগ করে নির্দিষ্ট বস্তু দিয়ে যাকাত দেওয়াই উত্তম”। অনুরূপ ফসলের যাকাত, প্রয়োজন ব্যতীত মূল্য দিয়ে পরিশোধ না করাই শ্রেয়।

খ. বকরির যাকাত: বকরির নিসাব নর বা মাদী ৪০টি বকরি। বকরি মেষকেও শামিল করে। অতএব, বকরি ও মেষের যাকাত নিম্নরূপ:

ক্র. বকরি / মেষের সংখ্যা যাকাতের পরিমাণ
১. ১-৩৯ যাকাত নেই, চাইলে সদকা করবে।
২. ৪০-১২০ ১ বকরি।
১২১-২০০ ২ বকরি।
২০১-৩০০ ৩ বকরি।

বকরি যদি ৩০০ থেকে অধিক হয়, প্রতি একশো থেকে একটি বকরি যাকাত দিবে। অর্থাৎ বকরি ৪০০ হওয়ার আগে চারটি বকরি ওয়াজিব হবে না, অতএব, ৩৯৯টি বকরি পর্যন্ত তিনটি বকরি ওয়াজিব হবে, বকরির সংখ্যা যখন ৪০০ হবে ৪টি বকরি ওয়াজিব হবে ৪৯৯টি পর্যন্ত। এভাবে উপরের দিকে অগ্রসর হবে।

লক্ষণীয় যে, সায়েমা বা স্বাধীনভাবে বিচরণকারী পশুর ওপর হিজরী এক বছর পূর্ণ হলে যাকাত ফরয হয়। আরেকটি বিষয়, ইতোপূর্বে বকরির যে নিসাব বলেছি সে নিসাব বরাবর হলে যাকাত ফরয হবে। পালের সব বকরি হোক, বা পালের সব মেষ হোক, বা পালের কতক বকরি ও কতক মেষ যেভাবে নিসাব পূর্ণ হবে, তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে।

যাকাত হিসেবে যে বকরি ওয়াজিব হয়, তার অবশ্যই দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করা জরুরি। এক বছর পূর্ণ হয়নি এরূপ মেষকে ‘জিয‘আহ’ বলা হয়, আবার কেউ ছয় মাস বা কেউ আট মাসের মেষকে জিয‘আহ বলেছেন।

আরেকটি জরুরি বিষয়, যাকাত হিসেবে যা ওয়াজিব হয় সেটি মেষ বা বকরি আবার নর বা মাদী যাই পরিশোধ করা হোক কোনো সমস্যা নেই। যাকাতের বকরি নিজের পাল বা অন্যত্র থেকে সংগ্রহ করে দেওয়ার অনুমতি আছে, সেটি খরিদ বা ঋণ করে যেভাবে হোক। অধিক বয়স্ক অথবা ত্রুটিযুক্ত অথবা পাঠা যাকাত হিসেবে দিবে না, তবে যাকাত উসুলকারী চাইলে সেটি গ্রহণ করতে সমস্যা নেই।

যাকাত উসুলকারী সর্বোত্তম ও সবচেয়ে সুন্দর পশু উসুল করবে না, যেমন বেশি বাচ্চাদানকারী অথবা বেশি মোটা-তাজা অথবা গর্ভবতী পশু। অনুরূপ নর-ছাগল নিবে না, তবে মালিক দিতে চাইলে গ্রহণ করতে সমস্যা নেই। যাকাত হিসেবে দু’বছরের বকরি অথবা আট-নয় মাসের মেষ উসুল করবে।

গ. গরুর যাকাত: গরুর যাকাতের নিসাব ৩০টি গরু। নর-মাদী উভয় প্রকার কিংবা শুধু মাদী বা শুধু নর যাই হোক ৩০টি গরু হলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। নিসাব পরিমাণ গরুর ওপর হিজরী এক বছর পূর্ণ হলে একটি তাবি বা তাবি‘আহ অর্থাৎ এক বছরের নর বা মাদী গরু যাকাত দিবে। তারপর প্রতি ৪০টি গরু থেকে একটি মুসিন্নাহ অর্থাৎ দুই বছরের গরু যাকাত দিবে। অধিকাংশ আলিম এ কথা বলেছেন। গরু যত বেশি হোক ৩০ ও ৪০ দু’টি সংখ্যায় অর্থাৎ তিন দশক ও চার দশক করে ভাগ করবে:

ক্র. গরুর সংখ্যা যাকাতের পরিমাণ
১. ১-২৯ যাকাত নেই
২. ৩০-৩৯ ১টি তাবি বা তাবিআহ (১ বছরের গরু)
৩. ৪০-৫৯ ১টি মুসিন্নাহ (২-বছরের গরু)
৪. ৬০ ৬০=(৩০*২)= দু’টি তাবি/তাবিআহ (নর-মাদী)
৫. ৭০ ৭০=(৩০+৪০)= ১টি তাবিআহ ও ১টি মুসিন্নাহ
৬. ১০০ ১০০=(৩০*২)+৪০= ২টি তাবিআহ ও ১টি মুসিন্নাহ

আরেকটি মাসআলা জানা জরুরি যে, যদি মনে করি কারও ৬৫ টি গরু আছে, সে ৬০টি গরুর যাকাত দিবে, পূর্বে বলেছি, ষাটের অতিরিক্ত ৫টি গরুর যাকাত নেই।

কয়েকটি জরুরি জ্ঞাতব্য:

১. গরুর ক্ষেত্রে সায়েমাহ হওয়া শর্ত কি না, আহলে ইলমগণ দ্বিমত পোষণ করেছেন। বিশুদ্ধ মতে অন্যান্য পশুর মত গরুরও সায়েমাহ হওয়া জরুরি।

২. উটের ন্যায় গরুর ক্ষেত্রে جُبران তথা ক্ষতিপূরণ নেই, যে গরু ওয়াজিব যদি সেটি তার কাছে না থাকে, ক্রয় করে বা ঋণ করে যেভাবে হোক হাজির করবে, কম বা বেশি বয়সী গরু গ্রহণ করা হবে না, তবে মালিক বেশি বয়সের গরু স্বেচ্ছায় দিলে যাকাত উসুলকারীর তা নিতে সমস্যা নেই।

৩. তাবি‘ অর্থাৎ এক বছরের গরু অথবা মুসিন্নাহ অর্থাৎ দু’বছরের গরু নর-মাদী উভয় গ্রহণ করা বৈধ।

৪. লক্ষণীয় যে, মহিষও এক প্রকার গরু। যদি গরু ও মহিষের মালিক হয় গণনার সময় একটির সাথে অপরটি যোগ করবে, যেমনটি বকরি ও মেষের ক্ষেত্রে যোগ করা হয়, অতঃপর হিজরী এক বছর হলে যাকাত দিবে।

৫. বাছুর ও উটের বাচ্চার দু’টি অবস্থা:

ক. কেউ যদি নিসাব পরিমাণ উট বা গরু বা বকরির মালিক হয়, অতঃপর হিজরী বছরের মাঝে কতিপয় পশু বাচ্চা দেয়, অধিকাংশ আলিম বলেন: বাচ্চা তাদের মায়ের সাথে গণনা করা হবে, তবে যাকাত ছোট বাচ্চা দিয়ে দিবে না, বড় পশু দিয়েই দিবে।

খ. যদি ছোট পশু নিসাব পরিমাণ থাকে এবং তার ওপর হিজরী এক বছর পূর্ণ হয়, একদল আলিম বলেন: এতে যাকাত নেই, কিন্তু অধিকাংশ আলিম বলেন: তাতে যাকাত ওয়াজিব, তবে ছোট পশু দিয়েই যাকাত দিবে। এটিই বিশুদ্ধ মত।

ইবন তাইমিয়াহ রহ. এসব অভিমত উল্লেখ করে বলেন: “… যদি সবপশু ছোট হয়, কেউ বলেছেন: ছোট পশু দিবে। আর কেউ বলেছেন: বড় পশু কিনে দিবে”।[3]

৬. আলিমদের প্রসিদ্ধ মতে, যৌথ মালিকানা পশুর যাকাতে ভূমিকা রাখে, অর্থাৎ যৌথ মালিকানার কারণে পশুর যাকাত হ্রাস-বৃদ্ধি হয়, যেমন তিন জন প্রতিবেশী প্রত্যেকে ৪০টি করে বকরির মালিক, সবাই একটি করে বকরি যাকাত দিবে এটিই স্বাভাবিক, অর্থাৎ তিনজন তিনটি বকরি যাকাত দিবে। কিন্তু যাকাত উসুলকারী আসার পর যদি তিনজনের বকরি এক জায়গায় করে পেশ করে ১২০টি বকরি হয়, যার যাকাত মাত্র একটি বকরি। বকরির যাকাতের চার্ট দেখুন। অথবা দু’জন শরীক যৌথভাবে ৪০টি বকরির মালিক, কিন্তু যাকাত উসুলকারী আসার পর যদি তারা ভাগ করে নেয়, একজন ২০টি করে পায়, ফলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হয় না, অথচ তাদের ওপর একটি বকরি ওয়াজিব, যেমন চার্টে বলেছি। যাকাত থেকে নিষ্কৃতির জন্য এরূপ বাহানা করা হারাম। অতএব, পশু যোগ বা ভাগ করার উদ্দেশ্য যদি হয় যাকাত হ্রাস বা রহিত করা, তাহলে এরূপ করা হারাম এবং অভিযুক্তরা শাস্তির উপযুক্ত।

কয়েকটি জরুরি বিষয়:

১. শাইখ ইবন উসাইমীন রহ. বলেন: পশু ব্যতীত অন্যান্য সম্পদ যোগ করলে যাকাতে প্রভাব পড়ে না। অতঃপর তিনি একটি উদাহরণ দিয়েছেন: দু’জন ব্যক্তি ফসলি জমি অথবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, উভয়ের সম্পদ যৌথভাবে নিসাব পরিমাণ, কিন্তু পৃথকভাবে প্রত্যেকের সম্পদ নিসাব পরিমাণ নয়। অতএব, তাদের ওপর যাকাত নেই।[4]

২. জ্ঞাতব্য, পশুর যাকাত পশুর স্থান থেকে গ্রহণ করবে, যেমন যাকাত উসুলকারী পশুর জায়গায় চলে যাবে, মালিককে উসুলকারীর জায়গায় পশু হাজির করতে বাধ্য করবে না।

ষষ্ঠ: ফল ও ফসলের যাকাত

১. কোন কোন ফসলের ওপর যাকাত ওয়াজিব?

হাদীসে যেসব ফসলের নাম উল্লেখ করে যাকাত নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো চার প্রকার: ক. الحِنطة বা গম, খ. الشعير  বা যব, গ. التمر বা খেজুর, ও ঘ. الزبيب বা কিশমিশ।

জ্ঞাতব্য যে, এই চার প্রকার ব্যতীত অন্যান্য ফল ও ফসলে যাকাত ওয়াজিব হবে কি না আহলে ইলমগণ দ্বিমত পোষণ করেছেন, বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, (আল্লাহ ভালো জানেন) যেসব ফল ও ফসল খাদ্য ও সঞ্চয় করার উপযুক্ত তাতে যাকাত ওয়াজিব, অর্থাৎ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করলে নষ্ট হয় না, যেমন ভুট্টা, চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য। অতএব, শাক-সবজি, জয়তুন ও ফলের ভেতর যাকাত নেই, কাঁচা খেজুর ব্যতীত [কারণ তা সঞ্চয় করা যায়], অনুরূপ আঙ্গুর ব্যতীত। কারণ, আঙ্গুর সঞ্চয় [করা যায়, তা সঞ্চয়] করলে কিশমিশ হয়।

ফল ও ফসলের যাকাতের নিসাব: অধিকাংশ আলিম বলেছেন: ফল ও ফসলের নিসাব পাঁচ ওসাক[5], যা সাধারণত ৬৪৭ কেজি হয়। লক্ষণীয় যে, এই পরিমাপ করবে শস্য খোসা থেকে পরিস্কার করার পর। অনুরূপ ফল শুকানোর পর। উদাহরণত কারও ১০ ওসাক আঙ্গুর আছে, শুকানোর পর যদি পাঁচ ওসাক থেকে কম হয়, তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে না, কারণ নিসাব পর্যন্ত পৌঁছেনি, অর্থাৎ পাঁচ ওসাক।[6]

যদি ফল ও ফসল খোসাসহ গুদামজাত করা হয়, বিশুদ্ধ মতে অভিজ্ঞগণ চিন্তা করে বলবেন খোসা থেকে পরিস্কার করা হলে কি পরিমাণ ফসল টিকবে, যদি পাঁচ ওসাক বা তার চেয়ে বেশি টিকে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে।[7]

ফসলে যাকাতের পরিমাণ: দশ ভাগের একভাগ ফসল যাকাত দেওয়া ওয়াজিব, অর্থাৎ মোট ফল ও ফসলের ১০% যাকাত দিবে, যদি প্রাকৃতিক সেচ দিয়ে বিনা খরচে ফসল উৎপন্ন হয়, যেমন নদী-খাল ও বৃষ্টির পানির ফসল। অনুরূপ যে গাছগাছালি লম্বা শিকড় দিয়ে দূর থেকে পানি চুষে নেয়, সেচ করার প্রয়োজন হয় না তার হুকুমও এক, যেমন খেজুর গাছ। আর যদি ফল ও ফসলের জমি টাকা খরচ করে সেচ করা হয়, যেমন মেশিন দিয়ে সেচ করা হয়, তার ৫% অর্থাৎ এক দশমাংশের অর্ধেক বা বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিবে। চার ইমামের মাযহাব এটি, এতে কেউ দ্বিমত করেন নি।

ফল ও ফসলের যাকাত দেওয়ার সময়: বিশুদ্ধ মতে, ফল যখন ব্যবহার উপযোগী হয় ও পেকে যায়, যেমন ফলের আঁটি শক্ত বা খেজুর লাল হয়, তখন তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়, তবে যখন ফসল খোসা থেকে পরিস্কার করবে বা তাতে মেশিন লাগাবে, তখন আদায় করবে, অনুরূপ খেজুর শুকানোর পর তার যাকাত দিবে।

জ্ঞাতব্য যে, ফসল নিসাব পরিমাণ হওয়ার পর মালিক যেভাবে ইচ্ছা তাতে কর্তৃত্ব করতে পারবে, যেমন বেচা ও হেবা করা ইত্যাদি। যদি ফল উপযুক্ত হওয়ার পর মালিক সেখান থেকে বেচে বা কাউকে হেবা করে, বিশুদ্ধ মতে তার যাকাত মালিকের ওপর ওয়াজিব হবে, অর্থাৎ বিক্রেতার ওপর। কারণ, যখন সে ফল/ফসলের মালিক ছিল, তখন যাকাত ওয়াজিব হয়েছে। এখন চাইলে ফসল কিনে যাকাত দিবে বা সহজতার জন্য টাকাও দিতে পারবে। আর যদি ফল উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে বেচে দেয় কিংবা হেবা করে, অতঃপর ক্রেতা কিংবা দান গ্রহীতার কাছে ফল বা ফসল উপযুক্ত হয়, ক্রেতা বা দান গ্রহীতার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে, যদি যাকাত পরিমাণ হয়।[8]

জ্ঞাতব্য যে, মালিকের হস্তক্ষেপ বা সীমালঙ্ঘন ছাড়া যদি ফল বা ফসল ধ্বংস হয় তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে না। যদি যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পর মালিক নিজে ধ্বংস করে, তবে তার ওপর থেকে যাকাত মওকুফ হবে না। যদি সে দাবি করে সীমালঙ্ঘন ছাড়া নষ্ট হয়েছে, বিশুদ্ধ মতে তার কথা গ্রহণযোগ্য হবে, কসম নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ইমাম আহমদ বলেছেন: সদকার জন্য কসম গ্রহণ করা যাবে না।

ফল ও ফসলের যাকাত সংক্রান্ত বিভিন্ন মাসআলা:

১. ফসলের মালিকের ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে, চাষি জমির মালিক হোক বা বৈধ চুক্তিতে অপরের জমি চাষ করুক, যেমন ভাড়া বা হেবা অথবা অবৈধভাবে তাতে চাষ করুক যেমন জবরদখল। যদি জমির মালিক ও চাষির মাঝে চাষবাসের চুক্তি হয়, যেমন চুক্তি করল: জমির মালিক জমি দিবে, চাষি চাষ করার যাবতীয় খরচ বহন করবে, যেমন চাষ করা, পানি দেওয়া, কাঁটা ও সংগ্রহ করা ইত্যাদি, তারপর চুক্তি মোতাবেক উভয় ফসল ভাগ করবে। যদি বণ্টন শেষে দু’জনের অংশ যাকাতের নিসাব পরিমাণ না হয় যাকাত ওয়াজিব হবে না, কারণ ফসলের যাকাতে যৌথ মালিকানার প্রভাব নেই, পশুর বিষয়টি ব্যতিক্রম, যেমন পূর্বে বলেছি, এটিই বিশুদ্ধ মত।

২. যে ফল ও ফসলে যাকাত ওয়াজিব হয়, সেই ফল ও ফসল যদি পাঁচ ওসাক হয় যাকাত ওয়াজিব হবে। পাঁচ ওসাক পূর্ণ করার জন্য এক ফসল অপর ফসলের সাথে যোগ করবে না। অতএব, খেজুরের সাথে কিশমিশ কিংবা যবের সাথে গম যোগ করবে না। যখন যেই প্রকার নিসাব পরিমাণ হবে তখন সেই প্রকারের যাকাত দিবে। যদি একই প্রকার ফসল বিভিন্ন জাতের হয়, তখন এক জাত অপর জাতের যোগ করবে, যেমন কাঁচা, আধা পাকা ও পাকা খেজুর, একটি অপরটির সাথে যোগ করে হিসেব করবে।

৩. এক প্রকার ফসল পাঁচ ওসাক হলে যাকাত ওয়াজিব হবে। যদি মালিক একজন হয় এক বা একাধিক ক্ষেতের ফসল যোগ করবে, ক্ষেতের মধ্যবর্তী দূরত্ব যাই হোক, যদি পাঁচ ওসাক হয় যাকাত দিবে। অনুরূপ কেউ গ্রীষ্মকালে ফসল করেছে, যা নিসাব পরিমাণ হয় নি, আবার বসন্তকালে একই ফসল করেছে, উভয় মৌসুমের ফসল যদি যৌথভাবে নিসাব পরিমাণ হয় এক-দশমাংশ যাকাত দিবে, কারণ বছর এক।

৪. জমি চাষ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়, যেমন চাষ করা, ফসল কাটা, সংগ্রহ করা, মেশিন লাগানো, পানির কুপ খনন ও প্রণালি তৈরি করা ইত্যাদি যাকাত থেকে নিবে কি না?

আহলে ইলমদের বিশুদ্ধ মাযহাব, -অধিকাংশ আলিমও বলেছেন- যদি চাষি চাষ করার জন্য ঋণ করে, তাহলে ঋণের পরিমাণ যাকাত থেকে পরিশোধ করবে। চাষি যদি নিজ থেকে খরচ করে এবং সে ঋণগ্রস্ত নয়, চাষের খরচ যাকাত থেকে নিবে না। এটি একটি বিষয়।

ইমাম খাত্তাবী রহ. বলেছেন: “চাষি যদি নির্দিষ্ট খরচ দিয়ে কুপ খনন ও নালা-প্রণালা তৈরি করে, অতঃপর তা নষ্ট হয় ও পানি কমে যায় এবং পুনরায় নতুন খরচে কুপ খনন করা জরুরি হয়, তবে চাষি এক-দশমাংশের অর্ধেক অর্থাৎ বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিবে। এটি মালিকের প্রতি এক প্রকার সহানুভূতি।[9]

৫. ফসল সংগ্রহ ও মাপার সময় চাষি, চাষির পরিবার ও চতুষ্পদ জন্তু যা খায় বা দুর্বলরা নেয় বা কাটার সময় সদকা করে সেগুলো চাষির থেকে গুনবে না।

৬. ইবন কুদামাহ রহ. বলেছেন: যদি টাকার বিনিময়ে সেচ করে বছরের প্রথম অর্ধেকে একটি ফসল তুলে, যা নিসাব পরিমাণ নয়। অতঃপর বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিনা খরচে একই ফসল করে এবং দুই বারের ফসল যৌথভাবে নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে যাকাত ওয়াজিব হবে। যাকাতের পরিমাণ: এক-দশমাংশের তিন চতুর্থাংশ।[10] অর্থাৎ মোট ফসলের ৭.৫% যাকাত দিবে।[11]

৭. কারও দু’টি বাগান একটি অর্থ দিয়ে অপরটি অর্থ ছাড়া সেচ করে, নিসাব হিসেব করার সময় দুই বাগানের ফসল যোগ করবে, অতঃপর যে বাগান বিনা অর্থে সেচ করে তার এক-দশমাংশ যাকাত দিবে, অর্থাৎ ফসলের ১০%, আর যে বাগান অর্থ দিয়ে সেচ করে তার এক দশমাংশের অর্ধেক অর্থাৎ বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিবে, যা মোট ফসলের ৫%।

৮. এক ফসলে যখন একবার উশর তথা এক-দশমাংশ যাকাত ওয়াজিব হয়, সেই ফসলে দ্বিতীয়বার উশর ওয়াজিব হবে না, তার ওপর দিয়ে যত বছর অতিক্রম করুক, তার উদাহরণ: জনৈক চাষির এক বছর থেকেও অধিক সময় ধরে একটি ফসল আছে, যার যাকাত সে একবার দিয়েছে, কিন্তু তার নিসাব কমে নি, দ্বিতীয়বার এই ফসলে যাকাত ওয়াজিব হবে না, তবে ফসলের কোনো অংশ যদি ব্যবসার জন্য নির্ধারিত করে, সে অংশ ব্যবসায়ী পণ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। তার ওপর বছর পূর্ণ হলে ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে যাকাত দিবে, যেমন পূর্বে আলোচনা করেছি।[12]

৯. ইবন উসাইমীন রহ. বলেন: “কাউকে বলা হল, এই ক্ষেতের ফসল তুলো, বিনিময়ে তুমি এক তৃতীয়াংশ নিবে, আর তোমার মালিক নিবে দুই-তৃতীয়াংশ। যদি এই শর্তে সে ফসল তোলে তার এক-তৃতীয়াংশে যাকাত ওয়াজিব হবে না, যদিও তা পাঁচ ওসাক অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ হয়। কারণ, যখন যাকাত ওয়াজিব হয়েছে তখন সে ফসলের মালিক ছিল না, মালিক হয়েছে ফসল তোলার পর।[13]

চলবে……

(লেখকঃ রামি হানাফী মাহমুদ)

তথ্যসূত্রঃ

[1] আশ-শারহুল মুমতি‘: (৬/৬০)।

[2] দেখুন: আল-ইখতিয়ারাতুল ফিকহিয়্যাহ: (পৃ. ১৮৪)।

[3] দেখুন: আল-ফাতাওয়া: (২৫/৩৭)।

[4] আশ-শারহুল মুমতি‘: (৬/৭০)।

[5] এক ওসাক ৬০ ‘সা’, তাই ৫ ওসাক ৩০০ ‘সা’ হয়, অথবা অধিকাংশ আলেমের দৃষ্টিতে ৩০০ ‘সা’ ৬৫৩ কেজি, যদি এক ‘সা’-কে ২১৭৫ গ্রাম ধরা হয়। কেউ এক ‘সা’-র পরিমাণ করেছেন ২.৫ কেজি, বা ২৫০০ গ্রাম। সে হিসেবে ৩০০ ‘সা’ ৭৫০ কেজি হয়, অর্থাৎ ১৮ মন ৩০ কেজি। এক ‘সা’ এর প্রকৃত হিসেবে আমরা ০০ নং পৃষ্ঠায় করে এসেছি, অর্থাৎ মাঝারি সাইজের মানুষের দুই হাতের চার খাবরি/আঁজলা/অঞ্জলি হচ্ছে এক ‘সা’। এই হিসেবে বিভিন্ন শস্যের এক ‘সা’ এর ওজন কম-বেশী হয়। কারণ চার খাবরি চাউল ও ভুট্টার ওজন এক নয়। কেউ যদি নিজের ফসলের যথাযথ পাঁচ ওসাক দিতে চায়, সে সংশ্লিষ্ট ফসল থেকে চার খাবরি নিয়ে আগে এক ‘সা’ নির্ণয় করবে, যেই ওজন হবে তার ষাট গুণ এক ওসাক, এভাবে পাঁচ ওসাক হলে যাকাত দিবে। এই নীতি মনে রাখলে ফল ও ফসলের যাকাতের জন্য কারও দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন হবে না, এবং পরিমাপ নিয়ে সংশয়ও থাকবে না। -অনুবাদক।

[6] দেখুন: আল-মুগনি: (২/৬৯৬)।

[7] দেখুন: আল-মুগনি: (২/৬৯৬)।

[8] দেখুন: আল-মুগনি: (২/৭০৪)।

[9] মাআলিমুস সুনান: (২/৭০২)।

[10] একশ‘ কেজির একদশমাংস ১০ কেজি, এই ১০ কেজির তিন চতুর্থাংশ ৭.৫ কেজি। অতএব এরূপ ফসল থেকে একশ‘ কেজি থেকে ৭.৫ কেজি যাকাত দিবে। -অনুবাদক।

[11] আল-মুগনি: (২/৬৯৯)।

[12] আল-মুগনি: (২/৭০২)।

[13] আশ-শারহুল মুমতি‘: (৬/৭৯)।

মতামত দিন