ফাতওয়া সলাত

ইমামকে যে রুকু অবস্থায় পেল তার হুকুম

প্রশ্ন: যে ব্যক্তি ইমামকে রুকু অবস্থায় পেল এবং রুকুতেই ইমামের সাথে শরীক হলো, তার এ রাকাত গণ্য হবে কী না, আপনাদের মতামত জানতে চাই?
উত্তর: আহলে ইলমগণ এ মাসআলায় দ্বিমত পোষণ করেছেন:
প্রথম মত হচ্ছে: এ রাকাত গণ্য হবে না। কারণ, সূরা আল-ফাতিহা পড়া ফরয ছিল যা সে পড়তে পারে নি। এ অভিমত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। ইমাম বুখারী নিজের লিখা ‘জুযউল কিরাআহ’ গ্রন্থে এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং এটাকে তিনি তাদের প্রত্যেকের অভিমত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যারা বলেন মুক্তাদির জন্য সূরা আল-ফাতিহা পড়া ওয়াজিব। আউনুল মা‘বুদ গ্রন্থেও এরূপ এসেছে। ইবন খুযাইমাহ ও একদল শাফে‘ঈ আলেম থেকেও অনুরূপ কথা বর্ণিত আছে। শাওকানী ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তার সপক্ষে বিস্তর আলোচনা করেছেন।


দ্বিতীয় মত হচ্ছে: এ রাকাত গণ্য করা হবে। হাফেয ইবন আব্দুল বার এ অভিমত আলী, ইবন মাসউদ, যায়েদ ইবন সাবেত ও ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম প্রমুখদের থেকে বর্ণনা করেছেন। জমহুর ইমামদের থেকেও তিনি উক্ত অভিমত বর্ণনা করেছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন: চার ইমাম, আওযা‘ঈ, সাওরী, ইসহাক ও আবু সাওর। একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকায় শাওকানী এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, আওনুল মা‘বুদের গ্রন্থকার স্বয়ং লিখকের বরাতে উক্ত পুস্তিকা সম্পর্কে বলেছেন। এ অভিমত আমার নিকট অধিক বিশুদ্ধ। সাহাবী আবু বাকরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীস তার দলীল। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রাকাত কাযা করার নির্দেশ দেন নি, (অথচ তিনি রুকু অবস্থায় জমাতে শরীক হয়েছেন, যে জামা‘আতের ইমাম ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।) যদি তার ওপর রাকাত কাযা করা ওয়াজিব হত তাহলে অবশ্যই তিনি তার নির্দেশ করতেন। কারণ, প্রয়োজনের মুহূর্ত থেকে নির্দেশ বিলম্ব করা বৈধ নয়, আর হাদীসে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (زادك الله حرصاً ولا تعد) (আল্লাহ তোমার আগ্রহ বাড়িয়ে দিন, কিন্তু পুনরায় এরূপ করো না [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৮৩]) এর অর্থ হচ্ছে ‘কাতারে অংশ গ্রহণ না করে দ্বিতীয়বার এরূপ করে সালাতে প্রবেশ করো না’। কারণ, মুসলিমের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে ইমামকে যে হালতে পাবে সে হালতেই সালাতে অংশ গ্রহণ করবে। জমহুর আলেমদের আরো দলীল হচ্ছে আবু দাউদ, ইবন খুযাইমাহ, দারাকুতনী ও বায়হাকী কর্তৃক বর্ণিত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর মারফু‘ হাদীস:
»إذا جئتم إلى الصلاة ونحن سجود فاسجدوا ولا تعدوها شيئاً ومن أدرك الركعة فقد أدرك الصلاة«
“যখন তোমরা সালাতের জন্য আস এবং আমরা সাজদাহয় থাকি, তোমরা সাজদাহ কর, তবে সেটাকে কিছু গণ্য কর না। আর যে ব্যক্তি রাকাত পেল সে সালাত পেল”।[সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৮৯৩] হাদীসটি ইবন খুযাইমাহ, দারাকুতনী ও বায়হাকীর বর্ণনায় এসেছে এভাবে:
»ومن أدرك ركعة من الصلاة فقد أدركها قبل أن يقيم الإمام صلبه«
“আর যে ইমামের পিঠ সোজা করার পূর্বে সালাতের রাকাত (রুকু) পেল সে তা (রাকাত) পেয়ে গেল”। [ইবন খুযাইমাহ: (খ. ৩), হাদীস নং ১৫৯৫]
এ হাদীস জমহুর আলেমদের স্পষ্ট দলীল। তা কয়েকটি কারণে:
এক. ‘সাজদাহ অবস্থায় অংশ গ্রহণ করো’ (ولا تعدوها شيئاً) এবং তা রাকাত হিসেবে গণ্য করো না। এ থেকে স্পষ্ট হয়, যে ব্যক্তি রুকু পেল সে রুকুকে রাকাত হিসেবে গণ্য করবে।
দুই. সাজদাহর সাথে রাকাত শব্দ উল্লেখ হলে তার অর্থ হয় রুকু। এরূপ অর্থ একাধিক হাদীসে এসেছে। তন্মধ্যে বারা ইবন আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসটি হচ্ছে:
»رمقت الصلاة مع محمد صلى الله عليه وسلم، فوجدت قيامه فركعته فاعتداله بعد ركوعه فسجدته… «
“আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত পর্যবেক্ষণ করেছি, তাই আমি দেখতে পেয়েছি তার কিয়াম, অতঃপর তার রাকাত (রুকু) অতঃপর রুকুর পর তার স্থির দাঁড়ানো অতঃপর তার সাজদাহ… ”।[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭১] 
অনুরূপ কুসুফের সালাত সম্পর্কিত একাধিক হাদীস ও তার ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয়, যা সাহাবীগণ করেছেন। সেখানেও ‘রাকাত’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ রুকু, যেমন তারা বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুসুফের সালাত চার রাকাত (রুকু) ও চার সাজদাহয় পড়েছেন। এখানে চার ‘রাকাত’ অর্থ চার রুকু।
তিন. ইবন খুযাইমাহ, দারাকুতনী ও বায়হাকীর বর্ণনা মোতাবেক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: (قبل أن يقيم صلبه) স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি ‘রাকাত’ দ্বারা রুকু বুঝিয়েছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর এ হাদীস দু’টি সনদে এসেছে, একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। হাদীস শাস্ত্রের স্বীকৃত নীতি অনুসারে এ জাতীয় দু’টি হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা যায়। অধিকন্তু এখানে উল্লেখ করা সাহাবীগণের আমল দ্বারাও হাদীসের অর্থ শক্তিশালী হয়। এতদসংক্রান্ত আলোচনা শেষে ইমাম নাওয়াবী ‘শারহুল মুহাযযাব’ (খ. ৪, পৃ. ২১৫) গ্রন্থে বলেন: “আমরা যে রাকাত পাওয়ার অর্থ রুকু পাওয়া করেছি এটাই ঠিক, ইমাম শাফে‘ঈ তা স্পষ্ট বলেছেন। এ কথাই বলেছেন অধিকাংশ বন্ধু ও আহলে ইলমগণ। এ অর্থের ওপর একাধিক হাদীস ও মনীষীদের ঐকমত্য রয়েছে। এ মাসআলায় একটি দুর্বল মত রয়েছে যে, (রুকু পেলে) রাকাত পাবে না। মতটি উদ্ধৃত করেছেন ‘তাতিম্মাহ’ গ্রন্থের লিখক মুহাম্মাদ ইবন খুযাইমার বরাত দিয়ে, যিনি আমাদের ফকীহ মুহাদ্দিসদের অন্যতম। রাফে‘ঈ উক্ত মত ‘তাতিম্মাহ’ গ্রন্থ ও আবু বকর সিগি থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘তাতিম্মাহ’ গ্রন্থের লিখক বলেন, এ মত বিশুদ্ধ নয়। কারণ, সমসাময়িক সবাই একমত যে, রুকু পেলে রাকাত পাবে। অতএব, তাদের পরবর্তী কারো ইখতিলাফ গ্রহণযোগ্য নয়”। ইমাম নাওয়াবীর কথা শেষ হল। হাফিয ইবন হাজার রহ. ‘তালখিসুল হাবির’ গ্রন্থে ইবন খুযাইমাহ থেকে যা বর্ণনা করেছেন, তার দ্বারা প্রমাণ হয় ইবন খুযাইমাহও জমহুরের সাথে আছেন, আর তা হলো রুকু পেলে রাকাত পাবে। আল্লাহ ভালো জানেন।

শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায (রহঃ)

সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি, সৌদি আরব।

মতামত দিন

কমেন্ট

  • সূয ডুবে গেছে মাগরিবের সময় কি দুখুলুল মসজিদ নামায আদায় করা যাবে? জামায়াত আদায় করতে করতে আমি দুখুলুল মসজিদ নামায পড়তে পারি সেই সময় কি পড়া যাবে