জীবনী

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহঃ) এর উপর অত্যাচারের ঘটনা

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহঃ) এর উপর অত্যাচারের ঘটনা
——————————————————————–

সমসাময়িককালের ধর্মীয় নেতারা খলিফার রোষানল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একে একে খলিফার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিই সমর্থন দিতে শুরু করেন; কিন্তু ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) মুতাজিলা মতবাদকে ভ্রান্ত বলে তা মানতে অস্বীকার করেন এবং এ জন্য নির্মম নির্যাতন ও কারাযন্ত্রণা ভোগ করেন। পবিত্র কোরআন ‘সৃষ্টি’ এ সম্পর্কে মুতাজিলা মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা আব্বাসীয় খলিফা মামুন-অর-রশীদ তাঁর বিরোধিতাকারী ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে তলব করে জিজ্ঞেস করলেন তিনি মুতাজিলা মতবাদ গ্রহণ করেছেন কি না। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘না, পবিত্র কোরআন হচ্ছে মহান আল্লাহর বাণী, কী করে কোরআনকে সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব?’ মামুন-অর-রশীদ ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠান।

খলিফা মামুন-অর-রশীদ ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন খলিফা আল মুতাসিম। তিনিও ইমাম সাহেবকে কারাগার থেকে বের করে এনে পবিত্র কোরআনের সৃষ্টি সম্পর্কে মুতাজিলা মতবাদকে স্বীকার করেন কি না তা জানতে চান। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তখনো এ ভ্রান্ত মতবাদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।

খলিফা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর সঙ্গে যুক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করলেন। কিছু ধর্মীয় নেতাও খলিফার যুক্তি সমর্থন করে বিভিন্ন দলিল পেশ করলেন। কিন্তু ইমাম সাহেব প্রতিটি কথার দাঁতভাঙা জবাব দিলেন। তাঁর যুক্তি এবং অকাট্য সব দলিল দরবারি আলেমদের মুখে পেরেক ঠুকে দিচ্ছিল। অসহায়ের মতো এ ওর দিকে তাকাচ্ছিলেন।

ইমামের এই আক্রমণাত্মক চেহারা দেখে মুতাজিলাদের সবচেয়ে কুটিল পৃষ্ঠপোষক প্রধানমন্ত্রী আবু দাউদ মুতাসিমকে উত্তেজিত করার জন্য বললেন ’আমিরুল মুমিনিন, এই লোকটি পথভ্রষ্ট আর অন্যকেও সে ভ্রষ্ট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আপনার সামনেই বসে আছেন আপনার রাষ্ট্রীয় ফকিহ্ ও বিচারকরা। আপনি এঁদের কাছেই জিজ্ঞেস করুন, দেখুন তাঁরা কী বলেন?’ তাঁরা যা বলবেন তা তো পরিষ্কার! তাঁরা সবাই একবাক্যে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কেই গুমরাহ্ ও পথভ্রষ্ট বলে ফতোয়া দিলেন; কিন্তু ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানালেন। খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ বললেন, ‘আহমাদ! তুমি আমার এই মত গ্রহণ করো, আমি তোমাকে আমার দরবারে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়ে দেব; তখন তুমি এমন লোকদের সঙ্গে ওঠাবসা করবে, যারা এই দামি কার্পেটের ওপর হাঁটতে পেরে গর্ব বোধ করে।’ ইমাম সাহেব বললেন_’বেশ, আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করলাম, কিন্তু আল্লাহর কিতাব এবং রাসুল (সা.)-এর হাদিস থেকে আপনাকে সমর্থনের দলিল দিতে হবে।’
অবস্থা বেগতিক দেখে মুতাজিলারা ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁরা ভাবলেন, না জানি খলিফাই তাঁর মত পাল্টে ফেলেন। তখন সবাই একসঙ্গে হৈচৈ করে বলে উঠলেন, ‘আমিরুল মুমিনিন! এই লোকটি কাফের, পথভ্রষ্ট; এ সবাইকে ভ্রষ্ট করে দেবে।’ এদের মধ্যে একজন উচ্চ কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আমিরুল মুমিনিন! লোকটিকে আপনি ছেড়ে দেবেন না! ওকে কঠিন শাস্তি দিন।’ মুতাসিম ইমামকে জনসমক্ষে ৭০ ঘা বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিলেন।

এই নৃশংস ঘটনার ব্যাপারে ইমামের নিজের বর্ণনা এ রকম_যখন প্রথম আঘাত করল আমি বললাম, ‘বিসমিল্লাহ’। ‘লা হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’। ‘আল কুরআন কালামুল্লাহ গাইরা মাখলুক’। ‘কুল লান ইউছিবুনা ইল্লা মা কাতাবাল্লাহু লানা ! দেখ, কেমন লাগে তার মজা।’ এরপর কতক্ষণ মেরেছে আমি জানি না। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পরই আমার জ্ঞান ফিরে এলে দেখলাম আর মারছে না।

মুতাসিম চিৎকার করে বললেন, ‘এখনো আমার কথা মেনে নাও, আমি তোমাকে ছেড়ে দেব।’ ওর এ কথার জবাব আমার কাছে ছিল না। আমি চুপ করে থাকলাম। জল্লাদ চিৎকার করে বলছে, ‘খলিফার কথা শুনতে পাচ্ছ না! তাঁর কথা মানছ না!’ সে পাগলের মতো এ কথা বলছে আর ওর গায়ের যত শক্তি আছে সব একত্র করে মারছে। মুতাসিম হাতের ইশারা করলে থামে। তখন সে জিজ্ঞেস করে, ‘কি আহমদ, এখনো আমার কথা শোনো, আমি তোমাকে ছেড়ে দেব।’ কিন্তু আমার কোনো কথা নেই। এভাবে বেশ কয়েকবার সে চেষ্টা করেছে, কিন্তু সে এবং তার জল্লাদ আমার মুখ দিয়ে কিছুই বের করতে পারেনি।

আঘাতের ফলে ইমামের শরীর থেকে স্রোতের মতো রক্ত ঝরছিল, তিনি জ্ঞান হারালেন। খলিফা তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। দুই বছর পর তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তারপর ইমাম সাহেবকে তাঁর বাড়িতে পেঁৗছে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সেদিনের এই ঘটনার পর থেকে মুতাসিম আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেননি। তীব্র অনুশোচনা আর বিচিত্র দুঃস্বপ্নে তিনি প্রায় অর্ধ-উন্মাদ। বারবার লোক পাঠিয়ে ইমামের অবস্থা জানতে চেয়েছেন। এরপর ধীরে ধীরে ইমাম সুস্থ হয়ে উঠলেন; কিন্তু দুই হাত ও দুই ঠোঁটে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা অনুভব করতেন। মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর এই সমস্যাটা ছিল। মুতাজিলা ছাড়া অন্য সবাইকে ইমাম ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। (তাবাকাতে শাফেয়িয়াহ্ আল কুবরা)

৭৫ বছর বয়সে ২৪১ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে বাগদাদে শহীদদের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। লাখ লাখ শোকাহত মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেয়।

উৎসঃ ইবনে আমীর হোসেন 

মতামত দিন