ইনসাফ প্রতিষ্ঠা প্রত্যেকের দায়িত্ব

ইনসাফ প্রতিষ্ঠা প্রত্যেকের দায়িত্ব (মক্কা শরিফের জুমার খুতবা)
শায়খ ড. খালেদ বিন আলী গামেদী

বর্তমান বিশ্বে অন্যায়, নিপীড়ন ও বৈরিতা স্থান-কালের সব সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। বর্ণবাদী উসকানি, জাতিগত উত্তেজনা, চৈন্তিক ও বিশ্বাসগত স্খলনের ফলে অত্যাচার ও স্বীকৃত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহুমাত্রিক প্রবণতা প্রকাশ পাচ্ছে। বিষয়টি মন-মস্তিষ্কের পরিশুদ্ধিকরণের তীব্র প্রয়োজনীয়তাকে এবং চারিত্রিক গুণাবলি ও নৈতিক উৎকর্ষতার মাধ্যমে আত্মার পরিশীলনকে অপরিহার্য ও জোরদার করে তুলছে। যেগুলোকে পরিপূর্ণতা দান ও লালনের জন্য আগমন করেছিলেন নবী করিম (সা.), যা আচরণকে সুদৃঢ় করে। অন্তরের বিচ্যুতিকে সংশোধন করে। এসব গুণাবলির মধ্যে অন্যতম মহান একটি গুণ, যা জীবনের বৃহত্তর ইসলামী মানবিক মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত, অনুপম উন্নত মূলনীতি ও শরিয়তের লক্ষ্যগুলোর মৌলিক নীতির একটি প্রধানতম লক্ষ, তা হলো ন্যায়-ইনসাফ ও সাম্য। পৃথিবীতে এ ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আল্লাহ নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার রাসুলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা হাদিদ : ২৫)।

আল্লাহ তায়ালা নবী (সা.) ও তাঁর উম্মতকে কথায়, কাজে ও মানুষের মাঝে বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও ন্যায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন- আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

বলো, ‘আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আদিষ্ট হয়েছি।’ (সূরা শূরা : ১৫)।

‘যখন তোমরা কথা বলো, তখন সুবিচার করো, যদি সে আত্মীয়ও হয়।’ (সূরা আনআম : ১৫২)।

তিনি আরও বলেন,

‘আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ করো, তখন মীমাংসা করো ন্যায়ভিত্তিক।’ (সূরা নিসা : ৫৮)।

রাসুল (সা.) জীবনব্যাপী তাঁর প্রতিপালকের এ আদেশ ও দিকনির্দেশনা মান্য করে তাঁর প্রতিটি কাজে ও ক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফ বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর পবিত্র সুন্নাহ ও সুরভিত জীবনচরিত এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ও নমুনা। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে পক্ষ-বিপক্ষ উভয়ের সঙ্গে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের যে বাস্তবিক দীক্ষা দিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত অগণিত, তার নমুনা গুনে শেষ করা যাবে না।

ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এক অমুসলিম বৃদ্ধের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করছিল। তখন তিনি তার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি করলেন, ‘আমরা যৌবনকালে তোমার কাছ থেকে জিজিয়া কর নিয়েছি, তারপর বার্ধক্যে তোমাকে অসহায় বানিয়েছি, আমরা তোমার প্রতি ইনসাফ করিনি।’ এরপর তিনি তার জন্য স্থায়ী ভাতার নির্দেশ জারি করেন। ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কোনো সীমা ও প্রথার মধ্যে আটকে থাকে না। তা কাছের-দূরের, কাফের-মুসলিম সবাইকে গ্রহণ করে।

এই ইনসাফ ও ন্যায়ের কারণেই শায়খ ইবনে তাইমিয়া তাতারদের হাত থেকে মুসলিম বন্দিদের মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালানোর সময় যখন জানতে পারলেন সেখানে অমুসলিম বন্দিরাও আছে তখন তাদের ছাড়াতেও তিনি পীড়াপীড়ি করলেন। তিনি উদার মনে নজিরবিহীন ইনসাফ করে বলেছেন, ‘বরং তোমার কাছে বন্দি সব ইহুদি ও খ্রিস্টান আমাদের জিম্মাদারির অন্তর্ভুক্ত। আমরা তাদেরও মুক্ত করব। মুসলিম ও অমুসলিম কোনো বন্দিকেই রেখে যাব না।’ ইনসাফ শরিয়তের অলঙ্কার ও উম্মাহর শোভা। পরিশুদ্ধির ভিত। ইনসাফ নবী-রাসুল ও মহৎ লোকদের বৈশিষ্ট্য। সুখ-শান্তি স্থাপন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যম। এ গুণে কেউ ভূষিত হলে তা তার হৃদয়ের নির্মলতা, অন্তরের পবিত্রতা ও সুস্থ বুদ্ধির পরিচয়কেই প্রকাশ করে। জাতি যখন ইনসাফ খুইয়ে বসে তখন আমিত্ব, স্বার্থপরতা, স্বজনপ্রীতি, অন্যায় পক্ষপাত ও মানুষের সবকিছুর অবমূল্যায়নের ছড়াছড়ি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের মনোবলে চিড় ধরে। কর্মঠ, সফল ও বিশ্বস্ত লোকেরা অকৃতজ্ঞতা ও অস্বীকৃতির তিক্ততা ভোগ করে। ভালো সবকিছু আড়াল করা হয়। মন্দের প্রচার ঘটানো হয়। ফলে তা সমাজের উদ্ভাবনী ও তৎপরতার চেতনাকে, গঠনমূলক ফলপ্রসূ কাজের প্রেরণাকে দুর্বল করে ফেলে।

ইনসাফ হলো ন্যায়ের ফল, শোভা ও সৌন্দর্য। ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করলে মানুষের জ্ঞান দ্বারা যথাযথ উপকার লাভ করা সম্ভব নয়। যেমন- আল্লাহ বলেন, ‘আর যাদের আমি সৃষ্টি করেছি, তাদের মধ্যে এমন একদল রয়েছে যারা সত্য পথ দেখায় এবং সে অনুযায়ী ন্যায়বিচার করে।’ (সূরা আরাফ : ১৮১)।

অন্যত্র বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা মা-বাবার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের যদি ক্ষতি হয়, তবুও।’ (সূরা নিসা : ১৩৫)।

সূরা মায়েদার আট নং আয়াতে বলেন, ‘এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো। এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী।’

সূরা হুদের ৮৫নং আয়াতে আছে, ‘এবং লোকদের জিনিসপত্রের কোনোরূপ ক্ষতি করো না।’ আহলে কিতাবদের প্রতি ইনসাফ করে কোরআন বলে, ‘তারা সবাই সমান নয়।’ (আলে ইমরান : ১১৩)। ‘তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী।’ (আলে ইমরান : ১১০)।

তাই বান্দার উচিত হলো তার সব কাজে ন্যায় ও ইনসাফের মানদ- বজায় রাখা। তার ওপর তার প্রতিপালকের হক আছে। মা-বাবার হক আছে। পরিবারের অধিকার আছে। ভাইবোন ও অভিভাবকের হক আছে। প্রত্যেকের অধিকার প্রদান করাই হলো ইনসাফ। ইনসাফকারীরা সব সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো প্রাপ্ত হয়ে তাঁর অনুগ্রহধন্য হবে, যারা তাদের বিচারে, পরিবারে ও অধীনস্থদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার অবলম্বন করেছে। আমাদের বর্তমান সময়টাতে ইনসাফের তাৎপর্য, নীতিমালা ও বিধান জানা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ভালোবাসা ও আত্মীয়তার কারণে কারও সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা আর অন্যদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে চোখ ফিরিয়ে নেয়া ইনসাফ নয়। কোনো স্খলন বা বিচ্যুতির কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নষ্ট করে দেয়াও ইনসাফ নয়, বরং কর্তব্য হলো অজুহাত ও আপত্তি অনুসন্ধান করা। ইতিবাচক ও সুন্দর দিকটাকে প্রাধান্য দেয়া। মানুষের চরিত্রের ক্ষেত্রে ক্ষমার নীতি গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের কাছ থেকে দূরে সরে থাক।’ (সূরা আরাফ : ১৯৯)। ইনসাফের মূলনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের নবীর বাণী বিরাট তাৎপর্যময়। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর পথে আমার মা-বাবা উৎসর্গিত হোক, কোনো মোমিন পুরুষ যেন তার মোমিন স্ত্রীকে ঘৃণা ও অপছন্দ না করে। একটি স্বভাব অপছন্দ হলে আরেকটি স্বভাবকে যেন পছন্দ করে।’ (মুসলিম)।

ইনসাফের অন্যতম উজ্জ্বল একটি দিক হলো দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে যেন মুসলমানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না হয়। এ বিষয়টি থাকলে পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে না। ইনসাফকে ধ্বংস করার একটি পন্থা হচ্ছে কোনো ভালো ও সৎ মুসলিমের দোষ প্রচারে লেগে যাওয়া, তার ভালো দিকগুলোকে গোপন করে রাখা। ইনসাফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমালোচনার ক্ষেত্রে ব্যক্তির সমালোচনা না করে ভালো নিয়তে ভদ্রভাবে ব্যক্তির কথার সমালোচনা করা। ইনসাফ একটি যথার্থ আল্লাহপ্রদত্ত স্বভাব। নবীর একটি চারিত্রিক মূল্যবোধ। যে এ গুণে ভূষিত হয়েছে, এ গুণ ধারণ করেছে সে সফল হয়েছে, সুখী হয়েছে, উন্নত হয়েছে, এগিয়ে গেছে।

আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। আর যে এর বিরোধিতা করেছে এবং যারা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, নিজেদের স্বার্থ ষোলআনা বুঝে তাদের পথ অনুসরণ করেছে তারা তো সঠিক পথ থেকে যোজন যোজন দূরে। ‘যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য দুর্ভোগ।’ (সূরা মুতাফফীফিন : ১)।

১৪ রবিউল আওয়াল ১৪৩৭ হিজরি মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবাটি সংক্ষেপে ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button