ইসলামী শিক্ষা ইসলামের ইতিহাস

ইসলামী সভ্যতায় মানবপ্রেম

রচনায়: ডঃ মুসতাফা আস-সিবায়ী

অনুবাদঃ আকরাম ফারুক

আমাদের চিরঞ্জীব সভ্যতা ও তার অবদান নিয়ে যারা আলোচনা গবেষণা করে, তাদের পক্ষে এই সভ্যতার একটি অনন্য বৈশিষ্টকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কেননা এটা একমাত্র ইসলামী সভ্যতারই বৈশিষ্ট্য—অন্য কোন সভ্যতা এতে অংশীদার হবার দাবী করতে পারেনা। এই বৈশিষ্ট্যটা হলো, মানবপ্রেম। একমাত্র আমাদের সভ্যতাই মানুষকে হিংসা, বিদ্বেষ, ভেদাভেদ ও সব রকম সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে তাকে ভালোবাসা। উদারতা, সহযোগিতা ও সাম্যের শিক্ষা দিয়েছে। ইসলামী আইনই বলুন কিংবা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থাই বলুন, এর কোনটাতেই বংশীয়, শ্রেণীগত, বা জাতিগত আভিজাত্যের প্রশ্নই ওঠেনা। এই মূলনীতি আমাদের সভ্যতার মৌল তত্ত্ব থেকে নিয়ে খুটিনাটি বিষয় পর্যন্ত লক্ষণীয়ভাবে কার্যকর রয়েছে।

ইসলামী মৌলতত্ত্বের খোজ নিতে গেলে দেখা যায়, ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, সকল মানুষ একজন মানুষ থেকেই সৃজিত হয়েছে। সূরা নিসার প্রথম আয়াতে বলা হয়েছেঃ

  يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا 

হে মানব জাতি তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন, তার থেকেই তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন এবং এ দু’জন থেকে বহু সংখ্যক নারী ও পুরুষের বিস্তার ঘটিয়েছেন।

সুতরাং সমগ্র মানব জাতির উৎস একটাই। সেই অভিন্ন উৎস থেকেই মানুষ বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, গোত্র ও দেশে বিভক্ত হয়েছে, যেমন একটি পরিবারে একই মা বাবা থেকে বিভিন্ন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সুতরাং জাতি ও গোত্রের এই প্রকারভেদের উদ্দেশ্য শুধু এটাই হওয়া উচিত যে, তা পারস্পরিক পরিচিতি ও সহযোগিতার মাধ্যম হবে। এ জন্যই আল কুরআন বলেছেঃ

 يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا

“হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজনমাত্র নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচয়ের আদান প্রদান করতে পার। (সূরা আল হুজরাত-১৩)

এরপর জীবনে কতক লোক সামনে এগিয়ে যায় এবং কতক লোক পেছনে পড়ে থাকে। কেউ ধনী হয়, কেউ পরমুখাপেক্ষী হয়। কেউ শাসক হয়, কেউ শাসিত হয়, কতক জাতির বর্ণ সাদা হয়, কতক জাতির চামড়া কালো হয়।

এটা প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। তাই বলে এই উচু নিচু ও ছোট বড় মানবতার ওপর প্রভাব বিস্তার করে বিদ্বেষ ও ভেদাভেদের কারণ ঘটাবে, এটা হতে দেয়া যায়না এবং ইসলাম তা হতে দেয়ওনা। গরীবের ওপর ধনীর, প্রজার ওপর শাসকের, কালোর ওপর সাদার কোনই শ্ৰেষ্ঠত্ব নেই। আদম সন্তান ও মানুষ হিসেবে সবাই সমান। শ্রেষ্ঠত্ব যদি কিছু থেকে থাকে তবে তা কেবল সততার ভিত্তিতেঃ

إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে সবচেয়ে তাকওয়াবান।’ (আল হুজুরাত-১৩)

আইনের চোখে সবাই একই রকম। সবার ওপর আইনের কর্তৃত্ব সমভাবে কার্যকর। তাদের মধ্যে পার্থক্য হতে পারে শুধু ন্যায়ের ভিত্তিতেঃ

فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ

وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ

‘যে ব্যক্তি কণা পরিমাণও ন্যায় কাজ করবে সে তা দেখবে (ভোগ করবে) আর যে ব্যক্তি কণা পরিমাণও অন্যায় কাজ করবে, সে তাও দেখবে’। (আল যিলযাল- ৭-৮)

সমাজ কাঠামোতে সকলের অবস্থান সমান। যে শক্তিশালী, সে দুর্বলকে সাহায্য করে। এভাবে গোটা সমাজ প্রতিটি ব্যক্তির সেবকে পরিণত হয়। হাদীসে আছেঃ পারস্পরিক স্নেহ মমতায় মুসলমানদের উদাহরণ একটা একক দেহের মত। দেহের একটা অংগ যখন রুগ্ন হয়, তখন সব কটা অংগ তার সাথে জ্বর ও নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত হয়। (সহীহ মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ)

এভাবে ইসলাম ক্রমাগত ঘোষণা করে আসছে যে, মানবজাতি একটা একক সত্তা এবং এর সদস্যরা সব একই মাতাপিতার সন্তান ও ভাইবোন। মানব সমাজের উদাহরণ একটা গাছের মত। যখন বাতাস বয়, তখন তার ওপর ও নীচের সব ডালপালা একই রকম নড়ে। এখান থেকে এ কথাটাও সহজেই বুঝা যায় যে, আল কুরআন যে বারবার ‘হে মানবজাতি’ এবং ‘হে আদম সন্তানেরা’ বলে সম্বোধন করে থাকে, সেটা এ জন্যই করে থাকে, যাতে মানুষের মনে মানবীয় ঐক্যের ধারণা সৃষ্টি ও বদ্ধমূল হয়ে যায়। অনুরূপভাবে মুসলমানদেরকে ‘হে মুমিনগণ’ এবং ‘হে ঈমানদারগণ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে, যাতে তাদের ভেতরে বংশীয় বা শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টির অবকাশ না থাকে।

ইসলামী সাম্যের সর্বব্যাপী রূপ

আমাদের সভ্যতার আইনকানুনে সর্বত্র মানবীয় সাম্য কার্যকর রয়েছে। নামাযে সবাই আল্লাহর সামনে সমান মর্যাদা নিয়ে দাড়ায়। কোন রাজা, নেতা, সরদার বা আলেমের জন্য কোন নির্দিষ্ট জায়গা নেই। রোযায় সবাই সমভাবে অনাহারে থাকে। এতেও ধনী গরীবের কোন ভেদাভেদ নেই। হজ্জেও সবাই একই ইহরামের পোশাক পরে, একইভাবে আল্লাহর সামনে দাড়ায় এবং একই নিয়মে হজ্জের কাজগুলো সমাধা করে। এতে সবল দুর্বল, আপন পর এবং ছোট বড়র কোন পার্থক্য নেই। দেওয়ানী আইনের দিকে যদি তাকাই, দেখতে পাই যে, সব মানুষের সাথে ন্যায়নীতি ও হকের ভিত্তিতে আচরণ করা হয়। আইন রচনার আসল উদ্দেশ্য সুবিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কিছু নয়। আইন যুলুম প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে ঝাণ্ডা ওড়ায়, যাতে সকল উৎপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষ তার নীচে আশ্রয় নিতে পারে। তারপর যখন আমরা ফৌজদারী আইন পর্যালোচনা করি, জানতে পারি যে, সকলের জন্য একই রকম শাস্তি নির্দিষ্ট রয়েছে। যে হত্যা করে তাকে হত্যা করা হয়। যে চুরি করে, সে শাস্তি পায়। যে অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করে, তাকে শায়েস্তা করা হয়। হত্যাকার জ্ঞানী হোক বা মূৰ্খ হোক, নিহত ব্যক্তি ধনী হোক বা গরীব হোক, মযলুম আরব হোক বা অনারব হোক, প্রাচ্যবাসী হোক বা পাশ্চাত্যবাসী-সবাই আইনের চোখে সমান।

 الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثَىٰ بِالْأُنثَىٰ ۚ فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ

‘স্বাধীন মানুষের বদলা স্বাধীন মানুষের কাছ থেকে, গোলামের বদলা গোলামের কাছ থেকে এবং নারীর বদলা নারীর কাছ থেকে নিতে হবে।…………..’ (আল বাকারাহ- ১৭৮)

ইসলামের উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গী

ইসলামের আইন এর চেয়েও উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বন করে এবং ধর্ম, বর্ণ ও বংশের ভেদাভেদ না করে সমগ্র মানব জাতিকে সম্মানের আসনে বসায়। আল্লাহ বলেনঃ

 وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا

‘আমি আদমের বংশধরকে সম্মানিত করেছি…………………।’ (বনী ইসরাইল-৭০)

এই সম্মান ও মর্যাদা সব মানুষের জন্মগত অধিকার। আকীদা-বিশ্বাস পোষণ, জ্ঞানার্জন ও জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সে সবাইকে সমান অধিকার দেয়। ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তব্য এই যে, সব রকমের ভেদাভেদের উর্ধ্বে উঠে সমভাবে এই অধিকারের নিশ্চয়তা দেবে। ইসলামী শরীয়ত মানুষকে আরো উচ্চতর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে এবং বলে যে, আল্লাহর কাছে তাদের আযাব ও সওয়াবের ফায়সালা তাদের বাহ্যিক কাজ কর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের নিয়তের ভিত্তিতে হবেঃ

আল্লাহ তোমাদের চেহারার দিকে নয়, বরং তোমাদের মনের দিকে তাকান। (সহীহ মুসলিম)

শাস্তি বা পুরস্কার প্রধানত নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সর্বসম্মত হাদীস রয়েছেঃ

‘নিয়তের ওপরই কাজ নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি যা নিয়ত করে, তাই পায়’।

সাথে সাথে ইসলাম এ কথাও বলে দিয়েছে যে, কল্যাণ সাধন, উপকার করা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তেই কাজ করতে হবে। এটাই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নিয়ত। কোন বস্তুগত বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাজ করা চাইনা। আর কল্যাণের যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তা দ্বারা উপকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে কোন পারিশ্রমিক বা বিনিময় লাভের আশা করা ঠিক নয়। আল্লাহ বলেনঃ

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا

إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا

তারা ভালোভাবেই দরিদ্র, ইয়াতীম ও কয়েদীদেরকে খাওয়ায়, আর বলে যে, আমরা তো তোমাদেরকে আল্লাহর জন্য খাওয়াই। তোমাদের কাছ থেকে কোন প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করিনা। (সূরা আদ-দাহর : ৮-৯)

উচ্চতর দৃষ্টিভংগীর ব্যাপকতা ও পূর্ণতা

ইসলামী আইন তার মানবপ্রেমকে তখনই পূর্ণতা দান করে, যখন সে মানুষ, জীবজন্তু, উদ্ভিদ, জড় পদার্থ, আকাশ ও পৃথিবী সব কিছুকেই আল্লাহর দাসত্ব ও প্রাকৃতিক আইনের আনুগত্যের আওতাধীন করে দেয়। আল কুরআন কত চিত্তাকর্ষক ভাষায় প্রত্যেক মুসলমানকে নামাযের প্রত্যেক রাকাতে স্মরণ করিয়ে দেয়ঃ সমস্ত প্রশংসা পরম দাতা ও দয়ালু সর্ব জগতের প্রভু আল্লাহর জন্য (আল-ফাতিহা)

এভাবে সে প্রত্যেক মুসলমানের কাছে দাবী জানায়, সে যেন প্রতি মুহুর্তে মনে রাখে যে, সে মহাবিশ্বেরই একটা অংশ, সে এমন এক সত্তার সৃষ্টি যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা ও দয়ালু এবং যার দয়া সকল জিনিস পর্যন্ত পৌছে। কাজেই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, যেন যে মহাবিশ্বে সে বাস করে এবং যার কাছে সে কিঞ্চিৎ মুখাপেক্ষীও থাকে সেখানে সে যেন আল্লাহর দয়া নামক গুণের বাহক হয়। অথচ আল্লাহ তার একটুও মুখাপেক্ষী নন।

এ সব ঘোষণা কি নিছক লোক দেখানো ছিল?

এই ছিল ইসলামী সভ্যতার মানবপ্রীতির নিদর্শন ও বৈশিষ্ট্য যা তার মৌলিক তত্ত্বে ও ধ্যানধারণায়ও সমভাবে বিদ্যমান এবং তার আইনেও বিরাজমান। এখন প্রশ্ন এই যে, ইসলাম যখন বিজয়ী ও শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, তখনও কি বাস্তবিক পক্ষে তার আচরণ এ রকমই ছিল? না তা জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের ন্যায় কোন নিষ্ক্রিয় আইনে পরিণত হয়েছিল? এই ঘোষণার বার্ষিকী মহা ধুমধামে সারা দুনিয়ায় পালিত হয়, কিন্তু দুনিয়ার সব বড় বড় দেশে তাকে প্রতি মুহুর্তে পদদলিত করা হয়। আর এই মূলনীতিগুলো কি শুধু ঐ সব দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল? যেখানে তার প্রথম ঘোষণা হয়েছিল, যেমন ফরাসী বিপ্লবের নীতি ও আদর্শ ফ্রান্স পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল এবং তার উপনিবেশগুলোর দ্বার তার জন্য রুদ্ধ ছিল? নিউইয়র্কের সমুদ্রতীরে যে স্বাধীনতার প্রতিমূর্তি স্থাপিত, যা ঐ দেশে প্রবেশকারী প্রতিটি ব্যক্তি দেখতে পায়। পৃথিবীর আর কোন অংশে কি ঐ ধরনের আর কোন প্রতিমূর্তি স্থাপিত হয়েছে? দুনিয়ার আর কোথাও কি আমেরিকা স্বাধীনতার এতটা মর্যাদা দেয়, যতটা সে তাকে নিজ দেশে দেয়?

বাইরের জগতে তো মার্কিনীদের আচরণ স্বাধীনতার প্রতি নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কিছু নয়। স্বাধীনতার সংগ্রামীদের ওপর সর্বত্র নির্যাতনের ষ্টীম রোলার চালানো হচ্ছে মার্কিনীদের পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু না, ইসলামী সভ্যতা এমনটি কখনো করেনি। সে যা বলেছে, তা করে দেখিয়েছে। এ বিষয়টি আমাদের ইতিহাসের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে। কেননা ইতিহাসই সবচেয়ে সত্যবাদী সাক্ষী। আমাদের সভ্যতার মানবপ্রেমের উজ্জ্বল দিকগুলোর ওপর দৃষ্টি দিতে হবে। আমাদের দেখতে হবে, আমাদের সভ্যতার শাসক ও জনগণের যে আচরণ বিশ্ব ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে, তা কী ধরনের ও কী কী তথ্য সোচ্চার কষ্ঠে ঘোষণা করছে।

প্রথম সাক্ষ্য

গিফার গোত্রের হযরত আবু যর (রা) কোন এক ব্যাপারে হযরত আবু বকরের মুক্ত হাবশী গোলাম হযরত বিলালের ওপর চটে গেলেন। দু’জনই ছিলেন রাসূল (সা) এর সাহাবী। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তিনি রাগের চোটে হযরত বিলালকে বলে ফেললেন, ইবনুস সওদা (কালো চামড়ার ধারিনীর ব্যাটা) কোথাকার! হযরত বিলাল রাসূল (সা) এর কাছে অভিযোগ দায়ের করলেন। রাসূল (সা) আবু যর (রা) কে বললেন, তুমি ওকে ওর মায়ের পরিচয় তুলে ভর্ৎসনা করলে? মনে হচ্ছে, এখনো তোমার মধ্যে কিছুটা জাহিলিয়াত অবশিষ্ট রয়েছে। হযরত আবু যর (রা) ভেবেছিলেন যে, জাহিলিয়াত সম্ভবত কোন যৌন অপরাধকে বলা হয় এবং ওটা কেবল যুবকদের দ্বারাই সংঘটিত হতে পারে। এ জন্য তিনি বললেন, হে’ রাসূল, এই বুড়ো বয়সে?’ রাসূল (সা) বললেনঃ হাঁ, বিলাল তোমার ভাই। এবার তিনি ভুলটা বুঝতে পারলেন, অনুতপ্ত হলেন, তওবা করলেন এবং অনুশোচনা ও বিনয় প্রকাশের জন্য হযরত বিলালকে অনুরোধ করলেন যে, তোমার পা দিয়ে আমার মুখমণ্ডল দলিত কর।

দ্বিতীয় সাক্ষ্য

রাসূল (সা) এর জীবিতকালেরই ঘটনা। বনু মাখযুম গোত্রের ফাতিমা নাম্নী এক মহিলা চুরি করে ধরা পড়লো। তাকে রাসূল (সা) এর দরবারে হাজির করা হলো শাস্তি দেয়ার জন্য। কোরায়েশদের জন্য ব্যাপারটা বড়ই বিব্রতকর হয়ে দেখা দিল। তাই তারা ভাবলো, কাউকে দিয়ে শাস্তি মওকুফ করার সুপারিশ করা দরকার। স্থির হলো যে, যেহেতু যায়েদের ছেলে উসামা রাসূল (সা) এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র, তাই কোরায়েশ তাকেই রাসূলের দরবারে সুপারিশের জন্য পাঠালেন। তিনি রাসূল (সা) এর সাথে আলোচনা করলেন। সব কথা শুনে রাসূল (সা) ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি উসামাকে বললেন, ‘স্বয়ং আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি হুদুদুল্লাহ-এর ব্যাপারে সুপারিশ করতে এসেছ, এতদূর ধৃষ্টতা তোমার?’ এরপর সবাইকে জমায়েত করে তিনি একটা স্বতস্ফূর্ত জনসমাবেশে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেনঃ তোমাদের পূর্ববতী জাতিগুলোর ধ্বংসের প্রধান কারণ ছিল এই যে, তাদের দৃষ্টিতে যারা অভিজাত ছিল, তাদের কেউ অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দিত। আর দুর্বল শ্রেণীভুক্ত কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দিত। আল্লাহর কসম, চুরির অপরাধে ধৃত এই ফাতিমা যদি মুহাম্মাদের (সা) মেয়ে ফাতিমাও হতো, তবে আমি তার হাতও না কেটে ছাড়তাম না।

তৃতীয় সাক্ষ্য

একবার সালমান ফারসী, সোহায়েব রুমী ও বিলাল এক মজলিসে বসেছিলেন। কায়েস বিন মাতাতিয়া নামক জনৈক মুনাফিক সেখানে এসে বলতে লাগলোঃ আওস ও খাজরাজ যে মুহাম্মাদের (সা) সাহায্য করেছে, সেটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু এই তিন অনারবের (সালমান, সোহায়েব ও বিলাল) কী হলো বুঝলামনা’।

হযরত মুয়ায বিন জাবাল পার্শ্বেই ছিলেন। তিনি উঠে এলেন এবং লোকটার জামা ধরে টানতে টানতে রাসূল (সা) এর কাছে নিয়ে গেলেন। গিয়ে তাকে এর কথাগুলো জানালেন। রাসূল (সা) এর মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেল এবং তৎক্ষণাত মসজিদে নববীতে গিয়ে সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ ‘মনে রেখ, তোমাদের প্রতিপালক একজন, তোমাদের আদি পিতা একজন এবং তোমাদের দ্বীনও এক। কেউ পিতার ঔরস ও মায়ের উদর থেকে আরব হয়ে জন্ম নেয়না। আরবী তো একটা ভাষা। যে ব্যক্তি আরবীতে কথা বলে সে-ই আরবী’।

চতুর্থ সাক্ষ্য

ইতিহাসখ্যাত দানবীর হাতেম তাইর ছেলে আদী ইসলাম গ্রহণের আগে মদীনা এলেন। রাসূল (সা) এর আশে-পাশে ক’জন সাহাবী ছিলেন। তারা সবে মাত্র কোন যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছেন বলে মনে হচ্ছিল এবং যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম তখনো তারা নামাননি। তাদের মধ্যে রাসূল (সা) এর একনিষ্ঠ আনুগত্য ও প্রগাঢ় ভক্তিশ্রদ্ধা দেখে আদী বিন হাতেম অভিভূত হয়ে যান। এই সময় মদীনার জনৈকা দরিদ্র মহিলা রাসূল (সা) এর কাছে উপস্থিত হলো। সে বললোঃ হে রাসূল, আমি আপনার সাথে নিভৃতে কিছু কথা বলতে চাই। রাসূল (সা) বললেনঃ মদীনার যে গলিতেই তুমি বলবে, সেখানে গিয়ে আমি শুনতে প্রস্তুত। তারপর তিনি তার সাথে উঠে গেলেন এবং কিছু দূরে গিয়ে দীর্ঘসময় ধরে তার কথা শুনে ফিরে এলেন। আদী বিন হাতেম এ পরিস্থিতি যখন দেখলেন, তখন তার অকল্পনীয় মানবপ্রীতিতে এতই মুগ্ধ হলেন যে, তৎক্ষণাত মুসলমান হয়ে গেলেন।

পঞ্চম সাক্ষ্য

এক নাগাড়ে একুশ বছরের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পর রাসূল (সা) মক্কা জয় করলেন। যারা মিথ্যুক আখ্যায়িত করে প্রত্যাখান করেছিল, তাকে গৃহছাড়া করেছিল, এবং তার সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল, তারা পরাজিত হয়ে তার সামনে এল। এ সময়েও তিনি তাদেরকে সেই দাওয়াতই পুনরায় দিলেন এবং সেই মূলনীতির কথাই স্মরণ করিয়ে দিলেন, যা তিনি এক সময় মক্কার আশ-পাশের এলাকায় নগ্ন পায়ে ঘুরে ঘুরে প্রচার করতেন, অথবা শাসক হিসাবে মদীনায় প্রচার করছিলেন এবং মানব ইতিহাসে একটা সম্পূর্ণ নতুন সভ্যতার পত্তন করছিলেন। বিজয় অর্জিত না হওয়ায় তিনি এ যাবত যে নীতিমালার কেবল প্রচারই চালিয়ে যাচ্ছিলেন, আজ তিনি সেগুলোর বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেন। তিনি কা’বা শরীফের দরজায় দাড়িয়ে বললেনঃ “ওহে কোরায়েশ জনতা, আজ আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অহংকার ও তোমাদের বাপ-দাদার দর্পচূৰ্ণ করে দিচ্ছেন। মনে রেখ, সকল মানুষ আদম (আ) এর সন্তান এবং আদম মাটি দিয়ে তৈরী।

সারা আরব উপদ্বীপে আভিজাত্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণকারী কোরায়েশ নেতারা নীরবে মাথা নীচু করে তার কথাগুলো শুনতে লাগলেন। এই সময় তিনি এ আয়াতটা পড়লেনঃ

‘হে মানব সকল, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরস্পরে পরিচয়ের আদান-প্রদান করতে পার। আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানার্হ যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।

ষষ্ঠ সাক্ষ্য

হযরত আবু বকরের খিলাফতের যুগ এল। তিনি এমন এক শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন, যার মন আর্ত মানবতার প্রতি সহানুভূতিতে বিগলিত থাকতো। খলীফা হয়েও তিনি মহল্লার সেই দরিদ্র মেয়েদের ছাগল দুয়ে দিতে গেলেন, যাদের পিতা যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেছে। তাদের ছাগল দোহনের সময় তিনি বলছিলেনঃ ‘আশা করি খিলাফতের দায়িত্ব বহন করা সত্ত্বেও আমি এই জনসেবার কাজটা চালিয়ে যেতে পারবো, যা এ যাবত করে এসেছি’।

সপ্তম সাক্ষ্য

হযরত উমর (রা) একজন লৌহমানব খলীফা হিসেবে আভির্ভূত হন। দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতিশীল। সত্য ও ন্যায়ের ব্যাপারে আপোষহীন। সকল মানুষ তার দৃষ্টিতে সমান। জনগণকে তৃপ্তি দেয়ার জন্য নিজে অনাহারে থাকতেন, জনগণকে তাদের প্রাপ্য দেয়ার জন্য নিজে বঞ্চিত থাকতেন। তিনি প্রজাদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে তাদের অভাব অভিযোগের খোজ খবর নিতেন। এ ব্যাপারে তিনি বিপুল সুখ্যাতির অধিকারী ছিলেন।

একবার তিনি বাজারে এক বুড়োকে ভিক্ষে করতে দেখলেন। তিনি তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। সে বললো, আমি মদিনার একজন ইহুদী। জিযিয়া দিতে ও সাংসারিক প্রয়োজন মেটাতে আমাকে এই বুড়ো বয়সে ভিক্ষে করতে হচ্ছে। এ কথা শুনে সেই মহামানব কী বললেন শুনুন। তিনি বললেন, বুড়ো মিয়া তোমার প্রতি আমরা সুবিচার করিনি। তুমি যখন যুবক ছিলে, তখন তোমার কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করেছি। আর যখন তুমি বুড়ো হয়ে গেছ, তখন তোমাকে কষ্টের মধ্যে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছি। এসো আমার সাথে। এই বলে তার হাত ধরে বাড়ীতে নিয়ে গেলেন, নিজ হাতে রান্না করে তাকে খাওয়ালেন, এবং বাইতুল মালের রক্ষকের কাছে হুকুম পাঠালেন যে, এই ব্যক্তির জন্য এবং এই ব্যক্তির মত অন্যান্য লোকদের জন্য এমন হারে ভাতা নির্ধারণ কর, যাতে তাদের ও তাদের গোটা পরিবারের ভরণ পোষন চলে যায়।

অষ্টম সাক্ষ্য

হযরত ওমর (রা) মদিনার একটা গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। সহসা একটা জীর্ণশীর্ণ মেয়েশিশুকে দেখলেন উঠিপড়ি করে ছুটে যাচ্ছে। তিনি সাথীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মেয়েটার এমন দুরবস্থা কেন? তোমাদের কেউ কি একে চিন?’ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (হযরত উমারের ছেলে) কাছেই দাঁড়ানো ছিলেন। তিনি বললেন, আমীরুল মুমেনীন, আপনি ওকে চিনেন না? ও তো আমারই অমুক মেয়ে। হযরত উমার বললেন, তা ওর এমন করুণ দশা কেন? আব্দুল্লাহ ইবনে উমার বললেনঃ আপনার কাছে যা কিছু আছে, তা থেকে আমাদেরকে তো যথেষ্ট পরিমাণে দেন না। এ কারণেই মেয়েটার ঐ অবস্থা হয়েছে। হযরত উমর (রা) বললেনঃ আল্লাহর কসম, আমার কাছে তোমাদের জন্য সাধারণ মুসলমানদের সমপরিমাণ ভাতার চেয়ে বেশী কিছুই নেই, চাই তাতে তোমাদের প্রয়োজন পূরণ হোক বা নাহোক। আমার ও তোমার মধ্যে আল্লাহর কিতাবই চূড়ান্ত ফায়সালাকারী।

নবম সাক্ষ্য

একবার মদিনায় একটা বাণিজ্যিক কাফিলা এল। ঐ কাফিলায় নারী, পুরুষ ও শিশুরা ছিল। হযরত উমর (রা) হযরত আব্দুর রহমান বিন আওফকে বললেন, আজকের রাতে কি আপনি ওদের পাহারা দিতে পারেন? তিনি রাযী হলেন। হযরত উমার ও আব্দুর রহমান বিন আওফ উভয়ে মিলে রাত জেগে কাফিলাকে পাহারা দিতে লাগলেন। এই অবস্থায় তারা তাহাজ্জুদের নামাযও পড়লেন। হযরত উমার একটা শিশুর কান্নার আওয়ায শুনতে পেলেন। তিনি তৎক্ষণাত তার কাছে গিয়ে তার মাকে বললেনঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং শিশুর দিকে লক্ষ্য রাখ। তারপর তিনি ফিরে এলেন। কিছুক্ষণ পর আবারও কান্না শুনলেন। তিনি পুনরায় তার মার কাছে গেলেন এবং তাকে বললেনঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং শিশুর যত্ন নাও। শেষ রাতে শিশুটা আবার কেঁদে উঠলো। হযরত উমার তার মার কাছে গেলেন। তাকে বললেনঃ তোমার জন্য আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে। তুমি মা হিসেবে খুবই খারাপ বলে মনে হচ্ছে। তোমার এই শিশু সারা রাত শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি কী কারণে? মহিলা জানতো না যে, সে আমীরুল মুমিনীনের সাথে কথা বলছে। সে বললো,

ওহে আল্লাহর বান্দা, তুমি সেই রাতের প্রথম ভাগ থেকেই আমার পেছনে লেগেছ। আমি এই শিশুকে জোরপূর্বক দুধ ছাড়াতে চেষ্টা করছি। কিন্তু সে কিছুতেই ছাড়ছেনা।

হযরত উমারঃ কেন দুধ ছাড়াতে চাইছ?

মহিলাঃ কারণ খলীফা উমার শুধু সেই শিশুকে ভাতা দেয়, যে দুধ ছেড়ে দিয়েছে।

হযরত উমারঃ এই শিশুর বয়স কত?

মহিলাঃ কয়েক মাস হয়েছে।

হযরত ওমরঃ তুমি দুধ ছাড়াতে এত তাড়াহুড়ো করোনা। এরপর তিনি ফজরের নামায এমন অবস্থায় পড়ালেন যে, তার কান্নার কারণে লোকেরা কিরাত শুনতেই পায়নি। সালাম ফেরানোর পর বললেনঃ উমারের ধ্বংস অনিবার্য। কেননা সে মুসলমানদের শিশুদের হত্যা করেছে। এরপর নির্দেশ দিলেন, ‘শহরে ঘোষণা করে দাও যে, কেবল ভাতার জন্য শিশুদের তাড়াতাড়ি দুধ ছাড়ানোর প্রয়োজন নেই। এখন থেকে প্রত্যেক শিশুকে ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই ভাতা দেয়া হবে’। যথা সময়ে সারা দেশে এই ঘোষণা প্রচার করা হলো।

অতুলনীয় দৃষ্টান্ত

আল্লাহর শপথ করে বলছি, সমগ্র মানব ইতিহাসে আমরা এ ধরনের চমকপ্রদ ও উজ্জ্বল । দৃষ্টান্ত আর একটাও দেখতে পাইনে। দুনিয়ার সব কটা সভ্যতার মধ্যে এমন সভ্যতার একটাও নেই, যা হযরত উমারের নমুনা পেশ করতে পারে। তিনি নিজে রাত জেগে কাফিলাকে পাহারা দিতে লাগলেন, আর কাফিলা আরামে ঘুমালো। অথচ তিনি তখন আমীরুল মুমিনীন- ক্ষমতাসীন খলীফা। অর্থাৎ সেই দোর্দণ্ড প্রতাপ মহাপরাক্রান্ত খলীফা, যিনি রোম ও পারস্যের সাম্রাজ্যকে পদানত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি এমন কাজ করলেন, যা আজকাল একজন নগণ্য সৈনিকও কোন কাফিলার প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়ে করবেনা। তিনি তিনবার শিশুর মাকে সতর্ক করলেন যে, শিশুকে আরামে রাখ। বিদেশী পথিকের শিশুর প্রতি উমারের মত এমন আচরণ আর কে করবেঃ মানব ইতিহাসের যত বড় ব্যক্তিত্বকেই নিয়ে আসুন, হযরত উমারের মানবিক চেতনার ধারে কাছেও পৌছতে পেরেছে এমন কাউকে পাওয়া যাবেনা।

দশম সাক্ষ্য

এখানেই শেষ নয় । আমাদের সভ্যতায় এর চেয়েও চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে। হযরত উমারের ভৃত্য আসলাম বর্ণনা করেন যে, আমি একদিন রাত্রে হযরত উমারের সাথে বের হলাম। চলতে চলতে আমরা মদীনা থেকে অনেক দূরে চলে গেলাম। আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিবাসীদের অবস্থা জানতে চেষ্টা করছিলাম। এক জায়গায় আমরা আগুন জুলতে দেখলাম। হযরত উমার বললেনঃ আমার মনে হয়, রাতের গভীরতা ও শীতের তীব্রতার কারণে কিছু লোক ওখানে রাত্র যাপন করছে। চল যাই, ওদেরকে দেখে আসি। আমরা দ্রুত পায়ে হেঁটে ওখানে পৌঁছলাম। আমরা দেখলাম, জনৈক মহিলার চারপাশে কয়েকটা শিশু বসে আছে। চুলোয় একটা হাড়ি চড়ানো। শিশুরা কান্নাকাটি করছে। হযরত উমার মহিলাকে সালাম করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন যে, তোমাদের কী অবস্থা এবং এখানে কী হচ্ছে? মহিলা বললো, রাত গভীর হয়ে গেছে এবং কনকনে শীত নেমেছে।

তাই আমরা এখানে থেকে গেলাম।

হযরত উমারঃ শিশুরা কাদছে কেন?

মহিলাঃ ওদের খিদে পেয়েছে।

হযরত উমারঃ ঐ হাড়িতে কী?

মহিলাঃ ওতে কেবল পানি। শিশুদেরকে প্রবোধ দেয়ার জন্য ওটা চড়িয়েছি, যাতে ওরা চুপ করে ও ঘুমিয়ে যায়। আমাদের ও খলীফা উমারের মধ্যে আল্লাহই ফায়সালা করবেন। মহিলা বুঝাতে চেয়েছিল যে উমার আমাদের প্রতি সুবিচার করছেন না।

হযরত উমারঃ উমার তোমাদের কথা জানবেন কি করে?

মহিলাঃ তা হলে সে খলীফা হয়েছে কেন? আমাদের অবস্থা সম্পর্কে সে যখন উদাসীন, তখন তার খলীফা হওয়ার মানে কী?

আসলাম বলেন, এই পর্যায়ে হযরত উমার আমাকে বললেন, “চল চাই।’ এরপর আমরা দ্রুত পদে সেখান থেকে রওনা হলাম। হযরত উমার আমাকে সাথে নিয়ে সোজা আটার গুদামে প্রবেশ করলেন। তিনি এক বস্তা আটা ও এক বোতল তেল নিলেন। তারপর আমাকে বললেন, এই জিনিসগুলো আমার ঘাড়ে তুলে দাও। আমি বললামঃ আমি ঘাড়ে তুলে নিচ্ছি। হযরত উমার ক্রুদ্ধ কণ্ঠে ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুমি কি কিয়ামতের দিনও আমার বোঝা বহন করবে?’ অগত্যা আমি বস্তা ও তেলের বোতল তার ঘাড়ে তুলে দিলাম। তারপর আমরা দু’জন জোর কদমে রওনা হলাম। হযরত উমার তার বয়ে আনা খাদ্যদ্রব্য মহিলার সামনে নামিয়ে রাখলেন। খানিকটা আটা বের করে মহিলাকে দিয়ে বললেন, এটা দিয়ে রুটি বানাও। আমি চুলোর আগুনকে আরও একটু তীব্র করি। তিনি হাড়ির নীচে ফুঁক দিতে লাগলেন। তার ঘন দাড়ির ভেতর থেকে আমি শাঁ শাঁ করে ধুঁয়া বেরুতে দেখছিলাম। রুটি তৈরী হয়ে গেলে হযরত উমার নিজেই তা চুলো থেকে নামালেন এবং শিশুরা তৃপ্তি সহকারে খাওয়া দাওয়া না সারা পর্যন্ত তিনি ঠায় বসে রইলেন। এরপর হযরত উমার বিদায় হলেন। আমিও তার সাথে রওনা হলাম। মহিলা বলতে লাগলোঃ “আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। খিলাফতের পদের জন্য উমারের চেয়ে আপনিই বেশী যোগ্য।”

হযরত উমার বললেনঃ “তোমার প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ। কাল যখন তুমি আমীরুল মুমিনীনের দরবারে আসবে তখন সেখানে আমার সাথে দেখা হবে ইনশায়াল্লাহ।”

তারপর হযরত উমার সেখান থেকে এসে ওদের তাবুর পাশেই লুকিয়ে ভেতরে কী হচ্ছে দেখতে লাগলেন। আমি বললামঃ আপনার জন্য এটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু তিনি কোন জবাব দিলেন না। আমরা দেখলাম ঐ মহিলার শিশুরা খেলছে। কিছুক্ষণ পর তারা ঘুমিয়ে গেল। হযরত উমার আলহামদুল্লিাহ বলে রওনা হলেন এবং আমাকে সম্বোধন করে বললেনঃ শোন আসলাম, ওরা খিদের চোটে ঘুমাতে পারছিলনা। ওদেরকে শান্ত হয়ে ঘুমাতে না দেখা পর্যন্ত আমি স্বস্তি পেতাম না। এ জন্যই ওদেরকে লুকিয়ে দেখলাম।

একাদশ সাক্ষ্য

সহানুভূতি ও মানবিক সাম্য সম্পর্কে মানবেতিহাসের নজীরবিহীন ঘটনাবলীর মধ্যে আরো একটা ঘটনা ঘটেছিল হযরত উমারের জীবনে। রাতের বেলা ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে প্রজাদের অবস্থার খোজখবর নেয়া হযরত উমারের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। একদিন রাতের বেলা তিনি মদিনার বাইরে একটা জনপদে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সহসা তিনি কান্নার শব্দ শুনলেন। শব্দটা এক তাবু থেকে আসছিল। সেই তাবুর দরজায় এক ব্যক্তি দাড়িয়েছিল। হযরত উমর (রা) তাকে সালাম করলেন এবং তার পরিচয় জানতে চাইলেন। সে বললোঃ আমি একজন গ্রামবাসী। এখানে আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে এসেছি। হযরত উমার বললেনঃ কান্নার শব্দটা কেন? লোকটা হযরত উমর (রা) কে বললেন। আপনি ভাই নিজের কাজে যান। যে বিষয়ের সাথে আপনার কোন সংশ্ৰব নেই, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আপনার কাজ নেই। সে জানতোনা যে, সে কথা বলছে স্বয়ং আমীরুল মুমিনীনের সাথে। হযরত উমার নাছোড়বান্দা। তিনি কিছুতেই না শুনে ছাড়বেন না। সে বললোঃ আমার স্ত্রী প্রসব বেদনায় ছটফট করছে এবং তাকে সাহায্য করার মত এখানে কেউ নেই। হযরত উমার তৎক্ষণাত ঘরে ফিরলেন। স্ত্রী হযরত উম্মে কুলসুম বিনতু আলী (রা) কে বললেনঃ আল্লাহ তোমার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন- এমন একটা পুণ্য কাজে কি তোমার আগ্রহ আছে? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেই পুণ্য কাজটা কি? হযরত তাকে বিশদ বিবরণ দিলেন এবং নবজাতক শিশু ও তার মায়ের প্রয়োজনীয় পোশাক, খাবার ও ঘি ইত্যাদি সাথে নিতে বললেন। হযরত উমার এই জিনিসগুলো হাতে নিয়ে রওনা হলেন এবং উম্মু কুলসুম তার পেছনে পেছনে চললেন। উভয়ে সেই তাবুর সামনে পৌছলেন। হযরত উমর (রা) উন্মু কুলসুমকে তাবুর ভেতরে যেতে বললেন। নিজে বাইরে পুরুষটার সাথে বসে রইলেন এবং আগুন জ্বালিয়ে রান্না খাবার তৈরী করতে লাগলেন। তখনো ঐ গ্রামবাসী লোকটি টের পায়নি যে, সে পৃথিবীর এক অসাধারণ মানুষের কাছে বসে রয়েছে। ইত্যবসরে তাবুর অভ্যন্তরে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। উন্মু কুলসুম ভেতর থেকে বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন, আপনার বন্ধুকে নবজাতকের জন্মের সুসংবাদ দিন। গ্রামবাসী উন্মু কুলসুমের কথাটা শুনতেই ভয়ে আঁৎকে উঠে হযরত উমারের কাছ থেকে সরে বসতে লাগলো। কারণ সে ইতিপূর্বে তার সাথে অশোভন আচরণ করেছে। হযরত উমার বললেনঃ স্বাভাবিকভাবে বসে থাক। তারপর উন্মু কুলসুমকে বললেন খাবার খাওয়াতে। আর নিজে পুরুষ লোকটাকে খাওয়ালেন। তারপর তাকে বললেন, আগামী কাল আমার কাছে এসো। পরদিন সকালে খলীফার দরবারে গিয়ে তারা দেখলো, শিশুর জন্য ভাতা নির্ধারিত হয়ে গেছে এবং তাদেরকেও বখশিশ দেয়া হয়েছে।

কোন একটা উদাহরণই দেখান আমি যতদূর জানি, নিশ্চয় করে বলতে পারি যে, মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মহামানবদের জীবনীতে আমি এ ধরনের উচ্চাংগের মানব প্রেমের একটা ঘটনাও পাইনি। আমেরিকার ত্রাণকর্তা জর্জ ওয়াশিংটন সম্পর্কে এ ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ যে, তিনি একদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, কয়েকজন সৈনিক একটা পাথর সরাতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা।

ওয়াশিংটন তাকে বললেন, তুমিও ওদের সাহায্য কর। কিন্তু সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করলো যে, ওটা আমার পদমর্যাদার পরিপন্থী। ওয়াশিংটন নিজেই তাদের সাহায্য করলেন এবং এতেই পাথরটা সরানো সম্ভব হলো। নিঃসন্দেহে এটা একটা বিরল ঘটনা এবং এটা বাস্তবিকই উন্নত মানের নৈতিকতার লক্ষণ। কিন্তু হযরত উমারের পূর্বোক্ত ঘটনাবলীর সাথে এ ঘটনার কোন তুলনা হয়না। তিনি রাতে নিজের ঘুম ও আরামকে হারাম করে প্রজাদের অবস্থা জানবার জন্য পথে পথে ঘুরে বেড়ান। একজন গর্ভবতী মহিলার প্রসব বেদনা উঠেছে অথচ তার কোন সাহায্যকারী নেই একথা জেনে তিনি নিজের স্ত্রীকে তার সাহায্যের জন্য নিয়ে যান। নিজে বাবুর্চি এবং তার স্ত্রী ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেন। অথচ তারা প্রচলিত পরিভাষায় মুসলিম জাহানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী। এমন উচ্চাংগের মানব প্রীতির কোন তুলনা কোথাও আছে কি? বস্তুত হযরত উমারের এই উদারতা ও মহানুভবতার পর্যায়ে আজ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে কোন শাসকই পৌছুতে পারেনি। এ মহত্ব হযরত উমারের চরিত্রের চমকপ্রদ বৈশিষ্ট আর আমাদের সভ্যতারও উজ্জ্বলতম দিক। এ বৈশিষ্ট হযরত উমারের ন্যায় একজন বাউণ্ডেলে যুবককে বিশ্বের অন্যতম শ্ৰেষ্ঠ মহামানবে পরিণত করেছে এবং আমাদের সভ্যতাকেও বানিয়েছে পৃথিবীর শ্ৰেষ্ঠতম সভ্যতা।

এখানে একথাও উল্লেখ্য যে, আমাদের সভ্যতা শুধু হযরত উমারকেই একজন পূর্ণাংগ ও মহানুভব মানুষ হিসেবে পেশ করেনি, বরং হযরত আবুবকর, হযরত ওসমান ও হযরত আলীও একই ধরনের পূর্ণাংগ ও মানব দরদী মানুষ ছিলেন। এ ছাড়া হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয, সালাহুদ্দীন আইয়ুবী প্রমুখের ন্যায় বড় বড় ব্যক্তিত্ব, বড় বড় ফকীহ, দার্শনিক ও নেতার জীবনেও অসংখ্য চিরঞ্জীব দৃষ্টান্ত বিদ্যমান এবং সেগুলিও সর্বতোভাবে আমাদের মহান সভ্যতার উজ্জ্বল নিদর্শন।

মতামত দিন