বিজ্ঞান ও ইসলাম

আল কুরআন ও বিজ্ঞান

রচনায়: রেজাউল করিম

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ এবং শাশ্বত জীবন-ব্যবস্থা। ইসলামের আছে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। বিংশ শতাব্দীর বিদায় লগ্নে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী এখন একবিংশ শতাব্দীকে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ প্রস্তুতি পর্বে বিজ্ঞানের অভিনব আবিষ্কার মানবতাকে করেছে মোহিত। কখনও বা বিজ্ঞানের আশ্চর্যজনক আবিষ্কার ভাবিয়ে তুলেছে অনুসন্ধিৎসুজনের। রহস্যের অনুসন্ধানে উদগ্রীব হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু আল কুরআনের সংস্পর্শে এসেছ তারা রহস্যের সেই জট খুলতে সক্ষম হয়েছেন। রহস্যময় বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ জবাব দিয়েছে আল কুরআন। বিজ্ঞানী, গবেষক উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘বিজ্ঞানের সাথে কুরআনের কোনো দ্বন্দ্ব নেই, বরং কুরআনের আছে নির্ভেজাল বৈজ্ঞানিক ভিত্তি’। তাঁরা মাথা পেতে দিয়েছেন কুরআনের চিরন্তন সত্যের কাছে। উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, “আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে মানিনা এবং রাসূল (সা) আল্লাহর প্রেরিত বান্দা।” আল কুরআনের বৈজ্ঞানিক সত্যে অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, এমন কয়েকজন পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীর ইসলাম গ্রহণের বাস্তব আলেখ্য নিয়ে এই ক্ষুদ্র উপস্থাপনা।

ড. আর্থার জে, এ্যালিসন

মনস্তত্ববিদ আধ্যাত্মিক বিষয়ের গবেষক ড. আর্থার জে. এ্যালিসন ইসলামের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ড. এ্যালিসন কায়রো বৈজ্ঞানিক মহাসম্মেলনে অংশগ্রহণের প্রাক্কালে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘মুসলমানেরা ইসলামের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা অন্য ধর্মের লোকের কাছে উপস্থাপন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে’।

ড. এ্যালিসন, যার নাম এখন “আবদুল্লাহ এ্যালিসন” বৃটিশ ইউনিভার্সিটির ইলেট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান। তিনি পাশ্চাত্য বিজাতীদের ইসলামের সাথে পরিচিত হবার আহবান জানিয়ে বলেছেন, “ইসলাম একই সাথে বুদ্ধিমত্তা ও আবেগকে উদ্বেলিত করে।” ড. এ্যালিসন বলেন, তিনি ছয় বছর ধরে বৃটিশ মনস্তত্ববিদ ও আধ্যাত্মিক স্টাডিজ সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন। এবং এ অবস্থান তাকে ইসলাম, বিভিন্ন ধর্ম এবং দর্শন গভীরভাবে পড়ার সুযোগ করে দেয়। তিনি বলেন, কায়রো সম্মেলনের প্রাক্কালে তার মূল কাজ ছিলো ইসলামের আলোকে মনস্তত্ববিদ্যা এবং আধ্যাত্মিক বিদ্যার ওপর প্রবন্ধ তৈরি করা। এবং এর ফলস্বরূপ তিনি ঘুম ও মৃত্যুর স্বরূপ ও অবস্থা সম্পর্কে খুবই মনোমুগ্ধকর ও প্রেরণাদানকারী তথ্যের সন্ধান পান। তিনি আরও বলেন, “আমার আনন্দের সীমা ছিলো না এবং স্টাডিটি আমার জন্যে খুবই প্রেরণাদায়ক ছিলো। এভাবেই আমি ইসলামের শাশ্বতরূপ খুঁজে পাই।” তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, পাশ্চাত্য, ইসলামের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এই বৃটিশ বিজ্ঞানী বলেন, “কায়রো সম্মেলনে আলোচনা কালে আমরা উপসংহারে উপনীত হই যে, ইসলাম বিজ্ঞানের পথে সাংঘর্ষিক নয় এবং কুরআনের আলোকে মনস্তত্ববিদ্যার ওপর আরও গবেষণার জন্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করি।”

ড. এ্যালিসন কায়রো সম্মেলনের প্রবন্ধ লেখার সময় পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত পড়ে অভিভূত হন,

 اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ۖ فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَىٰ عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَىٰ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

“আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ ছাড়েন না এবং অন্যান্যদের ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা যুমার, আয়াত নং-৪২)

তিনি বলেন, ‘গবেষণার মাধ্যমে পেয়েছেন, যখন মানুষ ঘুমায় তখন তার শরীর থেকে কিছু চলে যায় এবং যখন সেটি ফিরে আসে তখন মানুষ জেগে ওঠে। কিন্তু মৃত্যু হলে “এমন কিছু” চলে যায়, যা আর কখনও ফিরে আসে না। এবং যা কুরআনের উপরোক্ত আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণনা দেয়া হয়েছে।”

সমুদ্র তলদেশ অনুসন্ধান ফ্রান্সের সমুদ্র বিজ্ঞানীকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে

মি. জ্যাক ইয়েভস কসটিউ ফ্রান্সের প্রখ্যাত সমুদ্রবিজ্ঞানী। যিনি সারাজীবন সমুদ্র তলদেশ অনুসন্ধান করে কাটিয়েছেন এবং যাকে সমুদ্র তলদেশ অনুসন্ধানকারী শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি অভিনব এক অনুসন্ধানের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তার অনুসন্ধান পবিত্র কুরআন দ্বারা সমর্থিত হয়েছে এবং তিনি মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছেন যে, সমগ্র মানবজাতি এবং জীনের একমাত্র পথ প্রদর্শক আল্লাহ।

একদিন মিঃ জ্যাক সমুদ্র তলদেশে অনুসন্ধান করছিলেন, তখন তিনি লক্ষ্য করেন সমুদ্রের লবণাক্ত পানির সাথে আলাদাভাবে মিঠাপানির স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। যে বিষয়টি সবচেয়ে তাকে ভাবিয়ে তোলে তা হলো, লবণাক্ত পানি ও মিঠা পানির স্রোত আলাদাভাবে প্রবাহিত হচ্ছে এবং একটি অন্যটির সাথে কোনোক্রমেই মিশছে না। দীর্ঘক্ষণ ধরে তিনি এ রহস্যের কারণ অনুসন্ধানে আত্মনিমগ্ন হলেন। কিন্তু কোনো কুলকিনারা করতে পারলেন না।

একদিন তিনি বিষয়টি সম্পর্কে এক মুসলমান প্রফেসরের সাথে আলাপ করেন। সেই মুসলমান প্রফেসর তখন বললেন, “এটি সম্পূর্ণ আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হয় এবং সেটির সুস্পষ্ট বর্ণনা আল কুরআনে এভাবে আছে-

وَهُوَ الَّذِي مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ هَٰذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ وَهَٰذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ وَجَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا وَحِجْرًا مَّحْجُورًا

তিনিই সমান্তরালে দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্টি, তৃষ্ণা নিবারক ও অন্যটি লোনা, বিস্বাদ; উভয়ের মাঝখানে রেখেছেন একটি অন্তরাল, একটি দুর্ভেদ্য আড়াল।” (সূরা আল ফুরকান, আয়াত নং-৫৩)

এ আয়াত শুনে মি. কসটিউ বললেন, “অবশ্যই কুরআন কোনো মানুষের তৈরী গ্রন্থ নয়।” তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।

কুরআনের বৈজ্ঞানিক সত্যতা থাই-বিজ্ঞানীকে অভিভূত করে

প্রফেসর তাজাতেন তাহাসেন, যিনি অঙ্গব্যবচ্ছদ বিদ্যা (Anatomy) এবং ভ্রুণতত্ত্ববিদ্যা (Emoryology) বিভাগের ভূতপূর্ব প্রধান এবং থাইল্যাণ্ডের চ্যাংমি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন কলেজের বর্তমান উীন, তিনি যখন সৌদি আরব পরিভ্রমণ করেন, তখন তার গবেষণা ও অধ্যাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু কুরআনের আয়াত এবং হাদীসের সাথে পরিচিত হন। প্রফেসর তাজাতেন তখন কানাডার বিজ্ঞানী। কিথ মুরের (ভ্রুণতত্ত্ববিদ বিশেষজ্ঞ) সাথে পরিচত হবার এবং তার প্রবন্ধ পড়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। পরবর্তীতে প্রফেসর তাজাতেনের প্রফেসর মূরের একটি লেখা পড়ার সুযোগ হয়। সে প্রবন্ধে প্রফেসর মূর লিখেন যে, তার মতে, কুরআনের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের ঢের মিল রয়েছে। প্রফেসর তাজাতেন এটা পড়ে খুব আশ্চর্যান্বিত হন এবং কুরআন পড়ার প্রতি তার বিস্তর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। নিম্নের আয়াতটি তখন তিনি পড়েন,

 إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُم بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا

“এতে সন্দেহ নেই যে, আমার নিদর্শন সমূহের প্রতি যেসব লোক অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে, আমি তাদেরকে আগুনে নিক্ষপ করবো। তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে পুড়ে যাবে, তখন আবার আমি তা পাল্টে দেবো অন্য হিকমাতের অধিকারী।” (সূরা আন নিসা, আয়াত নং-৫৬)

প্রফেসর তাজাতেন এটির সাথে একমত হন এবং বলেন যে, এটি সাম্প্রতিক কালের একটি আবিষ্কারের সাথে সংগতিশীল।

তৃক সমস্ত স্নায়ুতন্ত্রের ধারক এবং যদি কোনো তৃক পরিপূর্ণভাবে পুড়ে যায় তবে এটির অনুভূতি শক্তি লোপ পায় অর্থাৎ এটি ব্যথা, স্পর্শ ইত্যাদি অনুভব করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে অবগত আছেন এবং এজন্যে অবিশ্বাসী দোযখবাসীকে বার বার আগুনে পুড়িয়ে প্রতিবার ত্বককে জীবিত করবেন যাতে সে (অবিশ্বাসী) অব্যাহতভাবে ব্যথা অনুভব করতে পারে।

প্রফেসর তাজাতেন বলেন যে, এটা খুবই অসম্ভব যে, কুরআন মানুষের উক্তি এবং এটি ১৪০০ বছরের পুরানো গ্রন্থ হলেও এটি সকল সময় ও যুগে চিরন্তন নতুন এক গ্রন্থ। কার নিকট থেকে জ্ঞানের এ অভিনব উৎস এসেছে? সেটির উত্তর, আল্লাহর নিকট থেকে। আল্লাহ কে? প্রফেসরের জিজ্ঞাসায় তাকে জানানো হলো যে, তিনি হলেন সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। যার নিকট থেকে সত্য জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দয়া ও মমতা এসেছে। প্রফেসর তাজাতেন থাইল্যাণ্ডে ফিরে এসে সৌদি আরবে যেসব কিছু শিখেছিলেন সে সবের উপর অনেকগুলো লেকচার দিলেন। এ লেকচারের প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ তার পাচ ছাত্র ইসলাম গ্রহণ করেন।

খুব অল্প সময় পরে প্রফেসর তাজাতেন সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্যে যান। উক্ত সম্মেলনের বক্তৃতায় প্রফেসর তাজাতেন ডেলিগেটদের উদ্দেশ্যে বলেন, পড়াশুনার কারণে তার বিশ্বাস জন্মেছে যে, কুরআনের সব কিছুই সত্য। কুরআনের বিষয়াবলী যেগুলো ১৪০০ বছর পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছিলো, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান সেগুলোর সত্যতার ব্যাখ্যা সম্প্রতি করেছে। প্রফেসর আরও বলেন, মুহাম্মাদ (সা) লিখতে পড়তে জানতেন না, তাই এসব সত্য-নিশ্চয় আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। প্রফেসর তাজাতেন বললেন, সময় এসেছে ঘোষণা দেয়ার “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)”। প্রফেসর তাজাতেন তাহাসেন কুরআনের সকল বর্ণনা সত্য হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।

চৌদ্দ শ’ বছরেরও অধিককাল পূর্বে প্রচারিত আল কুরআন তথা ইসলাম আজও বাস্তবতার কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে অমোঘ সত্য হিসেবে গৃহীত হচ্ছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত হতে থাকবে। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের যত উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে, আল কুরআনের বৈজ্ঞানিক সত্যতা বিজ্ঞানী, গবেষক তথা দুনিয়াবাসীর কাছে ততই দিবালোকের মত স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে।

আজ বিজ্ঞানের অভিনব উদ্ভাবন ও আবিষ্কার সারা বিশ্বকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। সেদিন আর বেশী দূরে নেই, যেদিন কুরআনের অমোঘ সত্য আবার সারা দুনিয়া জয় করবে।

(ইসলামিক ফিচার, সেপ্টেম্বর ৯৮ অবলম্বনে)

সূত্র: মাসিক পৃথিবী পুরনো সংখ্যা।

মতামত দিন