বিজ্ঞান ও ইসলাম

ইবনে মজিদ : উত্তাল সমুদ্রের সিংহ

রচনায়: মুহাম্মদ নূরুল আমীন

ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগে সাগরের বুকে মুসলিম নৌ-আধিপত্য ছিল অনেকটা প্রবাদের মতো। হযরত মুআবিয়ার (রা) যুগে নৌ-বিজয়ের শুরু হয় এবং তা কয়েকশত বছর ধরে ভারত মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের বিশাল বক্ষে পরিব্যাপ্তি লাভ করে। মুসলমান নাবিকদের সমুদ্র অভিযান এবং এ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান পরবর্তীকালে ইউরোপীয় নাবিকদের দিক নির্দেশক হিসাবে কাজ করে।

আধিপত্যের যুগে যে সকল মুসলিম নাবিক নিজের জীবন বিপন্ন করে দুঃসাহসী সমুদ্র অভিযানে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ্বের বাণিজ্য, সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সওদা করেছিলেন তাদের অনেকেই আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। তাদের সম্পর্কে আজ জানা যায় খুবই কম। ধ্বংসের হাত থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কিছু নথি এবং নাবিকদের কিছু রচনা থেকে আমরা যেটুকু জানতে পারি তাও আমাদের অনেকেরই অজানা।

সমুদ্র অভিযানে সফল যে মুসলিম নাবিকের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয় তিনি শিহাবুদ্দিন আহমদ ইবনে মজিদ। পঞ্চদশ খৃষ্টীয় শতকে ইউরোপীয় নাবিকরা যখন ভারত ও আমেরিকা যাওয়ার পানিপথ আবিষ্কারে ব্যস্ত তখন যে তথ্য ও অভিজ্ঞতা তারা ইবনে মজিদ থেকে পেয়েছিলেন, তার ঋণ অপ্রতিশোধ্য। মুসলমানদের তৈরি কম্পাস, মানচিত্র এবং গ্রন্থাদির প্রত্যক্ষ সাহায্য নিয়ে তারা অগ্রসর হয়েছিলেন। এছাড়া ঐ সময় ইউরোপীয়দের বিকল্প কোন রাস্তা ছিলো না।

শিহাবুদ্দিন আহমদ ইবনে মজিদের পিতা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ নাবিক। সমুদ্র বিদ্যায় পিতার কাছ থেকে তিনি মূল্যবান জ্ঞান ও তথ্য লাভ করেন বলে নিজেই উল্লেখ করেছেন। এই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান এবং নিজের ৫০ বছরের সমুদ্র বক্ষে বিচরণ- তাকে পরিণত করে একজন পরিণত নৌ বিশারদ রূপে। তিনি নিজেকে দুই কিবলার কবি (মক্কা ও জেরুসালেম) নামে অভিষিক্ত করেছিলেন।

আহমদ ইবনে মজিদের জন্ম তারিখ সঠিক জানা যায় না। তবে তার রচিত গ্রন্থাদির রচনা-সাল পরীক্ষা করে ধারণা করা হয় ১৪৩৩ থেকে ১৪৪১ খৃষ্টাব্দের কোন এক সময়ে তিনি স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন। বংশানুক্রমে তিনি ছিলেন নাবিক ও এ সম্পৰ্কীয় তথ্যাদির রচয়িতা। তার পিতাকে বলা হতো ‘দুই উপকূলের নৌ-পরিচালক’ আর তিনি । নিজেকে সিংহের বংশধর এবং উত্তাল সমুদ্রের সিংহ বলে পরিচয় দিতেন। তিনি বলতেন, আমার নিরাপত্তার জন্য নৌ-পরিচালকদের চেয়ে আমার পিতার দেয়া তথ্যের নিকট আমার বেশি ঋণী। ১৪৮৫ সালে তিনি ১৭° দক্ষিণে লোহিত সাগরের আরব উপকূলে অবস্থিত দুইটি দ্বীপ আসমা ও মাসনাদের মধ্য দিয়ে অতিক্রমের সময় অন্য নাবিকদের বিরোধিতা করেন। কারণ পিতার দেয়া তথ্যে তিনি জানতেন, দ্বীপসমূহের নিকটবতী এলাকায় কোন পথ নেই, সেখানে শুধু একটি শৈল শ্রেণী বিদ্যমান এবং দুই বাও গভীরে শুধু একটি পথ আছে। পরে দ্বিধাৰিত নাবিকরা গভীরতা পরিমাপক শব্দ সৃষ্টিকারী সীসা সহ সানবুক পাঠিয়ে দেখলেন যে, ইবনে মজিদের তথ্যই সঠিক।

আহমদ ইবনে মজিদ ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, পশ্চিম চীন সাগর এবং মালয় দ্বীপপুঞ্জের পানিসীমা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং এ সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন। তার এ সমুদ্র পথ বিষয়ে জ্ঞান কাজে লাগায় ইউরোপীয় নাবিকগণ । ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ সালে যখন পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে পৌছান তখন একজন আরব নৌ-পরিচালকের সন্ধান পান। এই নাবিকই ভাস্কো দা গামাকে সরাসরি কালিকট বন্দরে নিয়ে যায়। পর্তুগীজ ইতিহাসের কিছু গ্রন্থে এ সম্পর্কে অস্পষ্ট কিছু আলোচনা Damiao de Goes, Castanheda এবং Barros প্রমুখ ইতিহাসবিদ উক্ত নাবিকের নাম করেছেন Maleme Canaqua এবং Maleme Cana অর্থাৎ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও নৌ পরিচালন শিক্ষক। এই শিক্ষকই হচ্ছেন শিহাবুদ্দিন আহমদ ইবনে মজিদ।

‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামে’ উল্লেখ করা হয়েছে, ১৪৯৮ সালের ২৪ এপ্রিল ইবনে মজিদ ভাস্কো দা গামাকে নিয়ে আফ্রিকা ঘুরে পানিপথে ভারত যাত্রা করেন। তার অভিজ্ঞতা, যন্ত্রপাতির নিখুঁত ব্যবহার এবং দক্ষতার কারণে ভাস্কো দা গামা ইতিপূর্বে ইবনে মজিদের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। তাই প্রকৃতপক্ষে ভারত যাত্রার জলপথ আবিষ্কারে ইউরোপের নাম বেচা কেনার বলি হয়েছেন ইবনে মজিদ। কলম্বাসের অনেক আগেই যেমন মুসলমানরা সেখানে পৌছে গিয়েছিলেন, তেমনি সমসাময়িক ভাস্কো দা গামার অভিযানের পূর্বেই তার ইউরোপ থেকে ভারত আসার পানিপথের খবর রাখতেন। James Preincep এর মতে, উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ও ভারত এবং মালদ্বীপের লোকেরা ইবনে মজিদকে স্মরণ করতো।

ইবনে মজিদ নৌ-চলাচল বিষয়ক ৩০টি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ১৪৮০-৯০ সালে লিখিত ‘কিতাবুন ফাওয়াহিদ কী উসুল ইলমুল বহর ওয়াল কাওয়ায়ীদ’ তার অতি মূল্যবান রচনা। এতে তিনি নৌ-পরিচালনা, চৌম্বক কম্পাসের পৌরানিক উৎস, চান্দ্রগতি পথের ২৮টি অংশ, ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ, পশ্চিম চীন সমুদ্রের বিভিন্ন বন্দরের দ্রাঘিমাংশ, দশটি বিখ্যাত বড় দ্বীপ ও লোহিত সাগরের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

তার গ্রন্থাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে, ‘হাওইয়া আল ইখতিসার ফি উসুল ইলমুল বাহার’, ‘আল মাখারিয়া’, ‘কিবলাতুল ইসলাম’, ‘বহর আল আরব’, ‘কানযুল মুয়াল্লাম’, ‘দারিবাতুল দারাঈব’ উল্লেখযোগ্য। বেশ কিছু লেখা আরবী কবিতার ছন্দে রচিত। তার লিখিত বাইশটি মূল্যবান প্রবন্ধও পাওয়া গেছে।

আহমদ ইবনে মজিদ তাঁর রচনায় পূর্ববর্তী নাবিকদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। তিনি লিখেছেন, জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের ডিগ্রিসহ আষ্ট্রোল্যার প্রথম আবিষ্কার করেন আল ইদ্রিসী। ইবনে মজিদ দাবী করেন, তিনিই ‘বারবারা’ আবিষ্কার করেন। ভারত মহাসাগর যে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে যুক্ত তাও তিনি আবিষ্কার করেন বলে জানা গেছে।

সমুদ্রে নৌ-চালনার ব্যাপারে আহমদ ইবনে মজিদের গ্রন্থ পরবর্তীকালে আরব ও ইউরোপে প্রচুর প্রভাব বিস্তার করে। তুর্কী এডমিরাল সিদী আলী চালাবী রচিত নৌবিদ্যার বিখ্যাত গ্রন্থ মুহীত’-এ ইবনে মজিদের প্রচুর তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে গ্রন্থকার কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করেছেন। এই ‘মুহীত’ গ্রন্থটি বহু ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

আহমদ ইবনে মজিদ ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠতম মুসলিম নাবিক ও সমুদ্র বিশেষজ্ঞ। তার মৃত্যু সন সম্পর্কে জানা যায় না। আধুনিক ভারত ও সংশ্লিষ্ট দ্বীপপুঞ্জের নতুন ইতিহাসে তার অবদানের কিছু স্বীকৃতি পাওয়া যাচ্ছে, যদিও এখনো তিনি পুরোপুরি আবিষ্কৃত হননি পৃথিবীর কাছে।

সূত্র: মাসিক পৃথিবী পুরনো সংখ্যা

মতামত দিন