ইসলামী শিক্ষা

আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায় ও মাধ্যম

খুতবা প্রদানে : ফাদিলাতুশ শাইখ হুসাইন বিন আব্দুল আযীয আল শাইখ

অনুলিখন: বাকির হুসাইন

তারিখঃ ৮-৭-১৪২৪ হিজরী

মাসজিদে নববীর ইমাম ও খাতীব শাইখ হুসাইন বিন আবদুল আযীয আল শাইখ তাঁর জুম’আর খুৎবায় বলেন-

বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবনে মালেক (রা) হতে এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন , রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিয়ামত কবে হবে? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামতের জন্য কি প্রস্তুত করেছ? বর্ণনা কারী বলেন, মনে হলো যেন লোকটি নিঃস্ব হয়ে গেল, অত:পর উত্তরে বলল, কিয়ামতের জন্য বড় ধরনের নামায রোযা ও সাদাকাহ প্রস্তুত করতে পারিনি তবে আমি আল্লাহ এবং তার রাসূলকে ভালোবাসি। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, তুমি যাকে ভালোবাস তার সাথেই থাকবে। ’’

অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আমরা ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ কথা শুনে যে খুশি হয়েছি এর চেয়ে বেশী কখনো হইনি।

সহীহ মুসলিমে আনাস ইবনে মালেক হতে এর বর্ণনায় এভাবে এসেছে তিনি বলেন, ‘‘আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল, আবু বকর ও উমার সবাইকে ভালোবাসি আর আমি সাথী হবো এ আশা পোষণ করছি। যদিও আমি তাদের আমলের মত আমল করতে পারি না।’’

এ ভালোবাসার মর্ম সম্পর্কে ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রহঃ) বলেন, ‘‘এ ভালোবাসা হচ্ছে এমন স্তর ও মযার্দা যা লাভ করার জন্য প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে থাকে। আমলকারীগণ যে লক্ষ্য পানে এগিয়ে যায়। অগ্রসর বান্দাহগণ যার উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালায়। আল্লাহর ভালোবাসায় মগ্ন ব্যক্তিরা যার জন্য নিজেদের সর্বস্ব বিসর্জন করে থাকে । যার স্নিগ্ধ শীতল প্রবাহে আল্লাহর বান্দাহরা প্রশান্তি তৃপ্তি লাভ করে থাকে।

যা হচ্ছে অনন্তর বেঁচে থাকার একমাত্র আহার, মানবাত্মার অন্যতম খাদ্য, ও চক্ষু শীতলকারিনী নয়নাকর্ষণ। তা হচ্ছে এমন জীবন যে ব্যাক্তি এ জীবন হতে বঞ্চিত হলো সে মূলত মৃতদের সারিতে অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল। এমন নূর বা আলোকবর্তিকা যে ব্যাক্তি তা হারাল সে মূলত নিকষ অন্ধকারে নিজেকে নিমজ্জিত করল। আর তা হচ্ছে এমন আরোগ্য বা সুস্থতা যার অনুপস্থিতিতে মানুষের অন্তরে সকল প্রকার রোগ ব্যাধি প্রবেশ করে থাকে। এমন স্বাদ ও উপভোগ্য বস্তু যার তা লাভ করার সৌভাগ্য হয়নি সে প্রকৃত হতভাগ্য এবং তার গোটা জীবনটা দুশ্চিন্তা ও দুঃখ কষ্টে পরিপূর্ণ । আল্লাহর কসম করে বলছি যারা এ ভালোবাসা লাভ করতে পেরেছে তারাই মূলত দুনিয়া ও আখেরাতের সকল মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে যেতে পেরেছ; কেননা তারা তাদের সুপ্রিয় সত্ত্বার সাহচর্যের সবচেয়ে বেশী অংশ লাভ করতে পেরেছে’’

মুসলিম ভাইসব! এ ভালোবাসা সত্মরে পৌছতে হলে এবং এর সকল প্রকার সফলতা লাভ করতে হলে অনেক গুলো উপায় ও মাধ্যম আলেমগণ উল্লেখ করেছেন। এ উপায়গুলোর মূলনীতি সমূহ নিম্নে আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো।

প্রথম মূলনীতি হচ্ছে, অর্থসহ বুঝে শুনে উপলব্ধির মাধ্যমে পবিত্র কুরআন পাঠ করা । কুরআনে কারীমের নিঘূঢ় রহস্য প্রজ্ঞা সম্পর্কে বুঝা ও উপলব্ধি করা। এ কারণেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের জনৈক ব্যক্তি সূরা ইখলাস অধ্যয়নের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি সর্বদা নামাযে সূলা ইখলাস আওড়াতেন , যখন তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল তিনি উত্তরে বললেন, কেননা এ সূরাটি দয়াময় আল্লাহর গুণাবলী তাই আমি বার বার পাঠ করে থাকি এবং এটা পড়তে ভালোবাসি তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করলেন, তাকে সুসংবাদ দাও আল্লাহ তাআলাও তাকে ভালোবাসেন। বুখারী বর্ণনা করেছেন।

দ্বিতীয় মূলনীতিঃ ফরয ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলে নিয়মিত অতিরিক্ত নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি আমার কোন ওলি বা বন্ধুর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা করলাম। আমার বান্দার উপর আমি যা ফরয করেছি। বান্দাহ আমার নৈকট্য লাভ করার জন্য তা আমার কাছে সবচেয়ে অধিক প্রিয়। আমার বান্দাহ নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে এমনকি শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ভালোবাসি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে শুনে, আমি তার দৃষ্টিশক্তি হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে দেখে, আমি তার হাতে পরিণত হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে ধরে, এবং আমি তার পা হয়ে যাই যার মাধ্যমে সে চলাফেলা করে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায় আমি তাকে তা দিয়ে থাকি। আর আমার কাছে যদি সে আশ্রয় কামনা করে আমি তাকে আশ্রয় দেই’’ বুখারী বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয় মূলনীতিঃ সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকর বা স্মরণকে সার্বক্ষণিক করা। মুখ, অন্তর ও কাজের মাধ্যমে যিকর বাস্তবায়ন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَاذْكُرُوْنِيْٓ اَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوْا لِيْ وَلَا تَكْفُرُوْنِ

‘‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর আমি তোমাদের স্মরণ করব।’’ [ সূরা বাকারা-১৫২]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, ‘‘আল্লাহ তাআলা বলেন,‘‘আমি আমার বান্দার সাথে থাকি যতক্ষণ বান্দাহ আমাকে স্মরণ করে থাকে এবং তার দু’ঠোট নাড়াতে থাকে’’। ইমাম ইবনে মাজাহ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আর এরশাদ করেন, ‘‘মুফাররিদুনরা অগ্রগামী হয়ে গেছে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুফাররিদুন কারা? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন, তারা সে সব নর ও নারী যারা অধিক পরিমানে আল্লাহকে স্মরণ করে’’। মুসলিম

চতুর্থ মূলনীতিঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ভালবাসাকে প্রবৃত্তির তাড়নার সামনে নাফসের সকল ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেয়া এতে বান্দাহ বিপদ মুসিবত যতই কঠিন ও বড় হোক না কেন আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অন্য সব কিছুর উপর প্রধান্য দিয়ে থাকে। ইমান ইবনে কাইয়্যম (রঃ) বলেন, আল্লাহ সন্তুষ্টি অন্য কিছুর উপর প্রাধান্য দেয়ার অর্থ হচ্ছে যেসব কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে তা করার ইচ্ছে পোষণ করা এবং তা বাসত্মবায়ন করা যদিও তা সৃষ্টিকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে হয়। এটা হচ্ছে দারাজাতুল ঈসার বা অগ্রাধিকার দেয়ার স্তর এর সর্বোচ্চ পর্যায় মূলত নবী ও রাসূলদের জন্য। তিনটি কাজের মাধ্যমে এ স্তর করা সম্ভব।

  1. নাফসের সকল কামনা বাসনার দমন করা
  2. প্রবৃত্তির সার্বক্ষণিক বিরোধিতা
  3. শয়তান এবং তার বন্ধুদের সাথে জিহাদকরা ।

পঞ্চম মূলনীতিঃ আল্লাহর নাম ও গুনাবলী সমূহ অন্তরে উপলব্ধি ও চর্চা করা । কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহ রাববুল আলামিনকে তাঁর নাম, গুনাবলী ও কাজের মাধ্যমে চিনতে পারল সে মূলত: আল্লাহ তা’লার প্রকৃত মারেফাত বা পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হল। আর তা হতে হবে কুরআন ও হাদীস এ দু’ ওহীর মাধ্যমে প্রমাণিত, কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, উপমা, উদাহরণ বিবরণ, ব্যাখ্যা ও বিয়োজন ব্যতীরেকে। আল্লাহ তা’লা বলেন,

 وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا

‘‘আল্লাহর সুন্দরতম নাম সমূহ রয়েছে তার মাধ্যমে তাঁকে তোমরা ডাক। ’’ [সূরা আল আরাফ-১৮০]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদিসের মাধ্যে এরশাদ করেন ‘‘আল্লাহ তা’লার নিরানববাইটি নাম রয়েছে যে তা সংরক্ষণ করল সে জান্নাতে প্রবেশ করল’’। বুখারী।

ষষ্ঠ মূলনীতিঃ আল্লাহর অনুগ্রহ দয়া ও বদান্যতার প্রতি প্রত্যক্ষ দৃষ্টি দেয়া এবং তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল নেয়ামত ও করম্ননা সম্পর্কে উপলব্ধি করে তাঁর পরিচয় লাভ করা। কেননা এ সব কিছু আল্লাহর ভালোবাসার দিকে মানুষদেরকে পরিচালিত করে। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ, তার করূণা, দয়া ও অনুকম্পনা এমন মৌলিক কিছু ভাব ও অনুভূতি যা মানুষের সকল অনুভুতিও আবেগকে অবদ্ধ করে ফেলে এবং তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ফলে মানুষ সর্বদা যে ও তার প্রতি অনুগ্রহ ও দয়া করে থাকে তার প্রতি মানসিক ভাবে দুর্বল থাকে এবং তার ভালোবাসা সদা তার অন্তরে জাগ্রত থাকে। অথচ এ কথা স্বীকৃত যে , আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন দয়াশীলকারী নেই। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ভালোবাসার পাত্র একান্ত প্রিয়ভাজন কেউ নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ প্রকৃত ভালোবাসা অধিকারী নেই।

মানুষ প্রকৃতিগত ভাবে অনুগ্রহের দাস বা পুজারী। আর সে যখন বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া তার প্রতি প্রকৃত অনুগ্রহকারী আর কেউ নেই তখন সে আল্লাহর ভালোবাসার দিকে ধাবিত হতে থাকে। আর মানুষের উপর আল্লাহর ইহসান বা দয়া হচ্ছে অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘তোমরা যদি আল্লাহর নিআমত গণনা করতে থাক তোমরা তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না, নিশ্চয় মানুষ অন্যায়কারী ও অকৃতজ্ঞ। [সূরা ইবরাহীম-৩৪]

এসময় কৃতজ্ঞতা ও শোকার গুজার হওয়ার প্রশ্ন এসে দাড়ায় । স্বীয় কথা কাজ ও অন্তরের মাধ্যমে আল্লাহর শোকর আদায় করার চেষ্টা অপরিহার্য হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

‘‘যদি তোমরা শোকরিয়া আদায় কর অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দিব। ’’ [সূরা ইবরাহীম-৭]

রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, ‘‘মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজক, কেননা তার সকল ব্যাপারই উত্তম ও কল্যাণ কর। আর এটা শুধু মুমিনের জন্য অন্য কারো জন্য নয়। যখন কোন সমেত্মাষজনক বিষয় তাকে পেয়ে বসে তখন সে শুকরিয়া আদায় করে থাকে আর এটা তার জন্য কল্যাণকর। আর যখন কোন অনিষ্টকর বিষয় তাকে পেয়ে বসে সে এতে ধৈর্যধারণ করে থাকে তখন তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’’ ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও এরশাদ করেন, ‘‘আল্লাহ তা’লা বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন যখন বান্দাহ কোন খানা খায় তার পর আল্লাহর প্রশংসা করে এবং কোন পানীয় পান করে এতে আল্লাহর প্রশংসা করে’’ ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

সপ্তম মূলনীতিঃ আর এ মূলনীতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্মপূর্ণ ও আকর্ষণীয় তা হচ্ছে আল্লাহ তা’লার সামনে পরিপূর্ণ রূপে অক্ষমতা ও অন্তরের আকুতি তুলে ধরা আর আল্লাহর মহত্বের সামনে কথা, তাজ, অন্তর ও তনু মনে ভীতবিহবল হেয় বিনয়াবনত হওয়া। আল্লাহ তা’লা বলেন,

 قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ

‘‘মুমিনগণ সফলকাম হয়েছে যারা তাদের নামাযের মধ্যে ভীতবিহবল।’’ [ সূরা আল মুমিনুন -১,২]

আল্লাহ তা’লা তাঁর উত্তম বান্দাহদের সম্পর্কে বলেন,

  وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا ۖ وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ

‘‘নিশ্চয়ই তারা ভাল কাজসমূহের প্রতিযোগিতা করে এবং আমাদের আহবান করে আবেগ আপ্লুতভাবে ভীতবিহবল হয়ে। ’’ [সূরা আল আম্বিয়া-৯০]

অষ্টম মূলনীতিঃ আল্লাহ তা’লা দুনিয়ার আকাশে অবতরনের সময়ের প্রতি অপেক্ষা করা তারঁ মুনাজাত করার জন্য তাঁর কালাম তেলাওয়াত ও ইবাদতের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করার নিমিত্তে। আল্লাহ তা’লা তাঁর মনোনিত একদল মানুষ সম্পর্ক বলেন,

 تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ

‘‘বিছানা থেকে তাদের পাশ্বদেশ দূরে সরে যায় তারা ভীত বিহবল ও আশাবাদের সাথে তাদের প্রতিপালককে ডাকতে থাকে আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা হতে তারা ব্যয় করে থাকে।’’ [সূরা আস সাজদা-১৬]

মূলত রাত্রের এ দলই হচ্ছে আল্লাহর ভালবাসার আহাল বা প্রকৃত অধিকারী। আল্লাহ তা’লার সামনে রাত্র জাগরণই মূলত তাঁর ভালবাসা লাভের সকল উপায় ও মাধ্যম তাদের জন্য একত্রিত করে দেয়। এ কারণেই আসমানের আমানতদার জিবরীল (আ) পৃথিবীর আমানতদার মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে কথা বলা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, ‘‘হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জেনে রাখুন মুমীনের মর্যাদা হচ্ছে তার রাত্র জাগরনের মাঝে আর তার সম্মান ও পরাক্রম হচ্ছে অন্য মানুষের কাছ হতে অমুখাপেক্ষিতার মাঝে’’- সহীহ হাদিস।

হাসান বসরি (র:) বলেন, ‘‘রাত্রে নামাযের চেয়ে কোন ইবাদতকে আমি অধিক গুরত্মপূর্ণ পাইনি।’’ তাকে জিজ্ঞেস করা হল তাহাজ্জুদ গুজার লোকদের কি অবস্থা? কেন মানুষের মাঝে তাদের চেহারা এত উজ্জল হয়ে উঠে? তিনি উত্তর দিলেন, কেননা তারা দয়াময় রহমানের সাথে নির্জনতা লাভ করে ফলে তিনি তাদেরকে তাঁর নূল থেকে উজ্জ্বল্য দিয়ে থাকেন।

নবম মূলনীতিঃ সৎকর্মশীলদের প্রতি ভালবাসা, তাদের সাথে উঠা বসা ও তাদের নৈকট্য লাভ করা। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, ‘‘আল্লাহ তা’লা বলেছেন, ‘‘আমরা ভালবাসা তাদের জন্য ওয়াজিব হয়ে গেছে যারা পরস্পর আমার উদ্দেশ্যে ভালবাসে, উঠাবসা করে ও সাক্ষাৎ করে’’। শাইখ আলবানী হাদিসটি সহীহ বলেছেন।

রাসূল আরও এরশাদ করেন ‘‘ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল হচ্ছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঘৃণা করা’’। সহীহ হাদীস।

দশম মূলনীতিঃ ঐ সব কাজ হতে দূরে সরে থাকা যা মহিয়ান গরীয়ান আল্লাহ তাআলা ও মানুষের অন্তরের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। আর এটা সম্ভব হবে সকল প্রকার পাপাচার , হারাম ও ধ্বংসকারী বিষয় হতে নিজেকে দূরে সরে রাখার মাধ্যমে। কেননা যখন অন্তর বিপর্যস্ত ও বিনষ্ট হয়ে যায় তখন দুনিয়ার কোন জিনিসের মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার ফায়দা লাভ করতে সক্ষম হয় না। এর এ অন্তরের মাধ্যমে সে আখেরাতের জন্য কোন উপার্জন করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,

 يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

‘‘যে দিন কোন সম্পদ এবং সন্তান সন্ততি উপকার দিবে না সে ব্যক্তি ব্যতীত যে নিরাপদ আত্মা নিয়ে আল্লাহর কাছে এসেছে’’। [সূরা আশ শোআরা, আয়াত নং৮৯-৮৯]

হে মুসলমানগণ! বান্দাহ আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া এক বিশাল ও মহান মর্যাদার স্তর, এটা হচ্ছে মূলত আল্লাহর মহা অনুগ্রহ ও চিরস্থায়ী সফলতা এবং পবিত্র ও উত্তম জীবন লাভ। সুতরাং নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রর্দশিত সকল পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে এ ভালোবাসা পাওয়ার প্রচেষ্টা করা সকলের কর্তব্য। এর মোদ্দা কথা হচ্ছে সঠিক ঈমানের বাস্তবায়ন ও আল্লাহ ভীত অর্জন করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

 أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

‘‘সাবধান! নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওলীগণের কোন ভয় নাই, আর তারা দুশ্চিন্তাও করবে না। [সূরা ইউনুস-৬২]

সর্বশেষ জেনে রাখো আল্লাহর ভালোবাসা দাবী হচ্ছে নবী মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পেশকরা। সুতরাং রহমতের নবী, হেদায়াতের ঈমামের উপর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পেশ করতে অভ্যস্ত হও।

মতামত দিন