সালাম (سَّلاَمُ) সম্পর্কে আল্লাহর বিধান

রচনায়: সাজ্জাদ সালাদীন

ইদানিংকালে মুসলিমদের ভিতরে বিজাতীয় প্রথা অনুসরন হতে দেখা যাচ্ছে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাই বলেছেন, যে কাওম যে কাওমের অনুসরন করবে সে ওই কাওমে পরিণত হবে। উক্তিটি আসলেই বাস্তব আর প্রমানিত। এই কারনেই আজকাল মুসলিমদের ভিতরে সালাম প্রথা একদম উঠে গেছে বললেই ভুল হবে না। আর মুসলিমদের ভিতরে সালাম প্রদানে বিজাতীয় পদ্ধতি পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বাধিক। কিন্তু ইসলামী পদ্ধতিতে সালাম প্রদানে ছোট বড় সবাইকে সালাম দেয়া সুন্নাত। অথচ আজ পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত মানুষ মানুষকে ‘হাই বা Hi’ বলে অভিহিত করছেন এবং নিজেকে অনেক বড় ব্যক্তিত্ব বলে মনে করছেন কিন্তু কেন? অথচ সালামের প্রদানের মাধ্যমে যে সওয়াব রয়েছে তা আমরা ভুলে গেছি বললেই চলে।

তবে অমুসলিমদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। তাদের বিষয়ে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর হাদীস রয়েছে।

অমুসলিমদের ক্ষেত্রে সালাম প্রদানের হাদীসগুলো নিম্নরূপঃ

মুসাদ্দাদ (রহঃ) ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، عَنْ سُفْيَانَ، وَمَالِكِ بْنِ أَنَسٍ، قَالاَ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ دِينَارٍ، قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِنَّ الْيَهُودَ إِذَا سَلَّمُوا عَلَى أَحَدِكُمْ إِنَّمَا يَقُولُونَ سَامٌ عَلَيْكَ. فَقُلْ عَلَيْكَ “.

ইহুদীরা যখন তোমাদের কাউকে সালাম করে তারা কিন্তু ‘সামু আলাইকুম’ বলে। তাই তোমরা বলবে, আলাইকা — তোমার উপর। তিনি অন্যত্র বলেনঃ মুহাম্মদ ইবন মুকাতিল আবুল হাসান (রহঃ) … আনাস ইবন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مُقَاتِلٍ أَبُو الْحَسَنِ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، عَنْ هِشَامِ بْنِ زَيْدِ بْنِ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، يَقُولُ مَرَّ يَهُودِيٌّ بِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ السَّامُ عَلَيْكَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” وَعَلَيْكَ “. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” أَتَدْرُونَ مَا يَقُولُ قَالَ السَّامُ عَلَيْكَ “. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلاَ نَقْتُلُهُ قَالَ ” لاَ، إِذَا سَلَّمَ عَلَيْكُمْ أَهْلُ الْكِتَابِ فَقُولُوا وَعَلَيْكُمْ “.

জনৈক ইহুদী রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করল। আর বলল, আসসামু আলাইকা। তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ বললেন, ওয়া আলাইকা। এরপর রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের বললেন, তোমরা কি বুঝতে পেরেছ সে কি বলেছে? সে বলেছে, ‘আসসামু আলাইকা’ (তোমার মৃত্যু হোক)। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাকে হত্যা করব না? তিনি বললেন, না। বরং যখন কোন আহলে কিতাব তোমাদেরকে সালাম করবে তখন তোমরা বলবে, ‘ওয়া আলাইকুম’ (তোমাদের উপরও)।

রাসূল (সাঃ) আরও বলেনঃ আবূ নু’আয়ম (র) আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، عَنِ ابْنِ عُيَيْنَةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ قَالَتِ اسْتَأْذَنَ رَهْطٌ مِنَ الْيَهُودِ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالُوا السَّامُ عَلَيْكَ. فَقُلْتُ بَلْ عَلَيْكُمُ السَّامُ وَاللَّعْنَةُ. فَقَالَ ” يَا عَائِشَةُ إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الأَمْرِ كُلِّهِ “. قُلْتُ أَوَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالُوا قَالَ ” قُلْتُ وَعَلَيْكُمْ “.

একদল ইহুদী নবী – এর দরবারে প্রবেশের অনুমতি চাইল (প্রবেশ করতে গিয়ে) তারা বলল ‘আসসামু আলাইকা’ (তোমার মৃত্যু হোক)। তখন আমি বললাম, বরং তোদের উপর মৃত্যু ও লানত পতিত হোক। নবী বললেন, হে আয়েশা! আল্লাহ কোমল। তিনি সকল কাজে কোমলতা পছন্দ করেন। আমি বললাম, আপনি কি শুনেননি তারা কি বলেছে? তিনি বললেন, আমিও তো বলেছি ‘ওয়া আলাইকুম’ (তোমাদের উপরও)।

তাই আসুন, কুরআন ও হাদীস এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে কি বলে তা জেনে নেই।

সালাম (سَّلاَمُ) এর শাব্দিক বিশ্লেষণ

سَلاَمٌ (সালামুন) শব্দটি فَعَالٌ -এর ওযনে বাবে تفغيل -এর مصدر (ক্রিয়ামূল)। এর আভিধানিক অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। তাই اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ (আস-সালা-মু আলাইকুম) অর্থ হ’ল আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। পরিভাষায় একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের সময় যে বাক্য দ্বারা একে অপরের সাথে ভালবাসা-বন্ধুত্ব, শান্তি-নিরাপত্তা, কল্যাণ ও দো‘আ কামনা করে তারই নাম সালাম।

সালাম প্রচলনের ইতিকথা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই একে অপরের সাথে দেখা- সাক্ষাতের সময় পরস্পর ভাব বিনিময়ের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন জাতি নিজেদের সভ্যতা-সংস্কৃতি, আদর্শ ও রুচি অনুযায়ী বিভিন্ন শব্দ ও বাক্য বেছে নিয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় পরস্পরের দেখা-সাক্ষাতে আদাব, নমস্কার, নমঃনমঃ ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। ইউরোপ ও আমেরিকার খৃষ্টান সম্প্রদায় Good Morning, Good Afternoon, Good Evening, Good Night বলে একে অপরকে সম্ভাষণ জানিয়ে থাকে। তেমনি Good Bye, Ta Ta বলে বিদায় জানাতে দেখা যায়।

প্রাক ইসলামী যুগে আরব সমাজে اَنْعَمَ اللهُ بِكَ عَيْنًا (আন‘আমাল্লাহু বিকা আইনান) অর্থাৎ আপনার দ্বারা আল্লাহ আপনার প্রিয়জনদের চক্ষু শীতল করুন এবং اَنْعِمْ صَبَاحًا (আনয়ামা ছবাহান) অর্থাৎ আপনার প্রত্যুষ সুন্দর-সমৃদ্ধ হোক বা শুপ্রভাত ইত্যাদি শব্দের প্রচলন ছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের পর বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) প্রাক ইসলামী যুগে ব্যবহৃত শব্দগুলো পরিহার করে পরস্পরকে اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ (আস-সালা-মু আলাইকুম) বলে অভিবাদন জানাতে নির্দেশ দেন। (তথ্যসূত্রঃ আবুদাঊদ, মিশকাত ৪৪৪৯/২৭)।

সালামের অপব্যবহার ও বিকৃত উচ্চারণ

আল্লাহ তা‘আলা যে সালাম আদম (আঃ)-কে শিখিয়েছিলেন এবং আদম (আঃ) থেকে যে সালাম এখন পর্যন্ত চলছে এবং ক্বিয়ামতের আগ পর্যন্ত চলবে; আর আমাদেরকে নবী (ছাঃ) যে সালাম প্রতিষ্ঠা করে একে দো‘আ, সম্ভাষণ, সংস্কৃতি হিসাবে চালু করে দিয়েছেন, সে সালামের অপব্যবহার ও বিকৃত উচ্চারণ আজকের মুসলিম সমাজে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর কতিপয় নমুনা নিম্নে পেশ করা হ’ল:–

১। অফিসের বড় সাহেব তার পিয়নকে বললেন, শহীদ সাহেবকে আমার সালাম দাও। অর্থাৎ এ সালামের মানে হ’ল শহীদ সাহেব যেন তার সাথে দেখা করে। এখানে সালামকে তারা অফিসিয়াল কোড ওয়ার্ড হিসাবে ব্যবহার করেন।

২। মুদি দোকানদার তার এক কর্মচারীকে দিয়ে মহ’ললার এক বাসার গৃহকর্তার কাছে সালাম পাঠায়। মুদি দোকানদার এ সালাম পাঠায় বাসার কর্তার কাছে পাওনা তাগাদার জন্য। এ সালাম পাওনা তাগাদার সালাম।

৩। এক ভদ্রলোক তার পড়শীকে নিজের ছেলে পাঠিয়ে সালাম জানালেন। তার মানে পড়শীর কাছে পূর্বে টাকা ধার চেয়েছিলেন। ছেলেকে দিয়ে সালাম পাঠিয়ে তা স্মরণ করিয়ে দিলেন। সালাম পেয়েই যেন ছেলের হাতে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেন।

৪। দু’জনের মধ্যে কোন এক ব্যাপারে প্রচন্ড বিতর্ক চলছে। বিতর্কের শেষ পর্যায়ে একজন অপরজনকে বললেন, খুব হয়েছে ভাই, এবার সালাম! সালাম দিয়ে বিতর্ক থেকে কেটে পড়া মানে তিনি আর তর্ক করতে রাযী নন।

৫। ঈদের দিন শিশুরা স্বজনদের বাসায় বাসায় গিয়ে, মুরুববীদের সালাম দেয় সালামীর জন্য। প্রকৃত পক্ষে তারা এ দিনে সালাম দিয়ে সালামী বা টাকা কুড়াতে আসে। মূল উদ্দেশ্য সালাম দিতে আসা নয়। একে বিনোদনী আদুরে ভিক্ষা বলা যায়।

৬। অফিসে এসে বড় ছাহেবকে সালাম দেওয়ার অভ্যাস আছে অনেকের। কোন না কোন অসীলায় তারা দেখা করবেনই এবং একটা সালাম দেবেনই। এখানে বড় ছাহেবকে সালাম দেওয়া মানে বড় ছাহেবের নযরে আসা, আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করা।

আসলে সালামকে এসব উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইসলামী সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বরং এ সালামকে শুধুমাত্র আমাদের পারস্পরিক দো‘আ ও আশির্বাদ হিসাবে দান করা হয়েছে।

সুতরাং সালামকে আসল উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা ইসলামী সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গ করার শামিল। শুধু সালামের অপব্যবহারই নয়, আজকে আমাদের মুসলিম সমাজে সালামের বিকৃত উচ্চারণ লক্ষ্য করা যায়। কলকাতার ‘সংসদ বাঙ্গালা অভিধান সালামকে বিকৃত করে ফেলেছে। তারা সালামের শুদ্ধ বানান লিখেছে ‘সেলাম’। সালাম-এর ব্যাখ্যায় লিখেছে ‘সালাম’ হচ্ছে ‘সেলাম-এর রূপভেদ’। তাদের মতে ‘আস-সালা-মু আলাইকুম’-এর শুদ্ধ বানান হচ্ছে ‘সেলাম আলায়কুম’ যার অর্থ (লেখা হয়েছে) ‘নমস্কার’।

আজকের যুবকরা বিভিন্ন স্টাইলে সালাম প্রদান করে থাকে। যেমন- (১) সেলামালিকুম (২) শ্লামালিকুম (৩) আসসালামালিকুম (৪) আস্লামালিকুম (৫) সালামালিকুম। সালামের এই বিকৃত রূপ এখন প্রকৃত হ’তে যাচ্ছে। আগামীতে এই ‘সালাম’ আরও কত বিকৃত হবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। এজন্য আমরাই দায়ী। বিকৃত আর অপব্যবহার যে আমরাই করছি তাতে কোন সন্দেহ নেই। আসুন! আমরা সালামের অপব্যবহার ও বিকৃত উচ্চারণ থেকে বিরত হই।

সালাম আল্লাহ কর্তৃক প্রবর্তিত একটি বিধান

সালামের এই বিধান মহান আল্লাহ স্বয়ং প্রবর্তন করেছেন। এ মর্মে নিম্নোক্ত হাদীছটি প্রানিধাণযোগ্য।

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىُ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَلَقَ اللهُ آدَمَ عَلَى صُوْرَتِهِ طُوْلُهُ سِتُّوْنَ ذِرَاعًا فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ اِذْهَبْ فََسَلِّْمْ عَلَى أُوْلَئِكَ النَّفِرَ وَهُمْ نَفَرٌ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ جُلُوْسٌ، فَاُسْتَمِعْ مَا يُحَيُّوُْنَكَ فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَتِكَ، فَذَهَبَ فَقَالَ اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ، فَقَالُوْا السَّلاَمُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللهِ، قَالَ فَزَادُوْهُ وَرَحْمَةُ اللهِ،

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে তার আকৃতিতেই সৃষ্টি করেছেন। তার উচ্চতা ছিল ষাট হাত। আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করে বললেন, যাও অবস্থানরত ফেরেশতাদের ঐ দলকে সালাম কর। আর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর, তোমার দেওয়া সালামের জবাবে তারা কী বলে। কেননা এটিই হবে তোমার ও তোমার সন্তানদের অভিবাদনের পদ্ধতি। অতঃপর আদম (আঃ) সেখানে গিয়ে اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ বললেন। জবাবে ফেরেশতাগণ বললেন, اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللهِ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তারা وَرَحْمَةُ اللهِ অংশটি বৃদ্ধি করে বলেছেন’। (তথ্যসূত্রঃ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৬২৮)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, اَفْشُوْا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ ‘তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচলন ঘটাও’। (তথ্যসূত্রঃ মুসলিম, মিশকাত হা/৪৪৩১)।
নবী করীম (ছাঃ) শুধু নির্দেশই দেননি বরং নিজেও বাস্তব জীবনে এর উপর আমল করে উম্মতের সামনে এক অনুস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি সবাইকে আগেই সালাম দিতেন। তিনি এমন একজন বিশ্বনেতা ছিলেন, যার কথা ও কর্মে ছিল অপূর্ব মিল। তাই আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার মানুষকে লক্ষ্য করে বলেন, لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيْ رَسُوْلِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ ‘রাসূলুল্লাহ-এর জীবনাচরণেই রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ’ (সূরা আহযাব, আয়াত নং – ২১)।

সালামের গুরুত্ব ও ফযীলত

এক মুসলমান আর এক মুসলমানের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হলে সালাম দিবে এবং অপরজন তার উত্তর দিবে। এ নিয়ম যে কত সুন্দর নিয়ম তা ব্যাখ্যা করে শেষ করা যাবে না। সালামের মধ্যে শান্তির দু’আ করা হয়। আস্সালামু আলাইকুম – এর অর্থ হল আপনাদের শান্তি হোক, আল্লাহ আপনাদেরকে শান্তি দান করুন, রহমত দান করুন। সালামের মাধ্যমে শান্তির দুআ করা হয়। এর চেয়ে ভাল দুআ আর কি হতে পারে? শান্তির চেয়ে বড় কিছু মানুষের কাম্য নেই। আমরা সবকিছুতে শান্তি চাই, জীবনের সব ক্ষেত্রে চাই। দুনিয়াতেও চাই, আখেরাতেও চাই। প্রত্যেকটা পদে পদে শান্তি চাই। সালামের মধ্যে এরই দুআ করা হয়। তাই এর চেয়ে উত্তম দুআ আর হতে পারে না। কোন মুসলমান যখন সালামের অর্থ বুঝে অন্তর থেকে সালাম দিবেন, আর যিনি সালাম গ্রহণ করবেন তিনি অর্থ বুঝে সালাম গ্রহণ করবেন, তখন উভয়ের মধ্যে মহব্বত সৃষ্টি হবে।

যিনি সালাম গ্রহণ করবেন তিনি বুঝবেন যে, ইনি আমার কত কল্যাণকামী, আমার জন্য শান্তি কামনা করছেন! তখন সালামের উত্তর দেয়ার সময় তার মুখ থেকে আবেগের সাথে, যত্নের সাথে সালামের উত্তর বের হয়ে আসবে। যিনি সালাম দিবেন তিনিও বুঝবেন যে, আমি তার জন্য দুআ করছি। তার মুখ থেকেও আবেগের সাথে ও যত্নের সাথে সাথে সালাম বের হবে। আমরা যারা সালাম দেই, বুঝে দেই না, এজন্য সালাম বলার মধ্যে কোন আবেগ থাকে না, সালাম উচ্চারণের মধ্যেও কোন যত্ন থাকে না। আবার যারা সালাম নেই তারাও বুঝে নেই না, এজন্য সালামের জওয়াব দেয়ার মধ্যে কোন আবেগ, কোন যত্ন থাকে না। তাই সালাম দেয়ার সময়ও সহীহ শুদ্ধ করে সুন্দরভাবে দেয়া হয় না, জওয়াবটাও সহীহ শুদ্ধ করে সুন্দরভাবে দেয়া হয় না। তাই রাসূল (সাঃ) এর একটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য। আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أن رجلاً سأل رسول الله أي الإسلام خير؟ قال: «تطعم الطعام، وتقرأ السلام على من عرفت ومن لم تعرف» متفق عليه.

“এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামে কোন আমলটি সর্ব উত্তম? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বললেন, মানুষকে খানা খাওয়ানো এবং তুমি যাকে চিনো আর যাকে চিনো না সবাইকে সালাম দেয়া”। [বুখারী ও মুসলিম]

সালামের ফযীলত

সালামের ফযীলত নিম্নে সালামের বিশেষ কয়েকটি ফযীলত বর্ণনা করা হলঃ

সালাম একটি উত্তম আমল

ইসলামে সালাম একটি উত্তম আমল হিসেবে পরিগণিত। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে – হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিআল্লাহু আনহু বলেন যে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল ইসলামের কোন আমল উত্তম? তিনি বললেন – (অভুক্তকে) খানা খাওয়ানো এবং পরিচিত অপরিচিত নির্বিশেষে সকলকে সালাম করা। (বুখারী শরীফ)।

সালামে কমপক্ষে দশ নেকীঃ

সালামের আর একটি বিশেষ ফযীলত হল – সালাম দ্বারা কমপক্ষে দশটি নেকী পাওয়া যায়। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে – হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, একদা এক ব্যাক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল এবং বলল, আস্সালামু আলাইকুম। তিনি তার সালামের জবাব দিলেন।

অতঃপর সে বসে পড়ল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, (এ লোকটির জন্য) দশ নেকী (লেখা হয়েছে)। তারপর আরেক ব্যক্তি আসল এবং বলল, আস্ সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। তিনি তার সালামের জবাব দিলেন। অতঃপর সে বসে পড়ল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ লোকটির জন্য বিশ নেকী লেখা হয়েছে।

তারপর আর এক ব্যক্তি আসল এবং বলল, আস সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। তিনি তার সালামের জবাব দিলেন। অতঃপর সে বসে পড়ল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ লোকটির জন্য ত্রিশ নেকী লেখা হয়েছে। (তিরমিযী ও আবূ দাউদ)।

সালাম পারস্পারিক মুহাব্বত বৃদ্ধি ও জান্নাত লাভের ‍উপায়:

সালামের আরেকটি বিশেষ ফযীলত হল – সালাম দ্বারা পারস্পরিক মুহাব্বত-ভালবাসা বৃদ্ধি পায়
এবং এটা জান্নাত লাভের ওছীলা হয়। হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে – হযরত আবূ হুরায়রা বলেন যে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা ঈমানদার গণ্য হবে না, যতক্ষণ না তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কথা বলব না যা করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে? অবশ্যই বলব, আর তা হল – তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রচলন ঘটাবে। (তিরমিযী)।

হাদীসের ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে সালামের বিস্তার ঘটাতে তথা সালামের ব্যাপক প্রচলন ঘটাতে বলা হয়েছে। বেশী বেশী সালাম দিলেই সালামের বিস্তার ঘটবে তথা সালামের ব্যাপক প্রচলন ঘটবে। অতএব এ হাদীসে বেশী করে সালাম দিতে বলা হয়েছে।

সালামের মাধ্যমে আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য অর্জিত হয় :

সালামের আরেকটি ফযীলত হল – সালামের দ্বারা আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভ হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে – হযরত আবূ উমামা রাযিআল্লাহু আনহু বলেন যে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ সেই ব্যক্তিই আল্লাহ্ তায়ালার নিকট অধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত যে প্রথমে সালাম করে। (তিরমিযী ও আবূ দাউদ)।

হাদীসের ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে বুঝানো হয়েছে যদি উভয়ে অবস্থানগতভাবে সমান থাকে, তাহলে অগ্রে সালাম প্রদানকরীর এই ফযীলত। অর্থাৎ উভয়ে আরোহী বা উভয়ে পথচারী। অন্যথায় আরোহী পথচারীকে সালাম করবে, আগমনকারী অবস্থানকারীকে সালাম করবে ইত্যাদি।

সালাম দ্বারা বরকত অর্জিত হয়

সালামের একটি ফযীলত হল – সালাম দ্বারা নিজের ও নিজের পরিবারের জিন্দেগীতে বরকত অর্জিত হয়। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে – হযরত আনাস রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বলেছেনঃ হে বৎস ! যখন তুমি (ঘরে) পরিজনের কাছে যাবে তখন সালাম দিবে। এতে তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে। (তিরমিযী)।

সালামের ফযীলত সম্পর্কিত এই দীর্ঘ আলোচনার সারকথা হল –

সালামের বিশেষ ফযীলত ছয়টি। যথা –
. সালাম একটি উত্তম আমল।
. সালামে কমপক্ষে দশ নেকী।
. সালাম দ্বারা পারস্পরিক মহব্বত বৃদ্ধি পায়।
. সালাম জান্নাত লাভের উপায়।
. সালাম দ্বারা আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভ হয়।
. সালাম দ্বারা বরকত অর্জিত হয়।

মতামত দিন