ইসলামের ইতিহাস

বাংলাদেশে ইসলামঃ আগমন ও প্রতিষ্ঠা

-মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াকীল *

ভূমিকাঃ

ইসলাম হল শান্তির ধর্ম এবং সত্যনিষ্ঠ, বাস্তবসম্মত ও শাশ্বত জীবন ব্যবস্থা । ভৌগলিক সংকীর্ণতা ও জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা ছিন্ন করে সার্বজনীন জীবনাদর্শ । এর আদর্শের অমৃত সুধা পান করে সকলেই হোক উজ্জীবিত । একত্ববাদের সার্বভৌমত্বে অকপট বিশ্বাসী হয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রদর্শিত পথের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে সকলেই হৌক কৃতার্থ, দো-জাহানের অশেষ কল্যাণের অধিকারী, এটাই ইসলামের কাম্য । সহিংসতা ও জিঘাংসা পরিহার করে ভ্রাতৃত্ব, মানবতা ধর্মই হল ইসলাম । বিত্তহীনের পর্ণটি পর্যন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত সুমহান ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হৌক সেই লক্ষ্যেই মহানবী (ছাঃ)-এর শাশ্বত বাণী-

‘পৌছে দাও, আমার পক্ষ হতে । যদি (আমার) একটি বাণীও জানো’।

বিশ্বনবী (ছাঃ)-এর এই উদাত্ত আহ্বানে তাঁর ছাহাবায়ে কেরাম ও তৎপরবর্তী তাবেঈগণ ইসলামের মশাল হাতে প্রাচ্য হতে প্রতীচ্য, উদীচী থেকে অবাচী দিগ্বিদিক ছুটে চলেছিলেন জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিষা দূড় করতে । আর এই মিশন থেকে পাক-ভারত উপমহাদেশে বঙ্গোপসাগর বিধৌৎ সবুজ-শ্যামল ব-দ্বীপটিও বাদ পড়েনি; বরং ইসলামের সূচনালগ্নেই এর সুমহান আদর্শ এখানে পৌছে যায় ।

বেসামরিকভাবে বাণিজ্যিক পথ পরিক্রমায় আগমনঃ

আধুনিক শিক্ষিত ও অনেক পন্ডিতগণ সামরিকভাবে ইসলামের আগমনের সাথে পরিচিত হলেও তারা এটা জানেন না বেসামরিকভাবে বাণিজ্যের কাফেলার মাধ্যমে আরব বণিকগণের প্রচেষ্টায় ইসলামের আগমন ঘটেছিল ।

এক্ষেত্রে আমরা উল্লেখ করতে পারি, ইসলাম সর্বপ্রথম আরব বণিকগণের মাধ্যমেই এসেছিল । সেই সময়ে ইন্দোনেশিয়া মশলা কেন্দ্র মালাককা, সুমাত্রা, জাভা এইসব স্থানে আরব বণিকগণের যাতায়াত ছিল খুব বেশী । আর বণিকগণ যাত্রার প্রাক্কালে মাঝে মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরেও আসতেন । ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা । বিধায় এর দা‘ওয়াত দেওয়া মুসলমানগণ ফরয হিসেবেই গণ্য করেন । বণিকগণও তাই যাত্রা বিরতির প্রাক্কালে দা‘ওয়াত ও তাবলীগের কাজ যথাযথভাবে আঞ্জাম দিতেন । এইভাবে তাঁরা দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয় করতেন । অনেকে স্থায়ীভাবে বসবাস, বন্ধুত্ব এবং বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ ও আত্নীয়তার বন্ধনে সম্পৃক্ত হয়ে এই দেশে ইসলামের বুনিয়াদ তৈরি করেছিলেন । সেই ক্ষেত্রে ‘চট্টগ্রাম’ হল বাংলাদেশের ‘দারুল ইসলাম’ বা ইসলামের দ্বার ।

বিশ্বনবী (ছাঃ)-এর সময়েই ছাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে ইসলামের দা‘ওয়াত বাংলাদেশে পৌঁছেছিল । তার প্রমাণ স্বরূপ ‘মুস্তাদরাকে হাকেম’ হাদীছ গ্রন্থে (৪/১৩৫ পৃঃ) সংকলিত বর্ণনা মতে- বাংলার শাসক রাহমী বংশের রাজা শেষ নবীর আগমনের সংবাদে খুশী হয়ে আরব বণিকগণের মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে এক কলসি আসা উপঢৌকন হিসাবে পাঠিয়েছিলেন । রাসূল (ছাঃ) তা সনন্দে গ্রহন করতঃ নিজে খেয়েছিলেন ও তা টুকরো করে ছাহাবায়ে কেরামের মাঝে বন্টন করে দিয়েছিলেন ।

এ থেকে অনুধাবন করা যায় যে, রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনদ্দশাতে ইসলাম বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিল । মহানবী (ছাঃ)-এর তিরোধানের পর ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের যুগে বণিকগণের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে ।তাদের আদর্শ ও চরিত্র অনেককে ইসলাম গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেছে । আরব বণিকগণের তাবলীগে দ্বীনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অঞ্চলে ইসলামের অনুসারী ও সমর্থক বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে মুসলিম রাজ কায়েমের ক্ষেত্র তৈরি ও পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে ।

ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের মাধ্যমে ইসলামঃ

ভারত উপমহাদেশে ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে ইযামের মাধ্যমে ইসলামের আগমন ঘটে । যারা শুধুই দ্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে এই উপমহাদেশে আসেন ভারতবর্ষে ১৮ জন মতান্তরে ২৫ জন ছাহাবীসহ উমাইয়া খিলাফতের শেষ পর্যন্ত ২৪৫ জন তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈর শুভাগমন ঘটে । যদিও উল্লেখিত সংখ্যার ছাহাবায়ে কেরাম এবং তাবে ও তাবেঈ-তাবেঈনে ইযাম বর্তমান ভৌগলিক সীমার পাকিস্তান ও ভারতে এসেছিলেন; কিন্তু ঐতিহাসিক সূত্রে এই কথা প্রমাণীত এবং নিরীক্ষিত যে, কয়েকজন ছাহাবা ও বেশ কিছু তাবেঈন বা তাবে-তাবেঈনে ইযাম ইশা‘আতে দ্বীনের জন্য বাংলাদেশ অঞ্চলেও শুভাগমন করেন । তাঁদের দা‘ওয়াতী কার্যক্রম, চারিত্রিক মাধুর্য ও বৈশিষ্ট্য এবং অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশেও ইসলামের সোনালী আলোকচ্ছটায় নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয় ।

বিশেষতঃ তাবেঈ বা তাবে-তাবেঈনের যুগে ইসলামের আদর্শ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যাপকভাবে না হলেও মোটামুটি যে প্রচার লাভ করেছিল এবং বৌদ্ধ ও হিন্দু সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলিতে ইসলাম পৌঁছেছিল তা ধ্রুবসত্য । এই ক্ষেত্রে প্রমাণ সরূপ বলা যায়, জয়পুরহাটের পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে খলীফা হারূনুর রশীদের আমলের (১৭০-১৯৩ হিঃ) ১৭২ হিজরীতে মুদ্রিত প্রাচীন আরবী মুদ্রার প্রাপ্তি ।

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে, সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক বিজয়ের ছয় শতাব্দী পূর্ব হতেই ইসলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈনে ইযামের বাণিজ্যিক কাফেলার মাধ্যমে কিংবা তাবলীগে দ্বীনের জন্য তাঁদের আগমনে আবির্ভূত হয় । শতাব্দী শুধু নয় সহস্রাব্দের অধিক সময় পূর্ব হতে ইসলামী শিক্ষা-সভ্যতার ঐতিহ্যমন্ডিত সাংস্কৃতিক ইতিহাস সৃষ্টি হয় ও সমৃদ্ধি লাভ করে ।

রাজনৈতিক বিজয়ের পূর্বে ইসলামঃ

স্বর্ণযুগের পরেও রাজনৈতিক বিজয় ও সামরিক অভিযানের পূর্বে ইসলাম ছূফী-সাধক ও ‘উলামায়ে দ্বীন এবং মুজাদ্দিদগণের মাধ্যমে প্রচারিত হয় । অনেক রাজা-বাদশাহ ও জন সাধারণে তাঁদের প্রচেষ্টায় দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন । উল্লেখ্য যে ‘কোচ রাজার আমলে ১০৫৩ খৃষ্টাব্দে শাহ মুহাম্মাদ সুলতান রূমী ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা যেলার মদনপুরে আগমন করেন ও রাজাসহ স্থানীয় সকলে ইসলাম গ্রহন করেন । ১১১৯ খৃষ্টাব্দের দিকে রাজা বল্লাল সেনের আমলে ঢাকার বিক্রমপুর এলাকায় ‘বাবা আদম’ নামে একজন ধর্ম প্রচারক আসেন এবং অনুচরবৃন্দসহ বল্লাল সেনের হাতে নিহত হন । মূর্তিনাশক শাহ নে‘মাতুল্লাহ প্রচার করেন ।লক্ষণ সেনের রাজত্বের শেষ দিকে জালালুদ্দীন তাবরিযী বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন ।

উল্লেখিত আলোচনা সমূহের প্রেক্ষিতে এই কথা প্রতীয়মান হয় যে, উচ্চবর্ণ হিন্দুদের দাম্ভিকতা বা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে অসংখ্য সাধারণ ও নিরীহ মানুষ ইসলামকে একমাত্র শান্তির নীড় এবং মুক্তির পথ হিসাবে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে দলে দলে তাওহীদের দা‘ওয়াত গ্রহন করে । এতদ্ব্যতীত বগুড়ার মহাস্থানের শাহ সুলতান মাহিসাওয়ার এবং পাবনার শাহজাদপুরের মখদুম শাহ দৌল শহীদ বখতিয়ারের পূর্বে এসেছিলেন । ছূফীদের বিষয়টি নিয়ে আব্দুল করীম লিখিত History of the Muslims of Bengal এর ৮৬ পৃষ্ঠায় আলোকপাত হয়েছে । আমরা সেদিকে যেতে চাইনা । এতদ্ব্যতীত অনেকে মনে করেন দশম শতাব্দীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুসলিম রাজ্য ছিল । অবশ্য রাজ্যের কথা ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ (নওরোজ কিতাবিস্তান ৫, বাংলা বাজার, ঢাকা) গ্রন্থের প্রণেতাগণ স্বীকার করেননি ।

আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সামরিক অভিযানে বহু পূর্ব হতে বিশেষতঃ রাজনৈতিক বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান হয়েছিল । যদিও বাংলাদেশের বৃহদাংশ বখতিয়ারের রাজ্যের বাইরে ছিল কিন্তু এই কথা দিবালোকের মত স্বচ্ছ যে, একটি রাজ্য বিন প্রতিরোধে জয় করার পেছনে অবশ্যই কিছু কারণ নিহিত রয়েছে । আশানুরূপ মুসলমান ও সমর্থক সামরিক অভিযানের পূর্বেই সৃষ্টি হয়েছিল বিধায় নির্বিঘ্নে বাংলা বিজয় সম্ভব হয়েছিল । শুধু পেশীশক্তি কিংবা অস্ত্র দিয়ে কোন জাতিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা যায় না; বরং বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা টিকে থাকায় এই কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাংলাদেশ সহ বাংলায় এমন একটি মুসলিম পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যখন শুধুই রাজনৈতিক বিজয় অর্জন ও ক্ষমতা গ্রহন অবশিষ্ট ছিল ।

সামরিক বিজয়ঃ

ভারতবর্ষে প্রথম সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক বিজয়ের প্রায় ৪৯২ বছর পর কুতুবুদ্দীন আইবেকের নির্দেশে তাঁর বিশ্বত সেনাপতি ইখতিয়ারুদ্দীন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজী বাংলা বিজয় করেন । বাংলা বিজয়ের সন, তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকায় সঠিক তারিখ, সন উল্লেখ করা সম্ভব নয় । তবে ১২০২/১২০৩ অথবা ১২০৪ খৃষ্টাব্দে তথা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় বিজয় অর্জন হয় । বাংলা বিজয়ের সামরিক অভিযানে বখতিয়ারের সেনাধ্যক্ষদের মধ্যে তিনজনের নাম পাওয়া যায় । তাদের মধ্যে আলী মর্দান খলজী বরসৌলের ও হুসামুদ্দীন ইওজ খলজী গঙ্গতরীর শাসঙ্কর্তা নিযুক্ত হন । অপর সেনাধ্যক্ষের নাম শীরান খলজী । ‘বরসৌল’কে দিনাজপুর যেলার অন্তর্গত ঘোড়াঘাট এলাকায় নির্দেশ করা হয় । বরসৌল-এর অধীনে বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরের বৃহত্তর অঞ্চল ছিল। ১২০৬ খৃষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজী মৃত্যুমুখে পতিত হন । প্রকৃতপক্ষে বখতিয়ারই ছিলেন বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ।

বখতিয়ার খলজীর বীরত্বে বাংলায় (বাংলাদেশের কিয়দংশ সহ) মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে ইসলাম এতদঞ্চলের মানুষের চির সাথীতে পরিণত হল । পরবর্তীতে শাসনের হাত বদল হলেও মুসলমানগণই সময়ের আবর্তন ও বিবর্তনে সমগ্র বাংলাদেশ বা বাংলা তাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করার সৌভাগ্য অর্জন করেন । ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ২৩শে জুন পলাশীর পরাজয়ের পর সমগ্র উপমহাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতে শুরু করল । সৃষ্টি হল অন্য প্রেক্ষাপটের ।

ইসলামের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাঃ

বখতিয়ার খলজী বাংলা বিজয়ের প্রাক্কালে বা তৎপরবর্তী সময়ে যে ইসলাম প্রচারিত হয় তা বহুলাংশে ইসলামী আদর্শ হতে বিচ্যুত । তুর্কী ও পারসিক এবং হিন্দুস্তানী বা অন্যান্য ধর্মের বহুবিধ কুসংস্কার দ্বারা প্রভাবিত । যার ফলে ইসলামের আদিকাল হতে সেই আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যের সাথে বাংলাদেশের মুসলমান পরিচিত ছিলেন । পরবর্তিতে ত্রয়োদশ শতাব্দী হতে রাজনৈতিক বিজয়ের পর পূর্ণাঙ্গ ইসলামের রূপ বা নীতির বিপরীতে তাঁরা কিংবা তাঁদের উত্তরসূরীগণ শিরক ও বিদা‘আতযুক্ত তথা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইসলামের সাথে পরিচিত হলেন । ছূফী ও দরবেশদের অনেকেই ভ্রান্ত নীতিতে থাকার ফলে তাঁরা মুসলমানগণকে যথাযথ শিক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হন ।

রাজনৈতিকভাবে শাসকগণ ইসলামের বিভিন্নভাবে খিদমত করলেও ইসলামের প্রকৃত আদর্শ তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি ।খলজী বংশ হতে শুরু করে স্বাধীণ সুলতানী ব্যবস্থায় বলবনী শাসন কিংবা ইলিয়াস শাহী, হুসেন শাহী অথবা বাংলার আফগান, মুগল শাসন থেকে শুরু করে নবাবী শাসনামল পর্যন্ত ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার যথাযথ বিকাশ হয়নি । আর তাঁদের অনেকেই ইসলামের মূর্ত প্রতীকও ছিলেন না ।

তবুও এহেন প্রচেষ্টায় উত্তরোত্তর মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও ইসলাম যথাযথভাবে মুসলমানদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে জাহেলিয়াতকেই তাঁরা সযতনে লালন করেন । বিভিন্ন ঊলামা ও পীর-মাশায়েখদের মস্তিষ্ক প্রসূত চেতনা এবং ফিকহী বিষয়ের প্রধান্যতায় পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ অনেকটা নির্বাসিত হয়ে যায় ।তারপরেও প্রকৃত সত্য টিকে ছিল । মানুষ যাতে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর যথাযথ শিক্ষা অর্জন করে সমাজ ও জাতির মাঝে অবস্থিত ইসলামের নামে পূঞ্জীভূত আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করতঃ নিখাদ মুসলমান হতে পারে সেই প্রচেষ্টাও লক্ষ্যণীয় ছিল ।

এই ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সোনারগাঁও হাদীছ শিক্ষা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা বুখারীর নাম সর্বাগ্রে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয় । তিনিই সর্বপ্রথম ‘বুখারী-মুসলিম’ ভারত বর্ষে নিয়ে আসেন । সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ তেত্রিশ বৎসর(৬৬৭-৭৭০হিঃ/১২৬৮-১৩০০ খৃঃ) যাবত ছহীহায়নের দরস দানের ফলে এদেশের বহু মানুষ পবিত্র কুর’আন ও ছহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়তে উদ্বুদ্ধ হন ।

এতদ্ব্যতীত আলাউদ্দিন আলাউল হকও (মৃঃ ১৩৯৮ খৃঃ) সোনারগাঁয়ে ইসলাম প্রচার করেন ।

এইভাবে সামরিক বিজয়ের পরও ইসলামের প্রচার ও শিক্ষা প্রদান মুসলিম মনীষীগণ কর্তৃক অব্যাহত থাকে । উল্লেখিত দিকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, ইসলামের প্রকৃত আদর্শ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও হক্বের প্রচার থাকায় বহুক্ষেত্রে সঠিক ধ্যান-ধারণা যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করে ।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরেও বহু মুসলিম জ্ঞানী-গুণী এবং তাপস-সাধক বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেন । তাঁদের প্রচেষ্টা ও পাশাপাশি রাজকীয় ব্যবস্থাপনায় ও সহযোগিতায় ইসলাম প্রসার লাভ করলেওতার প্রকৃত আদর্শ বাস্তবায়িত হয়নি । অদ্যবধি সেই অবস্থা বিদ্যমান । তবে এখন অবশ্য প্রগতির কথিত স্রোতে আমাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ ।

অবশ্য বাংলাদেশ বা বাংলার অনেক শাসক ইসলামকে মনেপ্রাণে গ্রহন করতঃ বহু দ্বীনি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং শরী‘আতের গবেষণার লক্ষ্যে তাঁদের পৃষ্ঠপোষণ বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে । ইসলামী শিক্ষা ও কৃষ্টির আলোকে বাংলা বা বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ যাতে ইহলৌকিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পারলৌকিক জীবনের কন্টকযুক্ত পথকে কন্টকমুক্ত করতে পারে সেজন্য অনেক শাসন তদানীন্তন সময়ের জগদ্বিখ্যাত ঊলামাদের বিদেশ থেকে নিয়ে আসতেন এবং তাঁদের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষণ করতেন । এভাবে ইসলামী আদর্শ রীতি-নীতি অনুশীলন ও চর্চার পথ সুগম হয় এবং রাস্ট্রীয় জীবনে পুরোপুরি না হলেও সামাজিক জীবনে অনেকাংশেই ইসলামী পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয় ।

সৌভাগ্যের কথা হলঃ স্বাধীন যুগের শাসনম্লে বাংলার মুসলিম রাজ্য সমগ্র বাংলাদেশ বিস্তৃতি লাভ করে এবং ইলিয়াস শাহ সর্বপ্রথম সারা বাংলাদেশকে একক শাসনাধীনে আনেন । সুলতানী শাসনামলে ইসলামী শাসনপদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিচালিত হত বলে ঐতিহাসিকগণ অভিমত পোষণ করেন । বিভিন্ন শিলালিপি এবং মুদ্রা প্রাপ্ত সুলতানদের উপাধি দৃষ্টে মনে হয়, সে সুলতানেরা ইসলামের বিধি বহির্ভূত কোন আইন প্রণ্যন করতেন না । এতদ্ব্যতীত মুসলমান ও ইসলামের উন্নতি সাধন সুলতানদের দায়িত্ব হিসাবে বিশ্বাস করে তাঁরা দেশ পরিচালনা করতেন ।

উল্লেখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা অনুধাবন করতে পারি সমগ্র বাংলাদেশ কিভাবে ইসলামের আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটেছিল । তাইতো বহু পথ পরিক্রমা পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ আজ মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাস্ট্র ।

তথ্যসূত্র:

১ বুখারী,মিশকাত হা/১৯৮ ‘ইলম’ অধ্যায় ।

ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল গালিব, দাওয়াত ও জিহাদ (যুবসংঘ প্রকাশনী),পৃঃ ৬-৭ ।

ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, আহলে হাদীছ আন্দোলন উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিত সহ (পি.এইচ.ডি থিসিস) হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ অধ্যায় ৭, পৃঃ ২০৬ ।

প্রাগুক্ত, অধ্যায় ১০, পৃঃ ৪০৩ ।

প্রাগুক্ত, অধ্যায় ১০, পৃঃ ৪০৩-৪০৪ ।

ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হাসান (গ্লোব লাইঃ প্রাঃ লিঃ ঢাকা) পঞ্চম অধ্যায়, পৃঃ ৯০ ।

বাংলাদেশের ইতিহাস, (নওরোজ কিতাবিস্তান ৫, বাংলা বাজার, ঢাকা) দ্বিতীয় পর্বঃ প্রথম পরিচ্ছেদ, পৃঃ ১৩৬ ।

আহলেহাদীছ আন্দোলন উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, অধ্যায় ১০,পৃঃ ৪০৫-৪০৬ ।

বাংলাদেশের ইতিহাস (নওরোজ কিতাবিস্তান), অষ্টম পরিচ্ছদঃ সুলতানী যুগের শাসন ব্যবস্থা, পৃঃ ২৩৫

*সুপারিনটেনডেন্ট, ভারাডাংগী দারুস-সুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসা, বিরল, দিনাজপুর

মতামত দিন