সলাত

সলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ২৩)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী

সূরা ফাতিহা পাঠ

অতঃপর মহানবী (সাঃ) জেহরী (মাগরিব, এশা, ফজর, জুমুআহ, তারাবীহ্‌, ঈদ প্রভৃতি) নামাযে সশব্দে ও সির্রী (যোহ্‌র, আসর, সুন্নত প্রভৃতি) নামাযে নি:শব্দে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন,

الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، اَلرَّحْمنِ الرَّحِيْم، مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْن، إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِيْن، اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيْم، صِرَاطَ الَّذِيْنَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّيْن।

উচ্চারণ:- আলহামদু লিল্লা-হি রাব্বিল আ’-লামীন। আররাহ্‌মা-নির রাহীম। মা-লিকি য়্যাউমিদ্দীন। ইয়্যা-কা না’বুদু অইয়্যা-কা নাস্তাঈন। ইহ্‌দিনাস স্বিরা-ত্বাল মুস্তাক্বীম। স্বিরা-ত্বাল্লাযীনা আন্‌আ’মতা আলাইহিম। গাইরিল মাগযুবি আলাইহিম অলায্ব যা-ল্লীন।

অর্থ:- সমস্ত প্রশংসা সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। যিনি অনন্ত করুণাময়, পরম দয়ালু। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য চাই। আমাদেরকে সরল পথ দেখাও; তাদের পথ -যাদেরকে তুমি পুরস্কার দান করেছ। তাদের পথ নয় -যারা ক্রোধভাজন (ইয়াহুদী) এবং যারা পথভ্রষ্ট ( খ্রিষ্টান)।

এই সূরা তিনি থেমে থেমে পড়তেন; ‘বিসমিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহীম’ পড়ে থামতেন। অতঃপর ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’-লামীন’ বলে থামতেন। আর অনুরুপ প্রত্যেক আয়াত শেষে থেমে থেমে পড়তেন। (আবূদাঊদ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৪৩নং)

সুতরাং একই সাথে কয়েকটি আয়াতকে জড়িয়ে পড়া সুন্নতের পরিপন্থী আমল। পরস্পর কয়েকটি আয়াত অর্থে সম্পৃক্ত হলেও প্রত্যেক আয়াতের শেষে থেমে পড়াই মুস্তাহাব। (সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ৯৬পৃ:)

নামাযে সূরা ফাতিহার গুরুত্ব

মহানবী (সাঃ) বলতেন, “সেই ব্যক্তির নামায হয় না, যে ব্যক্তি তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না।” (বুখারী, মুসলিম,  আআহমাদ, মুসনাদ, বায়হাকী, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩০২নং)

“সেই ব্যক্তির নামায যথেষ্ট নয়, যে তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না।” (দারাক্বুত্বনী, সুনান, ইবনে হিব্বান, সহীহ, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩০২নং)

“যে ব্যক্তি এমন কোনও নামায পড়ে, যাতে সে সূরা ফাতিহা পাঠ করে না, তার ঐ নামায (গর্ভচ্যুত ভ্রুণের ন্যায়) অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ।” (মুসলিম,  আআহমাদ, মুসনাদ, মিশকাত ৮২৩নং)

“আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি নামায (সূরা ফাতিহা) কে আমার ও আমার বান্দার মাঝে আধাআধি ভাগ করে নিয়েছি; অর্ধেক আমার জন্য এবং অর্ধেক আমার বান্দার জন্য। আর আমার বান্দা তাই পায়, যা সে প্রার্থনা করে।’ সুতরাং বান্দা যখন বলে, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ-লামীন।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল।’ অতঃপর বান্দা যখন বলে, ‘আররাহ্‌মা-নির রাহীম।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার স্তুতি বর্ণনা করল।’ আবার বান্দা যখন বলে, ‘মা-লিকি য়্যাউমিদ্দীন।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দা আমার গৌরব বর্ণনা করল।’ বান্দা যখন বলে, ‘ইয়্যা-কা না’বুদু অইয়্যা-কা নাস্তাঈন।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘এটা আমার ও আমার বান্দার মাঝে। আর আমার বান্দা তাই পায়, যা সে প্রার্থনা করে।’ অতঃপর বান্দা যখন বলে, ‘ইহ্‌দিনাস স্বিরা-ত্বাল মুস্তাকীম। স্বিরা-ত্বাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম অলায্ব যা-ল্লীন।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘এ সব কিছু আমার বান্দার জন্য। আর আমার বান্দা যা চায়, তাই পাবে।” (মুসলিম, সহীহ ৩৯৫, আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, আআহমাদ, মুসনাদ, প্রমুখ, মিশকাত ৮২৩নং)

“উম্মুল কুরআন (কুরআনের জননী সূরা ফাতিহা) এর মত আল্লাহ আয্‌যা অজাল্ল্‌ তাওরাতে এবং ইঞ্জিলে কোন কিছুই অবতীর্ণ করেন নি। এই (সূরাই) হল (নামাযে প্রত্যেক রাকআতে) পঠিত ৭টি আয়াত এবং মহা কুরআন, যা আমাকে দান করা হয়েছে।” (নাসাঈ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ২১৪২ নং)

নামায ভুলকারী সাহাবীকে মহানবী (সাঃ) এই সূরা তার নামাযে পাঠ করতে আদেশ দিয়েছিলেন। (বুখারী জুযউল ক্বিরাআহ্‌, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ৯৮পৃ:) অতএব নামাযে এ সূরা পাঠ করা ফরয এবং তা নামাযের একটি রুক্‌ন।

‘দ্বা-ল্লীন’ না ‘যা-ল্লীন’

সূরা ফাতিহা পাঠের সময় যদি কেউতার একটি হ্‌রফের উচ্চারণ অন্য হ্‌রফের মত করে পড়ে, তাহলে এই মহা রুক্‌ন আদায় সহীহ হবে না। ঐ হ্‌রফ (আয়াত)কে পুন: শুদ্ধ করে পড়া জরুরী। যেমন যদি কেউع কে أ ,ح কে هـ , ط কে ت পড়ে তাহলে তার ফাতিহা শুদ্ধ হবে না। (অনুরুপ যে কোন সূরাই।)

আরবী বর্ণমালার সবচেয়ে কঠিনতম উচ্চারিতব্য অক্ষর হল ض । এরও বাংলায় কোন সম-উচ্চারণবোধক অক্ষর নেই। যার জন্য এক শ্রেণীর লেখক এর উচ্চারণ করতে ‘য’ লিখেন এবং অন্য শ্রেণীর লেখক লিখে থাকেন ‘দ’ বা ‘দ্ব’। অথচ উভয় উচ্চারণই ভুল। পক্ষান্তরে যাঁরা ‘জ’-এর উচ্চারণ করেন, তাঁরাও ভুল করেন। অবশ্য স্পষ্ট ‘দ’-এর উচ্চারণ আরো মারাত্মক ভুল।

আসলে ض এর উচ্চারণ হয় জিভের কিনারা (ডগা নয়) এবং উপরের মাড়ির (পেষক) দাঁতের স্পর্শে। যা ‘য’ ও ‘দ’-এর মধ্যবর্তী উচ্চারণ। অবশ্য ‘য’ বা ظ এর মত উচ্চারণ সঠিকতার অনেক কাছাকাছি। পক্ষান্তরে ‘দ’-এর উচ্চারণ জিভের উপরি অংশ ও সামনের দাঁতের মাড়ির গোড়ার স্পর্শে হয়ে থাকে। সুতরাং ض এর উক্ত উচ্চারণ করা নেহাতই ভুল। (দেখুন আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/৯১-৯৪)

ض এর উচ্চারণ ظ বা ‘য’-এর কাছাকাছি হওয়ার আরো একটি দলীল এই যে, আরবের লোক শ্রুতিলিখনের সময় শব্দের ض  অক্ষরকে ظ লিখে এবং কখনো বা ظ  অক্ষরের ক্ষেত্রে  ض লিখে ভুল করে থাকেন। আর এ কথা পত্র-পত্রিকা এবং বহু বই-পুস্তকেও আরবী পাঠকের নজরে পড়ে।

সুতরাং আমি মনে করি যে, ض  যখন ظ এর জাত ভাই এবং د  এর জাত ভাই নয়, তখন তার উচ্চারণ লিখতে ‘য’ অক্ষর লিখাই যুক্তিযুক্ত। অবশ্য তার নিচে ছোট ‘ব’ লাগিয়ে ‘য্ব’ লিখলে ظ  থেকে পার্থক্য নির্বাচন করা সহ্‌জ হয়।

‘আ-মীন’ বলা

সূরা ফাতিহা শেষ করে নবী মুবাশ্‌শির (সাঃ) (জেহরী নামাযে) সশব্দে টেনে ‘আ-মীন’ বলতেন। (বুখারী জুযউল ক্বিরাআহ্‌, আবূদাঊদ, সুনান ৯৩২, ৯৩৩নং)

পরন্তু তিনি মুক্তাদীদেরকে ইমামের ‘আমীন’ বলা শুরু করার পর ‘আমীন’ বলতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ইমাম যখন ‘গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম অলায যা-ল্লীন’ বলবে, তখন তোমরা ‘আমীন’ বল। কারণ, ফিরিশ্‌তাবর্গ ‘আমীন’ বলে থাকেন। আর ইমামও ‘আমীন’ বলে। (অন্য এক বর্ণনা মতে) ইমাম যখন ‘আমীন’ বলবে, তখন তোমরাও ‘আমীন’ বল। কারণ, যার ‘আমীন’ বলা ফিরিশ্‌তাবর্গের ‘আমীন’ বলার সাথে সাথে হয়- (অন্য এক বর্ণনায়) তোমাদের কেউ যখন নামাযে ‘আমীন’ বলে এবং ফিরিশ্‌তাবর্গ আকাশে ‘আমীন’ বলেন, আর পরস্পরের ‘আমীন’ বলা একই সাথে হয় -তখন তার পূর্বেকার পাপরাশি মাফ করে দেওয়া হয়।” (দেখুন, বুখারী ৭৮০-৭৮২, ৪৪৭৫, ৬৪০২, মুসলিম,  আবূদাঊদ, সুনান ৯৩২-৯৩৩, ৯৩৫-৯৩৬, নাসাঈ, সুনান, দারেমী, সুনান)

মহানবী (সাঃ) আরো বলেন, “ইমাম ‘গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম অলায যা-ল্লীন’ বললে তোমরা ‘আমীন’ বল। তাহলে (সূরা ফাতিহায় উল্লেখিত দুআ) আল্লাহ তোমাদের জন্য মঞ্জুর করে নেবেন।” (ত্বাবারানী, মু’জাম, সহিহ তারগিব ৫১৩নং) বলাই বাহুল্য যে, ‘আমীন’ এর অর্থ ‘কবুল বা মঞ্জুর কর।’

ইবনে জুরাইজ বলেন, আমি আত্বা-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সূরা ফাতিহা পাঠের পর ইবনে যুবাইর ‘আমীন’ বলতেন কি?’ উত্তরে আত্বা বললেন, ‘হ্যাঁ, আর তাঁর পশ্চাতে মুক্তাদীরাও ‘আমীন’ বলত। এমনকি (‘আমীন’-এর গুঞ্জরণে) মসজিদ মুখরিত হয়ে উঠত।’ অতঃপর তিনি বললেন, ‘আমীন’ তো এক প্রকার দুআ। (আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ ২৬৪০ নং, মুহাল্লা ৩/৩৬৪, বুখারী তা’লীক, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/৩০৬)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) মারওয়ান বিনহাকামের মুআযযিন ছিলেন। তিনি শর্ত লাগালেন যে, ‘আমি কাতারে শামিল হয়ে গেছি এ কথা না জানার পূর্বে (ইমাম মারওয়ান) যেন ‘অলায যা-ল্লীন’ না বলেন।’ সুতরাং মারওয়ান ‘অলায যা-ল্লীন’ বললে আবূ হুরাইরা টেনে ‘আমীন’ বলতেন। (বায়হাকী ২/৫৯, বুখারী তা’লীক, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/৩০৬)

নাফে’ বলেন, ইবনে উমার ‘আমীন’ বলা ত্যাগ করতেন না। তিনি তাঁর মুক্তাদীগণকেও ‘আমীন’ বলতে উদ্বুদ্ধ করতেন। (বুখারী তা’লীক, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/৩০৬-৩০৭)

পরের ঐশ্বর্য, উন্নতি বা মঙ্গল দেখে কাতর বা ঈর্ষান্বিত হয়ে সে সবের ধ্বংস কামনার নামই পরশ্রীকাতরতা বা হিংসা। ইয়াহুদ এমন এক জাতি, যে সর্বদা মুসলিমদের মন্দ কামনা করে এবং তাদের প্রত্যেক মঙ্গল ও উন্নতির উপর ধ্বংস-কামনা ও হিংসা করে। কোন উন্নতি ও মঙ্গলের উপর তাদের বড় হিংসা হয়। আবার কোনর উপর ছোট হিংসা। কিন্তু মুসলিমদের সমূহ মঙ্গলের মধ্যে জুমুআহ, কিবলাহ্‌, সালাম ও ইমামের পিছনে ‘আমীন’ বলার উপর ওদের হিংসা সবচেয়ে বড় হিংসা।

মহানবী (সাঃ) বলেন, “ইয়াহুদ কোন কিছুর উপর তোমাদের অতটা হিংসা করে না, যতটা সালাম ও ‘আমীন’ বলার উপর করে।” (ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, সহিহ তারগিব ৫১২নং)

তিনি আরো বলেন, “ওরা জুমুআহ -যা আমরা সঠিকরুপে পেয়েছি, আর ওরা পায় নি, কিবলাহ্‌ -যা আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকরুপে দান করেছেন, কিন্তু ওরা এ ব্যাপারেও ভ্রষ্ট ছিল, আর ইমামের পশ্চাতে আমাদের ‘আমীন’ বলার উপরে যতটা হিংসা করে, ততটা হিংসা আমাদের অন্যান্য বিষয়ের উপর করে না।” (আহমাদ, মুসনাদ, সহিহ তারগিব ৫১২নং)

প্রকাশ যে, ‘আমীন’ ও ‘আ-মীন’ উভয় বলাই শুদ্ধ। (সহিহ তারগিব ২৭৮পৃ:)  ইমামের ‘আমীন’ বলতে ‘আ-’ শুরু করার পর ইমামের সাথেই মুক্তাদীর ‘আমীন’ বলা উচিত। ইমামের বলার পূর্বে বা পরে বলা ইমামের এক প্রকার বিরুদ্ধাচরণ, যা নিষিদ্ধ। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ৬/৮১)

মতামত দিন