সলাত

স্বলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ৬)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী মাদানী

রোগীর পবিত্রতা ও ওযু-গোসল

রোগী হলেও গোসল ওয়াজেব হলে গোসল এবং ওযুর দরকার হলে ওযু করা জরুরী।

ঠান্ডা পানি ব্যবহার করায় ক্ষতির আশঙ্কা হলে রোগী গরম পানি ব্যবহার করবে। পানি ব্যবহারে একেবারেই অসমর্থ হলে বা রোগ-বৃদ্ধি অথবা আরোগ্য লাভে বিলম্বের আশঙ্কা হলে তায়াম্মুম করবে।

রোগী নিজে ওযু বা তায়াম্মুম করতে না পারলে অন্য কেউ করিয়ে দেবে।

ওযুর কোন অঙ্গে ক্ষত থাকলেও তা ধুতে হবে। অবশ্য পানি লাগলে ঘা বেড়ে যাবে এমন আশঙ্কা থাকলে হাত ভিজিয়ে তার উপর বুলিয়ে মাসাহ্‌ করবে। মাসাহ্‌ করাও ক্ষতিকারক হলে ঐ অঙ্গের পরিবর্তে তায়াম্মুম করে নেবে।

ক্ষতস্থানে পটি বাঁধা বা প্লাস্টার করা থাকলে অন্যান্য অঙ্গ ধুয়ে পটির উপর মাসাহ্‌ করবে। মাসাহ্‌ করলে আর তায়াম্মুমের প্রয়োজন নেই।

রোগীর জন্যও দেহ্‌, লেবাস ও নামায পড়ার স্থানের সর্বপ্রকার পবিত্রতা জরুরী। কিন্তু অপবিত্রতা দূর করতে না পারলে যে অবস্থায় থাকবে সে অবস্থাতেই তার নামায শুদ্ধ হয়ে যাবে।

কোন নামাযকে তার যথা সময় থেকে পিছিয়ে দেওয়া (যেমন ফজরকে যোহরের সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা) রোগীর জন্যও বৈধ নয়। যথা সম্ভব পবিত্রতা অর্জন করে অথবা (অক্ষম হলে) না করেই নামাযের যথা সময় অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই নামায অবশ্যই পড়ে নেবে। নচেৎ গুনাহগার হবে। (রাসাইল ফিত্ তাহারাতি অস্ সালাত, ইবনে উসাইমীন ৩৯-৪১পৃ:)

কেবলমাত্র মাথা ধুলে অসুখ হওয়ার বা বাড়ার ভয় হলে বাকী দেহ ধুয়ে মাথায় মাসাহ্‌ করবে। অবশ্য এর সাথে তায়াম্মুমও করতে হবে। (ইবনে বায, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২১৪)

সর্বদা প্রস্রাব ঝরলে অথবা বাতকর্ম হলে অথবা মহিলাদের সাদা স্রাব ঝরলে প্রত্যেক নামাযের জন্য ওযু জরুরী। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ১/২৮৭-২৯১ দ্র:)

নামাযের সময় হলে যদি কাপড়ে নাপাকী লেগে থাকে, তবে নামাযী তা বদলে লজ্জাস্থান ধুয়ে ওযু করবে। নামাযের সময় যাতে নাপাকী অন্যান্য অঙ্গে বা কাপড়ে ছড়িয়ে না পড়ে তার জন্য শরমগাহে বিশেষ কাপড়, ল্যাঙ্গট বা পটি ব্যবহার করবে।

গোসল করলে রোগ-বৃদ্ধি হবে এবং ওযু করলে ক্ষতি হবে না বুঝলে তায়াম্মুম করে ওযু করবে।

ওযু নষ্ট হওয়ার কারণসমূহ

১। পেশাব ও পায়খানা দ্বার হতে কিছু (পেশাব, পায়খানা, বীর্য, মযী, হাওয়া, রক্ত, কৃমি, পাথর প্রভৃতি) বের হলে ওযু ভেঙ্গে যায়। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ১/২২০)

তদনুরুপ দেহের অন্যান্য অঙ্গ থেকে (যেমন অপারেশন করে পেট থেকে পাইপের মাধ্যমে) অপবিত্র (বিশেষ করে পেশাব-পায়খানা) বের হলেও ওযু নষ্ট হয়ে যাবে। (ঐ১/২২১)

২। যাতে গোসল ওয়াজেব হয়, তাতে ওযুও নষ্ট হয়।

৩। কোন প্রকারে বেহুশ বা জ্ঞানশূন্য হলে ওযু নষ্ট হয়।

৪। গাঢ়ভাবে ঘুমিয়ে পড়লে ওযু ভাঙ্গে। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, “ চোখ হল মলদ্বারের বাঁধন। সুতরাং যে ঘুমিয়ে যায়, সে যেন ওযু করে।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, মিশকাত ৩১৬, জামে ৪১৪৯নং)

অবশ্য হাল্কা ঘুম বা ঢুল (তন্দ্রা) এলে ওযু ভাঙ্গে না। সাহাবায়ে কেরাম নবী (সাঃ) এর যুগে এশার নামাযের জন্য তাঁর অপেক্ষা করতে করতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঢুলতেন। অতঃপর তিনি এলে তাঁরা নামায পড়তেন, কিন্তু নতুন করে আর ওযু করতেন না। (মুসলিম, সহীহ ৩৭৬নং, আবূদাঊদ, সুনান ১৯৯-২০১নং)

৫। পেশাব অথবা পায়খানা-দ্বার সরাসরি স্পর্শ করলে ওযু নষ্ট হয়। (কাপড়ের উপর থেকে হাত দিলে নষ্ট হয় না।) (জামে ৬৫৫৪, ৬৫৫৫নং) মহানবী (সাঃ) বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিনা পর্দায় ও অন্তরালে নিজের শরমগাহ্‌ স্পর্শ করে, তার উপর ওযু ওয়াজেব হয়ে যায়।” (জামে ৩৬২, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১২৩৫ নং)

হাতের কব্জির উপরের অংশ দ্বারা স্পর্শ হলে ওযু ভাঙ্গবে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ১/২২৯)

৬। উটের গোশ্ত্ (কলিজা, ভূঁড়ি) খেলে ওযু ভেঙ্গে যায়। এক ব্যক্তি মহানবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করল, ‘উটের গোশ্ত্ খেলে ওযু করব কি?’ তিনি বললেন, “হ্যাঁ, উটের গোশ্ত্ খেলে ওযু করো।” (মুসলিম, সহীহ ৩৬০নং)

তিনি বলেন, “উটের গোশ্ত্  খেলে তোমরা ওযু করো।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, জামে ৩০০৬ নং)

যাতে ওযু নষ্ট হয় না

১। নারীদেহ্‌ স্পর্শ করলে ওযু ভাঙ্গে না। কারণ, মহানবী (সাঃ) রাত্রে নামায পড়তেন, আর মা আয়েশা (রাঃ) তাঁর সম্মুখে পা মেলে শুয়ে থাকতেন। যখন তিনি সিজদায় যেতেন, তখন তাঁর পায়ে স্পর্শ করে পা সরিয়ে নিতে বলতেন। এতে তিনি নিজের পা দু’টিকে গুটিয়ে নিতেন। (বুখারী ৫১৩, মুসলিম, সহীহ ৫১২নং)

তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)কে চুম্বন দিতেন। তারপর ওযু না করে নামায পড়তে বেরিয়ে যেতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ১৭৮-১৭৯ নং, আহমাদ, মুসনাদ ৬/২১০, দি: ৮৬, নাসাঈ, সুনান ১৭০, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৫০২নং, দারাক্বুত্বনী, সুনান ১/১৩৮, বায়হাকী ১/১২৫)

অবশ্য স্পর্শ বা চুম্বনে মযী বের হলে তা ধুয়ে ওযু জরুরী। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন১/২৮৫-২৮৬)

২। হো-হো করে হাসলে; এ প্রসঙ্গের হাদীসটি দলীলের যোগ্য নয়। তাই হাসলে ওযু ভাঙ্গে না। (ফিকহুস সুন্নাহ্‌ উর্দু ১/৫০-৫১, বুখারী, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ১/৩৩৬)

৩। বমি করলে; একদা নবী (সাঃ) বমি করলে রোযা ভেঙ্গে ফেললেন। তারপর তিনি ওযু করলেন। (আহমাদ, মুসনাদ ৬/৪৪৯, তিরমিযী, সুনান) এই হাদীসে তাঁর কর্মের পরস্পর অবস্থা বর্ণিত হয়েছে।  বমি করলেন বলে ওযু ভেঙ্গে গিয়েছিল, তাই তিনি ওযু করেছিলেন -তা প্রমাণ হয় না। (ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ১/১৪৮, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ১/২২৪-২২৫)

৪। গাঁটের নিচে কাপড় ঝুলালে; গাঁটের নিচে কাপড় ঝুলানো কাবীরা গুনাহ। কিয়ামতে আল্লাহ সেই ব্যক্তির দিকে তাকিয়েও দেখবেন না, যে ব্যক্তি তার পরনের কাপড় পায়ের গাঁটের নিচে পর্যন্ত ঝুলিয়ে পরে। (বুখারী ৫৭৮৪, মুসলিম, সহীহ ২০৮৫নং) কিন্তু এর ফলে ওযু ভাঙ্গে না। এক ব্যক্তি ঐরুপ কাপড় ঝুলিয়ে নামায পড়লে মহানবী (সাঃ) তাকে পুনরায় ওযু করে নামায পড়তে হুকুম দিয়েছিলেন বলে যে হাদীস আবূ দাঊদে বর্ণিত হয়েছে, তা যয়ীফ এবং দলীলের যোগ্য নয়। (যয়ীফ আবূদাঊদ, সুনান ১২৪, ৮৮৪নং)

৫। নাক থেকে রক্ত পড়লে; এতে ওযু নষ্ট হয় বলে হাদীস ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে, তা যয়ীফ। (যয়ীফ ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ২৫২, যয়ীফ জামে ৫৪২৬নং)

৬। দেহের কোন অঙ্গ কেটে রক্ত পড়লে, দাঁত থেকে রক্ত ঝরলে, তীরবিদ্ধ হয়ে রক্ত পড়লে; যা-তুর রিকা’ যুদ্ধে নবী (সাঃ) উপস্থিত ছিলেন। সেখানে এক ব্যক্তি তীরবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত হলেও সে রুকু সিজদা করে নামায সম্পন্ন করেছিল। হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন, মুসলিমরা এ যাবৎ তাদের রক্তাক্ত ক্ষত নিয়েই নামায পড়ে আসছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) একটি ফুসকুরি গেলে দিলে তা থেকে রক্ত বের হল। কিন্তু তিনি ওযু করলেন না। ইবনে আবী আওফা রক্তমাখা থুথু ফেললেন। অতঃপর তিনি তাঁর নামায সম্পন্ন করলেন। ইবনে উমার ওহাসান বলেন, কেউ শৃঙ্গ লাগিয়ে বদ-রক্ত বের করলে কেবল ঐ জায়গাটা ধুয়ে নেবে। এ ছাড়া ওযু-গোসল নেই। (বুখারী ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ১/৩৩৬)

পূর্বোক্ত তীরবিদ্ধ লোকটি ছিল একজন আনসারী। তার সঙ্গী এক মুহাজেরী তার রক্তাক্ত অবস্থা দেখে বলল, ‘সুবহানাল্লাহ্‌! (তিন তিনটে তীর মেরেছে?!) প্রথম তীর মারলে তুমি আমাকে জাগিয়ে দাওনি কেন?’ আনসারী বলল, ‘আমি এমন একটি সূরা পাঠ করছিলাম, যা সম্পূর্ণ না করে ছেড়ে দিতে পছন্দ করিনি!’ (আবূদাঊদ, সুনান ১৯৮নং)

৭। মুর্দা গোসল দিলে; মহানবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি মুর্দা কে গোসল দেবে, সে যেন নিজে গোসল করে নেয়। আর যে ব্যক্তি জানাযা বহন করবে, সে যেন ওযু করে নেয়।” (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ ২/২৮০ প্রভৃতি) কিন্তু এই নির্দেশটি মুস্তাহাব। অর্থাৎ না করলেও চলে। তবে করা উত্তম। কারণ, গোসলদাতার দেহে নাপাকী লেগে যাওয়ার সন্দেহ্‌ থাকে তাই। তাই তো অন্য এক বর্ণনায় আছে; তিনি বলেন, “মুর্দাকে গোসল দিলে তোমাদের জন্য গোসল করা জরুরী নয়। কারণ তোমাদের মুর্দা তো আর নাপাক নয়। অতএব তোমাদের হাত ধুয়ে নেওয়াই যথেষ্ট।” (হাকেম, মুস্তাদরাক ১/৩৮৬, বায়হাকী ৩/৩৯৮)

হযরত উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমরা মাইয়্যেতকে গোসল দিতাম। তাতে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ গোসল করে নিত। আবার অনেকে করত না।’ (দারাক্বুত্বনী, সুনান ১৯১নং)

অবশ্য মাইয়্যেতকে গোসল দেওয়ার সময় তার শরমগাহে হাত লেগে থাকলে ওযু অবশ্যই নষ্ট হবে। আর জানাযা বহন করাতে ওযু নষ্ট হয় না। (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ২৬/৯৬)

৮। মৃতদেহের পোষ্টমর্টেম করাতেও ওযু ভাঙ্গে না। (ঐ ২৭/৪০)

৯। ওযু করে মায়েরা যদি তাদের শিশুর পেশাব বা পায়খানা সাফ করে, তবে তা হাতে লাগলেও ওযু ভাঙ্গে না। অবশ্য পায়খানাদ্বার বা পেশাবদ্বার ধোয়ার সময় কোন দ্বারে হাত লাগলে ওযু নষ্ট হয়ে যায়। (ঐ ২২/৬২)

১০। কোনও নাপাক বস্তু (মানুষ বা পশুর পেশাব, পায়খানা, রক্ত প্রভৃতি)তে হাত বা পা দিলে ওযু ভাঙ্গে না। (ঐ ৩৫/৯৬)

১১। ওযু করার পর ধূমপান করলে ওযু নষ্ট হয় না। তবে ধূমপান করা অবশ্যই হারাম। (ঐ ১৮/৯২-৯৩)

১২। কোলন, কোহল বা স্পিরিট-মিশ্রিত আতর বা সেন্টব্যবহার করলে ওযুর কোন ক্ষতি হয় না। তবে তা ব্যবহার বৈধ নয়। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২০৩)

১৩। চুল, নখ ইত্যাদি সাফ করলে ওযু ভাঙ্গে না। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ১/২৯২, বুখারী ১/৩৩৬) তদনুরুপ অশ্লীল কথা বললে, হাঁটুর উপর কাপড় উঠে এলে, মহিলার মাথা খোলা গেলে, কাউকে বা নিজেকে উলঙ্গ দেখলে ওযু নষ্ট হয় না।

দুধ পান করলে নামাযের পূর্বে কুল্লি করা মুস্তাহাব। (বুখারী ২১১, মুসলিম, সহীহ ৩৫৮নং)

যে যে কাজের জন্য ওযু জরুরী বা মুস্তাহাব

নামায পড়ার জন্য, কুরআন মাজীদ (মুসহাফ) স্পর্শ করা বাহাতে নেওয়ার জন্য এবং কা’বা শরীফের তওয়াফ করার জন্য ওযু করা জরুরী।

এ ছাড়া কুরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর যিক্‌র, তেলাওয়াত ও শুক্‌রের সিজদা, আযান, সাফা-মারওয়ার সাঈ, বিভিন্ন খোতবা পাঠ ইত্যাদির সময় ওযু করা মুস্তাহাব।

মতামত দিন