ইসলামে ধূমপান

রচনায় :- মুহাম্মাদ গোলাম কিবরিয়া****

আমাদের বর্তমান সমাজে ধূমপান একটি মারাত্বক ব্যাধি। এই ব্যাধিতে ১০ বছরের কিশোর থেকে শুরু করে ৭০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত আক্রান্ত। ধূমপান   আমাদেরসভ্য সমাজকে ধূম্রজালের ন্যায় ঘিরে ফেলেছে। তাই আমাদের সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। ধূমপান সম্পর্কে আমার মুসলিম ভাইদের কিছু জানাতে চাই। যাতে তারা এ থেকে দূরে থাকতে সচেষ্ট হন।

আল্লাহর বাণী শুনে তাঁর আনুগত্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া উচিত। আর এজন্য আল-কুরাআনে ঘোষিত হয়েছে,

وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا

‘যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে সে বিরাট সাফল্য অর্জন করবে’৪।

ধূমপান সম্পর্কে আমাদের মাঝে দু’রকম মত আছে। কেউ এই মাকরূহ বলেছেন, আবার কেউ হারাম বলে মত পোষন করেছেন।

ধূমপান তো একটি বিষাক্ত ঘাতক-প্রাণঘাতী। মানুষকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়। এটা যেহেতু প্রানঘাতী এবং বিষাক্ত তাই হালাল নয়। এ মহান আল্লাহ্‌র বাণী :

وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ

‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুকে হালাল করেছেন এবং অপবিত্র বস্তুকে হারাম করেছেন’ (আ’রাফ ১৫৭)

এই আয়াতেই আমরা বুঝতে পারি যে, ধূমপান নিঃসন্দেহে হারাম। ধূমপান যেহেতু মানুষকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে। তাই এ ধূমপান আত্নহননের শামিল। ধূমপানের ফলে অনেক কচি কচি প্রাণ কালে ঝরে যাচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ

‘তোমরা আত্নহত্যা করো না’ (নিসা ২৯)।

এই ধূমপান মানুষের অকাল মৃত্যু ডেকে আনে। একটি সিগারেটে একজন মানুষের ৫-৬ মিনিট আয়ু কমে। প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ ইবনে সীনা বলেছেন, ‘পৃথিবীর এত ধূলি, ধোঁয়া, গ্যাস যদি মানুষের ফুসফুসে না ঢুকত, তাহ’লে হাজার হাজার বছর জীবিত থাকত’।

ধূমপান যে শুধু আমাদের শারীরিক দিক থেকে ক্ষতিকর তা নয়; ধূমপানের ফলে মানুষ নানা রকম পাপকাজে জড়িয়ে পড়ছে। ধূমপানে আমাদের অর্থের প্রচুর অপব্যয় হয়। তাছাড়া এতে অবৈধ খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়। অবৈধ খাতে অর্থ ব্যয়ই তো হ’ল অপব্যয়। আর অপব্যয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অতএব হে মুসলিম ভাই! আপনি কি এই দলের অন্তর্ভুক্ত হ’তে চান? এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালার বাণী হ’ল,

وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

‘আত্নীয়-স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। তোমরা অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রভুর প্রতি অকৃতজ্ঞ’ (ইসরা ২৬-২৭)।

ধূমপানে আমাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। একজন সাধারণ ধূমপায়ীর ধূমপানের পিছনে ব্যয়িত হিসাব করলে অর্থের দেখা যায়-২৪ ঘন্টায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ টি সিগারেট পান করে। এর দামও প্রায় ৩০-৪০ টাকা। এখানে যদি দিনে ৩০ টাকা ধরা হয় তবে মাসে খরচ দাঁড়ায় ৯০০ টাকা এবং বছরে ১০,৮০০ টাকা প্রায়।

মহানবী (সঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন। অনর্থক কথাবার্তা, সম্পদ বিনষ্টকর, অধিক প্রশ্নকরণ’।১

একজন ব্যক্তি যদি শুধু ধূমপানের খাতে এত টাকা ব্যয় করে, তবে লক্ষ্য লক্ষ্য লোকের কথা চিন্তা করলে কি অবস্থা দাঁড়ায়?

এই অপব্যয়ের পরও মহানবী (সঃ)–এর হুঁশিয়ারী, ‘যে ব্যক্তি বিষ গ্রহণ করে আত্নহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে নিজ হাতে বিষ গ্রহণ করতঃ সেখানে স্থায়ীভাবে থাকবে’।২

একজন ডাক্তার এক মৃত ধূমপায়ীর শব ব্যবচ্ছেদ করেন এবং তার ফুসফুস উন্মোচন করার পর তার ছাত্রদের সেটি দেখতে বলেন। এটার উপরিভাগে আলকাতরার একটি কালো আস্তরণ ছিল। তিনি নিজে এটা নিংড়াতে লাগলেন। তা থেকে টপটপ করে আলকাতরা পড়তে লাগল। এমনিভাবে তিনি ভিতর গিয়ে দেখতে পেলেন, মানুষ যে ছিদ্রগুলি দিয়ে অক্সিজেন গ্রহণ করে সেগুলি বন্ধ হয়ে গেছে এবং এর ফলেই তার মৃত্যু ঘটেছে।

একটি সিগারেটে যে পরিমাণ নিকোটিন থাকে তা একজন যদি সুস্থ দেহে প্রবেশ করানো যায়, তবে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হবে।

ধূমপান অনর্থক অপব্যয়। প্রিয় ভাই! আল্লাহ যদি আপনাকে আপনার সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন তবে আপনি কি উত্তর দিবেন? কোন খাতে তা ব্যয় করেছেন এবং আপনার দেহকে কোন খাতে ক্ষয় করেছেন?

রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘হাশরের ময়দানে আদম সন্তান পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত তার পদযুগল নড়াতে পারবে না।

(১) তার বয়স সম্পর্কে কিভাবে সে অতিবাহিত তা করেছে।

(২) তার যৌবনকাল, কিভাবে তা নিঃশেষ করেছে।

(৩) তার ধন-সম্পদ, কিভাবে তা উপার্জন করেছে।

(৪) সেই উপার্জিত সম্পদ কোন খাতে ব্যয় করেছে

(৫) সে যে অর্জন ইলম করেছিল সে অনুযায়ী আমল করেছে কি-না’।৩

ধূমপানের ফলে আমরা অনেক অপকারিতা লক্ষ করি এবং বিজ্ঞানেও তা প্রমাণিত। ধূমপানের ফলে-

হৃদযন্ত্রকে অকেজো করে ফেলে। কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। দাঁত হলুদ হয়ে যায়। কফ, কাশি ও বক্ষ ব্যাধি দেখা দেয়। এর ফলে যক্ষা ও হৃদরোগ হয় এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। খাবারে রুচি নষ্ট হয়। হজমে ব্যাঘাত ঘটে এবং রক্ত সঞ্চালনে অসুবিধা হয়। এটা নেশার সৃষ্টি করে। এতে দুর্গন্ধ রয়েছে। যারা তারা কষ্ট পায় এব সম্মানিত ফেরেশতাকুলও পান। মহানবী (সঃ) মুখে নিয়ে মসজিদের নিকটবর্তী হ’তে নিষেধ করেছেন। চেহারার লাবণ্য নষ্ট হয়। ঠোঁটকালো বর্ণের হয়ে যায়। দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও স্নায়বিদ দুর্বলতা দেখা দেয়। এর ফলে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। কার্যত সমাজের লোকদের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার মাধমে নিমন্ত্রণ জানান হয়। বিশেষত সমাজে অনুসরণীয় ব্যক্তিগণ যখন করেন, যেমন- পিতা, শিক্ষক, অভিভাবক ইত্যাদি।

একটু চিন্তা করে দেখুন! যদি কোন আপনার সম্মুখে একটি একশত টাকার নোট বের করে এবং তাতে অগ্নি সংযোগ করে তবে তার সম্পর্কে আপনার কি মত হ’তে পারে। আবার যে লোক হাজার হাজার টাকা নিঃসংকচে দগ্ধ করেছে এবং তার সাথে নিজেকেও দগ্ধ করেছে তার বা কি বলবেন?

সুরুচিশীল ব্যক্তিদের নিকট ধূমপান একটি অপবিত্র বলে গণ্য।ধূমপানের বিজ্ঞাপন যেন আমাদের বলে দেয়, ‘আপনার ফুলদান হোক ছায়দানী’ । ধূমপানের বিজ্ঞাপন তাই স্বাস্থ্য ও সম্পদ নষ্টের বিজ্ঞাপন। শরী‘আত ও সুস্থ বিবেকের দৃষ্টিতে হারাম। ধূমপান করার আগে আমাদের ভেবে দেখা উচিত এটি হালাল না হারাম। উপকার না ক্ষতিকর। পবিত্র না অপবিত্র । আমাদের সুস্থ বিবেক বলে দেবে এটি অবশ্যই হারাম, ক্ষতিকর এবং অপবিত্র।

হে মুসলিম ভাই! যেহেতু আপনি নিশ্চিতভাবে জানতে পারলেন যে, ধূমপান ক্ষতিকর এবং হারাম তাই আপনার কর্তব্য হ’লঃ

(ক) আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য এটাকে ঘৃণা করা, বর্জন করা এবং বর্জনে দৃঢ় সংকল্প করা।

(খ) ধূমপানের পরিবর্তে দাঁতন অথবা অন্য কোন হালাল দ্রব্য ব্যবহার করা।

আপনি আসক্ত হওয়ার পর এ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে সিলভার নাইট্রেট (এক প্রকার ক্ষার বিশেষ) দ্বারা কুলি করুন। এটি যেকোন ফার্মেসীতে পাওয়া যায়। এটি পরীক্ষিত এবং ফলদায়ক পদার্থ।

আল্লাহ আপনার রক্ষণাবেক্ষণ করুন। আপনার সহায় হৌন । তিনিই একমাত্র সরল পথের দিশারী।

***চাটাইডুবী, ইসলামপুর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

তথ্যসূত্র :

১. বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯১৫ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ‘সৎ কাজ ও সদাচরণ’ অনুচ্ছেদ।

২. ছহীহ মুসলিম হা/১০৯, ১০ ‘ঈমান’ অধ্যায় ১/১০৩-৪ পৃঃ।

৩. তিরমিযী, মিশকাত হা/৫১৯৭ ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়।

৪. আহযাব ৭১

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button
slot gacor skybet88 slot online skybet88 skybet88 skybet88 slot gacor skybet88 skybet88 slot bonus new member skybet88 slot shopeepay skybet88 skybet88 skybet88 slot shopeepay slot gacor skybet88 demo slot skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 mgs88 mgs88