নারী

নারী নির্যাতন রোধে ইসলামের ভূমিকা

নারী নির্যাতন রোধে ইসলামের ভূমিকা:

ইতঃপূর্বের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলাম নারীর মান মর্যাদা ও ইজ্জত-আব্রু হেফাযতের ব্যবস্থাই শুধু করে নি, বরং নারী যাতে কোনোক্রমেই দৈহিক কিংবা মানসিকভাবে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত না হয় সে রকম দিক-নির্দেশনা দিয়েছে এবং তদনুযায়ী নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধান জারী করেছে।

নিচে তার একটি ছোট্ট বিবরণ দেয়া হল:
১. ইসলাম নারীর সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করেছে। রাস্তায়, কর্মস্থলে ও যত্রতত্র নারীদেরকে হয়রানি করা তো দূরের কথা বরং ইসলাম নারীদের সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে অবনত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন,
﴿قُل لِّلۡمُؤۡمِنِينَ يَغُضُّواْ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِمۡ وَيَحۡفَظُواْ فُرُوجَهُمۡۚ ذَٰلِكَ أَزۡكَىٰ لَهُمۡۚ ﴾ [النور : ٣٠]
‘‘মুমিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজদের লজ্জাস্থান হেফাযত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্রতম।’’ [সূরা আন-নূর: ৩০]
ইসলামের স্বর্ণযুগে দেখা যায়, নারীরা সুদূর বাগদাদ থেকে মক্কা নগরীতে একাকী গমন করলেও তাদেরকে কেউ উত্যক্ত করত না। কেননা এরকম নিরাপত্তাই ইসলামী সমাজে প্রত্যাশিত। যারা নারীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকী, ইসলাম তাদেরকে তা‘যীরমূলক শাস্তি দেয়ার পথ খোলা রেখেছে। আর কেউ যেন নারীকে হয়রানি না করে বরং বোনের দৃষ্টিতে দেখে সেজন্যে পুরুষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَال»
‘‘নারীরা পুরুষদের সহোদরা’’। [সুনান আবি দাউদ ১/২৯৯, হাদীস নং ২৩৬]
শুধু তাই নয় ইসলামে নারীকে ধর্ষণ করা কিংবা করার চেষ্টা করা ও নারীকে মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ; যাতে খারাপ চিত্তের পুরুষগণ এসব অবাঞ্ছিত কাজ থেকে বিরত থাকে।
২. ইসলাম ব্যভিচার, দেহব্যবসা, নগ্নতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও দেহপ্রদর্শনীকে নিষিদ্ধ করেছে।

আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلزِّنَىٰٓۖ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةٗ وَسَآءَ سَبِيلٗا ٣٢ ﴾ [الاسراء: ٣٢]
‘‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয় তা অশ্লীলতা ও খারাপ পথ।’’ [ সূরা আল-ইসরা: ৩২]
﴿وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلۡفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ ﴾ [الانعام: ١٥١]
‘‘আর তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতার কাছাকাছি যেয়ো না।’’ [সূরা আল-আন‘আম: ১৫১]
অতএব ইসলামে বেশ্যাবৃত্তির কোনো স্থান নেই এবং নারীদেরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহারেরও কোনো বিধান নেই। বরং এ সবই ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। ইসলামের এ অনুশাসন মেনে চললে এগুলোর কারণে নারী যে নির্যাতন ও অবমাননার মুখোমুখি হয় সে পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।
৩. ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে ইতঃপূর্বে তার কিছু বিবরণ দেয়া হয়েছে, সেসব অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করার কোনো বৈধতা ইসলামে নেই। ইসলাম নর-নারী উভয়কে উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণ করে বলেছে
﴿ فَرِيضَةٗ مِّنَ ٱللَّهِۗ ﴾ [النساء : ١١]
“এটা বাস্তবায়ন আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয।” [সূরা আন-নিসা:১১]

ইসলাম নারীদেরকে দায়িত্বভার অনুযায়ী কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি দিলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের পার্থক্য না থাকায় সমান সম্পত্তি দিয়েছে। যেমন পূর্বের আয়াতটিরই একাংশে বলা হয়েছে,
﴿ وَلِأَبَوَيۡهِ لِكُلِّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا ٱلسُّدُسُ ﴾ [النساء : ١١]
“বাবা-মা প্রত্যেকের জন্য রয়েছে এক ষষ্ঠাংশ।” [সূরা আন-নিসা : ১১]
নারীর মোহরানার অধিকার সম্পর্কে ইসলাম বলেছে,
﴿قَدۡ عَلِمۡنَا مَا فَرَضۡنَا عَلَيۡهِمۡ فِيٓ أَزۡوَٰجِهِمۡ ﴾ [الاحزاب : ٥٠]
‘‘আমি জানি আমি তাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কী (মোহরানা) ফরয করেছি।’’ [সূরা আল-আহযাব: ৫০]
নারীদেরকে যত অধিকার আল্লাহ দিয়েছেন তা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে তাদেরকে নির্যাতন করার এখতিয়ার কারো নেই।
এছাড়া নারীর গৃহাস্থলী কাজের স্বীকৃতি আমরা দেখতে পাই আমীরুল মু’মেনীন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর জীবনে। এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর দৌরাত্মপনা সম্পর্কে অভিযোগ করার জন্য তার কাছে এসে দেখল যে, স্বয়ং উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর স্ত্রী চেঁচামেচি করছে আর উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ধৈর্য ধরে চুপ করে আছেন। সে ব্যক্তি ভাবল উমারের অবস্থা তো দেখি আমার চেয়ে খারাপ। তাই কিছুটা বিফল মনোরথ হয়ে সে চলে যেতে থাকলে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার আগমন ও প্রস্থান টের পেয়ে তাকে ডাকলেন এবং সবকিছু শুনে বললেন, দেখ আমাদের স্ত্রীদের অবদান আমাদের প্রতি অনেক বেশী। সুতরাং তাদের প্রতি আমাদের যথেষ্ট সহনশীল হওয়া উচিত।
৪. বাসা-বাড়ীতে কর্মরত কাজের মেয়ে এবং বুয়া ক্রীতদাসী নয়। ক্রীতদাস প্রথা আজ আর নেই। অথচ বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কি ক্রীতদাস-দাসীদের প্রতিও সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন,
«أَرِقَّاءَكُمْ أَرِقَّاءَكُمْ أَرِقَّاءَكُمْ أَطْعِمُوهُمْ مِمَّا تَأْكُلُونَ وَاكْسُوهُمْ مِمَّا تَلْبَسُون»
‘‘তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান! তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান! তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান! তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খেতে দেবে এবং তোমরা যা পরবে তাদেরকে তা পরতে দেবে।’’ [মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৬৪০৯, ২১৪৮৩, ২১৫১৫, আত-তাবাকাত আল-কুবরা ২/১৮৫]। সুতরাং তাদের প্রতি দূর্ব্যবহার করার কোনো স্থান ইসলামে নেই।
৫. নারীকে যে কোন ছুতোয় দৈহিকভাবে কিংবা মানসিকভাবে নির্যাতন করা শরীয়তে বৈধ নয়। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবনে তার কোনো স্ত্রী কিংবা কন্যার গায়ে হাত তোলেন নি।
৬. নারীকে অপবাদ দিয়ে মানসিক নির্যাতন করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلَّذِينَ يَرۡمُونَ ٱلۡمُحۡصَنَٰتِ ثُمَّ لَمۡ يَأۡتُواْ بِأَرۡبَعَةِ شُهَدَآءَ فَٱجۡلِدُوهُمۡ ثَمَٰنِينَ جَلۡدَةٗ وَلَا تَقۡبَلُواْ لَهُمۡ شَهَٰدَةً أَبَدٗاۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤ ﴾ [النور : ٤]
“আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।” [সূরা আন-নূর : ৪]
৭. স্বামী-স্ত্রীর অস্বস্তিকর জীবনের সুন্দর সমাধানের জন্য ইসলাম তালাকের বিধান রেখেছে। স্বামীর হাতে যদিও তালাকে প্রাথমিক অধিকার ন্যস্ত হয়েছে, কিন্তু সে অধিকার অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করাও শরীয়তে আরেকটি অন্যায় ও গোনাহরূপে বিবেচিত। মূলত বিবাহ যেমন mutual understanding এর ভিত্তিতে হয়ে থাকে তেমনি তালাকও সেরকম বোঝাপড়ার মধ্যে সম্পন্ন হওয়াই ইসলামের নির্দেশ। এজন্যই সাংসারিক অশান্তি দেখা দিলে উভয়ের মধ্যে দুপক্ষের সালিস বসিয়ে একটি সমাধানে পৌছার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
﴿وَإِنۡ خِفۡتُمۡ شِقَاقَ بَيۡنِهِمَا فَٱبۡعَثُواْ حَكَمٗا مِّنۡ أَهۡلِهِۦ وَحَكَمٗا مِّنۡ أَهۡلِهَآ إِن يُرِيدَآ إِصۡلَٰحٗا يُوَفِّقِ ٱللَّهُ بَيۡنَهُمَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرٗا ٣٥ ﴾ [النساء : ٣٥]
“আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশংকা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত।” [সূরা আন-নিসা : ৩৫]
কুরআনের spirit হচ্ছে দু’পক্ষ ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতেই একমত হয়ে তালাকের সিদ্ধান্ত নিবে। সালিসের পর করণীয় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿فَإِمۡسَاكُۢ بِمَعۡرُوفٍ أَوۡ تَسۡرِيحُۢ بِإِحۡسَٰنٖۗ ﴾ [البقرة: ٢٢٩]
“অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে।” [সূরা আল-বাকারাহ : ২২৯]
রাগের মাথায় তালাকের বিধান মূলত ইসলামে সমর্থিত নয়। এজন্যই প্রায় সকল মুসলিম আলেম একমত যে, প্রচণ্ড রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞানহারা হয়ে তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না। এছাড়া তিন তালাক একসাথে দিলে ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ ও ইবনুল কাইয়েমসহ আরো অনেক মুসলিম স্কলারের মতে এক তালাকই পতিত হবে। এসব তথ্য জানা থাকলে তালাকের অপব্যবহার বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব।
৮. আখেরাতের জবাবদিহিতা:
যদি কেউ নারী নির্যাতন করে থাকে তাহলে আখেরাতে তাকে এজন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ ব্যাপারে আয়াত ও হাদীসের সংখ্যা অত্যন্ত ব্যাপক। মূলত জবাবদিহিতা একজন মুসলিমকে উত্তম চরিত্রের মুসলিমে পরিণত করে।

উপসংহার:
বস্তুত ইসলামই যেমন নারীকে দিয়েছে সকল ন্যায্য অধিকার, তেমনি তাকে হেফাযতের ব্যবস্থা করেছে সকল প্রকার নির্যাতন থেকে। কেননা ইসলামী বিধান তো সে মহান সত্ত্বার কাছ থেকে অবতারিত যিনি নারীর স্রষ্টা। সুতরাং নারী-নির্যাতন মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে আমাদের জন্য ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। যদি প্রকৃতই ইসলাম মেনে চলা হয় তাহলে নারীর নির্যাতিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

মতামত দিন