আখলাক

ইসলামে দানশীলতা ও পরোপকারীতা

দান করার বিষয়টি উদার মনে সম্পদ ব্যয় করার উপরই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, যার অনেক স্তর ও শ্রেণী বিন্যাস রয়েছে। বদান্যতার সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে―আল্লাহর পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করা। কবি বলেন―

يجود بالنفــس إذ ضن البخيل بها ! والجود بالنفــس أقصى غاية الجود

তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করছেন, যদিও কৃপণ ব্যক্তি আপন জীবন দান করতে চায় না, মূলত: জীবন উৎসর্গ করাই হলো উঁচু পর্যায়ের বদান্যতা।

বদান্যতার আরেকটি স্তর হচেছ মুমিনদের কল্যাণে সময় দান করা এবং শিক্ষার্থী ও প্রশ্নকারীর জন্যে ইলম বণ্টন করা।

সকল মানুষের মাঝে সাহাবীগণই ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল।

সাহাবাদের জীবন উৎসর্গের নমুনা :

যে ব্যক্তি সাহাবীগণের জীবন-চরিত অধ্যয়ন করে, সে আল্লাহর রাহে সাহাবীগণের জীবন উৎসর্গের অনেক বিস্ময়কর ঘটনা দেখতে পাবে। নিম্নে কয়েকটি ঘটনা উলে­­খ করা হল।

(1)  আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বদর যুদ্ধে বলেন :―

قوموا إلي جنة عرضها السموات والأرض، فقال عمير بن الحمام الأنصاري رضي الله عنه : يا رسول الله ، جنة عرضها السموات و الأرض؟ قال : نعم، قال بخ بخ، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ما يحملك على قولك : بخ بخ ، قال : لا والله يا رسول الله إلا رجاء أن أكون من أهلها، قال : فإنك من أهلها، فأخرج تمرات من قرنه ، فجعل يأ كل منهن ، ثم قال : لئن أنا حييت حتى آكل تمراتي هذه إنها لحياة طويلة ، قال : فرمى بما كان معه من التمر ، ثم قاتلهم حتى قتل. (رواه مسلم : ৩৫২০)

তোমরা উঠ এবং জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীন বরাবর বিস্তৃত। একথা শুনে উমাইর ইবনে হামাম রা. বললেন―হে আল্লাহর রাসূল, জান্নাতের প্রশস্ততা আসমান ও যমীন বরাবর ? রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বললেন : হ্যাঁ। তিনি বললেন―বাখ! বাখ! রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বললেন, তুমি কি জন্যে বাখ! বাখ! শব্দ উচ্চারণ করলে ? বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি এ জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার আশায় এমনটি বলেছি। রাসূল বললেন, তুমি জান্নাতের অধিবাসী। তিনি তখন তার ব্যাগ থেকে কয়েকটি খেজুর বের করলেন এবং খেতে শুরু করলেন। অতঃপর বললেন আমি যদি সবগুলো খেজুর খাওয়া পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহলে তা অনেক দীর্ঘ জীবন। পরে তিনি অবশিষ্ট খেজুরগুলো নিক্ষেপ করে যুদ্ধে নেমে গেলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন।[1]

(2)  কোন এক যুদ্ধে আবু মূসা আশআরী রা. অংশগ্রহণ করেন। তিনি বললেন―রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বলেছেন :

إن أبواب الجنة تحت ظلال الــــسيوف… (رواه مسلم : ৩৫২১)

‘নিশ্চয় জান্নাতের দরজাসমূহ তলোয়ারের ছায়ার নীচে আছে।’ একথা শুনে অগোছালো পোশাক নিয়ে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে গেল এবং বলল হে আবু মূসা ; তুমি একথা রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম থেকে শুনেছ ? আবু মুসা রা. বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর সে সঙ্গীদের নিকট ফিরে গেল এবং বলল أقـــرأ عليـــكم الــــسلام আমি তোমাদেরকে সালাম করছি। অতঃপর তরবারির খাপ উন্মুক্ত করে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং শহীদ হয়ে গেল।[2]

আল্লাহর রাহে সম্পদ উৎসর্গ করার দৃষ্টান্ত :

(1)  উমর রা. ৪০০ (চার শত) দিনার হাতে নিয়ে তার গোলামকে বললেন, এগুলো আবু উবাইদার নিকট নিয়ে যাও। অতঃপর দূরে সরে থেকে লক্ষ্য কর তিনি সেগুলো কি করেন ? গোলাম সেগুলো নিয়ে তার নিকট গিয়ে বললেন, আমীরুল মুমিনীন এগুলো গ্রহণ করতে বলেছেন। তিনি (আবু উবাইদা) বললেন, আল্লাহ তার উপর দয়া করুক। অতঃপর তার বাঁদীকে বললেন, যাও সাতটি দিনার নিয়ে অমুকের নিকট যাও, আর এই পাঁচটি অমুকের নিকট নিয়ে যাও। ঐ মজলিসে বসেই তিনি সবগুলো দিনার শেষ করে ফেললেন। অতঃপর গোলাম উমর রা. এর নিকট ফিরে আসল এবং পূর্ণ ঘটনা খুলে বলল। এদিকে উমর রা. ঐ পরিমাণ দিনার মুয়ায ইবনে জাবাল রা.-এর জন্যে গণনা করে রাখলেন এবং সেগুলোও পাঠিয়ে দিলেন। মুয়ায রা. বললেন, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখুক। হে বাঁদী অমুক ব্যক্তির ঘরে এ পরিমাণ নিয়ে যাও। আর অমুক ঘরেও দিয়ে আস। মুয়ায রা.-এর স্ত্রী জানতে পেরে বললেন, আল্লাহর কসম আমরাও মিসকীন-দারিদ্রক্লিষ্ট। অতএব, আমাদেরও কিছু দিন। তখন পাত্রে মাত্র দুই দিনার অবশিষ্ট ছিল। তিনি মাত্র দুই দিনারই স্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন। গোলাম এসে উমর রা.-কে ঘটনা শোনালে তিনি খুশি হলেন এবং বললেন তারা সকলে ভাই ভাই। সবাই সবার উপকারে এগিয়ে আসে।

(2) তালহা ইবনে উবাইদুল­াহ রা.-এর দানের কাহিনি উলে­খযোগ্য। তাকে বলা হত طلحة الجود (দানবীর তালহা) ও طلحة الفيّاض(পরোপকারী তালহা) একবার হাযরামাওত থেকে তার নিকট কিছু মাল আসল। পরিমাণ সাত হাজার। তিনি ঐ রাতে খুব পেরেশান অবস্থায় ছিলেন। তার স্ত্রী তাঁকে বললেন আপনার কি হলো ? রাত থেকে কি যেন চিন্তা করছেন ? তালহা রা. বললেন : ঐ ব্যক্তির রব সম্পর্কে তার কি ধারণা যে এতগুলো মাল ঘরে রেখে রাত্রিযাপন করে ? তার স্ত্রী বললেন―আপনার বন্ধুদের পথ ধরে চলতে পারেন না ? যখন আপনি সকালে উপনীত হবেন তখন মালগুলো বণ্টন করে ফেলবেন। তিনি স্ত্রীকে বললেন আল্লাহ তোমাকে তৌফিক দান করুক। তুমি তৌফিক প্রাপ্তের মেয়ে তৌফিকপ্রাপ্তা। (অর্থাৎ আবু বকরের মেয়ে উম্মে কুলছুম।) সকাল হলে তিনি সব সম্পদ মুহাজির ও আনসারগণের মাঝে বণ্টন করে দিলেন। স্ত্রী তাকে বললেন―আমরা কি এ মালের কোন অংশ পাই না ? তিনি বললেন তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে ? এখন যা বাকি আছে তা তুমি নিয়ে নাও। থলের মাঝে তখন মাত্র এক হাজার দিরহাম অবশিষ্ট ছিল।

পরার্থপরতা ও অপরকে প্রাধান্য দেয়া :

إيـــثار এর মাঝে جود এর অর্থ বিদ্যমান। বরং তাতে দানের অর্থ আরো বেশি লুক্কায়িত আছে। কেননা, إيـــثار এর অর্থ হচ্ছে নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অপরকে প্রাধান্য দেয়া। এর অনেকগুলো স্তর রয়েছে।

(1) সব কিছুর উপর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়া। দুনিয়ার উপর আখেরাতকে এবং ধ্বংসযোগ্য অস্থায়ী জিনিসের উপর স্থায়ী জিনিসকে প্রাধান্য দেয়া। এটি সর্বোচ্চ স্তর।

(2) আল্লাহর সৃষ্টিকে প্রাধান্য দেয়া। অর্থাৎ নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে দান করা। আর এসব কিছুই হতে হবে আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে। প্রশংসা কিংবা পদ-লাভের উদ্দেশ্যে নয়।

এ প্রকারের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে―অপরের জন্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করা। কোন কোন সাহাবী রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­ামকে বলতেন―

نفـــسي فداك، ونحــري دون نحــرك.

আমার জীবন আপনার জন্যে উৎসর্গ করলাম। আরো একটি স্তর হচ্ছে―সম্পদের দ্বারা অপরকে প্রাধান্য দেয়া। আল্লাহ আনসারদের প্রশংসা করেছেন যখন তারা মুহাজির ভাইদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দিয়েছে―

وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿9﴾ (سورة الحشر : 9)

‘যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং ঈমান আনয়ন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে। মুহাজিরদের যা দেয়া হয়েছে তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত তারাই সফলকাম।’[3]

নবী সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম ও সাহাবাগণ অপরকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে সকল উম্মত অপেক্ষা অগ্রগামী ছিলেন।

(1)  সাহল ইবনে সা’দ রা. বলেন : নবী কারীম সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম-এর নিকট একজন মহিলা একটি চাদর নিয়ে আসল। এসে বলল : হে আল্লাহর রাসূল ! আপনাকে আমি এই চাদরটি পরাতে চাই। রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম খুব আগ্রহ সহকারে চাদরটি গ্রহণ করে পরিধান করলেন। এক সাহাবী রাসূলের গায়ে চাদরটি দেখে বললেন―চাদরটি কতই না সুন্দর। এটি আমাকে পরিয়ে দিন। নবী কারীম সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বললেন, নাও। নবী করিম সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম মজলিস থেকে চলে গেলে উপস্থিত সাহাবীগণ লোকটিকে তিরস্কার করতে লাগলেন। তারা বললেন, তুমি যখন দেখলে রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম আগ্রহ সহকারে চাদরটি পরিধান করেছেন তখন তোমার জন্যে তাঁর চাদরটি চাওয়া ঠিক হয়নি। তুমি তো ভাল করেই জান কেউ কিছু চাইলে তিনি কখনও না বলেন না। তিনি বললেন, আমি রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম-এর পরিধেয় বস্ত্রের বরকত অর্জন করতে চেয়েছি, আমার আশা এটি যেন আমার কাফন হয়।

(2) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল ক্ষুধার কারণে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বিবিগণের নিকট পাঠিয়ে কিছুই পেলেন না। অতঃপর রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বললেন, এমন কে আছে, যিনি আজকের রাতে এ ব্যক্তির মেহমানদারী করতে পারবে ? আল্লাহ তার উপর রহম করুক। একজন আনসারী সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন, আমি পারব। তিনি ঐ ব্যক্তিকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম-এর মেহমান। অতএব কোন কিছু তাকে না দিয়ে রেখে দিও না। স্ত্রী বললেন, আমার নিকট বাচ্চাদের খাবার ব্যতীত অতিরিক্ত কিছুই নেই। সাহাবী বললেন, রাতে যখন বাচ্চারা খাবার চাইবে তখন তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। আর তুমি বাতি নিভিয়ে ফেলবে। আমরা আমাদের পেট আজ রাতে বেধে রাখব। স্ত্রী তা-ই করলেন। সাহাবী সকাল বেলা রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম-এর নিকট উপস্থিত হলে রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বললেন, আল্লাহ তাআলা অমুক স্বামী ও স্ত্রীর কাজ দেখে আশ্চর্য হয়েছেন অথবা হেসেছেন।

তথ্যসূত্র :-

[1] মুসলিম : ৩৫২০

[2] মুসলিম : ৩৫২১

[3] হাশর-৯

মতামত দিন