ইসলামের ইতিহাস

মিরাজের ইতিহাস ও শিক্ষা (শেষ পর্ব)

মিরাজের ইতিহাস ও শিক্ষা

আগের পর্বের লিংক

রচনায়:-  মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

মিরাজ পরবর্তী ঘটনা

আব বকর (রা) এর “সিদ্দীক” উপাধি লাভ:

আয়েশা (রা) বলেন, একরাতেই বায়তুল্লাহ থেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাস যাতায়েরত অকল্পনীয় খবর শুনে নওমুসলিম অনেকে মুরতাদ হয়ে যায়। (কেননা মক্কা থেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাস যেতে তখন কমপক্ষে একমাস সময় লাগত)। তাদের অনেকে আবুবকর (রাঃ)-এর নিকটে এসে বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করল, আপনার সাথীর কিছু হয়েছে কি ? তিনি একরাতেই বায়তুল মুক্বাদ্দাস সফর করে এসেছেন বলে দাবী করছেন ? আবুবকর বললেন, হ্যাঁ। যদি তিনি একথা বলে থাকেন, তবে তা অবশ্যই সত্য। এর চাইতে আরও দূরবর্তী আসমানের খবর আমি সকাল ও সন্ধায় তাঁর কাছ থেকে শুনি ও বিশ্বাস করি’। আয়েশা বলেন, সেদিন থেকেই তাঁকে ‘আছ-ছিদ্দীক্ব’ বা ‘অতীব সত্যবাদী’ নামকরণ করা হয় ।১৪

উল্লেখ্য যে, আবু জাহলের প্রস্তাবক্রমে মক্কার নেতাদেরকে কা’বা চত্বরে ডাকা হয় । অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের প্রশ্নসমূহের উত্তর দিতে থাকেন। যাতে তারা নিশ্চিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অবশ্যই স্বচক্ষে তা দর্শন করে এসেছেন। ‘এসময় আল্লাহ পাক তাঁর চোখের সম্মুখে বায়তুল মুক্বাদ্দাসকে তুলে ধরেছিলেন’।১৫ এতদসত্ত্বেও তারা ঈমান আনেনি ।

উল্লেখ্য যে, মি’রাজকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করার অহেতুক কসরত করার চেয়ে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করার মধ্যেই আত্নিক প্রশান্তি ও বৈজ্ঞানিক উন্নতি নিহিত রয়েছে । যে যুগের লোকেরা এটা বিশ্বাস করে মুমিন হয়েছেন, আজকের রকেট ও ইন্টারনেটের যুগের তুলনায় সেটা খুবই কষ্টকর ছিল। আগামী দিনে বিজ্ঞান হয়ত আরও এগিয়ে যাবে। কিন্তু তখন আমরা থাকব না। অতেব বিজ্ঞানের প্রমাণের অপেক্ষায় না থেকে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যু বরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

মি‘রাজ অবিশ্বাসীদের পরিণামঃ

মুসনাদে আহমাদে ছহীহ সনদে ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘মি’রাজের ঘটনাকে অবিশ্বাসকারী মুরতাদ কাফিরগুলি আবু জাহলের সাথে (বদরের যুদ্ধে) নিহত হয়’ ।১৬

 

মি‘রাজে কি রাসূল স্বীয় প্রভুকে দেখেছিলেন ?

এ বিষয়ে চূড়ান্ত জবাব এই যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আল্লাহকে স্বরূপে দেখেননি । অনুরূপ কথা কোন ছাহাবীও কখনো বলেননি ।১৭ বরং তিনি আল্লাহর নূর দেখেছিলেন ।১৮ আয়েশা (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি বলবে মুহাম্মাদ আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন বা তিনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তার কিছুলুকিয়েছেন বা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত পাঁচটি অদৃশ্য বিষয় তিনি জানেন, ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বড় অপবাদ দিয়েছে। বরং তিনি জিব্রাইলকে দু’বার দেখেছিলেন । শেষবার সিদরাতুল মুনতাহায় এবং প্রথমবার নিম্ন মক্কায় ‘আজিয়াত’ নামক স্থানে (প্রথম অহী নাযিলের সময়) ৬০০ ডানা বিশিষ্ট তার মূল চেহারায়, যা দিগন্ত ঢেকে নিয়েছিল ।১৯ মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়াতে কেউ আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখতে পারবে না (আন‘আম ১০৪, আ‘রাফ ১৪৩ ) ।

মি‘রাজ কয়বার ও কখন হয়েছেঃ

এ বিষয়ে ইবনু কাছীর বলেন, মি‘রাজ সম্পর্কে বর্ণিত ছহীহ, হাসান, যঈফসকল প্রকারের বর্ণনা একত্রিত করলে তার সারকথা দাড়ায় এই যে, মক্কা থেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাসে ‘ইসরা’ অর্থাৎ মে‘রাজের উদ্দেশ্যে রাত্রিকালীন সফর মাত্র একবার হয়েছিল, একাধিক নয় । যদি একাধিক হত, তাহলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সে বিষয়ে উম্মতকে অবহিত করে যেতেন । খ্যাতনামা জ্যেষ্ঠ তাবেঈ ইবনু শিহাব যুহরীর বরাতে তিনি বলেন যে, হিজরতের এক বছর পূর্বে মে’রাজ সংঘটিত হয়েছিল’।

ছফিউর রহমান মুবারকপুরী এ বিষয়ে ৬টি মতামত উল্লেখ করেছেন । যথাঃ

(১) নবুঅত প্রাপ্তির বছর । এটি ইমাম ইবনু জারীর ত্বাবারীর মত

(২) ৫ম নববী বর্ষে । এটাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন ইমাম নববী ও ইমাম কুরতুবী

(৩) ১০ম নববী বর্ষের ২৭শে রজবের রাতে । এটা পসন্দ করেছেন সুলায়মান মানছুরপুরী

(৪) কেউ বলেছেন, হিজরতের ১৬ মাস পূর্বে ১২ নববী বর্ষের রামাযান মাসে

(৫) কেউ বলেছেন, হিজরতের ১৪ মাস পূর্বে ১৩ নববী বর্ষের মুহারম মাসে ।

(৬) কেউ বলেছেন, হিজরতের এক বছর পূর্বে ১৩ নববী বর্ষের রবীউল আউয়াল মাসে ।

অতঃপর মুবারকপুরী বলেন, প্রথম তিনটি মত গ্রহনযোগ্য নয় একারণে যে, খাদীজা (রাঃ) ১০ম নববী বর্ষের রামাযান মাসে মারা গেছেন, তখন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয হয়নি । আর এ বিষয়ে সকলে একমত যে, ছালাত মি‘রাজের রাত্রিতে(অতএব ২৭শে রজব তারিখে মি‘রাজ হয়েছে বলে যে কথা চালু আছে, তার কোন ভিত্তি নেই) । বাকী তিনটি মত সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলির কোনটিকে আমি অগ্রাধিকার দেব ভেবে পাইনা । তবে সূরা বনী ইসরাঈলে বর্ণিত আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্ক এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, ইসরা-র ঘটনাটি খুবই শেষের দিকে হয়েছিল’ ।২০

বলা বাহুল্য যে, আল্লামা মুবারকপুরীর এ মন্তব্য পূর্বে বর্ণিত তাবেঈ বিদ্বান মুহাম্মাদ বিন মুসলিম ওরফে ইবনু শিহাব যুহরী(৫০-১২৪হিঃ)-এর বরাতে ইবনু কাছীরের বক্তব্যকে সমর্থন করে । অর্থাৎ হিজরতের এক বছর পূর্বে মি‘রাজ হয়েছে । তবে সঠিক তারিখ বা দিনক্ষণ জানা যায় না । আর সঠিক দিন-তারিখ অন্ধকারে রাখার কারণ এটাই, যাতে মুসলমান মি‘রাজের শিক্ষা ও তাৎপর্য ভুলে একে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় বেঁধে না ফেলে এবং সর্বাস্থায় আল্লাহর আনুগত্যে থেকে আত্নিক ও জাগতিক উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহনের চেষ্টায় রত থাকে । দুর্ভাগ্য যে, এখন সেটাই হচ্ছে । আমরা এখন মি‘রাজের মূল শিক্ষা বাদ দিয়ে অনুষ্ঠান সর্বস্ব হয়ে পড়েছি । আমরা এখন উন্নয়ন মুখী না হয়ে নিম্নমুখী হয়েছি । মি‘রাজের রূহ হারিয়ে তার অনুষ্ঠান নামক কফিন নিয়ে আমরা মেতে উঠেছি ।

 

মি‘রাজের শিক্ষা ও তাৎপর্যঃ

সূরা বনু ইসরাঈলের শুরুতে মাত্র একটি আয়াতে আল্লাহ পাক ইসরা ও মি‘রাজের এ ঘটনা ও তার উদ্দেশ্য অতীব সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন । এখানে মক্কা থেকে বায়তুল মুক্কাদ্দাসে ভ্রমণ করানোর তৎপর্য হতে পারে এই যে, অতি সত্ত্বর পৃথিবী হতে ইহুদীদের কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাসে ও পৃথিবী ব্যাপী সর্বত্র মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে । ১৫ হিজরীতে এটা বাস্তবায়িত হয় ওমর ফারূকের হাতে বায়তুল মুক্বাদ্দাস বিজয়ের মাধ্যমে রাসূলের মৃত্যুর মাত্র চার বছরের মাথায় । উল্লেখ্য যে, ইহুদী থেকে মুসলমান হওয়া ছাহাবী কা‘ব আল-আহবারের পরামর্শ অগ্রাহ করে ওমর ফারূক (রাঃ) ছাখরাকে পিছনে রেখে ক্বিবলার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেখানেই ছালাত আদায় করেন, যেখানে মি‘রাজের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাত আদায় করেছিলেন’ ।২১

অতঃপর তৎকালীন বিশ্বের সকল পরাশক্তি মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকারে বাধ্য হয় । অতঃপর উমইয়া,আব্বাসীয়, স্পেনের উমাইয়া ও মিশরের ফাতেমীয় খেলাফত সারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে । সর্বশেষ তুরষ্কের ওছমানী খেলাফত বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মাত্র ১৯২৪ খৃষ্টাব্দে শেষ হল । মুসলমান আবারও তার হারানো কর্তৃত্ব ফিরে পাবে, যদি সে ইসলামের পথে ফিরে আসে ।

সূরা ইসরায় বিশ্ব বিজয়ের এই ইঙ্গিতটি দেওয়া হয়েছিল এমন একটি সময়ে, যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনগণ কর্তৃক নিন্দিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় মক্কা পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন । এতে বুঝা যায় যে, মূল বিজয় নিহিত থাকে সঠিক আক্বীদা ও আমলের মাধ্যে । অর্থ-বিত্ত, জনশক্তি ও ক্ষাত্র শক্তির মধ্যে নয় ।

২য় তাৎপর্য- মি‘রাজের ঘটনা সংঘটিত হয় ১২ নববী বর্ষের হজ্জের মওসুমে আক্বাবায়ে ঊলার কিছু পূর্বে অথবা ১৩ নববী বর্ষের হজ্জের মওসুমে অনুষ্ঠিত আক্বাবায়ে কুবরার পূর্বে । অর্থাৎ মি‘রাজের ঘটনা পরপরই ইসলামী বিপ্লবের পূর্বশর্ত হিসেবে ইমারত ও বায়‘আতের ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয় মিনা প্রান্তরে এবং তার পরেই তিনি মদীনায় হিজরত করেন । অতঃপর সেখানে ইসলামী সমাজের রূপরেখা বাস্তবায়িত হয় ।

৩য়- মি ‘রাজের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘যাতে আমি তাকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই’। এটা একারণে যে, لَيْسَالْخَبْرُكَالْمُعَايِنَةِ‘সংবাদ কখনো স্বচক্ষে দেখার মত হয় না’ । এর মধ্যে দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় প্রতিভাত হয় যে, ইতিপূর্বে ইবরাহীম ও মূসাকে দুনিয়াতেই আল্লাহ স্বীয় কুদরতের কিছু নমুনা দেখিয়েছেন (আন‘আম ৭৬, ত্বহা ২৩) । কিন্তু কোন নবীকে আখেরাতের দৃশ্য স্বচক্ষে না দেখিয়ে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রত্যক্ষ করানোর মাধ্যমে এটাই বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, তিনিই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী । আর কেউ এই সুযোগ পায়নি এবং পাবেও না । তৃতীয়তঃ আদৃশ্য জগতের যেসব খবর নবীদের মাধ্যমে জগতবাসীর নিকটে পৌছানো হয়, ওয়াহী-র মাধ্যমে প্রাপ্ত সেই সব খবরের সত্যতা স্বচক্ষে যাচাইয়ের মাধ্যমে শেষনবীসহ বিশ্ববাসীকে নিশ্চিতভাবে আশ্বস্ত করা হল । চতুর্থতঃ এর দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, মানব জাতির জন্য অনুসরণীয় আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ দ্বীন হল ইসলাম ও সর্বশেষ নবী হলেন মুহাম্মাদ (ছাঃ) ।

৪র্থ- এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত রয়েছে মানবজাতির উন্নতিকামী প্রতিভাবান, চিন্তাশীল ও কর্মঠ ব্যক্তিদের জন্য এ বিষয়ে যে, কুর’আন-হাদীছ গবেষণা ও তা অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল দুনিয়ায় সর্বোচ্চ উন্নতি ও আখেরাতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব । অন্য কোন পথে মানবজাতির সত্যিকারের উন্নতি ও মঙ্গল নিহিত নেই । বস্তুতঃ মি‘রাজের পথ ধরেই মানুষ দুনিয়াতে কেবল চন্দ্র বিজয় নয়, সৌর বিজয়ের পথে উৎসাহিত হতে পারে । একইভাবে সে আখিরাতে জান্নাতুল ফিরদাউস লাভে ধন্য হতে পারেন ।

৫ম- মি‘রাজের ঘটনায় একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আল্লাহ নিজ সত্তায় সপ্ত আসমানের উপরে নিজ আরশে সমাসীন । তাঁর সত্তা সর্বত্র বিরাজমান নয়, বরং তাঁর ইলম ও কুদরত সর্বত্র বিরাজমান । তিনি নিরাকার নন, বরং তাঁর নিজস্ব আকার আছে । তবে তা কারো সাথে তুলনীয় নয় । তিনি কথা বলেন, তিনি শোনেন ও দেখেন ।

৬ষ্ঠ- মি‘রাজে নিজ সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে আল্লাহ পাক মানব জাতির জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের যে তোহফা প্রদান করলেন, এর দ্বারা একথাই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও ভীতিপূর্ণ ভালবাসার জন্য মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত সৎ মানুষ তৈরি হতে পারে এবং প্রকৃত অর্থে সামাজিক শান্তি, উন্নতি ও অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে। অতএব সমাজ বিপ্লবের আবশ্যিক পূর্বশর্ত হল মানুষের নিজের মধ্যেকার আত্নিক ও নৈতিক বিপ্লব সাধন। সলাতই হল আত্ন সংশোধনের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান। অতএব ‘তাযকিয়ায়ে নাফস’ বা আত্নশুদ্ধির নামে কথিত অলি-আউলিয়া ও পীর-মাশায়েখদের তৈরি হরেক রকমের মা’রেফতী ও ছূফীবাদী তরীকা সমূহ দ্বীনের মধ্যে সৃষ্ট বিদা’আত বৈ কিছু নয়। যা থেকে দূরে থাকা কর্তব্য ।

রজব মাসের ফযীলতঃ

এ মাসের সবচাইতে বড় ফযীলত এই যে, এটি চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। বাকী তিনটি হ’ল যুলক্বা’দাহ, যুলহিজ্জাহ ও মুহাররাম। এ চার মাসে মারামারি, খুনা-খুনি নিষিদ্ধ। জাহেলী আরবরাও এ চার মাসের সম্মানে আপোষে ঝগড়া-ফাসাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রাখত। ইসলামেও তা বহাল রাখা হয়েছে (তওবা ৩৬)। অতএব এ মাসের সম্মানে মারামারি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে দূরে থাকাই বড় নেকীর কাজ।

 

উল্লেখ্য যে, জাহেলী যুগে আরবরা রজব মাসের বরকত হাছিলের জন্য তার প্রথম দশকে তাদের দেব-দেবীর নামে একটি কুরবানী করত। যাকে ‘আতীরাহ’ বা ‘রাজাবিয়াহ’(العتيرة او الرجبية ) বলা হ’ত। ইমাম তিরমিযী বলেন, রজব মাসের সম্মানে তারা এ কুরবানী দিত। কেননা এটি ছিল চারটি নিরাপদ ও সম্মানিত মাসের প্রথম মাস’। কেউ কেউ তাদের পালিত পশুর প্রথম বাছুর দেব-দেবীর নামে কুরবানী দিত তাদের মাল-সম্পদে প্রবৃদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যে, যাকে ‘ফারা’فرع বলা হ’ত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এগুলিকে নিষেধ করে দেন’। [মুত্তাফাক্ব আলাইহ মিশকাত হা/১৪৭৭; মির’আত হা/১৪৯১-এর ভাষ্য]। দুর্ভাগ্য আজকের মুসলমানেরা জাহেলী আরবদের অনুকরণে রজব মাসের নামে হরেক রকমের বিদ’আত করছে। অথচ আল্লাহ্‌র হুকুম মেনে তার সম্মানে আপোষে হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রাখতে পারেনি।

 

রজব মাসের বিদ’আত সমূহঃ

রজব মাসের জন্য বিশেষ ছিয়াম পালন করা, ২৭শে রজবের রাত্রিকে শবে মে’রাজ ধারণা করে ঐ রাতকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা, উক্ত উদ্দেশ্যে বিশেষ কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা, যিকর-আযকার, শাবীনা খতম ও দো’আর অনুষ্ঠান করা, মীলাদ ও ওয়ায মাহফিল করা, ঐ রাতের ছওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, সরকারী ছুটি ঘোষণা করা ও তার ফলে জাতীয় অর্থনীতির বিশাল অংকের ক্ষতি করা, ছহীহ হাদীছ বাদ দিয়ে মে’রাজের নামে উদ্ভট সব গল্পবাজি করা, মে’রাজকে বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণ করতে গিয়ে অনুমান ভিত্তিক কথা বলা, ঐদিন আতশবাজি, আলোক সজ্জা, কবর যিয়ারত, দান-খয়রাত, এ মাসের বিশেষ ফযীলত লাভের আশায় ওমরাহ পালন ইত্যাদি সবই বিদ’আতের পর্যায়ভুক্ত। অনেক রাজনৈতিক মুফাসসিরে কুরআন বলেন, এরাতে ইসলামী শাসনতন্ত্রের ১৪ দফা মূলনীতি নাযিল হয়েছে। দলীল হিসাবে তাঁরা সূরা বনু ইসলাঈলের ২৩ থেকে ৩৫ আয়াত পর্যন্ত পড়তে বলেন। অথচ ঐ মুফাসসির এতটুকু নিশ্চয়ই জানেন যে, মি’রাজে মূলতঃ কেবল পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতই ফরয করা হয়েছিল।

অনেক জাহিল কুরআনের কিছু আয়াত ও কিছু ছহীহ হাদীছের দোহাই পেড়ে নিজেদের আবিস্কৃত বিদ’আত সমূহকে প্রমাণসিদ্ধ করতে চান। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁর গুণগান কর’(আহযাব ৪১-৪২)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতা মণ্ডলী নবীর উপরে রহমত বর্ষণ করে থাকেন। অতএব হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাঁর উপরে বেশী বেশী দরূদ ও সালাম পেশ কর’(আহযাব ৫৬)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘যখন তোমাকে আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দাও যে,) আমি (তার) অত্যন্ত নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে থাকি, যখন সে আমাকে আহ্বান করে’(বাক্বারাহ ১৮৬)।‘তোমরা আমাকে ডাক। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’(গাফের (মু’মিন) ৬০)। একটি ছহীহ হাদীসে রয়েছে

الصلاة خير موضوع فمن استطاع أن يستكثر فليستكثر‘ছালাত আল্লাহর পক্ষ থেকে তৈরী করা সর্বোত্তম বস্তু। অতএব যে ব্যক্তি ক্ষমতা রাখে, সে যেন বেশী বেশী তা করে’ (অর্থাৎ যেন বেশী বেশী নফল ছালাত আদায় করে)। [ত্বাবারাণী আওসাত্ব, হাদীছ হাসান, ছহীহুল জামে’ হা/৩৮৭০]।

উপরোক্ত সাধারণ নির্দেশাবলী সম্বলিত আয়াত ও হাদীছের দোহাই দিয়ে রাসূলের সুন্নাত ও বাস্তব আমলের তোয়াক্কা না করে অসংখ্য ভিত্তিহীন যিকর, দো’আ ও ছালাত এদেশে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং তা সমাজে ব্যাপকভাবে চালু হয়েছে কিছু সংখ্যক বিদ’আতী মৌলবী ও রেওয়াজপন্থী সমাজনেতাদের মাধ্যমে। অথচ তারা একবারও ভাবে না যে, এইসব আয়াত যে নবীর উপরে নাযিল হয়েছে এবং উক্ত হাদীছ যে নবীর মুখ দিয়ে হয়েছে, তিনি কখনো এসব বিদ’আতী অনুষ্ঠানের ধারে কাছে যাননি। অনেক বিদ’আতপন্থী ব্যক্তি বলে থাকে যে, ‘রাসূল তো নিষেধ করেন নি’। অথচ শুরুতেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসব থেকে নিষেধ করে গেছেন এই বলে যে,

من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد

‘যে ব্যক্তি এমন আমল করল, যে বিষয়ে আমাদের হুকুম নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’। [মুসলিম হা/১৭১৮ ‘বিচার কার্য সমূহ’ অধ্যায়]।

তিনি মৌলিকভাবে সকল প্রকার বিদ’আতকে নিষেধ করে গেছেন, নাম ধরে ধরে নয়। কেননা ক্বিয়ামত পর্যন্ত নানা রকমের বিদ’আত আবিষ্কৃত হবে। সে সবের নাম জানা কারু পক্ষে সম্ভব নয়।

অতএব বল হে দুনিয়াপূজারী বিদ’আতীরা! যে রাসূল মি’রাজে গিয়েছিলেন, তিনি কি কখনো এজন্য বিশেষ কোন দো’আ, ছালাত, ছিয়াম, ওয়ায মাহফিল, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম,উমরাহ পালন, দান-খয়রাত, কবর-যিয়ারত, ভাল খানা-পিনার ব্যবস্থা, রকমারি সাজ-সজ্জা, লেখাপড়া, কাজ-কাম সব বাদ দিয়ে ঘরে বসে ছুটি পালন ইত্যাদি করেছেন? তাহ’লে তিনি কি উপরে বর্ণিত আয়াত সমূহের নির্দেশ লংঘন করে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছেন? তাঁর শ্রেষ্ঠ চার জন খলীফাও কি ঐ আয়াত গুলির মর্মার্থ বুঝেন নি?

অতএব শারঈ বিষয়ে এ মূলনীতিটি সর্বদা মনে রাখা উচিত যে, যে সকল ইবাদত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যেভাবে করেছেন, সেগুলি সেভাবে করাটাই সুন্নাত। অনুরূপভাবে যে সকল ইবাদত তিনি পরিত্যাগ করেছেন, সেগুলি পরিত্যাগ করাটাই সুন্নাত। যেমন সফরে তিনি যোহর-আছর এবং মাগরিব-এশা জমা ও ক্বছর করেছেন, সুন্নাত পড়েননি। আমাদেরও সেটা করা সুন্নাত। নিজের জন্ম দিবস তিনি কখনোই পালন করেননি। আমাদেরও তা মীলাদের নামে পালন না করাটাই সুন্নাত। শা’বানে তিনি অধিকহারে ছিয়াম পালন করেছেন। আমরা সেটা করব। কিন্তু তিনি প্রচলিত ‘শবেবরাত’ পালন করেননি। খাছ করে ১৪ই শা’বান দিবাগত রাতে নফল ইবাদত ও ১৫ই শা’বান দিবসে নফল ছিয়াম পালন করেননি, করতে বলেননি। ছাহাবীগণও করেননি। অতএব আমাদের তা না করাটাই সুন্নাত। মি’রাজ উপলক্ষে তিনি কোন বাড়তি ইবাদত বা কোন অনুষ্ঠানাদি করেননি। অতএব আমাদেরও কিছু না করাটাই হবে সুন্নাত। আর করাটা হবে বিদ’আত। মোট কথা সুন্নাতের অনুসরণের মধ্যেই জান্নাত রয়েছে, বিদ’আতের মধ্যে নয়।

সুন্নাতের রাস্তা ধরে নিশ্চিন্তে চলো হে পথিক!

জান্নাতুল ফিরদাউসে সিধা চলে গেছে এ সড়ক।

 

তথ্যসূত্র :

১৪. বায়হাক্বী, তাফসীরে ইবনে কাছীর ৩/২৪; আর-রাহীকুল মাখতূম পৃঃ১৪০ ।

১৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৬৬-৫৮৬৭; তাফসীর ইবনু কাছীর ৩/২৩ ।

১৬. তাফসীর ইবনু কাছীর ৩/১৬ ।

১৭. আর-রাহীক্ব পৃঃ ১৩৯ ।

১৮. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৫৯ ‘আল্লাহ দর্শন’ অনুচ্ছেদ ।

১৯. তিরমিযী, মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৬১-৬২; আর-রাহীক্ব পৃঃ ১৩৯ ।

২০. আর-রাহীকুল মাখতূম পৃঃ ১৩৭ ।

২১. আহমাদ, তাফসীরে ইবনে কাছীরে ৩/১৯ ।

মতামত দিন