প্রবন্ধ

বাইআত কি ও কেনো ? (পর্ব ২)

( আগের পর্বের লিংক)

বাইআহ এর প্রকারভেদঃ
বাইআহ দুই প্রকার।
যথাঃ বাই‘আতুল ইনয়িক্বাদ ও আল বাই‘আতুল আম্মাহ।

বাই‘আতুল ইনক্বিয়াদঃ
এটি হলো ইসলামী রাষ্টের আমীর নির্বাচনের জন্যে নির্বাচক পরিষদের বাইআহ। তারা কোন একজন যোগ্য আমীর নির্বাচন করে তাকে সাহায্য ও তার আনুগত্য করার জন্যে বাইআহ গ্রহণ করবে। তারপর অন্যেরা তার নিকট বাইআহ গ্রহণ করবে। আর এই বাইআহ খুলাফায়ে রাশেদার সময় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটা প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ছিল না। এটা গণতান্ত্রিক সরকারের তত্বাবধায়ক সরকারের মত। পার্থক্য এতটুকু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানকে তত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের নিকট থেকে বাইআহ নিতে হয় না। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের কাছে বাইআহ ঈমানী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। সরকার গঠনের এই বিশেষ বাইআহকে বাইআতুল ইনয়িক্বাদ বলে।

বাইআতুল আম্মাহ বা সাধারণ বাইআহঃ
এটি নির্বাচকমন্ডলী কর্তৃক আমীর নির্বাচন করার পর তারা আমীর হিসাবে যার নাম ঘোষণা করবেন। তারপর নির্বাচকমন্ডলী নির্বাচিত আমীরের বাইআহ গ্রহণ করবেন। অতঃপর সাধারণ মুসলিমগণ তার কাছ থেকে বাইআহ বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করবেন। উদাহরণ স্বরুপঃ প্রথম খলিফা নির্বাচনে নির্বাচকমন্ডলী সাকীফাহ বানী সাআদাহ এ আবু বকর (রা) কে খলিফা নির্বাচন করেন, তারপর উমর (রা) জনগনকে সংবাদ দেন আবু বকর (রা) কে আমীরুল মু‘মিনীন হিসাবে মনোয়ন দেওয়া হয়েছে। আপনারা তার কাছে বাইআহ নিন। তখন সাধারণ মুসলিমগণও তার নিকট বাইআহ গ্রহণ করলেন। এটাই হলো সাধারণ বাইআহ।

কোন কোন ক্ষেত্রে বাইআহ প্রজোয্যঃ
সাধারণত তিনটি ক্ষেত্রে আমীরের প্রয়োজন হয় যার নিকট বাইআহ গ্রহণ ওয়াজিব। যথাঃ
১. ইসলামী রাষ্ট্রের আমীর নির্বাচনের জন্যে।
২. আমীরের মৃত্যুতে নতুন আমীর বা রাষ্টপ্রধান নির্বাচনে।
৩. ইসলামী বিধানের আলোকে পদচ্যুত আমীরের স্থলে নতুন আমীর মনোনয়নে।

বাইআহ এর শর্তাবলীঃ
প্রতিটি কাজের শর্ত ও তা ভঙ্গের কারণ রয়েছে। যেমন ইসলাম গ্রহণের শর্তাবলী, ইসলাম ভঙ্গের কারণাবলী, অযুর শর্তাবলী, অযু ভঙ্গের শর্তাবলী, সিয়ামের শর্তাবলী, সিয়াম ভঙ্গের কারণসমূহ, অনুরুপভাবে বাইআহ এর শর্তবলী ও বাইআহ ভঙ্গের কারণাবলী রয়েছে।
প্রধান প্রধান শর্তগুলো নিম্নরুপঃ
ক. ইসলামী নেতৃত্ব শর্তসম্পন্ন ইসলামী রাষ্ট্রের আমীর থাকা।
খ. নির্বাচকমন্ডলী কর্তৃক মনোনয়ন প্রাপ্ত আমীর থাকা।
গ. পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে বাইআহ হওয়া।
ঘ. একজন আমীর থাকা।
আমীর একজন হতে হবে, একজনের অধিক আমীর হলে তখন বাইআহ চলবে না বা বাইআহ প্রযোজ্য নয়। কারণ হাদীসের দু’জন বাইআহ নিলে দ্বিতীয় আমীরকে কতলের কথা বলা হয়েছে। কারণ, এটা ইসলামী শরীআতে রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ।

বাইআহ এর হুকুমঃ
ইসলামী রাষ্টের বিশেষজ্ঞগণ একমত যে, বাইআহ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত এবং এটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপর যথাযথভাবে আদায় করা ওয়াজিবে কিফায়্যা। কিছসংখ্যক মানুষ আদায় করলে সবার পক্ষে আদায় হয়ে যাবে যেমন জানাযার সালাত।

বাইআতের পদ্ধতীঃ
বাইআতের তিনটি পদ্ধতী রয়েছে। যথাঃ
১. হাতের উপর হাত রেখে বাইআহ।
২. শুধু কথার মাধ্যমে বাইআহ।
৩. চিঠির মাধ্যমে বাইআহ।

১. হাতের উপর হাত রেখে বাইআহঃ
হাতের উপর হাত রেখে বাইআহ শরীআত সম্মত। আল্লাহ বলেনঃ
আর যারা তোমার কাছে বাই‘য়াত গ্রহণ করে, তারা শুধু আল্লাহরই কাছে বাই‘য়াত গ্রহণ করে; আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর; অতঃপর যে কেউ ওয়াদা ভঙ্গ করলে তার ওয়াদা ভঙ্গের পরিণাম বর্তাবে তারই উপর। আর যে আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করবে অচিরেই আল্লাহ তাকে মহা পুরস্কার দেবেন। (সূরা ফাতহঃ ১০)

২. শুধু কথার মাধ্যমে বাইআহঃ
শুধু কথার মাধ্যমে বাইআহ ইসলামে স্বীকৃত। বিশেষ করে এটি মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মহিলা আমীরের হাতে হাত রাখবেন না। বরং আমীর অঙ্গীকারের বিষয়াবলী পাঠ করে তাদের নিকট মৌখিক স্বীকৃতি নিবেন মাত্র। (সূনানে ইবনে মাজাহ হা/২৮৭৫; সহীহা হা/৫২৯)

৩. চিঠির মাধ্যমে বাইআহঃ
চিঠির মাধ্যমে বাইআহ ইসলামে বৈধ হয়েছে। যেমন- হাদীসে এসেছে,
আব্দুল্লাহ ইবনু দীনার (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন লোকেরা আব্দুল মালিকের নিকট বাইআত নিল, তখন আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা) তার কাছে চিঠি লিখলেন- আল্লাহর বান্দা, মু’মিনদের নেতা আব্দুল মালিকের প্রতি, আমি আমার সাধ্য মোতাবেক আল্লাহর ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত অনুযায়ী তাঁর কথা শোনার ও তাকে মেনে চলার অঙ্গীকার করছি আর আমার ছেলেরাও তেমনি অঙ্গীকার করছে। (বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ৬ষ্ঠ খন্ড, হা/৭২০৫)

বাইআহ ভঙ্গের বিধানঃ
বাইআহ যদি ইসলামের উপর হয়। আর এই বাইআহ যদি কেউ ভঙ্গ করে তাহলে সে ইসলাম হতে বের হয়ে যাবে। তখন কাফির মুরতাদ এ পরিণত হবে। এই বাইআহ কেবলমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্যে খাছ ছিল। তার অবর্তমানে এখন ইসলাম গ্রহণের জনে বাইআহ লাগবে না বরং কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ ও ইসলাম কবুল করলেই মুসলিম হয়ে যাবে। অনুরুপভাবে হিজরতের উপর বাইআহও মক্কা বিজয়ের পর শেষ হয়ে গেছে।

পক্ষান্তরে ইসলামী রাষ্ট্রের আমীরের নিকট আনুগত্যের বাইআহ ওয়াজিব। এটা পরিত্যাগকারী কবীরা গুনাহ সম্পাদন কারী পাপী হবে। এজন্যে যে আল্লাহর নিকট শাস্তি যোগ্য অপরাধী হবে। তবে সে ঈমান থাকায় কাফির বা মুরতাদ হবে না। ইসলামী রাষ্ট্রের আমীরের কথা শ্রবণ ও তার আনুগত্য করার প্রতি বহু হাদীস এসেছে। এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হলঃ

ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কেউ তার আমীরের নিকট অপছন্দীয় কিছু করতে দেখলে ধৈর্য ধারণ করা উচিত। কেননা, যে কেউ জামা‘আত হতে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবার পর মৃত্যুবরণ করবে, সে অন্ধকার যুগের ন্যায় মৃত্যুবরণ করবে।(বুখারী, মুসলিম,মিশকাত হা/৩৪৯৯)

আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে কেউ শাসকের আনুগত্য হতে দূরে সরে যায় এবং মুসলিম জামা‘আত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তদবস্থায় তার মৃত্যু হলে বর্বরতার উপরই তা হবে। আর যে কেউ এমন ঝান্ডার নীচে যুদ্ধ করে যার হক নাহক সম্পর্কে অবগতি নেই; বরং সে গোত্রীয় ক্রোধের বশীভূত হয় বা বংশীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লোকদেরকে সেদিকে ডাকে। অথবা বংশীয় প্রেরণায় সাহায্য করে। এমনতাবস্থায় সে নিহত হলে বর্বরতার উপরই নিহত হবে। আর যে কেউ আমার উম্মাতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে এবং ভাল মন্দ সকলের উপর হামলা করে, এমনকি তা হতে আমার কোন মু‘মিন উম্মাতও রেহাই পায় না। আর আশ্রিত তথা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাথে সম্পাদিত সন্ধিচুক্তিও পূরণ করে না; এমন ব্যক্তির সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই এবং তারও আমার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। (মুসলিম ১৮৪৮, মিশকাত)

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ইমাম/শাসকের আনুগত্য হতে হাত উঠিয়ে নেয়, কিয়ামত দিবসে সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করবে যে, তার নিকট ওজর-আপত্তির কোন যুক্তি থাকবে না। আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, সে ইমাম বা শাসকের আনুগত্যের বাইআত করেনি। সে বর্বরতার উপর মৃত্যুবরণ করবে। (মুসলিম, মিশকাত)

আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, বনী ইসরাঈলের নবীগণ বনী ইসরাঈলের উপর বাদশাহীও করতেন। একজন নবী মৃত্যুবরণ করলে অন্য আরেকজন নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন; কিন্তু আমার পরে আর কোন নবী নেই। অবশ্য খলীফা বা প্রতিনিধি হবে এবং তারা বহুসংখ্যক হবে। সাহাবাগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তখন আমাদের কি করতে হবে বলেন? তিনি যদি আমাদের এমন শাসক নিযুক্ত করেন, যে আমাদের নিকট হতে নিজের প্রাপ্য আদায় করে নিতে চায় কিন্তু আমাদের প্রাপ্য আদায় করে দিতে অস্বীকার করে? তিনি বলেন, তাদের আদেশ শুনবে এবং তাদের আনুগত্য করবে। কেননা, তাদের কর্তব্য হল, তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করা আর তোমাদের কর্তব্য হল তোমাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করা। (মুসলিম, মিশকাত)

হারেস আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি। যথাঃ ১. মুসলিমদের জামাত এবং সংগঠনের সাথে নিজেকে জড়িত রাখবে। ২. আমীরের নির্দেশ মেনে চলবে। ৩. শরী’আতের নির্দেশ ভঙ্গ না করা পর্যন্ত আমীরের আনুগত্য করবে। ৪. হিজরত করবে। ৫. আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। আসলেই যে ব্যক্তি মুসলামনদের জাম’আত হতে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরল, সে নিশ্চয়ই তার গলদেশ থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলল। যে পর্যন্ত না সে ফিরে এসে পুনরায় ঐ জাম’আতের সাথে মিলিত হয়। আর যে ব্যক্তি বর্বর যুগের রীতি-নীতির দিকে অনুষদদেরকে আহবান করবে সে দোযখীদের অন্তর্ভূক্ত। চাই সে সাওমব্রত পালন করুক, ছালাত আদায় করুক এবং নিজেকে মুসলিম বলে ধারণা করুক।” (আহমদ, তিরমিযী, মিশকাত, আলবানী হা/৩৬৯৪, সনদ সহীহ)

এই অংশটুকুর সারমর্মঃ
***বাইআত নিতে হবে মুসলিমদের আমীর তথা শাসকের নিকট থেকে।
***পীর-ফকীর বা তরিকত পন্থীদের বাইআত নেওয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই। কারণ, এই রকমের বায়আতের কোন পদ্ধতীর অস্তিত্ব নেই।
***মুসলিমদের দল বা সংগঠন বলতে একাধিক সংগঠন বুঝানো হয়নি, মুসলমানদের একটি দল যেখানে তাদের আমীর শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী, তার নিকট বাইআতের কথা বলা হয়েছে।
***ইমাম বা শাসকের নিকট থেকে বাইআত ছিন্ন করে যে ব্যক্তি বর্বর যুগের দিকে আহবান করবে সে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করলেও সে দোযখীদের অন্তর্ভূক্ত।
***ইমাম বা শাসক যদি না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে বাইআতের প্রয়োজন নেই বিষয়টা হচ্ছে অনেকটা এরকম, যার যাকাত দেওয়ার মত নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই তার যাকাত প্রদান করার প্রয়োজন নেই ঠিক তেমনি মুসলমানদের ইমাম বা শাসক যদি না থাকে তাহলে বাইআতেরও প্রয়োজন নেই। সে ক্ষেত্রে কালেমা শাহাদাতই হচ্ছে মুসলিম হওয়ার জন্যে যথেষ্ট, বাইআতের জন্য কোন তরীকত পন্থী কিংবা পীরের বা কোন ইসলাম নামধারী বিভিন্ন দলের নিকট বাইআহ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

– অনুলিখন ও সংক্ষেপায়নে : উমর

এই লেখাটি লিখতে যে বইটির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে-
ইসলামে বাইআত, মোঃ আবূ তাহের, গ্রন্থনা: আব্দুছ ছবূর চৌধুরী।

মতামত দিন

কমেন্ট

  • সালাম গ্রহন করবেন, মুল কথা ডা. জাকির নায়েক একজন ইসলাম প্রচারক, বিধায় তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। তবে কিছু বিষয় আমার মতোভেদ আছে যা পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করবো ইনশাআল্লা।ধন্যবাদ।