আক্বীদা

আক্বীদাহ, এর অর্থ এবং গুরুত্ব

আক্বীদাহ, এর অর্থ এবং গুরুত্ব

মূল: ড. আব্দুল আজীজ আল ক্বারী

অনুবাদ ও অনুলিখন: উমর।

এই হাদীসটি বুখারী এবং মুসলিম উভয় সহীহ হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল ﷺ যখন মুয়ায (রা) কে ইয়েমেন পাঠাচ্ছিলেন, তখন তিনি ﷺ তাকে বললেন, “তুমি এমন একটি সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ভুক্ত। প্রথমে তুমি তাদেরকে, শুধুমাত্র আল্লাহকে ইবাদত করার প্রতি আহবান জানাবে এবং যখন তারা আল্লাহ সম্পর্কে জেনে নিবে তখন জানিয়ে দিবে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন…”

এই হাদীসটি বোঝার ক্ষেত্রে খুবই সহজ একটি হাদীস। এই হাদীসটি বুঝার জন্যে খুব একটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন পরে না। রাসূল ﷺ ইসলাম কিভাবে শিক্ষা দিতে হবে তাই হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন। সঠিক ও বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদাহ ছাড়া একজন মুসলিম ইসলাম বিরোধী ধ্যান-ধারণা থেকে বাঁচতে পারে না। সেজন্যেই মহানবী ﷺ নবী হবার পরে মক্কায় সুদীর্ঘ তের বছর থাকাকালীন লোকদের সালাত ও যাকাত, রোযা ও হাজ্জ্ব এবং জিহাদ প্রভৃতি পালন করার আর সুদ ও ব্যাভিচার এবং মদ ও জুয়া ত্যাগ করার নির্দেশ দেবার আগেই আক্বীদাহ বিশুদ্ধ করার এবং মূর্তিপূজা ত্যাগ করার তাগিদ দিতে থাকেন। আর এই পদ্ধতীতেই সাহাবীরা গড়ে উঠেছেন।

Aqeedah meaning and importance

এক যুবক সাহাবী জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, আমরা নবী ﷺ এর সাথে ছিলাম। তখন আমরা নব যুবক ছিলাম। তাই আমরা কুরআন শেখার আগে ঈমান শিখতাম। তারপরে আমরা কুরআন শিখতাম। ফলে ওর কারণে আমাদের ঈমান বেড়ে যেত। (ইবনে মাজাহ)

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেন, আমাদের সময়ে আমরা কুরআন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার আগে প্রথমে ঈমান সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতাম এবং যখন সূরাগুলো নাযিল হত তখন আমরা শিখে নিতাম সেখানে কি বৈধ আর কি অবৈধ, কি করা নিষিদ্ধ আর কি করতে সূরাগুলো নির্দেশ করছে আর সেগুলোর প্রতি আমাদের করণীয় কি তাও আমরা শিখে নিতাম। কিন্তু আমি অনেককেই দেখছি যাদেরকে ঈমান বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করার আগেই কুরআন দেওয়া হচ্ছে আর সে এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে নিচ্ছে অথচ সে জানে না এর(কুরআনের) আদেশগুলো কি কি, নিষেধ গুলো কি কি এবং সে সম্পর্কে করণীয়গুলোই বা কি কি। সে হচ্ছে ঐ ব্যক্তির মতো যে খেজুরগুলোকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে (অর্থাৎ সে তার কুরআন পড়া থেকে কোন উপকার পাচ্ছে না।)

সূরা বাকারা শুরুই হয়েছে এভাবে, “এই সেই (মহা) গ্রন্থ (কুরআন), তাতে (কোন) সন্দেহ নেই, যারা (আল্লাহ তাআলাকে) ভয় করে (এই কিতাব) তাদের জন্যে পথপ্রদর্শক। যারা গায়েবের উপর ঈমান আনে, যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, তাদের আমি যা কিছু দান করেছি তারা তা থেকে ব্যয় করে। যারা তোমার উপর যা কিছু নাযিল করা হয়েচে তার উপর ঈমান আনে- (ঈমান আনে) তোমার আগে যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার ওপর, তারা পরকালের ওপরও বিশ্বাস রাখে। (সত্যিকার অর্থে) এ লোকগুলোই তাদের মালিকের (দেখানো) সঠিক পথের ওপর রয়েছে এবং এরাই সফলকাম। যারা এ বিষয়গুলো অস্বীকার করে তাদের তুমি সাবধান করো আর না করো, (কার্যত) উভয়টাই সমান, এরা কখনও ঈমান আনবে না”। (সূরা বাকারা: ২-৬)

যারা গায়েবের উপর ঈমান আনে – এর মাঝেই ঈমানের যে ছয়টি স্তম্ভ রয়েছে তা একসাথে এসে যায়। গায়েবের প্রতি ঈমানের মাঝেই আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসূলগণের প্রতি ঈমান, ফেরেশতাগণের প্রতি, আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি, পরকালের প্রতি ঈমান এবং তাকদীরের ভাল মন্দের প্রতি ঈমান রয়েছে। এই ঈমান আনার বিষয়গুলো যদি ঠিক না হয়, যদি এর মধ্যে গলদ থেকে যায় তাহলে তাকে যতই বলা হক অমুক কাজটি করো না, তা বলা আর না বলা সমান কথা। কারণ, ‘(সত্যিকার অর্থে) এ লোকগুলোই তাদের মালিকের (দেখানো) সঠিক পথের ওপর রয়েছে এবং এরাই সফলকাম।’ কুরআন মুত্ত্বাকীদের পথ প্রদর্শক আর মুত্ত্বাকীদের যে গুণাবলী আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন সে বিষয়গুলো সম্পর্কে যদি তার আক্বীদা সহীহ না হয়ে গলদ সম্পন্ন হয় তাহলে সে কুরআন দিনে রাতে দুইবার করে খতম দিলেও কুরআন তার কন্ঠ পর্যন্তই থেকে যাবে, বাস্তবে তার কোন উপকার করবে না। কারণ, ”যারা এ বিষয়গুলো অস্বীকার করে তাদের তুমি সাবধান করো আর না করো, (কার্যত) উভয়টাই সমান, এরা কখনও ঈমান আনবে না”।

এই পদ্ধতীতেই রাসূল ﷺ তার সাহাবীদের গড়ে তুলেছেন: প্রথমে ঈমান এরপর কুরআন। আর ঠিক একই সুরে ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: আগে দ্বীন সম্পর্কে বুঝ (অর্থাৎ তাওহীদ) এরপর শরীয়াহ সম্পর্কে বুঝ।
ঈমানের বিশ্বাসকে সর্বপ্রথম সঠিক করতে হবে এরপর দ্বীন ইসলামের সকল দিকের বিষয়গুলো অনুসরণ করতে হবে।

ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর সামনে গলদ ঈমান(অর্থাৎ রাসূল ﷺ এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী না বুঝে নতুন উদ্ভাবিত পন্থায় ঈমান বুঝা) নিয়ে দাড়ানোর চাইতে শিরক ব্যতীত সকল গুণাহ নিয়ে দাড়ানো উত্তম।

কোন ধারণা ও বিশ্বাস যখন মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে যায় তখন ঐ ধারণাটা তার মনের মধ্যে গেঁথে যায় এবং তা গাঁট বাঁধার মতো চিমটে যায়। আরবীতে বাঁধাকে আক্কদ কলে। তাই মনের বদ্ধমুল ধারণাকে আরবীতে আক্বীদা বলা হয়। এই ঈমান ও আক্বীদাহ যখন ইসলাম ভিত্তিক হয় তখন মনের ঐ বিশ্বাসকে ইসলামী ঈমান এবং ঐ বদ্ধমূল ধারণাটাকে ইসলামী আক্বীদাহ নামে অভিহিত করা হয়।

কোন কাজের ভিতই হচ্ছে মনের বিশ্বাস। কোন বিষয়ের উপরে বিশ্বাস না জন্মালে তা করতে কোন মানুষই উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয় না। তেমনি ইসলাম নির্দেশিত সমস্ত কাজকর্মেরই বুনিয়াদ ইসলামী ঈমান ও আক্বীদাহর উপর প্রতিষ্ঠিত। এজন্য ইসলামী কাজকর্ম করার আগে ইসলামী ঈমানের বিষয়টা জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একান্ত ফরজ ও অপরিহার্য কর্তব্য।

আমাদের দেশে যেভাবে ঈমান সম্পর্কিত জ্ঞান আমরা পেয়ে থাকি যার মূল উদ্দেশ্যই থাকে অনেকটা পত্রিকা পড়ে কোন কিছু জানার মতো। যার ফলে ঈমানের বাস্তবিক প্রয়োগ আমাদের মাঝে আমরা খুব কম দেখতে পাই। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, দূর্বল ও গলদ সম্পন্ন আক্বীদা। একটি বিষয় জানা এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করার মধ্যে ঢের পার্থক্য রয়েছে। শুধু জানাটাই ঈমানের মূল উদ্দেশ্য নয়, বিশ্বাস করা এবং সেই বিশ্বাসের সঙ্গতি অনুযায়ী চিন্তা-ভাবনা, কথা এবং কর্ম সম্পন্ন করা অতিব জরুরী। যদি কারো জানাটাই শুধু ঈমানের মূল ভিত্তি হয় তাহলে বলতে হবে তার ঈমান হবে শয়তান এবং ফিরাউনের মতো। শয়তান হচ্ছে অন্যতম জানলেওয়ালা, সে আল্লাহ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে কিন্তু তার গর্ব এবং অহংকার তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অপরদিকে ফিরাউন, যদিও সে দাবী করতো আমিই প্রভু কিন্তু সে জানতো এই বিশ্ব জাহানের মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং তিনিই শুধুমাত্র ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। “মূসা বলল: তুমি একথা ভাল করেই জান, (নবুওয়াতের প্রমাণ সম্বলিত এসব) অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞান আসমানসমূহ ও যমীনের মালিক ছাড়া আর কেউই নাযিল করেননি…”(সূরা ইসরা: ১০২)। যদিও শয়তান এবং ফেরাউন উভয়েই সত্য সম্পর্কে জানতো কিন্তু তারা তাদের এই জানাটাকে কর্মে সম্পাদন করে নি, শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি ইবাদতে নিবেদিত হয়নি।

হাদীসে জিবরীলে রাসূল ﷺ ঈমানের স্তম্ভগুলো বর্ণনা করেছেন যে বিষয়গুলোতে প্রত্যেক মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। রাসূল ﷺ কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ঈমান কি? তিনি বলেছিলেন: আল্লাহর উপর, ফেরেশতাদের উপর, আল্লাহর কিতাব সমূহের উপর, নবী-রাসূলদের উপর, কিয়ামত দিবসের উপর এবং ভাগ্যের ভাল মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান।

মুসলিম মাত্রই ঈমানের এই স্তম্ভগুলো সম্পর্কে সঠিকভাবে জেনে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে ঠিক সেই পদ্ধতীতে যেই পদ্ধতীতে সাহাবীগণ এবং তাদেরকে যারা পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করতো ঠিক তাদের মতো করে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। মুসলিম মাত্রই এটা কর্তব্য। ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “শরীয়াহ’র চেয়ে ঈমান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা বেশী গুরুত্বপূর্ণ”। অর্থাৎ তাওহীদ সম্পর্কিত জ্ঞান সবার আগে অর্জন করতে হবে, ঈমানের স্তম্ভগুলো সম্পর্কে সহীহ আক্বীদার অধিকারী হতে হবে কেননা গলদ আক্বীদা সম্পন্ন ব্যক্তির ইবাদতের কোন মূল্য নেই। কোন খ্রিস্টান, ইহুদী, হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ যদি নামায পরে তাহলে তার সেই নামায উঠা বসা ছাড়া কিছুই হবে না কারণ তার আক্বীদায় চরমপর্যায়ের গলদ রয়েছে।

শাইখুল ইসলাম আল হারুঈ আল আনসারী (মৃত. ৪৮১ হিজরী) তার ‘ইতিকাদ আহলুল সুন্নাহ’ এর শুরুর দিকে লিখেছেন, ‘সর্ব প্রথম আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা বান্দার জন্যে অবশ্য কর্তব্য’। এটি মুয়ায (রা) এর হাদীস থেকে প্রমাণিত, “তুমি এমন একটি সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ভুক্ত। প্রথমে তুমি তাদেরকে, শুধুমাত্র আল্লাহকে ইবাদত করার প্রতি আহবান জানাবে এবং যখন তারা আল্লাহ সম্পর্কে জেনে নিবে তখন জানিয়ে দিবে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন…”

আমরা যদি বড় বড় স্কলারদের কাজের দিকে খেয়াল করি তাহলে দেখব তারা এই পদ্ধতীতেই মানুষকে শিক্ষা দিতেন অর্থাৎ আগে আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান তথা ঈমানের স্তম্ভগুলো সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। উদাহরণ স্বরপ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারী রহিমাহুল্লাহ এর সহীহ আল বুখারীর প্রতি যদি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব- ‘ওহীর সূচনা’ এই অধ্যায় দিয়ে তিনি শুরু করেছেন এরপরের অধ্যায় হচ্ছে ‘ঈমান’ আর ঠিক এর পরের অধ্যায় হচ্ছে ‘ইলম’ অধ্যায়। যার মানে হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের উপর ঈমান সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। আর এই ঈমান সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করার উৎস হচ্ছে ‘ওহী’। মাশাল্লাহ, ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ ‘ওহীর সূচনা’ দিয়ে শুরু করেছেন আর এরপরেই ‘ঈমান’ এবং ‘ইলম’ অধ্যায় রেখেছেন। তিনি যে এভাবে সাজিয়েছেন এমন নয় যে অবচেতন মন থেকে এমনি এমনি করেছেন, আল্লাহ সম্পর্কিত সহীহ জ্ঞান, সহীহ আক্বীদার গুরুত্ব রয়েছেই বলেই এভাবে সাজিয়েছেন।

এই লিখার সারাংশ এটাই যে, ঈমান হতে হবে সহীহ আক্বীদা সম্পন্ন আর এই ঈমান সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করার উৎস হচ্ছে ‘ওহী’ তথা কুরআন এবং সহীহ হাদীস।

ঈমান ও আক্বীদা সম্পর্কিত বিষয়ক জানার জন্যে নিম্নোক্ত বইগুলো পড়া যেতে পারে:
১. ঈমান ও আকীদা – হাফিজ শাইখ আইনুল বারী আলিয়াবী।
২. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা – আব্দুল্লাহ শাহেদ আল মাদানী।
৩. তৌহিদের মূল সূত্রাবলী – ডক্টর আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস।

মতামত দিন