ভ্রান্ত মতবাদ

সুফীবাদঃ সমস্যা কোথায় ?

সুফীবাদঃ সমস্যা কোথায় ?

– আব্দুল্লাহ শাহেদ।

ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানগণ নিঃশর্তভাবে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করে চলতেন। তারা নির্দিষ্ট কোন মাজহাব, তরীকা বা মতবাদের দিকে নিজেদেরকে নিসবত করতেন না। সকলেই মুসলিম বা মুমিন হিসেবে পরিচয় দিতেন। তবে বদরের যুদ্ধ যেহেতু ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল এবং তাতে অংশগ্রহণ করা বিশেষ একটি ফজীলতের কাজ ছিল, তাই যারা বদরের যুদ্ধে শরীক হয়েছেন তাদেরকে বদরী সাহাবী, যারা বাইআতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদেরকে আসহাবে বাইআত এবং দ্বীনি ইলম শিক্ষায় সর্বক্ষণ আত্মনিয়োগকারী সুফ্ফাবাসী কতিপয় গরীব সাহাবীকে আসহাবে সুফ্ফা বলা হত। কিন্তু পরবর্তীর্তে মুসলমানগণ রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য কারণে বিভিন্ন দলে ও উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। মুসলমানদের মাঝে আত্মপ্রকাশ করে শিয়া, খারেজী, মুতাজেলা, কদরীয়া, আশায়েরা, জাহমেয়ী এবং আরও অসংখ্য বাতিল ফির্কা ও মতবাদ।

এরই ধারাবাহিকতায় সুফীবাদও একটি ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে মুসলমানদের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে। সুফী মতবাদ কখন থেকে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে, তার সঠিক সময় নিধারণ করা কঠিন। তবে এ বিশুদ্ধ মতবাদটি হিজরী তৃতীয় শতকে ইসলামী জগতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন শুধু কতিপয় লোকের ব্যক্তিগত প্রবণতা, আচরণ ও আগ্রহের মধ্যেই এটি সীমিত ছিল। কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক দুনিয়ার ভোগবিলাস ও আরাম-আয়েশ পরিহার করে ইবাদতে মশগুল হওয়ার আহবান জানানোর মাধ্যমে এ পথের যাত্রা শুরু হয় ।

পরবর্তীতে ব্যক্তিগতভাবে গড়ে উঠা আচরণগুলো উন্নতি লাভ করে একটি মতবাদে পরিণত হয় এবং সুফীবাদের নামে বিভন্ন তরীকার আবির্ভাব ঘটে।

এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকা, আত্মাকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পরিশুদ্ধ করা, আল্লাহর ভয় দিয়ে অন্তর পরিপূর্ণ রাখা, তাওবা-ইস্তেগফার ও যিকির-আযকারের মাধ্যমে কলব পরিস্কার রাখার প্রতি সুফীরা আহবান জানায়। নিঃসন্দেহে এই কাজগুলোর প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। এগুলো ইসলামের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। তবে পার্থক্য হচ্ছে সুফীরা আত্মশুদ্ধি অর্জন ও আত্মার উন্নতির মাধ্যমে আল্লাহর সান্যিধ্যে পৌঁছার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পথ বাদ দিয়ে কাশ্ফ এবং মুশাহাদার আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কুরআন ও সুন্নাহর পথ বাদ দিয়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করার কারণে সুফীবাদের মধ্যে ইউনানী, পারস্য, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য দর্শন প্রবেশ করে। পরিণামে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সুফীবাদের সূচনা হয় কালের পরিক্রমায় তা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি অগ্রহণযোগ্য মতবাদে পরিণত হয়। তাতে প্রবেশ করে ইসলাম ধ্বংসকারী বিভিন্ন শির্ক ও বিদআত।

পরিস্থিতি যখন এরূপ ভয়াবহ আকার ধারণ করল, তখন উম্মাতের আলেমগণ লেখনী ও ভাষন-বক্তিৃতার মাধ্যমে এই মতবাদের কঠোর প্রতিবাদ করেছেন এবং মুসলমানদেরকে সুফী ও তাদের মতবাদ থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়েছেন। আল্লামা ইবনে তাইমীয়ার ভূমিকা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশেও সুফীবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশেও রয়েছে অসংখ্য সুফী তরীকা ও মতবাদ।

মুসলমানদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমরা এ প্রবন্ধে প্রচলিত সুফীবাদের কিছু আকীদা-বিশ্বাস ও আমল বর্ণনা করবো। যাতে একজন মুসলিম এ সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং যারা সুফী দর্শনে বিশ্বাসী তারাও যেন সুফীবাদের সমস্যাগুলো জানতে পারেন এবং প্রচলিত সুফীবাদের বিশ্বাস, কথা ও কাজগুলো কুরআন ও হাদীছের কতটুকু কাছে বা তা থেকে কতটুকু দূরে তাও অনুমান করতে পারেন। মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে সঠিক কথা শুনা ও তা মানার তাওফীক দেন। আমীন।

প্রচলিত সুফীবাদের কতিপয় বিশ্বাস

সুফীবাদের যেহেতু বিভিন্ন তরীকা রয়েছে তাই তরীকা ও মাশায়েখ অনুযায়ী তাদের রয়েছে বিভিন্ন আকীদা ও কার্যক্রম। নিম্নে আমরা অতি সংক্ষেপে তাদের কতিপয় আকীদাও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করবো। এখানে মনে রাখতে হবে যে, সুফীবাদের সকল সমর্থকের ভিতরেই নিম্নের ভুল-ভ্রান্তিগুলো রয়েছে তা বলা কঠিন।

১) الحلول হুলুলঃ

সুফীদের কতিপয় লোক হুলুল তথা সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর অবতরণে বিশ্বাস করে। হুলুল-এর সংজ্ঞায় আলেমগণ বলেনঃ

أما الحلول فمعناه أن الله يحل في بعض مخلوقاته، ويتحد معها، كاعتقاد النصارى حلوله في المسيح عيسى ابن مريم، واعتقاد بعض الناس حلوله في الحلاج، وفي بعض مشايخ الصوفية،

হুলুল এর তাৎপর্য হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর কতিপয় সৃষ্টির মধ্যে অবতরণ করেন এবং তার সাথে মিশে একাকার হয়ে যান। যেমন খৃষ্টানদের ধারণা যে, ঈসা ইবনে মারইয়ামের মাধ্যমে স্বয়ং আল্লাহ অবতরণ করেছিলেন। সুফীদের কতিপয় লোকের বিশ্বাস হচ্ছে প্রখ্যাত সুফী সাধক মানসুর হাল্লাজ এবং অন্যান্য কতিপয় সুফী সাধকের মধ্যে আল্লাহ অবতরণ করেছেন। নাউযুবিল্লাহ।

২) وحدة الوجود ওয়াহদাতুল উজুদঃ

এর তাৎপর্য হচ্ছে, وأما الاتحاد فمعناه أن عين المخلوقات هو عين الله تعالى অর্থাৎ সৃষ্টিজীব এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। ইবনে আরবী এ মতেরই সমর্থ ছিলেন। তার মতে পৃথিবীতে যা আছে সবই মাবুদ। অর্থাৎ সবই সৃষ্টি এবং সবই মাবুদ। এ অর্থে কুকুর, শুকর এবং অন্যান্য নাপাক সৃষ্টিও মাবুদ হতে কোন বাঁধা নেই। সুতরাং যারা মূতি পূজা করে তারা আল্লাহরই এবাদত করে। ইবনে আরাবীর মতেঃ

إن العارف المكمل هو من يرى عبادة الله والأوثان شيء واحد

অর্থাৎ পরিপূর্ণ মারেফত হাসিলকারীর দৃষ্টিতে আল্লাহর এবাদত ও মূর্তিপুজা একই জিনিষ।

ইবনে আরাবী তার কবিতায় বলেনঃ

العبد رب والرب عبد * يا ليت شعري من المكلف

إن قلت عبد فذلك حق * أو قلت رب فأنى يكلف

বান্দাই প্রভু আর প্রভুই বান্দা। আফসোস যদি আমি জানতাম, শরীয়তের বিধান কার উপর প্রয়োগ হবে। যদি বলি আমি তাঁর দাস তাহলে তো ঠিকই। আর যদি বলি আমিই রব তাহলে শরীয়ত মানার প্রয়োজনীয়তা কোথায়?

৩) সুফীদের কতিপয় লোক আল্লাহ্ তাআলার সত্বা, নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আশায়েরা ও মাতুরিদীয়া আকীদায় বিশ্বাসী।

৪) অলী-আওলীয়াদের আহবানঃ

তারা নবী ও জিবীত এবং মৃত অলী-আওলীয়াদের কাছে দুআ করে থাকে। তারা বলে থাকেঃ ইয়া জিলানী, ইয়া ইয়া রিফাঈ, ইয়া রাসূলুল্লাহ ইত্যাদি। অথচ আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে ছাড়া অন্যেকে আহবান করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দুআ করবে, সে মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لا يَنْفَعُكَ وَلا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ

“তুমি আল্লাহ্ ব্যতীত এমন বস্তুকে ডাকবে না যে তোমার উপকার কিংবা ক্ষতি কোনটিই করতে পারে না। যদি তুমি তাই কর তবে তুমি নিশ্চিত ভাবেই জালেমদের মধ্যে গন্য হবে। (ইউনুসঃ ১০৬)।

আল্লাহ্ তাআলা আরো বলেন:

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ

এবং ঐ ব্যক্তির চেয়ে আর কে বেশী পথভ্রষ্ট যে আল্লাহ্ ব্যতীত এমন ব্যক্তিদেরকে আহবান করে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না এবং তারা তাদের ঐ আহবান থেকে স¤পূর্ন বেখবর রয়েছে? (আহকাফঃ ৫)

৫) গাউছ, কুতুব, আবদাল ও নুজাবায় বিশ্বাসঃ

সুফীরা বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীতে কতিপয় আবদাল, কুতুব এবং অওলীয়া আছেন, যাদের হাতে আল্লাহ্ তাআলা পৃথিবী পরিচালনার কিছু কিছু দায়িত্ব সোপর্দ করে দিয়েছেন। সুতরাং তারা তাদের ইচ্ছামত পৃথিবীর কাজকর্ম পরিচালনা করে থাকেন। এটি এমন একটি বিশ্বাস যা মক্কার মুশরিকরাও পোষণ করত না। আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের সম্পর্কে কুরআনে বলেনঃ

قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمْ مَنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ

হে নবী! আপনি জিজ্ঞেস করুন, তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে কে রুযী দান করেন? কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃত্যুকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ্! তখন তুমি বলো, তারপরেও ভয় করছ না? (সূরা ইউনুসঃ ৩১)

তিনি আরও বলেনঃ

يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ

“তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন। (সূরা সাজদাঃ ৫)

এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, غوث অর্থ হচ্ছে ত্রাণ কর্তা। এটি আল্লাহর গুণ। কোন মানুষ গাউছ হতে পারে না। ঢাকা শহরের মহাখালীতে মাসজিদে গাউছুল আযম নামে বিশাল একটি মসজি রয়েছে। আমরা সকলেই জানি এখানে গাউছুল আযম দ্বারা বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীকে বুঝানো হয়েছে। আল-গাউছুল আল-আযাম অর্থ হচ্ছে মহান ত্রাণকর্ত। যারা আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)কে মহা ত্রাণ কর্তা হিসেবে বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন হলো, তারা কি এ ধরণের কথার মাধ্যমে বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)কে আল্লাহর সমান করে দেন নি?

৬) সুফী তরীকার মাশায়েখগণ বিপদা-পদে উদ্ধার করতে পারেনঃ

সুফীরা বিশ্বাস করেন যে, তাদের মাশায়েখ ও অলীগণ বিপদাপদ হতে উদ্ধার করতে সক্ষম। তাই বিপদাপদে তারা তাদের অলীদেরকে আহবান করে থাকে। তারা বলে থাকে মদদ ইয়া আব্দুল কাদের জিলানী, হে উমুক, হে উমক ইত্যাদি। এভাবে বিপদাপদে আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আহবান করা প্রকাশ্য শির্কের অন্তুর্ভূক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

“আর যদি আল্লাহ্ তোমাকে কোন কষ্ট দেন, তবে তিনি ব্যতীত তা অপসারণকারী কেউ নাই। পক্ষান্তরে যদি তোমার মঙ্গল করেন, তবে তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান”। (সূরা আনআমঃ ১৭)

৭) এবাদতের সময় সুফীরা দ্বীনের সর্বোচ্চ স্তর তথা ইহসান তাদের নিজ নিজ মাশায়েখদের দিকে মতাওয়াজ্জেহ করে থাকে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

الإحسان أن تعبد الله كأنك تراه فإن لم تكن تراه فإنه يراك

“ইহসান হল, এমন ভাবে তুমি আল্লাহ পাকের ইবাদত করবে যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছ। যদি তাঁকে দেখতে নাও পাও তবে (বিশ্বাস করবে যে,) তিনি তোমাকে অবশ্যই দেখছেন। (সহীহ মুসলিম)

৮) নবী-রাসূলদের সম্পর্কে সুফীদের ধারণাঃ

নবী-রাসূলদের ব্যাপারে সুফীদের বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। তাদের কতিপয়ের কথা হচ্ছে, خضنا بحراً وقف الأنبياء بساحله অর্থাৎ আমরা এমন সাগরে সাতার কাটি, নবীগণ যার তীরে দাঁড়িয়ে থাকেন। অর্থাৎ সুফীগণ এমন মর্যাদায় পৌঁছতে পারেন, যা নবীদের পক্ষেও সম্ভব নয়।

৯) অলী-আওলীয়াদের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাসঃ

অলী-আওলীয়াদের ক্ষেত্রে সুফীদের আকীদা হচ্ছে, তাদের কেউ নবীদের চেয়ে অলীগণকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, অলীগণ এবং আল্লাহর মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহর সকল গুণই অলীদের মধ্যে বর্তমান। যেমন সৃষ্টি করা, রিযিক প্রদান করা, কাউকে জীবন দান করা, কাউকে মৃত্যু দান করা ইত্যাদি আরও অনেক।

১০) আমাদের নবী (সাঃ) ক্ষেত্রে সুফীবাদের কতিপয় লোকের বিশ্বাসঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে সুফীদের বিশ্বাস এই যে, তিনি হচ্ছেন সৃষ্টি জগতের কুব্বা তথা গম্বুজ। তিনি আরশে সমাসীন। সাত আসমান, সাত জমিন, আরশ-কুরসী, লাওহে মাহফুয, কলম এবং সমগ্র সৃষ্টিগত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কথার সত্যতা যাচাই করতে বুসেরীর কাসীদাতুল বুরদার একটি লাইন দেখুনঃ

فإنَّ من جودك الدنيا وضرَّتها + ومن علومك علم اللوح والقلمِ

হে নবী! আপনার দয়া থেকেই দুনিয়া ও আখেরাত সৃষিট হয়েছে। আর আপনার জ্ঞান থেকেই লাওহে মাহফুয ও কলমের জ্ঞান উদ্ভাসিত হয়েছে। সুফীদের কতিপয় লোকের বিশ্বাস যে, তিনি হচ্ছেন সর্বপ্রথম সৃষ্টি। এটিই প্রখ্যাত সুফী সাধক ইবনে আরাবী ও তার অনুসারীদের আকীদা। কতিপয় সুফীবাদের মাশায়েখ এমতকে সমর্থন করেন না; বরং তারা এ কথাগুলোর প্রতিবাদ করেন এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মানুষ মনে করেন ও তাঁর রেসালাতের স্বীকৃতি প্রদান করেন। তবে তারা রাসূলের কাছে শাফাআত প্রার্থনা করেন, আল্লাহর কাছে তাঁর উসীলা দিয়ে দুআ করেন এবং বিপদাপদে রাসূলের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। আসুন দেখি বুসেরী তার কবিতায় কি বলেছেনঃ

يا أكرم الخلق ما لي من ألوذ به + سواك عند حلول الحوادث العمم

“হে সৃষ্টির সেরা সম্মানিত! আমার জন্য কে আছে আপনি ব্যতীত, যার কাছে আমি কঠিন বালা মসীবতে আশ্রয় প্রার্থনা করবো?” (নাউযুবিল্লাহে মিন যা-লেক)

সুফীবাদের সমর্থক ভাইদের কাছে প্রশ্ন হলো বুসেরীর কবিতার উক্ত লাইন দু’টির মধ্যে যদি শির্ক না থাকে, তাহলে আপনারাই বলুন শির্ক কাকে বলে?

পরিতাপের বিষয় জহচ্ছে আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সিলেসাসে শির্ক মিশ্রিত এ জাতীয় কবিতা পাঠ্য করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এগুলো পাঠ করে ইসলামী শিক্ষার নামে শির্ক ও বিদআতী শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষকগণ যদি শির্ক মিশ্রিত সিলেবাস নির্ধারণ করে তা দিয়ে আমাদের জাতি গঠনের কাজে আত্ম নিয়োগ করেন, তাহলে আমরা তাওহীদের সঠিক শিক্ষা পাবো কোথায়?

১১) ফিরআউন ও ইবলীসের ক্ষেত্রে সুফীদের একদলের বিশ্বাসঃ عقيدة الصوفية في فرعون وإبليس

সুফীদের কতিপয় লোক ইবলীস ও ফেরাউনকে পরিপূর্ণ ঈমানদার ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা মনে করে। সুফী দর্শনের মতে ইবলীস সর্বোত্তম সৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত এবং সে পরিপূর্ণ ঈমানদার। আর মিশরের রিআউন সম্পর্কে সুফীদের কতিপয়ের কথা হচ্ছে, ঈমানের পরিপূর্ণ হাকীকত অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল বলেই সে একজন সৎ লোক ছিল। ফিরআউনের কথাঃ أنا ربكم الأعلى “আমি তোমাদের মহান প্রভু” এর তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে সুফীদের কতিপয় লোক বলেঃ ফিরআউন নিজের ভিতরে উলুহীয়াতের অস্থিত্ব খুঁজে পেয়েছিল বলেই এ রকম কথা বলেছে। কেননা তাদের মতে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই আল্লাহ। সুতরাং প্রতিটি সৃষ্টিই এবাদত পাওয়ার অধিকার রাখে। সুতরাং যে ব্যক্তি ইবলীসের এবাদত করল, সে আল্লাহরই এবাদত করল এবং যে ফিরআউনের এবাদত করল সে আল্লাহরই এবাদত করল। (নাউযুবিল্লাহ)

মানসুর হাল্লাজ এবং ইবনে আরাবী মনে করেন, শয়তানকে আল্লাহর রহমত থেকে বিতারিত করা হয় নি এবং সে জাহান্নামীও নয়। সে তাওবা করে পরিশুদ্ধ হয়ে জান্নাতী হয়ে গেছে। মানসুর হাল্লাজ সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছে যে, শয়তান ও ফিরআউন হচ্ছে তার আদর্শ ও ইমাম। এই জাতীয় কথা যে, বাতিল ও মিথ্যা তার প্রতিবাদ ছাড়াই ইসলাম সম্পর্কে সামান্য ধরাণার অধিকারী অতি সহজেই বুঝতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوّاً وَعَشِيّاً وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ

সকালে ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাঊন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর। (সূরা মুমিনঃ ৪৬)

১২) কবর ও মাজার সম্পর্কে সুফীদের আকীদাঃ عقائد الصوفية في القبور والمزارات

সুফী ও সুফিবাদের প্রভাবিত ব্যক্তিগণ অলী-আওলীয়া ও তরীকার মাশায়েখদের কবর পাকা করা, কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ, তাতে বাতি জ্বালানো, কবর ও মাযার যিয়ারত করার উপর বিশেষ গুরত্ব প্রদান করে থাকে। অথচ নবী (সাঃ) এ থেকে তাঁর উম্মতকে কবর নিয়ে বাড়াবাড়ি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেনঃ

اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنًا يُعْبَدُ اشْتَدَّ غَضَبُ اللَّهِ عَلَى قَوْمٍ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ

হে আল্লাহ্! আমার কবরকে পূজার স্থানে পরিণত করো না, যাতে এর ইবাদত করা হয়। আল্লাহ্ অভিশাপ করেছেন ঐ জাতিকে যারা তাদের নবীদের কবর সমূহকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরী করেছে।” (মুসনাদে আহমাদ) আবু হুরায়রা (রাঃ) এর সূত্রে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ

لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ

ইহুদী খৃষ্টানদের প্রতি আল্লাহ্র লানত। কারণ তারা তাদের নবীদের

কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।”

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আবুল হায়্যায আল আসাদীকে বলেন, দুআআমি কি তোমাকে এমন আদেশ দিয়ে প্রেরণ করব না, যা দিয়ে নবী (সাঃ) আমাকে প্রেরণ করেছিলেন?

أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا إِلَّا طَمَسْتَهُ وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ

কোন মূর্তী পেলেই তা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবে। আর কোন কবর উঁচু পেলেই তা ভেঙ্গে মাটি বরাবর করে দিবে।” (মুসলিম)

এমনিভাবে নবী (সাঃ) নিষেধ করেছেন, কবর পাকা করতে, চুনকাম করতে, তার উপর বসতে, কবরে লিখতে। আর তিনি অভিশাপ করেছেন ঐ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে যারা কবরকে মসজিদ বানায় এবং সেখানে বাতি জালায়। (মুসলিম) সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈন (রাঃ) এর যুগে ইসলামী শহর সমূহে কোন কবর পাকা করা বা কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ করা হয় নি। না নবী (সাঃ) এর কবরে না অন্য কারও কবরে। এরপরও কি আমাদের সমাজের বিপথগামী লোকদের হুশ হবে না?

১৩) মৃত আওলীয়ার নামে মান্নত পেশ করাঃ تقديم النذور للأولياء الأموات

সুফীবাদে বিশ্বাসীগণ মৃত অলী-আওলীয়াদের কবর ও মাজারের জন্য গরু, ছাগল, হাস-মুরগী-কবুতর, টাকা-পয়সা ইত্যাদি মানত করাকে ছাওয়াবের কাজ মনে করে থাকে। অথচ কুরআন ও সহীহ হাদীছের মাধ্যমে জানা যায় যে মানত হচ্ছে বিরাট একটি এবাদত, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশ্যে করা সম্পূর্ণ শির্ক।

সুতরাং মান্নত যেহেতু আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ এবাদত, তাই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য তা পেশ করা শির্ক। যেমন কেউ বললঃ উমুক ব্যক্তির জন্য নযর মেনেছি। অথবা এই কবরের জন্য আমি মান্নত করেছি, অথবা জিবরীল (আঃ)এর জন্য আমার মানত রয়েছে। উদ্দেশ্য হল এগুলোর মাধ্যমে তাদের নৈকট্য অর্জন করা। নিঃসন্দেহে ইহা শির্কে আকবরের অন্তর্গত। এ থেকে তওবা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তোমরা যাই খরচ কর বা নযর মান্নত কর না কেন আল্লাহ্ সে সমপর্কে অবগত থাকেন। (সূরা বাকারাঃ ২৭০) কোন বস্তকে আল্লাহ্র ইলমের সাথে সমপর্কিত করা হলে সে বিষয় হল ছওয়াব অর্জনের স্থান। আর যে বিষয়ে ছওয়াব পাওয়া যায় সেটাই তো ইবাদত। আর যে কোন ইবাদত গাইরূল্লাহর জন্য সম্পাদন করা অবৈধ। আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ

يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا

তারা মান্নত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূরপ্রসারী। (সূরা দাহরঃ ৭) আর এ ধরণের মান্নত যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় করা হয়, যেমন কেউ মান্নত করল, আমি আজমীর শরীফে কিংবা বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী অথবা খাজা বাবার উদ্দেশ্যে একটি ছাগল যবাই করবো, তাহলে শির্ক হবে এবং তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।

১৪) অলী-আওলীয়ার উসীলাঃ

সকল প্রকার সুফী তরীকার লোকদের আকীদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এই যে, তারা মৃত অলীদের উসীলা দিয়ে দুআ করে থাকেন, গোনাহ থেকে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। উসীলা অর্থ হচ্ছে, যার মাধ্যমে কারও নৈকট্য অর্জন করা যায়, তাকে উসীলা বলা হয়। আর কুরআন ও হাদীছের পরিভাষায় যে সমস্ত বিষয় দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা যায়, তাকে উসীলা বলা হয়। কুরআন মাযীদে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট উসীলা প্রার্থনা কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা মায়িদাঃ ৩৫) সাহবা, তাবেয়ী এবং পূর্ববর্তী সম্মানিত উলামায়ে কিরাম থেকে উসীলার যে অর্থ বর্ণিত হয়েছে, তা হল ভাল আমল করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। ইমাম ইবনে যারীর (রঃ) وَابْتَغُوا إِلَيْه الْوَسِيلَة এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ আল্লাহর সন্তোষ জনক আমল করার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা কর। ইমাম ইবনে কাছীর (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করে বলেন, উসীলা অর্থ নৈকট্য। মুজাহিদ, হাসান, আবদুল্লাহ ইবনে কাছীর, সুদ্দী এবং ইবনে যায়েদ থেকেও অনুরূপ কথা বর্ণিত হয়েছে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহর আনুগত্যমূলক এবং সন্তোষ জনক কাজ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর। উপরোক্ত কথাগুলো বর্ণনা করার পর ইবনে কাছীর (রঃ) বলেন, উসীলার ব্যাখ্যায় যা বলা হলো, এতে ইমামদের ভিতরে কোন মতবিরোধ নেই। কাজেই আয়াতের মাঝে উসীলার অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। (দেখুন তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩/১০৩) উপরোক্ত আয়াতকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে যারা আম্বীয়ায়ে কিরাম, আওলীয়াদের ব্যক্তিসত্বা এবং তাদের সম্মানের উসীলা দেয়া বৈধ মনে করে, তাদের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বাতিল এবং কুরআনের আয়াতকে পরিবর্তনের শামিল। এমনকি কুরআনের আয়াতকে এমন অর্থে ব্যবহার করা, যার কোন সম্ভাবনা নেই এবং যার পক্ষে গ্রহণযোগ্য কোন মুফাসসিরের উক্তি নেই। আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত আলেম উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলে থাকে, আল্লাহ তায়ালা এখানে পীর ধরতে বলেছেন। পীরই হলো উসীলা। পীর না ধরলে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। এ ধরণের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বানোয়াট। পূর্ব যুগের গ্রহণযোগ্য কোন আলেম এ ধরণের ব্যাখ্যা করেন নি।

১৫) ইসলামের রুকনগুলো পালনের ক্ষেত্রে সুফীদের দৃষ্টিভঙ্গিঃ

সুফীবাদে বিশ্বাসীগণ মনে করেন যে, তাদের কল্পিত অলীদের উপর নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি কোন কিছুই ফরজ নয়। কেননা তারা এমন মর্যাদায় পৌঁছে যান, যেখানে পৌঁছতে পারলে এবাদতের প্রয়োজন হয় না। তাদের কথা হচ্ছেঃ

إذا حصلت المعرفة سقطت العبادة

মারেফত হাসিল হয়ে গেলে এবাদতের কোন প্রয়োজন নেই। তারা তাদের মতের পক্ষে কুরআনের একটি আয়াতকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

واعبد ربك حتى يأتيك اليقين

তুমি ইয়াকীন আসা পর্যন্ত তোমার রবের এবাদত কর। (সূরা হিজিরঃ ৯৯) সুফীরা বলে থাকে এখানে ইয়াকীন অর্থ হচ্ছে, মারেফত। এই মারেফত হাসিল হওয়ার পূর্ণ পর্যন্ত আল্লাহর এবাদত করতে হবে। তা হাসিল হয়ে গেলে এবাদতের আর কোন প্রয়োজন নেই। তাদের এই কথাটি সম্পূর্ণ বাতিল। ইবনে আব্বাস (রাঃ)সহ অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এখানে ইয়াকীন অর্থ হচ্ছে, মৃত্যু। (দেখুনঃ ইবনে কাছীরঃ (৪/৫৫৩)

সুতরাং তাদের কথা হচ্ছে নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি এবাদত সাধারণ লোকেরা পালন করবে।

১৬) সুফীদের যিকির ও অযীফাঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন মুসলিম ঘুম থেকে উঠে, ঘুমানোর সময়, ঘরে প্রবেশ কিংবা ঘর হতে বের হওয়ার সময় থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পঠিতব্য অসংখ্য যিকির-আযকার শিখিয়েছেন। কিন্তু সমস্ত সুফী তরীকার লোকেরা এ সমস্ত যিকির বাদ দিয়ে বিভিন্ন ধরণের বানোয়াট যিকির তৈরী করে নিয়েছে। নকশবন্দী তরীকার লোকেরা যিকরে মুফরাদ তথা শুধু الله (আল্লাহ) الله (আল্লাহ) বলে যিকির করে। শাযেলী তরীকার لا إله إلا الله এবং অন্যান্য তরীকার লোকে শুধু هوهو হু হু বলে যিকির করে থাকে। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ এভাবে আওয়াজ করে বা আওয়াজবিহীন একক শব্দ দ্বারা যিকির করার কোন দলীল নেই; বরং এগুলো মানুষকে বিদআত ও গোমরাহীর দিকে নিয়ে যায়। (মাজমুআয়ে ফতোয়াঃ পৃষ্ঠা নং- ২২৯) আমাদের দেশেরে বিভিন্ন পীরদের মুরীদদেরকে যিকরে জলী ও যিকিরী খফী নামে বিভিন্ন ধরণের বিদআতী যিকির করতে দেখা যায়, যেগুলোর কোন শরই ভিত্তি নেই।

১৭) চুলে ও দাড়িতে ঝট বাঁধাঃ

সুফীবাদের কতিপয় লোকের মাথায় ও দাড়িতে ঝট বাঁধতে দেখা যায়, কারও শরীরে লোহার

শিকল, কাউকে উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়। এটি সাহাবী, তাবেয়ী বা তাদের পরবর্তী যুগের কোন আলেম বা সাধারণ সৎ লোকের নিদর্শন ছিল না। এমন কি আব্দুল কাদের জিলানী, শাইখ আহমাদ রেফায়ী এবং সুফীরা যাদেরকে সুফীবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করেন তাদের কেউ এ ধরণের রেবাস গ্রহণ করেন নি।

১৮) অলী-আওলীদের নামে শপথঃ

অলীও আওলীদের নামে শপথ করা সুফী তরীকার লোকদের একটি সাধারণ ব্যাপার। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেনঃ

مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ

যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করল সে শির্ক করল। (আবু দাউদ)

১৯) হালাল-হারামঃ

যে সমস্ত সুফী ওয়াদাতুল উজুদে বিশ্বাসী তারা কোন কিছুকেই হারাম মনে করে না। মদ, জিনা-ব্যভিচারসহ সকল প্রকার কবীরা গুনাহতে লিপ্ত হওয়াই তাদের জন্য বৈধ।

তথ্যসূত্রঃ

ক) আল-কুরআনুল কারীম

খ) সহীহ মুসলিম

গ) ফুসুসুল হিকাম লেখক ইবনে আরাবী

ঘ) الموسوعة الميسرة في الأديان والمذاهب والأحزاب المعاصرة

ঙ) তাবলীগি নিসাব ফাজায়েলে আমাল

চ) তালীমে মারেফত

ছ) সুফীবাদের সমর্থক ও সুফীবাদ দ্বারা প্রভাবিত বিভিন্ন বক্তার ক্যাসেট ও সিডি

জ) সুফীবাদ দ্বারা প্রভাবিত বক্তাদের থেকে শুনা ওয়াজ-নসীহত

ঝ) ইন্টার নেটের বিভিন্ন ওয়াবে সাইট

মতামত দিন