পর্যালোচনা প্রবন্ধ

সত্য ও সুন্দরের পথে এক বালকের অভিযাত্রা

সত্য ও সুন্দরের পথে এক বালকের অভিযাত্রা

লিখেছেন: সামিয়া সামি

একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত…

আমার আর রুহানের কথোপকথন…

রুহান এসেই আমাকে বলল…

-hey dude what’s up?

= আরে মামা তুই কখন আইলি? ওই তোর কাসে সিগারেট আসে?

– হ আসে। এই নে। মামা মাইয়াডারে দ্যাখ, ঐযে রাস্তা দিয়া হাইটা যাইতেসে, joss…

= আসলেই জোস তো।… জানিস তোরে তো আসল কথাই কই নাই, কালকে আমারে ওই সুন্দরি ফোন দিসিল।

– কি মামা, কার কথা কও? কত মাইয়াই তো তোমারে ফোন দেয়।

= আরে শম্পার কথা কইতাসি। ও ফোন দিয়া আমারে প্রপোজ করসে।

– কও কি মামা!! তোর কপালটা আসলেই অনেক ভাল। আমরা সারাদিন কাইন্দাও একটা মাইয়া পটাইতে পারি না, আর তুই মামা একলগে কতডিরে ঘুরাস। কিরে, এইডাও কি টাইম পাস ? নাকি সিরিয়াস?

= সিরিয়াস হমু আমি তাইলেই হইসে। চল কালকে একটা পার্টি দেই। কই যাবি ক?

– তাই নাকি? চরম হইব তাইলে। চল সাভারে আমাদের ফার্মহাউজে যাই। কেউ থাকে না সেখানে।

= ওকে নো প্রবলেম। সবাইরে ইনভাইট করা শুরু করি, তোর কেয়ারটেকার রে ফোন কইরা খাবার এর এরেঞ্জ করতে ক। যা খরচ আসে আমি দিমু যা।

– সাউন্ড সিস্টেম, লেটেস্ট মিউজিক এর চিন্তা করিস না। এগুলোর ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

= এখনি সবাইরে ডাকতেসি। শম্পা, সানিয়া, বাঁধন, প্রিয়া, সারিকা, তানিয়া, মাহমুদ, জামিল, সাজ্জাদ, রেজা, জাহান……… সবাইরেই তো বললাম। আর কেউ বাদ পরসে মামা?

– উমমম… সামায়রা এর কথা তো কইলি না।

= কি মামা সামায়রা… হুমম… ঘটনা কি? পটাইয়া ফালাইস?

– তোর কোন সমস্যা? তুই মামা ৩ টা ফোন লইয়া সারাদিন কথা কবি, হাজার মাইয়ার লগে, আর আমি একটারে পটাইলেই হিংসা লাগে?

= যা ফাইনাল। কালকে যাইতাসি তাইলে। সবাই ৯ টার মধ্যে চলে আসবে। তোরা একটা মাইক্রো করে যাবি, আর আমি snacks আর drinks নিয়ে আমার জান, সুইটহার্ট কার এ আসব। ………

 

পরদিন, সারাদিন হইহুল্লর, গানবাজনা আর নাচাচি করে বাড়ি ফিরলাম অনেক রাত করে। মডার্ন পরিবারের ছেলে বলে কথা। কোন বাধা ধরা নিয়ম নাই। অফুরন্ত স্বাধীনতা, যেমন খুশি তেমন করে চললেও বাধা দেয়ার কেউ নাই। সেই কলেজে পড়ার সময় থেকেই পকেটে তিন তিনটা মোবাইল, হাজারো কথা সারাদিন। খাওয়ার টাইম, ঘুমের টাইম, এমন কি বাথরুমেও আমার ফোনে কথা বলা লেগেই থাকে। আমার ফোনে এত ব্যাস্ত থাকা দেখে মা আমাকে বলেন বিজনেস ম্যাগনেট। লেটেস্ট মিউজিক, ক্লাস ফাকি দিয়ে ঘুরে বেড়ানো, বন্ধু-বান্ধবির সাথে আড্ডা, সিগারেট খাওয়া, কনসার্ট, জিম এসব আমার নিত্য দিনের সাথী। অনেকটা yo boy, আর cool dude টাইপ এর ছেলে আমি। কারো পরওয়া আমি করি না। সারাদিন ভাইগিরি করে বেড়ানো, আর তাই দেখে মেয়েরা আমার জন্য পাগল, অনেকটা হিরো বনে গেছি তাদের মাঝে। হাজারো মেয়ে আমার পিছে ঘুর ঘুর করে, আমিও তাদের সময় দেই। একেক সময়ে একেক রকমের ফ্যাশন করে বেড়াই, কখনও স্পাইক করি চুলে, কখনও বা মেয়ে মানুষের মত চুল বড় রেখে ঝুঁটি করি। আবার হাতে মেয়ে মানুষের মত ব্রেসলেট পরি। কোনদিন বাইক আবার কোনদিন প্রাইভেট কার এ ভার্সিটি আসি, পড়ালেখার নাম গন্ধ আমার মাঝে নাই, এভাবে এক বছর চলে গেল আর সেমিস্টার শেষ হল মাত্র একটা। আমি বুঝতে পারলাম এই ভার্সিটিতে থাকলে আমার পড়া লেখা হবে না, অন্য একটায় ট্রান্সফার হলাম। এভাবেই যেতে থাকল আমার দিন, কিন্তু আমার কিছুই ভাল লাগতো না কেন যেন। কিসের যেন একটা শুন্যতা অনুভব করতাম। সবকিছু ছিল, তবুও কি যেন নেই মনে হত। কি যেন একটা হচ্ছে না আমার জীবনে, কিছু একটা মিস করে যাচ্ছি, তখনও বুঝিনি আমি কি মিস করছি।

 

মায়ের মুখে শোনা, আমার জন্ম হয়েছিল ৬ মাসে। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছিল আমাকে বাঁচানো সম্ভব না। আমাকে বাচালে আমার মা মারা যাবে। তখন আমার মা আল্লাহর কাছে বলেছেন, আল্লাহ তুমি আমাকে মৃত্যু দিয়ে আমার সন্তানকে বাঁচাও। আমার মায়ের দুয়া আল্লাহ কবুল করলেন, আমাকে আর মাকে দুজনকেই বাঁচিয়ে দিলেন। আমার জন্মের পর আমাকে তুলার মধ্যে রাখা হয়েছিল, আমার চোখ ফোটেনি তখনও। ডাক্তার বলেছিল আমি হয় খুব দুর্বল হব নাহয় অনেক শক্তিশালী হব, আমি শক্তিশালী কিনা জানি না, তবে আমি দুর্বল না আলহামদুলিল্লাহ…

 

আমি ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলাম, আর আমার দুষ্টামির মাত্রাও বাড়তে লাগলো। আমার দুষ্টামির জালায় সবাই অতিষ্ঠ ছিল। আমাকে বেঁধে রাখা হত, এত দুষ্ট ছিলাম আমি। পড়ালেখা মোটেই করতে চাইতাম না। মা অনেক মারধর করে আমাকে পড়িয়েছেন। এভাবে ক্লাস এইট পর্যন্ত গেল। ক্লাস নাইন এ উঠে আমি আরও দুষ্ট হলাম। স্যাররা ক্লাস এ ঢুকেই আগে আমাকে মারতেন পরে পড়ানো শুরু করতেন, কারন তারা জানতেন আমি দুষ্টামি করবই। তাই আগেই মেরে রাখতেন। অনেক জ্বালিয়েছি তাদের।

 

একবার বাসায় কথা হচ্ছিল দেশের বাইরে আমাকে পাঠিয়ে দিবে। উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য। তো আমি শিক্ষা অফিসে গেলাম আমার SSC আর HSC এর যাবতীয় কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য, তারা সাফ জানিয়ে দিল এটাতে অনেক সমস্যা আছে, কোনদিনই ঠিক হবে না, এটা শুনেও আমি বার বার চেষ্টা করতে লাগলাম ওগুলো ঠিক করার। কিন্তু কোন লাভ হল না, টানা ৫ বছর দৌড়িয়েছি। কিছুতেই আমি সেগুলো ঠিক করতে পারলাম না। শেষে আমি খুব হতাশ হলাম, একদমি ভেঙ্গে পড়লাম। কোনকিছুই ভাল লাগতো না, সারাদিন মন মরা হয়ে পড়ে থাকতাম। তখনি মনে হল একমাত্র আল্লাহ্‌ই আমার সাহায্য করতে পারেন, তিনি পারেন আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষ্যা করতে। আমি নামাজ পড়া শুরু করে দিলাম, আমার এখনও মনে আছে আমি জোহরের নামাজ দিয়ে শুরু করেছি। আমি আল্লাহর কাছে আমার প্রবলেমের কথা বলে হেল্প চাইলাম, প্রথম একমাস শুধু এটাই চাইতাম আল্লাহর কাছে যেন সব ঠিক হয়ে যায়।

 

وَاسْتَعِينُواْ بِالصَّبْرِ وَالصَّلاَةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلاَّ عَلَى الْخَاشِعِينَ 45 (surah Baqarah)

ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।

 

তারপর আশ্চর্যজনক ভাবে আমার পরিবরতন হতে লাগলো। আমি এরপর থেকে কান্নাকাটি করতে লাগলাম। আমার মাঝে আখিরাতের ভয় চলে আসল, আর আমি এতদিন যে পাপ করেছি তারজন্য ক্ষমা চাওয়া শুরু করলাম। আমি নিয়মিত কুরান, হাদিস অর্থসহ পড়তে লাগলাম।

 

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُواْ لِي وَلاَ تَكْفُرُونِ 152 (surah Baqarah)

সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; অকৃতজ্ঞ হয়ো না।

 

আমি দাঁড়ি রাখলাম। আমার পরিবার থেকে এর বিরধিতা করা হলেও আমি শুনলাম না, আমার মজবুত ইমানের কারনে আমি তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলামিক জীবন যাপন করা শুরু করলাম। এখন তারা আর আমাকে কোন কিছুতে বাঁধা দেয় না। আমার আব্বু আমাকে নিয়ে গর্ব করেন এখন। আমার আম্মু সর্বদাই দুয়া করেন আমার জন্য।

 

إِلاَّ الَّذِينَ تَابُواْ وَأَصْلَحُواْ وَبَيَّنُواْ فَأُوْلَـئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 160 (surah Baqarah)

তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু

 

আমি আমার খামখেয়ালি পূর্ণ জীবনকে সম্পূর্ণ ভাবে বিদায় দিলাম, সব হারাম কে গুড বাই জানালাম, আর লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিলাম আমার দাম্ভিকতাকে। আমি চেষ্টা করছি সম্পূর্ণ ভাবে কুরান আর সুন্নাহর অনুসরণ করতে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র আইন বাস্তবায়ন করতে। আমি এখন আমার মা-বাবা, বোনদের ইসলামের পথে দাওয়াত দেই, তাদের আহ্বান করি সুন্দর সত্যের পথে। ইনশাআল্লাহ আমি একদিন সফল হব, আল্লাহ চাইলে তাদের হেদায়েত দিবেন।

 

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ 31 (surah Al-Imran)

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু

 

আমার এই পরিবর্তনের পর থেকে জীবনের সবকিছুই অনেক সহজ হয়ে গেছে। সবকিছুই সুন্দর ভাবে হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ্‌……, এখন মানুষ আমাকে অনেক ভালবাসে, সম্মান করে। পথে বের হলেই আমাকে মানুষ এখন সালাম দেয়। আমি এখন BBA 9 semester আছি আলহামদুলিল্লাহ্‌। আর আমার SSC, HSC এর documents গুলতে যে প্রবলেম ছিল, তাও ঠিক হয়ে গেছে ৯ মাস আগে, আলহামদুলিল্লাহ্‌। যারা বলেছিল দুনিয়া শেষ হয়ে গেলেও এগুলো ঠিক হবে না, তারা অনেক অবাক হয়েছে। আমি তাদের বলেছিলাম, আল্লাহ তাদেরি সাহায্য করেন যারা আল্লাহ্‌র পথে থাকেন, আর সীমা লঙ্ঘনকারীদের তিনি ধ্বংস করে দেন।

 

يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَن يَشَاء وَاللّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ 74 (surah Al-Imran)

তিনি যাকে ইচ্ছা নিজের বিশেষ অনুগ্রহ দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।

 

আমাদের সবারই উচিৎ আল্লাহ্‌র দিকে ধাবিত হওয়া। আমরা যদি আল্লাহ্‌র দিকে এক কদম এগিয়ে যাই তিনি আমাদের দিকে দৌড়ে আসেন। আপনারা যদি বুঝতেন যে কি শান্তি আছে এই সত্য সুন্দর ইসলামের পথে, আমি আল্লাহ্‌র কসম করে বলছি তাহলে আপনারা এই পথে চলতেন।

 

بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ 112 (surah Baqarah)

হাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পন করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার বয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না

সূত্র

মতামত দিন