প্রশ্ন ও উত্তর বিদআত

মৃত ব্যক্তির কুরবানী কি শারী‘আত সম্মত ?

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া কি শারী‘আত সম্মত?

আমাদের সমাজে মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা যাবে কি যাবে না মর্মে অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন। অতএব এ বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি। ইসলামী শারী‘আতের একটি নীতি হচ্ছে এই যে, যে কোন মুসলিম ব্যক্তি সাওয়াবের আশায় ইবাদাত হিসেবে কিছু করতে চাইলে অবশ্যই যা করতে চাচ্ছে তার সমর্থনে কুরআনের আয়াত অথবা সহীহ্ হাদীস থেকে দলীল থাকতে হবে। যদি সহীহ্ দলীল থাকে তাহলে তা করা যাবে আর যদি না থাকে তাহলে তা করা যাবে না। আর দলীল না থাকলেই তা নবাবিস্কার এবং বিদ‘আত হিসেবে গণ্য হবে।

এ রকমই একটি বিষয় হচ্ছে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে কি যাবে না এ বিষয়টি। আমরা যদি‘ এর সমর্থনে দলীল অনুসন্ধান করতে যায় তাহলে দেখব যে, মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা যাবে মর্মে কোন সহীহ্ দলীল পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি মৃত ব্যক্তির সাথে কুরবানীর কোন সম্পৃক্ততাই নেই।

ইমাম আবূ দা‘ঊদ এবং ইমাম তিরমিযী এ মর্মে দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন নিম্নে সে দু’টি নিয়ে আলোচনা করা হলো:
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَحَدَّثَنَا شَرِيكٌ عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ عَنْ الْحَكَمِ عَنْ حَنَشٍ قَالَرَأَيْتُ عَلِيًّا يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ فَقُلْتُ لَهُ مَا هَذَا فَقَالَ إِنَّرَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصَانِي أَنْ أُضَحِّيَعَنْهُ فَأَنَا أُضَحِّي عَنْهُ.
ইমাম আবূ দাঊদ বলেনঃ আমাদেরকে উসমান ইবনু আবী শাইবাহ্ হাদীস বর্ণনা করে (শুনিয়েছেন), তিনি বলেনঃ আমাদেরকে শারীক হাদীস বর্ণনা করে (শুনিয়েছেন), তিনি আবুল হাসনা হতে, তিনি আল-হাকাম হতে, তিনি হানাশ হতে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেনঃ আমি আলী (রা.) কে দু’টি মেষ যবেহ করতে দেখেছি। আমি তাকে বললাম এ কি? (অর্থাৎ দু’টি কেন?) তিনি উত্তরে বললেনঃ রসূল (স:)( আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করার জন্য অসিয়্যাত করে গেছেন। তাই আমি তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করছি। (হাদীসটি সহীহ্ নয় / আবূ দাঊদ: ২৭৯০)

আর ইমাম তিরমিযীর ভাষাটি হচ্ছে নিম্নরূপঃ
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدٍ الْمُحَارِبِيُّالْكُوفِيُّ حَدَّثَنَا شَرِيكٌ عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ عَنْ الْحَكَمِ عَنْحَنَشٍ عَنْ عَلِيٍّ أَنَّهُ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ أَحَدُهُمَا عَنْالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْآخَرُ عَنْ نَفْسِهِ فَقِيلَلَهُ فَقَالَ أَمَرَنِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِوَسَلَّمَ فَلَا أَدَعُهُ أَبَدًا

ইমাম তিরমিযী বলেনঃ আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু ওবাইদ মুহারিবী কূফী হাদীস বর্ণনা করে শুনিয়েছেন, তিনি বলেনঃ আমাদেরকে শারীক হাদীস বর্ণনা করে শুনিয়েছেন, তিনি আবুল হাসনা হতে, তিনি আল-হাকাম হতে, তিনি হানাশ হতে, তিনি আলী (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি (আলী) দু’টি মেষ কুরবানী দিতেন, একটি নাবী (স:) এর পক্ষ থেকে আর দ্বিতীয়টি তার নিজের পক্ষ থেকে। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ আমাকে নাবী (সাল্লালহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ( তা করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। অতএব আমি কখনও তা ছাড়ব না। (হাদীসটি গারীব / তিরমিযী: ১৪৯৫)

রসূল (স:) কর্তৃক অসিয়্যাত করা মর্মে ইমাম তিরমিযী এবং আবূ দাঊদ কর্তৃক বর্ণনাকৃত উক্ত হাদীসদ্বয়ের সনদে তিন তিনজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। অতএব যখন হাদীসটি দুর্বল তখন এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা কোনক্রমেই সঠিক হতে পারে না।
কোন কোন আলেম উক্ত হাদীসের দ্বারা দলীল গ্রহণ করে বলেছেন যে, যদি মৃত ব্যক্তি অসিয়্যাত করে যায় তাহলে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে। কিন্তু যেহেতু দুর্বল হওয়ার কারণে হাদীসটির দ্বারা দলীলই গ্রহণ করা যাচ্ছে না, তখন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানীর ব্যাপারে অসিয়্যাত করে যাওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হচ্ছে না। এরূপ কথা বললে তা দলীলনির্ভর কথা হবে না। তবে অসিয়্যাতের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভিত্তিক ‘আম হাদীসের কারণে মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে যদি তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার অসিয়্যাত করে যেয়ে থাকে তাহলে তার এক তৃতীয়াংশ সম্পদের মধ্য থেকে তা তার অভিভাবক বাস্তবায়ন করবে। তবে কুরবানী করার জন্য অসিয়্যাত করাকে সুন্নাত মনে করা যাবে না। কারণ এ মর্মে বর্ণিত হাদীসটি সহীহ্ নয়।

রসূল (স:) এর স্ত্রী খাদীজাহ্ মক্কাতে মারা গিয়েছিলেন এবং তাঁর তিন মেয়ে পরবর্তীতে মারা যান, তাঁর চাচা হামযাহ্ মারা যান কিন্তু তিনি তাদের কারো পক্ষ থেকেই কুরবানী করেননি। যদি এরূপ করা বিধিসম্মত হত তাহলে অবশ্যই তিনি তাঁর উম্মাতকে তা করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি আর এরূপ নির্দেশনা প্রদান না করাই প্রমাণ করছে যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা শারী‘আত সম্মত নয়। যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা শারী‘আত সম্মত হতো তাহলে রসূল (স:) সে সময়েই বলে দিতেন। কিন্তু তিনি তা বলে যাননি। অতএব মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করার প্রশ্নই আসে না। আর ইসলামী শারী‘আতের ফিকহ শাস্ত্রের একটি পরিভাষা হচ্ছে لا يجوز تأخير البيان عن وقت الحاجة. -লা ইয়াযূযু তা’খীরুল বায়ানে আন অকতিল হাজাতে- অর্থাৎ ‘প্রয়োজনের সময় থেকে দেরী করে ব্যাখ্যা আসা না-জায়েয’।

তবে মৃত পিতা-মাতাকে নিজের কুরবানীর পশুর সাথে সাওয়াবে অংশীদার করার নিয়্যাত করাকে কোন কোন বিশিষ্ট আলেম জায়েয আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক তারা কোন সৎকর্ম করে যে পরিমাণ সাওয়াব অর্জন করে এর সমপরিমাণ সাওয়াব পিতা এবং মাতাও পান। এ ক্ষেত্রে সন্তানের সাওয়াবে কোন প্রকার ঘাটতি করা হয় না। অতএব পিতা বা মাতার পক্ষ থেকে কুরবানীর নিয়্যাত করারই প্রয়োজন নেই। এছাড়া নিম্নের হাদীস থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, একটি ছাগল এক ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ঃ
عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍيَقُولُ: سَأَلْتُ أَبَا أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيَّ كَيْفَ كَانَتْ الضَّحَايَاعَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: كَانَالرَّجُلُ يُضَحِّي بِالشَّاةِ عَنْهُ وَعَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ فَيَأْكُلُونَوَيُطْعِمُونَ…).

আতা ইবনু ইয়াসার হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি আবূ আইঊব আনসারী (রা.) -কে জিজ্ঞেস করেছিলাম রসূল (স:)এর যুগে কিভাবে কুরবানী করা হতো? উত্তরে তিনি বললেনঃ নাবী (স:) এর যুগে এক ব্যক্তি একটি ছাগল কুরবানী করত নিজের এবং তার গৃহের সদস্যদের পক্ষ থেকে। অতঃপর নিজেরা খেতো এবং অন্যদেরকে খাওয়াতো …। [হাদীসটি সহীহ্, ‘‘সহীহ্ তিরমিযী’’ (১৫০৫) ও ‘‘সহীহ্ ইবনে মাজাহ্ (৩১৪৭)]। অতএব এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হচ্ছে সাওয়াবে গৃহের অন্যান্য সদস্যরাও সম্পৃক্ত হবে। এ থেকে এরূপ বুঝা যায় না যে, মৃত পিতা বা মাতার নাম উল্লেখ করে নিয়্যাত করতে হবে কিংবা তাদের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে কুরবানী করলে গ্রহণযোগ্য হবে।

কেউ কেউ নিম্নের হাদীসের দ্বারা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে মর্মে দলীল গ্রহণ করে থাকেনঃ
عَنْ جَابِرِ بْنِعَبْدِ اللَّهِ قَالَ شَهِدْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَالْأَضْحَى بِالْمُصَلَّى فَلَمَّا قَضَى خُطْبَتَهُ نَزَلَ عَنْ مِنْبَرِهِفَأُتِيَ بِكَبْشٍ فَذَبَحَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَبِيَدِهِ وَقَالَ بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ هَذَا عَنِّي وَعَمَّنْ لَمْيُضَحِّ مِنْ أُمَّتِي.
জাবের হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেনঃ আমি রসূল (স:) এর সাথে ঈদুূল আযহার মুসল্লায় উপস্থিত ছিলাম। তিনি যখন তাঁর খুদবাহ শেষ করলেন তখন তাঁর মিম্বার থেকে নামলেন। অতঃপর একটি মেষ নিয়ে আসা হলো। তিনি এটি আমার এবং আমার উম্মাতের যারা যাব্হ করেনি তাদের পক্ষ থেকে নিজ হাতে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে যাবহ করলেন। (হাদীসটি তিরমিযী: ১৫২১; আবূ দাঊদ: ২৮১০ বর্ণনা করেছেন)

নিম্নের হাদীসটির দ্বারাও দলীল গ্রহণ করার চেষ্টা করা হয়ঃ
عَنْ عَائِشَةَ وَعَنْ أَبِيهُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَاأَرَادَ أَنْ يُضَحِّيَ اشْتَرَى كَبْشَيْنِ عَظِيمَيْنِ سَمِينَيْنِ أَقْرَنَيْنِأَمْلَحَيْنِ مَوْجُوءَيْنِ فَذَبَحَ أَحَدَهُمَا عَنْ أُمَّتِهِ لِمَنْ شَهِدَلِلَّهِ بِالتَّوْحِيدِ وَشَهِدَ لَهُ بِالْبَلَاغِ وَذَبَحَ الْآخَرَ عَنْمُحَمَّدٍ وَعَنْ آلِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
আয়েশা ও আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত হয়েছে, রসূল (স:) যখন কুরবানী করার ইচ্ছা করতেন তখন বড়, মোটাসোটা, শিং বিশিষ্ট এবং কালো রংয়ের চেয়ে সাদার পরিমাণ বেশী এরূপ দু’টি খাসি করা মেষ ক্রয় করে একটি তাঁর উম্মাতের পক্ষ থেকে সেই ব্যক্তির জন্য যাব্হ করতেন যে আল্লাহর এক (এবং অদ্বিতীয়) হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছে এবং তিনি (মুহাম্মাদ) যে আল্লাহর বাণীকে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এ সাক্ষ্য দিয়েছে তার জন্য। আর দ্বিতীয়টি মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পরিবারের পক্ষ থেকে যাব্হ করতেন। [হাদীসটি সহীহ্ দেখুন ‘‘সহীহ্ ইবনু মাজাহ্’’ (৩১২২)]।
এ হাদীসে প্রমাণ মিলছে যে, একটি মেষ এক ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে এবং সাওয়াবের ক্ষেত্রেও তারা সকলে অংশীদার হবে।

আর রসূল (স:) তাঁর উম্মাতের যারা কুরবানী করেনি তাদের পক্ষ থেকে একটি মেষ কুরবানী করেছেন। উম্মাতের পক্ষ থেকে এরূপ মেষ কুরবানী করাটা তাঁর খাস ব্যাপার ছিল। এর উপর ভিত্তি করে অন্য কেউ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করবেন তা হতে পারে না। কারণ যদি এরূপ করা জায়েযই থাকত তাহলে রসূল (স:) এর মৃত্যুর পর চার খালীফা সহ অন্যান্য বিশিষ্ট সহাবীগণ হতে অবশ্যই তা সহীহ্ সূত্রে সাব্যস্ত হত। কিন্তু তাঁর সহাবীগণ মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন মর্মে সহীহ্ সূত্রে এর কোন প্রমাণ মিলে না। অতএব তাঁর সুন্নাত হিসেবে সে যুগে যা করা হয়নি এ যুগে তা করা জায়েয হতে পারে না।

 

সূত্র

মতামত দিন