সিয়ামের আদব, করণীয় ও বর্জণীয় (পর্ব: ৩)

সিয়ামের আদব, করণীয় ও বর্জণীয় (পর্ব: ৩)
আজকের পর্বের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সাওম ভঙ্গের কারণ এবং ভয় ও আশা পোষণ করা। প্রত্যেক বিষয়ের একটি সীমানা আছে, এ সীমা যাতে অতিক্রম না হয়ে যায় এ লক্ষ্যে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য হাদিসে নির্দেশ এসেছে। যদিও সীমানা পর্যন্ত যাওয়া বৈধ কিন্তু সাবধানতা অবলম্বন বিধেয়। মনে রাখতে হবে রমজানের দিনের বেলা সিয়াম ভেঙে ফেলা একটি কবিরা গুনাহ। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি বা এমনটি হবে বুঝতে পারিনি বলে কবিরা গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। এ ধরনের কথা কখনো অজুহাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

৬. যা কিছু সাওম ভঙ্গের সহায়ক তা পরিহার করে চলা: সিয়াম পালনকারীর এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যে, যে সকল আচার-আচরণ সিয়াম ভঙ্গ করার কারণ হয় অথবা সিয়াম নষ্ট করার সহায়ক হয় এমন সকল বিষয় থেকে দুরত্ব বজায় রাখা। সাওম ভঙ্গের কারণ ৮ টি-ক) স্ত্রী সহবাস: রোযাদার যদি রমাযানের দিনে স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হয় তবে উক্ত সাওম কাযা আদায়সহ জটিল কাফ্ফারা আদায় করতে হবে। আর তা হলো: একটি গোলাম আজাদ করা, যদি সামর্থ্য না থাকে তবে ধারাবাহিক দুই মাস (মাঝে বিরতি ছাড়া) রোযা রাখতে হবে আর যদি তার সামর্থ্য না থাকে তবে ৬০ জন মিসকীনকে খাওয়াতে হবে।

খ) বীর্যপাত: জাগ্রতাবস্থায় হস্ত মৈথুন, স্ত্রীর সাথে মেলা মেশা করা, চুমো দেয়া, স্পর্শ করা অথবা অন্য কোন কারণে বীর্যপাত হলে সাওম বিনষ্ট হয়ে যাবে।

গ) পানাহার: উপকারী বা ক্ষতি কারক (যেমন ধূমপান) কোন কিছু পানাহারে সাওম ভেঙে যায়।

ঘ) ইনজেকশন যোগে খাদ্যের সম্পূরক খাদ্য জাতীয় কোন কিছু প্রয়োগ করলে। কিন্তু তা যদি খাদ্যের সম্পূরক না হয় তবে শরীরের যেখানেই প্রয়োগ করা হোক যদিও তার স্বাদ গলায় অনুভূত হয় সাওম নষ্ট হবে না।

ঙ) ইনজেকশন যোগে রক্ত প্রয়োগ: যেমন সিয়ামকারী যদি রক্ত শূন্যতা দেখা দেয় আর তার ফলে ইন্জেকশন প্রয়োগে রক্ত প্রবেশ করান হয় তবে সাওম নষ্ট হয়ে যাবে।

চ) মাসিক ঋতু স্রাব ও সন্তান প্রসব জনিত স্রাব।

ছ) শিংগা বা এ জাতীয় কিছু লাগিয়ে রক্ত বের করা, তবে যদি রক্ত স্বাভাবিকভাবে যেমন নাক থেকে রক্তক্ষরণ বা দাঁত উঠানোর ফলে বা এ ধরনের অন্য কারণে বের হয় তবে সাওম বিনষ্ট হবে না।

জ) বমি করলে: ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে রোযা নষ্ট হবে কিন্তু অনিচ্ছায় বমি করলে সাওম নষ্ট হবে না।

৭. ভয় ও আশা পোষণ করা: প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির কর্তব্য হল সকল ইবাদত ও সিয়াম-সালাত সঠিক পদ্ধতিতে আদায় করা। কিন্তু সে জানে না তার এ সালাত ও সিয়াম আল্লাহ কবুল করেছেন না প্রত্যাখ্যান করেছেন। অতএব তার সর্বদা এ ভয় থাকা উচিত যে, হয়তো আমি আমার ইবাদত-বন্দেগি এমনভাবে আদায় করতে পারিনি যেভাবে আদায় করলে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। ফলে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান হয়তো পাব না। আবার এ আশাও পোষণ করা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে আমার ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে আমার ইবাদত-বন্দেগি কবুল করে আমাকে প্রতিদান দেবেন। এ অবস্থার নাম হল আল-খাওফ ওয়ার রজা অর্থাত্ ভয় ও আশা। এটা ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ আকীদাগত পরিভাষা। মনে রাখতে হবে আল্লাহ তাআলা সকলের নেক আমল কবুল করেন না। যেমন তিনি বলেন :
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ.
“অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কাজ কবুল করেন।” (সূরা মায়েদাহ: ২৭)
হাদিসে এসেছে আয়েশা রা. এ আয়াতের অর্থ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ স. কে জিজ্ঞেস করলেন:
“وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ” وَجِلَةٌ قَالَتْ عَائِشَةُ أَهُمْ الَّذِينَ يَشْرَبُونَ الْخَمْرَ وَيَسْرِقُونَ قَالَ لَا يَا بِنْتَ الصِّدِّيقِ وَلَكِنَّهُمْ الَّذِينَ يَصُومُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَتَصَدَّقُونَ وَهُمْ يَخَافُونَ أَنْ لَا يُقْبَلَ مِنْهُمْ أُولَئِكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ.
“(যারা তাদের যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে)- এ কথা কাদের জন্য বলেছেন, যারা মদ্য পান করে, চুরি করে তাদের জন্য? তিনি উত্তরে বললেন: না, হে সত্যবাদীর কন্যা! তারা হল, যারা সিয়াম পালন করে, সালাত আদায় করে, দান-সদকা করে সাথে সাথে এ ভয় রাখে যে হয়তো আমার এ আমলগুলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী। (তিরমিযী)

বর্ণিত আয়াত ও হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হল যে, আল্লাহ ঐ সকল মুনিমদের প্রশংসা করেছেন যারা নেক আমল করে কবুল হবে কি হবে না এরকম একটা ভয় পোষণ করে। এবং কাজ আরো সুন্দর করার চেষ্টা করে। কিন্তু এ ভয় যেন আবার মানুষকে নৈরাশ্যবাদী না করে। কোন অবস্থাতেই কোন মুসলিম আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত থেকে নিরাশ হতে পারে না। আল্লাহর সম্পর্কে নৈরাশ্যবাদী হওয়া একটা কুফরি। নেক আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে প্রবল আশাবাদী হতে হবে কিন্তু এ আশাবাদী মনোভাব যেন অহংকার ও আত্ম-তৃপ্তিতে ফেলে না দেয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অহংকার ও আত্ম-তৃপ্তি নেক আমলকে বাতিল করে দেয়। অনেক সময় অলসতা নিয়ে আসে। অপরদিকে ভয় মানুষকে তত্পর ও কর্মঠ হতে সাহায্য করে। তাই সকলের উচিত সকল প্রকার নেক আমল করতে হবে ভয় ও আশা নিয়ে। শুধুই ভয় অথবা শুধুই পাওয়ার আশায় নয়।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button
slot gacor skybet88 slot online skybet88 skybet88 skybet88 slot gacor skybet88 skybet88 slot bonus new member skybet88 slot shopeepay skybet88 skybet88 skybet88 slot shopeepay slot gacor skybet88 demo slot skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 skybet88 mgs88 mgs88